জৈব-রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া দিয়ে চেতনাকে ব্যাখ্যা করতে চাওয়ার সীমাবদ্ধতা

মানুষজনকে প্রায়ই বলতে দেখি যে, আমরা আসলে কিছু বৈদ্যুতিক সংকেত আর কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টি ব্যাতীত আর কিছুই না। কথাটা যদিও মোটাদাগে সঠিক, এর মাঝে কিছুটা সরলীকরণ রয়েছে।

সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসী বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক রেনে দেকার্ত(Rene descartes) জগতকে আত্মা বা মন(mind) এবং বস্তু(matter)  এই দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন। দেকার্তের ধারণা ছিল, মন এবং বস্তু দুটো ভিন্ন মাত্রার জিনিষ। সকল ফিজিকাল ল শুধুমাত্র বস্তুর জন্য প্রযোজ্য, মনের জন্য নয়।  মানুষ মাইন্ড এবং ম্যাটার উভয়ের সমন্বয়েই গঠিত। যেহেতু এই মাইন্ড এবং ম্যাটারের একটা মিলনস্থল থাকতে হবে, দেকার্ত ধরে নিয়েছিলেন এই মাইন্ড এবং ম্যাটারের সমন্বয় ঘটে মানব মস্তিষ্কের পিনেয়াল গ্রন্থিতে(pineal gland).  দেকার্তের নিজের ভাষায়ঃ

 

“ আমার মনে হয় যে এই গ্রন্থি হল মনের প্রধান আসন, এখান থেকেই সকল চিন্তার জন্ম হয়। আমার এই বিশ্বাসের পেছনে কারণ হল, এই অংশ বাদে আমি মস্তিষ্কের এমন কোন অংশ খুঁজে পাই না, যা সংখ্যায় দুটো করে নেই। যেহেতু আমরা দুটি চোখ দিয়ে শুধু একটি জিনিষ দেখি, দুটি কান দিয়ে শুধু একটি কণ্ঠ শুনি, এবং কখনোই একসাথে একের বেশি চিন্তা করি না। তাহলে এটা খুবই পরিষ্কার যে আমার দুটি চোখ বা দুটি কান দিয়ে যে অনুভূতিগুলো প্রবেশ করে, সেগুলো মনের কাছে পৌঁছানোর আগে শরীরের কোন অংশে একীভূত হয়। এখন আমার কাছে এই গ্রন্থি বাদে মস্তিষ্কের আর কোন অংশই এর জন্য উপযুক্ত মনে হচ্ছে না।“ (সূত্রঃ Reality: A Very Short Introduction, Oxford University Press.)

বর্তমান সময়ের মূলধারার নিউরোসায়েন্টিস্টরা অবশ্য বস্তুবাদী (materialistic) ধারণার অনুসারী, তারা দেকার্তের এই মন-বস্তু বিভাজনের হাইপোথিসিসের মধ্যে না গিয়ে শুধু বস্তুর মিথস্ক্রিয়া দিয়েই সবকিছু ব্যাখ্যা করার পক্ষে। তবে এখনো পর্যন্ত শুধু বস্তুর মিথস্ক্রিয়া দিয়ে চেতনাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা সফল হয় নি।  একটু শুদ্ধভাবে বললে, consciousness is not reducible to matter. বস্তুর মিথস্ক্রিয়া দিয়ে চেতনার ‘subjectivity’(এর বাংলা অনুবাদ সম্ভবত হতে পারে ‘আমিত্ব’ ঘরানার কোন কিছু)কে  ব্যাখ্যা করা যায় না। সবকিছু যদি স্রেফ বস্তুর রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া হয়, তাহলে এর মাঝে ‘আমি’ বা ‘আমার’ এর জন্ম কোথায়?

এখনো পর্যন্ত কেউই এই ‘Objective’ এবং ‘Subjective’  জগতের মাঝে  সেতুবন্ধন ঘটাতে সক্ষম হননি। নিউরোসায়েন্টিস্ট Susan Blackmore তার ‘Consiousness:A very Short Introduction’ বইতে এই সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন চেতনার ‘কঠিন সমস্যা(Hard problem)’ হিসেবে।

“ এই সমস্যাকে বলা হয় চেতনার ‘কঠিন সমস্যা’। সর্বপ্রথম এই নামের ব্যাবহার করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান দার্শনিক ডেভিড চামার। তিনি এর মাধ্যমে এই অতিরিক্ত রকমের কঠিন সমস্যাকে আরও অপেক্ষাকৃত সহজ সমস্যা থেকে আলাদা করতে চেয়েছিলেন। চামারের মতে, সহজ সমস্যা(easy problem) হলো সেগুলোই, যেগুলো আমরা এখনো সমাধান করে না ফেললেও কিভাবে সমাধান করতে হবে সে সম্পর্কে ধারণা রাখি। এর মাঝে আছে সংবেদনশীলতা(perception), শিক্ষা(learning), মনোযোগ(attention), স্মৃতি(memory), কিভাবে আমরা বিভিন্ন বস্তু সনাক্ত করি বা উদ্দীপকের(stimuli) প্রতি কিরকম প্রতিক্রিয়া দেখাই, জাগৃতি এবং নিদ্রামগ্ন অবস্থার পার্থক্য কি। চামারের মতে, এই সমস্ত সমস্যাই সহজ, স্বয়ং অভিজ্ঞতার(experience) নিজেরই কঠিন সমস্যার সাথে যদি তুলনা করা হয়।“ (সূত্রঃ  Consiousness:A very Short Introduction, Susan Blackmore, Oxford University Press)

চেতনার সাবজেক্টিভিটির এই সমস্যা আদৌ কখনো ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে কিনা, সেটা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

 

“চেতনার প্রকৃতি নিয়ে নিউরোসায়েন্টিস্ট, মনোবিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন, এখনো করে যাচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দার্শনিক দাবি করেছেন যে, এইসব গবেষণায় যাই উঠে আসুক না কেন, এটা কখনোই চেতনার প্রকৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করবে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল, চেতনার মাঝে কোন এক রহস্যময় ব্যাপার রয়েছে, যা কোন পরিমাণের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ভিত্তি কি? এর পেছনে মূল যুক্তি হল, সচেতন অভিজ্ঞতা(conscious experience)  জাগতিক অন্য সবকিছুর চেয়ে মৌলিকভাবে স্বতন্ত্র, এর মাঝে একটি ‘আমিত্বের বোধ’ (subjective aspect) রয়েছে। একটি ভৌতিক মুভি দেখার কথা বিবেচনা করা যাক। এটা একটা অভিজ্ঞতা যার এক স্বতন্ত্র ‘অনুভূতি’(‘feel’) রয়েছে।  আজকালকার ভাষায় বললে,  এই অভিজ্ঞতার ‘এইরকম একটা অনুভূতি’ রয়েছে। নিউরোসায়েন্টিস্টরা হয়তো একদিন কিভাবে কোন  জটিল প্রক্রিয়ায় এই ভয়ের অনুভূতি  সৃষ্টি হয় সেটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। কিন্তু সেটা কি ব্যাখ্যা করতে পারবে কেন একটা ভৌতিক মুভি দেখলে অন্যরকম লাগার পরিবর্তে এরকম লাগে? অনেকেরই ধারণা, পারবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, মস্তিষ্কের বৈজ্ঞানিক গবেষণা খুব বেশি হলে আমাদেরকে ধারণা দিতে পারে মস্তিষ্কের কোন প্রক্রিয়া কোন সচেতন অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু, এটা থেকে আমরা কোন ধারণা পাই না যে কেন পুরোপুরি বস্তুগত(physical) প্রক্রিয়া থেকে স্বতন্ত্র সাবজেক্টিভ ‘অনুভূতির’ জন্ম হবে। তাই চেতনা, অন্তত চেতনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অধীনস্ত নয়।

যদিও এটা বেশ শক্তিশালী যুক্তি, সব দার্শনিক এই মতের সাথে একমত নন, সব নিউরোসায়েন্টিস্ট তো ননই। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেটের সুপরিচিত একটি বইয়ের দাম্ভিক শিরোনাম হল ‘Consciousness explained’. চেতনা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বাইরে- এই মতের সমর্থকদের অনেকসময় দুর্বল কল্পনাশক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও এই মুহূর্তে মস্তিষ্কের বিজ্ঞান সঠিকভাবে আমিত্বকে ব্যাখ্যা করতে পারছে না, আমরা কি এমন কোন পুরোপুরি ভিন্নরকম মস্তিষ্কের বিজ্ঞানের আগমন কল্পনা করতে পারি না, যেটা ব্যাখ্যা করতে পারবে কেন আমাদের অনুভূতিগুলো এভাবে অনুভূত হয়? দার্শনিকদের অনেকদিনের ঐতিহ্য হলো বিজ্ঞানীদের জ্ঞান দিয়ে বেড়ানো যে কোনটা কোনটা অসম্ভব,  পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানের উন্নতি যেটা ভুল প্রমাণিত করেছে। শুধুমাত্র সময়ই বলে দেবে চেতনার ভাগ্য একই ফল অপেক্ষা করছে, নাকি চেতনা  সবসময়েই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে এড়িয়ে যাবে।” ( সূত্রঃ Philosophy of Science:  A very Short Introduction, Samir Okasha, Oxford University Press)

 

আমার এই নাতিদীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য হল, ‘মানুষ শুধুই কিছু কার্বনের দলা আর জৈব-রায়ায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টি’- এ ধরণের উক্তি করার সময় এই উক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা।

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz