পারমাণবিক শক্তি বিবরণী : পঞ্চম ও শেষ পর্ব – পারমাণবিক অস্ত্র

প্রথম পর্ব || দ্বিতীয় পর্ব || তৃতীয় পর্ব || চতুর্থ পর্ব

১৯০৫ সালে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এ্যলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর ভর-শক্তি তুল্যতা সূত্র প্রতিপাদন করেন। তাত্ত্বিকভাবে তখন থেকেই পারমাণবিক শক্তির যাত্রা শুরু। বস্তু বা পদার্থ এবং শক্তি যে দুটি ভিন্ন রূপ এবং পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায় এই সূত্রের সাহায্যেই তা প্রথম প্রমাণিত হয়।

পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটিই হল তাঁর পরিমাণ। অতি অল্প পরিমাণ বস্তু থেকে বিপুল পরিমাণে শক্তি আহরণ করা যায় যেটি অচিন্তনীয় ছিল তখনকার সময়ে। এই শক্তির ব্যবহারে পারমাণবিক চুল্লি মানব সভ্যতা বিকাশে অবদান রাখছে প্রায় অফুরন্ত শক্তি ভাণ্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে; একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্র মানব সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবার মত ভয়াবহতার হাতছানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রথম পর্বে পারমাণবিক শক্তির সাধারণ ধারণা, পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা, পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং পারমাণবিক শক্তি উৎস হিসেবে পরিচিত অধিক ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিষয়বস্তু ছিলো সভ্যতার অগ্রগতিতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor). তৃতীয় পর্বে ছিল পারমাণবিক অস্ত্র পরিচিতি, ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকারভেদ, গঠন ও কার্যপ্রণালীর বিবরণ। চতুর্থ পর্ব ছিলো পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা ও পারমাণবিক অস্ত্র কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে তার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে। পঞ্চম ও শেষ পর্ব সাজানো হল পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস, বর্তমান পৃথিবীতে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ, অতীত থেকে বর্তমানের অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিস্ফোরকের তুলনামূলক শক্তিমাত্রার ধারণা এবং পারমাণবিক শক্তির ব্যাবহারের সাথে মানবজাতি তথা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত তথ্যাদি দিয়ে।

পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রথমবারের মত ব্যবহৃত হয় পারমাণবিক অস্ত্র, দুটি পারমাণবিক বোমা। ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’। পৃথিবীবাসী বাকরুদ্ধ হয়ে প্রত্যক্ষ করে এবং আসলে বুঝতে পারে পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এ দুটি পারমাণবিক বোমা ছিল পৃথিবীতে প্রথমবার ও এখনপর্যন্ত শেষবারের মত যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরিত পারমাণবিক বোমা। এর পরে বিভিন্ন সময়ে এর চেয়ে বৃহৎ আকারের ও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে জনমানবহীন এলাকায়; কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ব্যবহৃত হয়নি। বর্তমানে এ থেকে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী পারমাণবিক বিস্ফোরক রয়েছে পৃথিবীতে। সেগুলোর ক্ষমতা সম্পর্কে আন্দাজ করতে হলেও এ দুটোর ধরন, আকার-আকৃতি ও ফলাফল সম্পর্কে জানতে হবে।

Little Boy – লিটল বয়

পৃথিবীর প্রথম ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা : Little Boy

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮:১৬ মিনিটে জাপানের হিরোশিমা শহরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ‘লিটল বয়’ এর। এটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমার ব্যবহার। সেসময় হিরোশিমা শহরে আনুমানিক ২,৮০,০০০ – ২,৯০,০০০ বেসামরিক জনগণ এবং ৪৩,০০০ সামরিক বাহিনীর সদস্য অবস্থান করছিল।

বিস্ফোরণের ফলে ৭০-৭৬ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে ৪৮ হাজার বাড়ি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। ধারণা করা হয় বিস্ফোরণের সাথে সাথে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। চার মাসের মধ্যে ৯০,০০০ – ১,৬৬,০০০ মানুষ মারা যায়, পাঁচ বছরের মধ্যে বিস্ফোরণের প্রভাবে মারা যায় ২ লক্ষ মানুষ। পরবর্তীতে এই পারমাণবিক বোমার ‘লং টার্ম এফেক্ট’ এর প্রভাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২,৩৭,০০০ জনে।

লিটল বয় বোমার কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেয়া যাক 

১. Gun Type Atom Bomb.
২. Explosive Fuel: Highly Enriched Uranium.
৩. Explosion Power – 15,000 tons of TNT
৪. এর দৈর্ঘ্য ছিল ১০ ফুট, ব্যাস ২৮ ইঞ্চি
৫. ভর – ৯৭০০ পাউন্ড বা ৪৪০০ কেজি বা ৪.৪০ টন।

Fat man – ফ্যাট ম্যান

পৃথিবীতে ব্যবহৃত দ্বিতীয় ও এখন পর্যন্ত শেষ পারমাণবিক বোমা : Fat Man

‘লিটল বয়’ বিস্ফোরণের তিন দিন পর জাপানের নাগাসাকি শহরে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ এর। ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট দুপুর ১১:০২ মিনিটে বিস্ফোরিত হয় ‘ফ্যাট ম্যান’। তখন নাগাসাকি শহরে অবস্থান করছিল ২,৪০,০০০ জাপানি বেসামরিক নাগরিক; ৯,০০০ জাপানি সামরিক বাহিনীর সদস্য; ৪০০ যুদ্ধবন্দী সহ প্রায় আনুমানিক ২,৬৩,০০০ মানুষ।

বোমাটি বিমান থেকে ফেলার পর ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬৫০ ফুট উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথে ৪০-৭৫ হাজার মানুষ নিহত হয়। গুরুতর আহত হয় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। বছর শেষে ফ্যাট ম্যান বিস্ফোরণের কারণে মৃতের সংখ্যা পৌঁছে ৮০ হাজারে।

ফ্যাট ম্যান বোমার কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেয়া যাক

১. Implosion Type Atomic Bomb.
২. Explosive Fuel: Highly Enriched Plutonium239
৩. দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং ব্যাস ৫ ফুট
৪. ভর ১০,৮০০ পাউন্ড বা প্রায় ৪,৯০০ কেজি বা ৪.৯ টন।
৫. Explosion Power: 21,000 tons of TNT
৬. ৫,৩০০ পাউন্ড বা প্রায় ২,৪০০ কেজি রাসায়নিক বিস্ফোরক কেন্দ্রের সফটবল আকৃতির ১৩.৬ পাউন্ড বা প্রায় ৬ কেজির প্লুটোনিয়াম গোলককে সংকুচিত করে টেনিস বল আকৃতিতে নিয়ে আসে। ১.১৭৬ কিলোগ্রাম প্লুটোনিয়াম শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল ‘ফ্যাট ম্যান’ এর বিস্ফোরণে।

পৃথিবীতে মজুদ পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ

বর্তমানে বেশ কিছু রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিধর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং এই গুটি কয়েক রাষ্ট্রের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ সীমাবদ্ধ। এদের কারো কাছে বেশি, কারো কাছে কম, কারো আছে ফিশন বোমা, কারো হাতে ফিউশন বোমা, মহাশক্তিধরদের নিয়ন্ত্রণে আবার হাইড্রোজেন বোমা বহনকারী মিসাইল থাকার গুঞ্জনও শোনা যায়। আবার এরা মাঝে মধ্যেই অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে চোখ রাঙিয়ে যেন পাল্লা দিয়ে একের পর এক শক্তিশালী থেকে পর্যায়ক্রমে অধিক শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রের ‘পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ’ ঘটিয়ে এক প্রকার নীরবে জানান দিচ্ছে পৃথিবীর প্রতি তাদের হুমকি।

পারমাণবিক অস্ত্র থাকার তথ্য গোপন সামরিক তথ্য হওয়ায় কঠোর সামরিক নিরাপত্তার মাধ্যমেই এই তথ্য গোপন রাখা হয়। তাই একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয় কোন রাষ্ট্রের কাছে কি পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ আছে। তবুও বিভিন্ন সময় পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের খাতিরে কিছু উন্মুক্ত তথ্য এবং পারমাণবিক শক্তি গবেষকদের ধারণা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কোন কোন রাষ্ট্রে কি পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তার একটি চার্ট প্রকাশ করে The New York Times বিগত বছরের শেষ ভাগে।

চিহ্নিত দেশ সমূহ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদকারী

Federation of American Scientists এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মোটামুটি আটটি দেশের কাছে আনুমানিক মোট প্রায় ১৫০০০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এই রাষ্ট্রগুলো হল পর্যায়ক্রমে রাশিয়া (৭০০০ টি), ইউনাইটেড স্টেটস (U.S. – ৬৮০০ টি), ফ্রান্স (৩০০ টি), চীন (২৬০ টি), ব্রিটেন (U.K. – ২১৫ টি), পাকিস্তান (১৩০ টি), ভারত (India – ১২০ টি) এবং ইসরায়েল (৮০ টি) ।

দেখা যাচ্ছে এদের মধ্যে মহাপরাক্রমশালী অবস্থানে আছে যথাক্রমে রাশিয়া ও ইউনাইটেড স্টেটস। অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্র সংখ্যা এই দুই দেশের তুলনায় এতটাই নগণ্য যে এই দুই রাষ্ট্র ছাড়া বাকি সকলের অস্ত্রের সংখ্যার সমষ্টি এদের যেকোনো একজনের সংখ্যার ২০ শতাংশেরও কম।

পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে মজুদকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণের তুলনামূলক লেখচিত্র

এই সাতটি রাষ্ট্র ছাড়াও উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রের সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও গবেষকগণ ধারণা করে থাকেন তাদের অস্ত্রের পরিমাণ ১০ টির কম।

অন্য পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ না করলেও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের এক চতুর্থাংশ (যথাক্রমে আনুমানিক ১৭৯০ এবং ১৫৯০ টি) এবং ফ্রান্স তাদের প্রায় সবই সশস্ত্র সামরিক প্রহরায় মোতায়েন করে রেখেছে যেকোনো মুহূর্তের প্রয়োজনে উৎক্ষেপণ বা নিক্ষেপের জন্য।

একটি তথ্য আশা জাগায় যে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ বুঝতে শিখেছে যে পারমাণবিক অস্ত্র সাময়িকভাবে হয়ত একটি রাষ্ট্রকে যুদ্ধে তথাকথিত জয় এনে দিতে পারবে কিন্তু তাতে হারতে হবে পৃথিবীকে। পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না একেবারেই। তাই ‘কোল্ড ওয়ার’ খ্যাত সময়ে বিংশ শতাব্দীর প্রায় শেষ সময়েও যে পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ ছিল তা গত ত্রিশ বছরে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক অস্ত্র মজুদের সর্বোচ্চ অবস্থায় রাশিয়া এবং ইউনাইটেড স্টেটস এর মোট পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ আনুমানিক প্রায় ৭০৩০০ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে এখন তাদের মজুদ মোট আনুমানিক ১৪০০০ তে দাঁড়িয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র মজুদের ইতিহাসের উত্থান-পতন

বর্তমানের শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনামূলক আকৃতি ও ধ্বংসক্ষমতা

১৫ কিলোটনের ‘লিটল বয়’ আর ২১ কিলোটনের ‘ফ্যাট ম্যান’ এর তুলনায় বর্তমান পারমাণবিক অস্ত্রগুলো কতটা শক্তিশালী তা বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ এর তথ্য থেকে জানা যায়।

এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ Tsar Bomb এর তুলনায় Little Boy আরক্ষিক অর্থেই LITTLE

  • পাকিস্তানের সর্বশেষ পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ১৯৯৮ সালে – ক্ষমতাঃ ৪০ কিলোটন
  • ইউনাইটেড কিংডম ১৯৫২ সালে পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় ৫০০ কিলোটন ক্ষমতার IVY King Shot নামের একটি ফিশন বোমা
  • ইউনাইটেড স্টেটস তাদের প্রথম Thermo-Nuclear Weapon অর্থাৎ হাইড্রোজেন বোমা ‘Castle Bravo’ এর পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় ১৯৫৪ সালে।
    তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে স্বভাবতই এর ক্ষমতা ছিল বহুগুণ বেশী। প্রায় ১৫ মেগাটন। ‘লিটল বয়’ এর তুলনায় ১০০০ গুন বেশি শক্তিশালী।
  • এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী তাপ-পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে রাশিয়া ১৯৬১ সালে। Tsar Bomb – ৫০ মেগাটন ক্ষমতাসম্পন্ন। যা কিনা সরলীকরণ করে বলা চলে ৩৩৩৩ টি ‘লিটল বয়’ এর বিস্ফোরণের সমান ক্ষমতাসম্পন্ন।
    এই বোমাটি মূলত ডিজাইন করা হয়েছিল ১০০ মেগাটন ক্ষমতার সমান করে। কিন্তু প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য এর ভিতরে ইউরেনিয়ামের একটি টেম্পার স্তরের পরিবর্তে সীসার স্তর দেয়া হয় যা একটি ফিশন বিস্ফোরণ কমিয়ে দেয় এবং এর ক্ষমতা অর্ধেক হ্রাস করে।
    অর্থাৎ এখন পর্যন্ত তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোজেন বোমার ক্ষমতা ১০০ মেগাটন।

Tsar Bomb Test Detonation এর উপর ৩ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র সংযোজিত হলো।


১৯৪৫ সালে বিস্ফোরিত ১৫ কিলোটন এর ‘লিটল বয়’ থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের পদচারণা শুরু হয়ে ১৯৬১ সালে পরীক্ষামূলক বিস্ফোরিত ৫০ মেগাটন ক্ষমতার Tsar Bomb এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ তাপ-পারমাণবিক অস্ত্র।

নিচের ভিডিওটিতে এই পুরো বিষয়টি গ্রাফিক্যাল ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এখান থেকে আরো ভালভাবে উপলব্ধি করা যাবে বর্তমানের থার্মো-নিউক্লিয়ার অস্ত্রগুলো কতটা মারাত্মক।


ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে ব্যাচেলর ডিগ্রী এবং পরবর্তীতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানের ইতিহাস (History of Science) বিভাগে Ph. D. অর্জন করেন Dr. Alex Wellerstein.
বর্তমানে Stevens Institute of Technology, Hoboken, New Jersey এর  College of Arts and Letters এ  Science and Technology Studies (STS) বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন।

তার ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণা প্রকল্পের সংরক্ষণশালা নিউক্লিয়ার-সিক্রেসি ব্লগের একটি অংশ হল ‘Nukemap’

এখানে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করা হয়েছে পৃথিবীর কোনো অংশে বিভিন্ন মাত্রার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটালে তার ক্ষয়ক্ষতি কেমন হতে পারে তা সহজে বোঝানোর জন্য। এখানে ম্যাপের উপর রঙিন বৃত্তাকার অংশের মাধ্যমে দেখানো হবে কোন পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বিস্ফোরণস্থল বা গ্রাউন্ড জিরো’র চারদিকে আনুমানিক কতটুকু যায়গায় কি ধরণের ক্ষতিসাধিত হবে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রে ঢাকার ‘জিরো পয়েন্ট’ কে গ্রাউন্ড জিরো ধরে ‘ফ্যাট ম্যান’ যে উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়েছিল ১৬৫০ ফুট সেই উচ্চতায় Tsar Bomb এর সমান অর্থাৎ ৫০ মেগাটনের একটি হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণে কি হতে পারে তার ভিজুয়াল ইফেক্ট দেখানো হয়েছে এই চিত্রে।

ঢাকায় Tsar Bomb বিস্ফোরিত হলে আক্রান্ত এলাকার মানচিত্র

সবচেয়ে বাইরের বৃত্তটি ফার্স্ট ডিগ্রী বার্ন, বাইরের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃত্তাকার এলাকা সেকেন্ড ডিগ্রী বার্ন এবং তৃতীয় বৃত্তাকার এলাকা থার্ড ডিগ্রী বার্ন এর সঙ্কটাপন্ন এলাকার অন্তর্গত। দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বৃত্তটি একদিকে বাংলাদেশের সীমানা বরাবর এবং সবচেয়ে বাইরের বৃত্তটি সীমানা পেরিয়ে গেছে অনেকখানি। লম্বা অংশটি ‘রেডিওএ্যাকটিভ ফল-আউট’ নির্দেশক। বাতাসের গতি ওইদিকে থাকলে ফল-আউটের মাধ্যমে এতটা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে তেজস্ক্রিয়তা।

গর্ত, ব্লাস্ট ইফেক্ট, থার্মাল রেডিয়েশন ইফেক্ট কোন কোন এলাকা কি পরিমাণ প্রভাবিত করছে তা বিস্তারিত দেখতে ও জানতে চলে যান এই চিত্রের নিউকম্যাপ পাতায়।

পারমাণবিক শক্তি ও অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানবজাতি তথা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ

এই শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীতে জীবাশ্ম জ্বালানীর সঙ্কট দেখা দেবে এবং বিগত লক্ষাধিক বছরের পরিবর্তনে সৃষ্ট জীবাশ্ম জ্বালানি ফুরিয়ে আসবে। ততদিনে পৃথিবীতে নানা কাজের জন্য শক্তির প্রয়োজনে জ্বালানীর যে চাহিদা তার ভগ্নাংশও পূরণ করতে পারবে না অবশিষ্ট জীবাশ্ম জ্বালানি।

এই সঙ্কট উত্তরণের প্রধানত দুটি পথ। অফুরন্ত প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অচিন্তনীয় দক্ষতার পারমাণবিক শক্তি। এর মধ্যে প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য শক্তি সংগ্রহ ও কাজে লাগানো ধীর গতির, সময়সাপেক্ষ ও কম দক্ষতা সম্পন্ন। শুধুমাত্র এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা পূরণ করা দুঃসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভব। তাই আজ হোক কাল হোক পারমাণবিক শক্তির দিকে পৃথিবীকে যেতেই হবে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পারমাণবিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কাজে লাগিয়ে বিশাল পরিমাণে কার্যকরী বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করে অল্প জ্বালানী দিয়ে বছরের পর বছর বিপুল সংখ্যক জনগণ ও বিশাল এলাকার প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করা যায়। জীবাশ্ম জ্বালানী সঙ্কটে ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তিই দিতে পারে বিপুল ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটানোর আশ্বাস। যাতে উত্তর উত্তর এগিয়ে যাবে মানবজাতি।

কিন্তু এই পারমাণবিক চুল্লি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আড়ালে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প এই প্রবল শক্তির আধারকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকেও ধাবিত করতে পারে যার ফলাফল হতে পারে পুরো মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ।

কী হতে পারে একটি বড়সড় পরমাণু যুদ্ধের ফলাফল?

Federation of American Scientist এর ভাষ্যমতে প্রথম কথাই হচ্ছে পরমাণু যুদ্ধে আসলে কেউ জিতবে না। সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে চরমভাবে হারবে এবং সেই সাথে হারিয়ে দেবে পৃথিবী, মানবজাতি ও মানবিকতাকে।

যদি ধরা হয়ে বর্তমান পরাক্রমশালী যেকোনো একটি রাষ্ট্রের সকল মোতায়েনকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হল যুদ্ধে। তাহলে কী ঘটবে? সেক্ষেত্রে সেই অস্ত্র সমূহের আঘাতে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, বনাঞ্চল ও আবাসিক স্থলভূমিতে যে প্রকাণ্ড অগ্নিকাণ্ড ও অগ্নিঝড় বয়ে যাবে তাতে সৃষ্ট আনুমানিক ১৮০ মিলিয়ন টন বা ১৮ কোটি টন কার্বন ছড়িয়ে পড়বে পুরো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। বায়ুমণ্ডলে কার্বনের স্তর ঢেকে দেবে সূর্যকে। ভূপৃষ্ঠে সূর্যালোক পৌছবে না। সূর্য থেকে আগত ৭০ শতাংশ আলো ও তাপ আটকে যাবে দুষিত কার্বনের স্তরে। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাবে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।

শিল্পীর চোখে পারমাণবিক শৈত্যের কাল্পনিক চিত্র – ৭০ শতাংশ সৌরালোক ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত

পৃথিবীর তাপমাত্রা নেমে যেতে থাকবে হিমাংকের নিচে। বছর খানেকের মধ্য বর্তমানে প্রচণ্ড উত্তপ্ত ইউরেশিয়া অঞ্চলের তাপমাত্রাও কমে নেমে যাবে হিমাংকের নিচে। পৃথিবীতে সূচনা হবে আরেকটি বরফ যুগ। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস হবে। সামগ্রিক ফলাফলে পৃথিবীর জীবজগতে বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিদ মৃত্যুবরণ করবে এবং জীবজগতে আরেকটি গণবিলুপ্তি দেখা দেবে পৃথিবীতে। গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট ধুলোর স্তরের কারণে একসময় যেমন পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল তেমন আরেকটি জীববিলুপ্তির ঘটনার সাক্ষী হবে পৃথিবী।

এ তো গেল যদি এক দেশের সকল অস্ত্র ব্যবহৃত হয় তার ফলাফল। যদি পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ একাধিক মহাপরাক্রমশালী দুটো দেশের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধ সংঘটিত হয় তবে? যুদ্ধরত দুটো দেশই পুরোপুরিভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ফলাফলে উপরে বর্ণিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আরো প্রবলভাবে এবং আরো দ্রুত দেখা দেবে। বাড়তি বিপর্যয় হিসেবে সেই দুই দেশে অবশিষ্ট সকল পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস হবে ও মিশে যাবে প্রকৃতিতে। রাসায়নিক সংরক্ষণাগার ও শিল্প কারখানা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় সেগুলোতে জমে থাকা ক্ষতিকর ও বিষাক্ত দ্রব্যাদি ছড়িয়ে পরবে পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলে। দুটো বৃহৎ রাষ্ট্রের সকল বিষাক্ত পদার্থ যখন আবহাওয়ায় মিশে যাবে তখন তা ছড়িয়ে পরবে ও প্রাণঘাতী প্রভাব ফেলবে পুরো পৃথিবীর সমগ্র জীবজগতের উপরেই।

এত কিছুর পড়েও পৃথিবীতে যেসকল জীব ও মানুষ কোন ভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হবে (যদি আদৌ টিকে থাকতে সক্ষম হয়) তারা একটি তেজস্ক্রিয় ও বিষাক্ত আবহাওয়ার পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। মানুষের পরবর্তী বংশধরেরা দেখবে তাদের পূর্ববর্তী বংশধরদের অপরিণামদর্শী যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলাফল একটি বিষাক্ত-তেজস্ক্রিয় বাসঅযোগ্য পৃথিবী।

সমাপ্তি

সবশেষে “পারমাণবিক অস্ত্র বিবরণী” সিরিজ টি একটি কার্টুন দিয়ে শেষ করছি। পরমাণু যুদ্ধ মানবজাতি ও সমগ্র পৃথিবীর জন্য কত বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত এই কার্টুনটি তারই একটি রূপক চিত্রায়ন।

১৯৮৩ সালের ২০ নভেম্বর ABC News এর ViewPoint অনুষ্ঠানে ‘The Day After’ Nuclear War/Deterrence Discussion বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে দুটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সামর্থ্য নিয়ে বিতর্কের অবস্থা বোঝাতে এমন রুপক একটি উক্তি করেছিলেন কার্ল সেগান।

দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের পরমাণু যুদ্ধের হুমকি ও ফলাফলের প্রকৃত প্রকৃতি

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

পারমাণবিক শক্তির মত একটি বিষয় নিয়ে পাঁচ পর্বের সিরিজ লেখার কাজে তথ্য ও তথ্যসূত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের একাডেমিক পাঠ্যপুস্তক সংগ্রহ, নানা সময়ে নানা রকম তথ্য যাচাই-বাছাই কাজে সহযোগিতা এবং নির্ভুল সিরিজ রচনায় প্রয়োজনীয় প্রতিটি পর্বের ইনফরমেশন ক্রস-চেক এর গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে সর্বদা উৎসাহ প্রদান করে সিরিজটি সমাপ্ত করতে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন বিজ্ঞানযাত্রী। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই সিরিজ হয়ত এতটা তথ্যসমৃদ্ধ নাও হতে পারত। এই সিরিজের জন্য পর্দার আড়াল থেকে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া সিরিজ সমাপ্তি কার্টুনটি সম্পাদনা করে শেষ পর্ব ও সিরিজের সমাপ্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন “আর্টিস্ট”।

তথ্যসূত্র সমগ্র

সর্বশেষে রইলো পাঁচ পর্বের “পারমাণবিক শক্তি বিবরণী” সিরিজে ব্যবহৃত তথ্যের তথ্যসূত্রসমূহের পূর্ণাঙ্গ তালিকা।

১. Nuclear Energy: Principles, Practices And Prospects – Second Edition by David Bodansky (Reference Text Book, Nuclear Engineering Department, Dhaka University)
২. Nuclear Energy: An Introduction to the Concepts, Systems and Applications of Nuclear Processes – Sixth Edition by Raymond L. Murray (Reference Text Book, Nuclear Engineering Department, Dhaka University)
৩. The University of Arizona
৪. Princeton University
৫. Federation of American Scientists
৬. Union of Concerned Scientists
৭. United States Nuclear Regulatory Commission
৮. Nuclear Energy Institute
৯. World Nuclear Association
১০. Atomic Archive
১১. Nuclear Weapon Archive
১২. Atomic Heritage
১৩. Global Security
১৪. military.com
১৫. The New York Times
১৬. BBC UK
১৭. ABC News

Comments

S. A. Khan

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাছে পরাজিত সকল বাঁধা।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz