সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: দুর্ঘটনা বিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ

Image result

যুগে যুগে সভ্যতার উন্নয়নের সাথে জড়িত বিজ্ঞানের নানা রকম আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের জন্য কত বিজ্ঞানী কত খেটেছেন তার কোনো সীমা নেই। এখনো আবিষ্কার হচ্ছে নিত্য নতুন সামগ্রী। তবে এসব আবিষ্কার সবসময় সচেতনভাবে হয়েছে এমন না। মাঝে মাঝে এমনো অনেক বস্তু আবিষ্কার হয়েছে যা আবিষ্কারের কোনো চিন্তাভাবনাই বিজ্ঞানীদের ছিলো না। একটা কাজ করতে গিয়ে ভুলবশত, দুর্ঘটনা, কিংবা দুর্যোগের কারণে অথবা শুধুই হেঁয়ালিপনায় আবিষ্কার হয়ে গেছে অনেক সামগ্রী যা পরবর্তীতে সভ্যতার উন্নয়নে বিপ্লব এনেছে। এরকম কিছু আবিষ্কারের গল্প পাবেন এই লেখায়।

ইউরিয়া আবিষ্কার ও জৈব রসায়নের সূচনা

ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে মানুষ মনে করতো “জীবন” সম্পর্কিত বিজ্ঞান পদার্থ-রসায়নের নিয়ম মেনে চলে না এবং এ কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণীতে প্রাপ্ত রাসায়নিক বস্তুগুলো (আমিষ, শর্করা জাতীয় পদার্থ) পরীক্ষাগারে তৈরি করা সম্ভব না। এসব পদার্থ জীবদেহে বিশেষ অজানা এক স্বর্গীয় অলৌকিক শক্তির প্রভাবে উৎপন্ন হয়। এই ধারণা “প্রাণশক্তি মতবাদ” বা “VITALISM” নামে পরিচিত ছিলো। এই তত্ত্ব এতো শক্তিশালী ছিলো যে তখন মানুষ অজৈব কোনো বস্তুকে ঔষধ হিসেবেও গ্রহণ করতো না। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৭৭৩ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী হিলারি রাউল মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর মূত্র হতে ইউরিয়া উৎপন্ন করেছিলেন।

১৮২৮ সাল। ফ্রেডরিক ভোলার ছিলেন জার্মানির বার্লিন কারিগরি স্কুলের বিজ্ঞানী যিনি অ্যালুমিনিয়াম আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। একদিন তিনি অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ও সিলভার সায়ানেটের মিশ্রণ থেকে অ্যামোনিয়াম সায়ানেট তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর উৎপাদিত দ্রব্য পরীক্ষা করে দেখলেন যে এটি অ্যামোনিয়াম সায়ানেট নয়, বরং এই পদার্থ আর হিলারি রাউলের উৎপাদিত ইউরিয়ার ধর্ম সম্পূর্ণ এক। এ কী করে সম্ভব! ইউরিয়া তো একটি জৈব যৌগ। যে যৌগ অলৌকিক শক্তির প্রভাবে প্রাণীদেহে উৎপন্ন হয়, তা কী করে পরীক্ষাগারে তৈরি হয়! সে যাই হোক, ভোলারকে সত্য স্বীকার করে নিতে হলো যে জৈব যৌগ পরীক্ষাগারে তৈরি করা সম্ভব।

তিনি এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তে আসেন যা তিনি বিজ্ঞানী বার্জেলিয়াসকে লেখা চিঠিতে তুলে ধরেন, “আপনাকে জানাতে চাই যে আমি কোনো মানুষ বা কুকুরের কিডনি ছাড়াই ইউরিয়া তৈরি করতে পারি”

আসলে যা ঘটেছিলো-

ভোলার অ্যামোনিয়াম সায়ানেট ঠিকই তৈরি করেছিলেন, কিন্তু এটি ছিলো একটি অস্থায়ী পদার্থ যা সহজেই পুনর্বিন্যাস বিক্রিয়ার মাধ্যমে অধিকতর স্থায়ী ইউরিয়া উৎপন্ন করে। আর এভাবে “প্রাণশক্তি মতবাদ” ভূলুণ্ঠিত হলো, এবং শুরু হলো রসায়ন বিজ্ঞানের নতুন একটি ক্ষেত্র – জৈব রসায়ন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভোলারের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নিয়ে ভোলার খুব একটা খুশি ছিলেন না, কারণ তাঁর কাছে “প্রাণশক্তি মতবাদ” কে খুব সুন্দর ধারণা বলে মনে হতো। কিন্তু তাঁর আবিষ্কার এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে। তিনি বার্জেলিয়াসকে লেখেন, “বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হচ্ছে, একটা কুৎসিত ঘটনার দ্বারা একটা সুন্দর ধারণাকে হত্যা করা”

সুপার গ্লু

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় “ইস্টম্যান কোডাক” কোম্পানির রাসায়নিক প্রকৌশলী হ্যারি কুভার ও তাঁর দল একটি প্লাস্টিক তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন যা বন্দুকের লক্ষ্য নির্ধারণী নলের মুখে ব্যবহার করা যাবে। তাঁদের অসফল প্রচেষ্টার ফলে সৃষ্টি হয়ে গেলো এক ধরনের একটি আঠা যার সাথে যা কিছুই স্পর্শ করানো হয় লেগে যায়। বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সত্ত্বেও তখন কুভার তার প্রকল্পের সাথে না মেলায় এ নিয়ে আর বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেননি। কিন্তু ভাগ্য কুভারের পিছু ছাড়েনি।

নয় বছর পরের ঘটনা। ১৯৫১ সাল। ডক্টর কুভার “ইস্টম্যান কোডাক” এর অন্য একটি প্রকল্পের কাজ হাতে নেন। এবার তিনি জেট বিমানের ছাউনি হিসাবে ব্যবহারযোগ্য একটি তাপ-নিরোধী পলিমার তৈরির চেষ্টা করছিলেন। এবারের চেষ্টায় যে পদার্থ উৎপন্ন হলো তা নিয়ে তাঁর সহকর্মী ফ্রেড জয়নার দুইটা আলোক প্রতিসারক প্রিজমকে জোড়া লাগাতে সক্ষম হন আর বুঝতে দেরি লাগলো না তাঁরা এবারো একই পদার্থ আবিষ্কার করেছেন। এবার কুভার এই পদার্থের মাহাত্ম্য বুঝতে পারলেন।

তাঁরা আসলে যা আবিষ্কার করেছেন তা ছিলো সায়ানো অ্যাক্রিলেইট নামক এক প্রকার আঠা যাকে বর্তমানে আমরা সুপার গ্লু হিসেবে জানি।

স্যাকারিন

রসায়ন বিজ্ঞানের একটা নিয়ম হচ্ছে সবসময় কাজের শেষে ও শুরুতে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

১৮৭৯ সাল। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইরা রেমসেন এর পরীক্ষাগারে রাশিয়ান রসায়নবিদ ও গবেষক কন্সট্যান্টিন ফালবার্গ আলকাতরার একটি নতুন জাতক তৈরির চেষ্টায় ছিলেন। তিনি তেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেন না। কাজ শেষে হাত না ধুয়েই তিনি বাড়িতে গেলেন দুপুরের খাবার খেতে আর খেতে বসে লক্ষ্য করলেন পাউরুটিতে অস্বাভাবিক মিষ্টি স্বাদ। একটি সাক্ষাৎকারে ফালবার্গ বলেন তিনি ততক্ষণাৎ ল্যাবে ফিরে এসে সব পদার্থের স্বাদ নিতে শুরু করলেন যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি এই মিষ্টি স্বাদের উৎস খুঁজে না পেলেন। ভাগ্যবশত সেদিন তাঁর ল্যাবে কোনো বিষাক্ত পদার্থ ছিলো না।

প্রকৃতপক্ষে ফালবার্গের ল্যাবে খনিজ আলকাতরা, সালফারের যৌগ, অ্যামোনিয়া এবং অন্যান্য রাসায়নিক বস্তুর বিক্রিয়ায় একধরনের মিষ্টিকারক পদার্থ উৎপন্ন হয়েছিলো তাঁর অজান্তেই। আর ফালবার্গের প্রস্তুতকৃত সেই পদার্থ ছিলো বিশ্বের প্রথম সংশ্লেষিত মিষ্টিকারক পদার্থ – স্যাকারিন। ভাগ্যিস ফালবার্গ সেদিন হাত ধুতে ভুলে গিয়েছিলেন বলে  মানুষ প্রথম কৃত্রিম মিষ্টিকারক পদার্থের ধারণা পান। তবে স্যাকারিনের ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হবার পর এর ব্যবহার বর্তমানে কমে গেছে।

রন্টজেন-রশ্মি বা এক্স-রে

Image result for accidental invention of science

রসায়ন নিয়ে এতক্ষণ পড়ার পর সবাই ভাববেন শুধু রসায়নেই বুঝি এরকম দুর্ঘটনায় বা ভুলবশত কিংবা ভাগ্যবশত কোনো কিছু আবিষ্কার সম্ভব। তাদের জন্য দুঃসংবাদ –

১৮৯৫ সাল। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী উইলহেল্‌ম রন্টজেন ভুর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে ক্যাথোড রশ্মির বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি ব্যারিয়াম প্লাটিনোসায়ানাইডের পর্দায় একটি নতুন ধরনের আভা দেখতে পেলেন। তিনি দেখলেন, যে বিকিরণ বেরুচ্ছে তা অন্ধকার কক্ষে থাকা কাগজ, কলম, কাঠ সব ভেদ করে যেতে পারে। তিনি রশ্মিটা দিয়ে তাঁর স্ত্রীর হাত পরীক্ষা করলেন। দেখা গেলো পূর্ণ হাতের প্রতিবিম্ব সৃষ্টি না হয়ে হাতের কঙ্কালের প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হয়েছে ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপর।

তিনি বুঝতে পারলেন রশ্মিটি হাতের মাংস ভেদ করলেও হাড় ভেদ করতে পারে না ফলে হাড়ের প্রতিচ্ছবি উৎপন্ন হয়েছে ফটোগ্রাফিক পর্দার উপর। আর এ অবস্থা দেখার পর তাঁর স্ত্রীর ভাষ্য, “আমি যেন নিজের মৃত্যু দেখতে পেলাম”।

রন্টজেন বুঝতে পারলেন নতুন ধরনের কোনো রশ্মি আবিষ্কার হয়েছে। তখনো পর্যন্ত এ রশ্মি সম্পর্কে প্রায় সবই অজানা ছিলো বলে অজানা এই রশ্মির নাম রাখা হলো এক্স রশ্মি।

বর্তমানে সারা দুনিয়া জুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই রশ্মির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে।

তেজষ্ক্রিয়তা

চিত্রঃ বেকেরেলের তৈরিকৃত ফটোগ্রাফিক প্লেটে তেজষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন

কিছু পদার্থকে সূর্যালোকে রাখলে এরা দীপ্তি ছড়ায়, এই ঘটনাকে ফ্লোরোসেন্স বলে। আর এর আগে ১৮৯৫ সালে আবিষ্কৃত হয় উইলহেল্ম রন্টজেনের এক্স রশ্মি।

হেনরি বেকেরেল ফ্লোরোসেন্স ও এক্স রশ্মিতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। বেকেরেল মনে করেছিলেন এক্স রশ্মি ও ফ্লোরোসেন্স একসূত্রে গাঁথা। আর এটা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে তিনি একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি চাইলেন ফ্লোরোসেন্স প্রদর্শন করে এরকম একটা বস্তুকে সূর্যালোকে রেখে তারপর এটি অন্য কোন বস্তুর প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে কিনা পরীক্ষা করে দেখবেন যাতে তিনি বলতে পারেন যে, ফ্লোরোসেন্ট বস্তুগুলো মূলত এক্স রশ্মি বিকিরণ করে।

ফেব্রুয়ারি ২৬, ১৮৯৬। দিনটিতে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় বেকেরেলের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। তিনি তাঁর পরীক্ষণীয় বস্তুসামগ্রী – পটাসিয়াম ইউরিনাইল সালফেট নামক ইউরেনিয়ামের যৌগ (ফ্লোরোসেন্ট প্রদর্শনকারী বস্তু), ফটোগ্রাফিক প্লেট আর তামার খণ্ড একটি কালো কাপড়ে মুড়িয়ে রেখে দেন, আর সূর্যের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

কিছুদিন পরে বেকেরেল যখন কাপড়ের মোড়ক খুললেন তখন যা দেখলেন তার জন্য বেকেরেল প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি দেখলেন ফটোগ্রাফিক প্লেটে তামার বস্তুটির প্রতিবিম্ব। এ কি করে সম্ভব? তিনি তো ইউরেনিয়ামের যৌগটিকে সূর্যালোক স্পর্শ করাননি! এটি ছিলো মূলত ভারী ধাতুর তেজষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন।

এরপর তিনি এই পরীক্ষা তিনভাবে করলেন – একটি ইউরেনিয়াম যৌগ ফটোগ্রাফিক প্লেটে রাখেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টিতে ইউরেনিয়াম যৌগ ও ফটোগ্রাফিক প্লেটের মাঝখানে যথাক্রমে একটি অ্যালুমিনিয়াম শীট ও একটি গ্লাস শীট রাখলেন। কয়েক ঘণ্টা অন্ধকারে রাখার পর দেখলেন তিনটি সেটেই ফটোগ্রাফিক প্লেট তেজষ্ক্রিয় রশ্মির প্রভাবে কালো  হয়ে গেছে, তবে যে সেটে মাঝখানে কোনো শীট রাখা হয়নি সেটি সবচেয়ে বেশি কালো হয়েছে কারণ এতে তেজষ্ক্রিয় রশ্মির চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধক ছিলো না। এ বিষয়ে তিনি তাঁর ডায়েরীতে লেখেন “আমি এখন বিশ্বাস করি যে ইউরেনিয়াম লবণ অদৃশ্য বিকিরণ উৎপন্ন করতে পারে, এমনকি অন্ধকারে রেখে দিলেও”।

স্বতঃস্ফূর্ত তেজষ্ক্রিয়তার এই আবিষ্কার তাঁকে ১৯০৩ সালে নোবেল পুরষ্কার এনে দেয়।

পেনিসিলিন

আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের পদ্ধতি অন্বেষণ করছিলেন।

১৯২৮ সাল। তিনি টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে কিছু স্টেফিলোকক্কাই ব্যাকটেরিয়া জন্মালেন। ফ্লেমিং একটু বেপরোয়া প্রকৃতির ছিলেন, তাঁর ল্যাব ছিলো খুব অপরিচ্ছন্ন। একদিন তিনি দুই সপ্তাহের ছুটিতে যান। ছুটিতে যাবার সময় তিনি দুইটা ভুল করেন – তিনি সব প্লেটকে জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য সঠিক উপায়ে রেখে যাননি, এবং তিনি পরীক্ষা কক্ষের জানলা বন্ধ করে যাননি।

ছুটি থেকে ফিরে এসে দেখেন সব কালচার প্লেট ছত্রাক জন্মে নষ্ট হয়ে গেছে। এটা ছিলো সেই ছত্রাক যা সচরাচর বাসি পাউরুটিতে জন্মে। ফ্লেমিং প্লেটগুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন প্লেটে যদিও অনেক ব্যাকটেরিয়া জন্মেছে কিন্তু কিছু কিছু স্থানে কিছু বলয় রয়েছে যেখানে কোনো ব্যাকটেরিয়া জন্মায়নি। তখন তিনি বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে প্লেট না ধুয়ে চলে আসেন।

এই ছত্রাক (Penicillium notatum)  নিয়ে ফ্লেমিং খুব পরিশ্রম করেন এবং কিছু রস বের করে নিতে সক্ষম হন। তিনি এই রসের নাম দেন পেনিসিলিন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তিনি খুব সামান্য পেনিসিলিন রস আহরণ করতে পারলেও তা তিনি সংরক্ষণ করতে পারেননি বলে এটি যে আসলেও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে তা তিনি তখন কাউকে দেখাতে পারেননি।

১৯৩৪ সালে ফ্লেমিং পেনিসিলিন নিয়ে কাজ ছেড়ে দেন এবং অন্য কাজে মনস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৩৮ সালে হাওয়ার্ড ফ্লোরি এবং আর্নেস্ট চেইন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্লেমিং এর আবিষ্কৃত পেনিসিলিন নিয়ে কিছু কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ উদ্দেশ্যে তাঁরা কিছু ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালিয়ে সফল হন। এরপর তাঁরা ৪৩ বছর বয়স্ক এক পুলিশ অফিসারকে বাঁচাতে ব্যর্থ হলেও আশা ছেড়ে দেননি। পরে ১৫ বছর বয়স্ক এক বালককে বাঁচাতে সক্ষম হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পেনিসিলিন অসংখ্য রোগীর প্রাণ বাঁচায়। এবং পেনিসিলিনকে বলা হয়, “জীবন রক্ষাকারী ঔষধ”। তবে বর্তমানে পেনিসিলিনের ব্যবহার তেমন নেই, আবিষ্কৃত হয়েছে আরো অনেক ধরনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্ট।

টেফলন

Image result for teflon tape

টেফলন টেপের কথা সম্ভবত সবাই শুনে থাকবেন। পাইপের ফিটিং-এ এর ব্যবহার ব্যাপক। এটিও আবিষ্কৃত হয় দুর্ঘটনাবশত।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে নিউ জার্সির জ্যাকসনে “ডুপঁট” কোম্পানিতে কাজ করার সময় রয় প্লাঁকেট প্রচলিত ঠাণ্ডাকারক (Refrigerant) সালফার ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া ইত্যাদির বিকল্প হিসেবে একটি অবিষাক্ত ঠাণ্ডাকারক পদার্থ খুঁজছিলেন। ১৯৩৮ সালে সাতাশ বছর বয়সে ডক্টর প্লাঁকেট ও তাঁর সহযোগী জ্যাক রেবক একটি সম্ভাবনাময় পদার্থ টেট্রাফ্লোরোইথিলিন নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁরা ১০০ পাউন্ড টেট্রাফ্লোরোইথিলিন গ্যাস তৈরি করে তা উচ্চচাপে একটি সিলিন্ডারে রাখলেন।

কিছুদিন পরে ডক্টর প্লাঁকেট একটি সিলিন্ডারের মুখ খুললেন গ্যাসটি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এ কী কাণ্ড! সিলিণ্ডারের গ্যাস হাওয়া(!) হয়ে গেলো। তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন সিলিন্ডার কেটে দেখবে গ্যাস কোথায় হাওয়া খেতে গেছে। সিলিন্ডার কেটে তাঁরা পেলেন এক ধরনের মোমসদৃশ পদার্থ।

প্রকৃতপক্ষে উচ্চচাপে টেট্রাফ্লোরোইথিলিন পলিমারকরণ বিক্রিয়ায় পলিটেট্রাফ্লোরোইথিলিন বা টেফলনে পরিণত হয়েছিলো যা একটি খুবই পিচ্ছিলকারক, স্থায়ী, অক্ষয়, এবং উচ্চ গলনাঙ্ক বিশিষ্ট পলিমার।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন

এবার আসা যাক স্বশিক্ষিত এক বিজ্ঞানীর গল্পে।

পার্সি স্পেন্সার। মাত্র আঠারো মাস বয়সে বাবাকে হারান। সাত বছর বয়সের আগেই তাঁর মা, চাচাকে হারান। পরে অনেক সংগ্রাম করেন জীবনে। আঠারো বছর বয়সে তিনি টাইটানিক জাহাজের ওয়ারলেস অপারেটরদের কাহিনী শুনে ওয়ারলেস বা বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আগ্রহী হন এবং মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেন।

“আমি কেবল প্রচুর পাঠ্যবই সংগ্রহ করেছিলাম আর রাতে পাঁহারা দেওয়ার সময় এসব পড়ে নিজে নিজে শিখতাম” –  তিনি বলেন। এ সময় নিজে নিজেই স্পেন্সার রাডার টিউব ডিজাইনে দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং ১৯৩৯ সালে “রেথিওন” কোম্পানির পাওয়ার টিউব বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজে যোগ দেন। তিনি তাঁর দক্ষতা বলে এই কোম্পানির অনেক সুফল আনেন। এমআইটি এর বিকিরণ পরীক্ষাগারের জন্য রাডার যন্ত্র সরবরাহে রেথিওনকে সহায়তা করেন স্পেন্সার।

একদিন স্পেন্সার রাডার যন্ত্রের জন্য একটি ম্যাগনেট্রন তৈরি করছিলেন। তিনি একটি সক্রিয় রাডার যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ দেখলেন তাঁর পকেটে থাকা ক্যান্ডি বার গলে গেছে। এ কী কাণ্ড! বেশ অবাক হলেন বটে তবে ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন স্পেন্সার। তিনি তাঁর সহকর্মীদের সাথে বেশকিছু খাবার নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। দেখলেন রীতিমত রান্না হয়ে যাচ্ছে খাবার।

প্রকৃতপক্ষে ম্যাগনেট্রনে ব্যবহৃত মাইক্রো তরঙ্গ তাপ উৎপাদন করায় খাবার রান্না হয়ে যাচ্ছিলো সহজেই যা স্পেন্সারের ভাবনার উর্ধ্বে ছিলো। এরপর তিনি একটি ধাতুর তৈরি বক্সে একটি উচ্চ ঘনত্বের তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র স্থাপন করে প্রথম সত্যিকারের মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরি করেন। ১৯৪৫ সালের ৮ অক্টোবর প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মাইক্রোওয়েব ওভেন বাজারজাত করা হয় যা ছয় ফুট লম্বা ও ৭৫০ পাউন্ড ভরবিশিষ্ট ছিলো।

কৃত্রিম রঙ

আঠারো বছর বয়সে উইলিয়াম হেনরি পার্কিন একটি আবিষ্কারের মাধ্যমে নিজে যেমন ধনী হন তেমনি সৃষ্টি করেন রসায়ন গবেষণার নতুন একটি ক্ষেত্র। তিনি তা করেন সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাবশত।

রসায়নের প্রতি মুগ্ধ হয়ে পার্কিন তেরো বছর বয়সেই সিটি অফ লন্ডন স্কুলে ভর্তি হন। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডেকে লিখেন এবং তাঁর শনিবারের বিকালের লেকচারে যোগ দেয়া শুরু করেন। ১৮৫৫ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পার্কিন রয়্যাল কলেজ অফ সায়ন্সে তাঁর পাঠ শেষে রিসার্স অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।

তাঁর প্রথম কাজ ছিল ম্যালেরিয়া রোগে ব্যবহৃত কুইনাইন প্রস্তুতির একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা। কারণ কুইনাইন ছিল একটি প্রাকৃতিক যৌগ যা গাছের বাকল থেকে সংগ্রহ করা হতো, কিন্তু তা খুব সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিলো বলে ঔষধ হিসেবে এর ব্যবহার বেশ ব্যয়বহুল ছিলো।

একদিন কাজ করার সময় সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি “অ্যানিলিন সালফেট” নামক একটি যৌগকে জারিত করবেন। দুর্ভাগ্যবশত তিনি বুঝতে পারেননি যে তাঁর পরীক্ষণীয় যৌগে “টলুইডিন” নামক একটি যৌগ মিশ্রিত ছিলো। যখন তিনি বিক্রিয়া কাজ সমাপ্ত করেন তখন দেখেন একটি অদ্ভুত ঘন বেগুনী পদার্থ পাত্রের তলায় তলানি হিসেবে পড়ে আছে।

নিজ লক্ষ্যে ব্যর্থ হলেও পার্কিন দমবার পাত্র নন। পরীক্ষা করে দেখলেন আসলে উক্ত তলানিটি ছিলো একটি রঙ্গিন যৌগ যার নাম “মাউভেইন”। এভাবেই দুর্ঘটনাবশত আবিষ্কৃত হয় প্রথম কৃত্রিম রঙ। আর বর্তমানে কৃত্রিম রঙের ব্যবহার এতই ব্যাপক যে রঙ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর প্রায় ৫,০০,০০০ টন কৃত্রিম রঙ উৎপাদন করে থাকে।

রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি

কার্ল জেন্সকি “বেল টেলিফোন ল্যাবোরেটরি”তে টেলিফোন লাইনে শব্দ প্রেরণে একধরনের প্রতিবন্ধকতা লক্ষ্য করলে তা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। একটি বৃহৎ অ্যান্টেনা ব্যবহার করেন এ উদ্দেশ্যে।  অ্যান্টেনায় ধরা পড়লো অজানা একটি সংকেত। এই সংকেতটা ২৪ ঘণ্টা পরপর পরিলক্ষিত হতো বলে জ্যান্সকি ভাবলেন পৃথিবীর ঘূর্ণন-জনিত কারণে এই অ্যান্টেনাটি সূর্যকে অতিক্রমকালে সূর্যের বিকিরণ থেকে এই সংকেতটা আসতো।

ক্রমাগত পর্যবেক্ষণে দেখা গেলো এই সংকেতটা ২৪ ঘণ্টা পর নয়, বরং ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট পর পর ধরা পড়ছে। জ্যান্সকি এই বিভ্রান্তিকর ঘটনা তাঁর বন্ধু, জ্যোতিপদার্থবিদ ও শিক্ষক অ্যালবার্ট মেলভিন স্কেলেট এর সাথে আলোচনা করলেন যিনি দেখলেন যে এই সংকেত এর পুনরাবৃত্তি হবার সময় ঠিক নাক্ষত্রিক দিনের (Sidereal day, উচ্চারণ সাইডীরিয়েল ডে) সময়ের সাথে মিলে যায়।

অপটিক্যাল-জ্যোতির্বিদ্যা-ম্যাপের সাথে তুলনা করে জ্যান্সকি সিদ্ধান্তে আসেন যে এই সংকেত আসছে যখন তাঁর অ্যান্টেনা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সবচেয়ে ঘন অংশ অতিক্রম করছে। যেহেতু সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্র তেমন রেডিও বা বেতার তরঙ্গ বিকিরণ করে না, তাই জ্যান্সকি সিদ্ধান্তে আসলেন এই অদ্ভুত বেতার তরঙ্গ অবশ্যই ছায়াপথের আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু (Interstellar Gas & Dust) থেকে আসছে। আর এই ঘটনার মাধ্যমে সূত্রপাত হলো বেতার জ্যোতির্বিদ্যা বা রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির।

গানপাউডার বা বারুদ

Remember, Remember
The Fifth of November
The Gunpowder Treason and Plot.
I Know of No Reason
Why the Gunpowder Treason
Should Ever be Forgot.

না, কোনো গানপাউডার ট্রিজনের কাহিনী নয়, আপাতত শুধু গানপাউডার এর কাহিনীই শুনি।

অমরত্ব লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ কত কিছুই না করেছে। চীনারাও দমে যাবার পাত্র নয়। অমরত্ব লাভ করতেই হবে, নইলে পৃথিবীতে আসলাম কী করতে, এসে যদি চলেই যাই! চীনাদের প্রাচীন সাহিত্যে প্রচুর ঔষধের রেসিপি পাওয়া যায় তন্মধ্যে অপরসায়নবিদরা (Alchemists) একটি রেসিপি তৈরি করেছিলো অমরত্ব লাভের উদ্দেশ্যে। তাদের ধারণা ছিলো এই ঔষধ সেবনের মাধ্যমে হয়তো অমরত্ব লাভ করা যাবে।

ঔষধটি তৈরি করা হয়েছিলো সালফার, কাঠকয়লা এবং সল্ট পিটার বা পটাসিয়াম নাইট্রেট মিশিয়ে। দেখা গেলো এই ঔষধটি যখন উত্তপ্ত করা হলো তখন এটি বিস্ফোরিত হলো। এ কারণে এটিকে তারা “আগুন ঔষধ” নামকরণ করে। কিন্তু এটার বিস্ফোরণ গুণ থাকায় এটিকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য তৈরিতে ব্যবহার শুরু হয়। তখন এটিকে বলা হতো “হোও ইয়াও” যাকে বর্তমানে আমরা বারুদ বা গান পাউডার বলে থাকি।

কী চমৎকার! অমরত্ব লাভের উদ্দেশ্যে তৈরিকৃত ঔষধ পরিণত হলো মানুষ মারার হাতিয়ারে।

বি.দ্র. যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি সঠিক তথ্য সংযোজন করতে। এরপরও কোনো ভুল দৃষ্টিগোচর হলে অবশ্যই জানানোর অনুরোধ রইলো।

তথ্যসূত্রঃ

১. http://www.sciencefocus.com/feature/tech/top-10-accidental-discoveries

২.http://www.todayifoundout.com/index.php/2011/08/super-glue-was-invented-by-accident-twice/

৩.http://humantouchofchemistry.com/urea-and-the-beginnings-of-organic-chemistry.htm

৪.http://www.abpischools.org.uk/page/modules/infectiousdiseases_timeline/timeline6.cfm

৫.http://www.earthmagazine.org/article/benchmarks-henri-becquerel-discovers-radioactivity-february-26-1896

৬.http://www.todayifoundout.com/index.php/2011/08/the-microwave-oven-was-invented-by-accident-by-a-man-who-was-orphaned-and-never-finished-grammar-school/

৭.http://www.open.edu/openlearn/history-the-arts/history/history-science-technology-and-medicine/history-science/the-birth-synthetic-dyeing

৮.http://www.middleschoolchemistry.com/atomsworld/2012/06/accidental-discovery/

৯.https://en.wikipedia.org/wiki/Radio_astronomy

১০.http://www.csmonitor.com/Technology/2012/1005/The-20-most-fascinating-accidental-inventions/Post-its

১১.http://www.inventor-strategies.com/accidental-inventions.html

১২.http://www.history.com/this-day-in-history/german-scientist-discovers-x-rays

১৩.Google.com

১৪.Wikipedia.org

Comments

Monir Hossen Misbah

বুদ্ধিমত্তার সত্যিকারের নিদর্শন জ্ঞান নয়, কল্পনা - আইনস্টাইন।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

4 মন্তব্য on "সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: দুর্ঘটনা বিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
Anamul
অতিথি

আহা! এরকম দু চারটা ভুল যদি আমার জীবনে হইত।

S. A. Khan
সদস্য

চমৎকার লিখেছেন। গানপাউডার, এক্স রে আর তেজস্ক্রিয়তা এই তিনটার ঘটনা জানা ছিল শুধু।
নতুন গুলো জানলাম। ধন্যবাদ।

wpDiscuz