মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করলেও আমাদের নিজেদের পৃথিবীর কেন্দ্র সম্পর্কে কমই জানি আমরা। যা কিছু জানি তা সবই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিয়ে প্রমাণিত কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা কেন্দ্রের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা আমরা করতে পারিনি এখনও। শতাধিক বছর ধরে মাটিতে খোঁড়াখুঁড়ি করে খনিজ সংগ্রহ করছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা পৃথিবীর ভূত্বক ভেদ করতে পারিনি। একবারের জন্যেও না। এই (২০১৫ সালের) ডিসেম্বরেই বিজ্ঞানীরা মানব জাতির অর্জনের তালিকায় সেটা যোগ করার কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। আসুন জেনে নিই, পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে এই অভিযান সম্পর্কে।
ছবিঃ ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অংশ
ভূত্বক ভেদ করার এই অভিযান পরিচালিত হবে দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতীয় শৈলশিরা‘র আটলান্টিস ব্যাংক অংশে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র অনুসন্ধান কার্যক্রম এর ড্রিলিং জাহাজ জোডিস রেজোলিউশন
ইতোমধ্যে আটলান্টিস ব্যাংকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। এখানে জাহাজটি SloMo (Slow Spreading Ridge Moho) নামের একটি প্রজেক্টের আওতায় ভূপৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার (প্রায় ০.৯ মাইল) গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
এই প্রজেক্টে যৌথভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোফেসর ক্রিস ম্যাকলিওড এবং ম্যাসাচুসেটস এর উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইন্সটিটিউটের হেনরি ডিক। আর এই প্রজেক্ট আরও বড় একটা কর্মযজ্ঞের সূচনা মাত্র। প্রাথমিক সফলতা পেলে তাঁরা ২০২০ সাল নাগাদ জাপানের চিকু (Chikyū) ড্রিলিং জাহাজের সাহায্যে প্রথমবারের মত পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ ভেদ করে তরল কেন্দ্রের (mantle) কাছে পৌঁছাতে চান।
এই ব্যাপারে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ক্রিপ ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির সমুদ্রবিজ্ঞানী ওয়াল্টার মাঙ্ক ন্যাচার নিউজকে বলেন – “আমরা এই পৃথিবীতে বাস করছি। এবার আমরা জানতে চাই আমাদের পায়ের নিচে আসলে কী ঘটছে।” মাংক এবং ডিক দু’জনেই এর আগে যথাক্রমে ১৯৬১ ও ১৯৯৭ সালে ভূপৃষ্ঠ ভেদ করার দুইটি উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। যদিও আগের কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি। কিন্তু এবারের উদ্যোগটি নিয়ে আমরা বিশেষ করে আশাবাদী।
এবারের SloMo প্রোজেক্টটি ভূত্বকের একটি বিশেষ অংশে পরিচালিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে এই অংশটিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরের তরল ম্যান্টল স্ফীত হয়ে আছে ফলে ভূত্বক ভেদ করে ম্যান্টলের কাছে পৌঁছানো অনেক সহজ হবে। সাধারণত ম্যান্টল Moho (Mohorovičić discontinuity) – ভূত্বক ও ম্যান্টলের মধ্যবর্তী একটি বিশেষ অংশ – এর নিচে থাকলেও এই অংশটিতে ম্যান্টল Moho’র উপরে মাত্র ২.৫ কিলোমিটার গভীরে আছে। এই অংশটিতে Moho আছে প্রায় ৩.১ – ৩.৪ কিলোমিটার গভীরে।
ইন্ডিয়ান রিজ মোহো এক্সপেডিশন (Indian Ridge Moho Expedition) নামের এই প্রাথমিক অভিযানে জোডিস রেজোলিউশন নামের বিশেষায়িত জাহাজের ড্রিল ভূপৃষ্ঠের গভীরে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করবে। পরবর্তী বছরগুলোতে অভিযান পরিচালিত হবে আরও গভীরে যাওয়ার।
এই অভিযানের আরেকটি মূল উদ্দেশ্য হবে এই গভীরতায় “সার্পেন্টিনাইজেশন” (পৃথিবীর গভীরে সক্রিয় তাপের উৎস, যেমন ম্যাগমা থেকে সৃষ্ট পাথর) পরীক্ষা করা। এ ধরণের পাথরে প্রচুর পরিমাণে আণুবীক্ষণিক প্রাণ পাওয়া যায়। বিবিসি কে প্রোফেসর ম্যাকলিওড বলেন “এখানে যদি অনেক বেশি সার্পেন্টাইট পাওয়া যায়, কে জানে সেখানে কতটা আণুবীক্ষণিক প্রাণের প্রাচুর্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে”।
SloMo অভিযান চলবে জানুয়ারি ৩০, ২০১৬ পর্যন্ত। যদি এটা সফল হয়, আমরা অনেকটাই এগিয়ে যাব পৃথিবীর কেন্দ্রের ম্যাগমা থেকে নমুনা সংগ্রহের দিকে।
কৃতজ্ঞতাঃ
১। জোডিস রেজোলিউশনের ছবিঃ উইকিমিডিয়া
২। ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরের ছবিঃ উইকিমিডিয়া
৩। SloMo প্রোজেক্টের ছবিঃ নেচার নিউজ
৪। মূল লেখা – IFLScience
৫। নেচার নিউজ