শেষের পরে (কল্পকাহিনী)

কিছুক্ষণ আগে E-07 নামক গ্রহে এসে পৌঁছালাম। আজ থেকে ২৭ বছর ৮ মাস আগে পৃথিবী থেকে E-07 গ্রহের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম আমি এবং আরো ১৪৯ জন। কিন্তু শেষমেশ এখানে জীবিত এসে পৌঁছেছি ১৪৩ জন।  বাকি ৭ জন নানা কারণে যাত্রাপথেই মারা গেছে। তাদেরকে এই গ্রহেই সমাধিস্থ করে অসহ্য স্পেসস্যুট পড়ে বসে আছি এই গ্রহের মাটিতে। আর ভাবছি ২০৫৭ সালের কথা, যখন প্রিয় পৃথিবীকে ছাড়লাম। এখন এখানে এসে পৌঁছেছি যখন, তখন পৃথিবীর হিসেবে ২০৮৫ সাল। বর্তমানটা এই মূহুর্তে আমার জন্য বেশি কষ্টের ও আনন্দের! কষ্টের কারণ – পৃথিবীকে ছেড়েছি। আনন্দের কারণ – এখানে নতুন সম্ভাবনা দেখছি।

আমরা ২০৩৭ সালে প্রথমবারের মতো এই E-07 গ্রহটা খুঁজে পাই, যেটাতে অনেকটাই পৃথিবীর মতো পরিবেশ। সমস্যা হলো আমাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি অক্সিজেন বাড়াতে হবে।  অক্সিজেন যা আছে তা দিয়ে মোটামুটি কিছু বছর ভালোভাবে বাঁচা যায়, যদি প্রকৃতির উপর হস্তক্ষেপ না করি। কিন্তু আমাদের বাঁচতে হবে বহু বছর। নতুন করে তৈরি করতে হবে এই নতুন জগতকে।

আমরা, নাসার বিজ্ঞানীরা, যখন এই গ্রহকে আবিষ্কার করেছিলাম, তখন আনন্দের বদলে সূক্ষ্ম বেদনা পেয়েছিলাম! কারণ, পৃথিবীটা তত দিনে প্রায় ধ্বংস হতে চলেছিলো। আর আমরা অনুমান করতে পারছিলাম, কোনো না কোনোদিন ঠিকই আমাদের এই প্রিয় পৃথিবী ছাড়তে হবে। তখন হয়তো E-07 ই হবে ভরসা। আমরা এই গ্রহটার আরো একটু ভালো নাম দিতে চেয়েছি। কিন্তু বারবার পৃথিবী আমদেরকে ডেকে গেছে। E-07 নামের কারণ, পৃথিবীর মতো দেখতে যে সব গ্রহ আমরা আবিষ্কার করেছি, তার ভিতরে এটা ৭ম গ্রহ। কিন্তু, পরিবেশ বিবেচনায় পৃথিবীর পরেই এটার অবস্থান।

বিবর্তনের সিঁড়ি পেরিয়ে মানুষ এসেছিলো সবচেয়ে উন্নত ও জটিলভাবে চিন্তাযোগ্য মস্তিষ্ক নিয়ে। সবসময়ই কোনো না কোনো সমস্যা তৈরি করেছে এরা। ইচ্ছামত খেলেছে পৃথিবীটাকে নিয়ে। স্পেসস্যুট যেমন বৈরী আবহাওয়া থেকে নভোচারীদের বাঁচায়, তেমনি ওযোনস্তর রক্ষা করতো পৃথিবীকে। মানুষেরা নানা ভাবে স্তরটা ধ্বংস করেছে। ধর্ম দিয়ে আলাদা করেছে পুরো জাতিকে। ১০৩২ কোটি মানুষ ছিলো পুরো পৃথিবীতে। সম্ভাবনা ছিলো সবাই এক সাথে মিলেমিশে ভালো কিছু করার। কিন্তু আমরা নিজেদেরকে কমপক্ষে ৪০০০ ভাগে ভাগ করেছি। নিজেদেরকে সবসময় সেরা দাবি করেছি। ধর্মযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছি পুরো বিশ্ব জুড়ে। প্রতিটা জাতি চেয়েছে নিজেদের সেরা প্রমাণ করতে। সেরা প্রমাণের চিন্তাটা খারাপ না। কিন্তু, সবাই ভেবেছে অন্যভাবে। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সবাই চেয়েছে সেরা হতে। সেই সাথে বাকি সব ধর্মাবলম্বীদেরকে চিরতরে শেষ করে দিতে। এখানেই থেমে থাকেনি কেউ। নিজ নিজ ধর্মের ভিতরেও তৈরি করেছে বিভেদ। ফলস্বরূপ ঈশ্বরের উপাসকদের অত্যাচারে ঈশ্বর নিজেই তার কাজ থকে ইস্তফা দিয়েছেন। পুরো পৃথিবী হয়েছে নরক। প্রচুর সম্ভাবনা ছিলো পৃথিবীকে স্বর্গ বানানোর। অদৃশ্য ও অসহায় স্বর্গের পিছে ছুটে নিজ বাড়িকেই সবাই মিলে নরক করে তুলেছিলো।

সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, আমরা আন্তর্জাতিক সীমারেখা দিয়েছিলাম নিজেদের ভাগ করতে ভালোবাসি বলে। সীমারেখা দেয়ার পরেও সবাই নিজেদের সীমা অতিক্রম করতে চেয়েছি বার বার। ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, জাপান, আমেরিকাসহ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেয়ার জন্য বার বার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে ২০০০ এর বেশি পারমাণবিক বোমা বারবার হুমকি দিয়েছে মানব সভ্যতাকে। পারমাণবিক শক্তি কাজে লাগিয়ে আমরা পুরোপুরি বদলে দিতে পারতাম পৃথিবীকে। সাজাতে পারতাম নিজ বাড়িকে, স্বর্গের চেয়েও বেশি সুন্দর করে। নগর পোড়াতে গিয়ে দেবালয়ও ধ্বংস করেছি আমরা সেই বিশাল বিশাল বোমার আঘাতে। প্রতিটা বোমা মেরে নিজেরকে, নিজ নিজ ঈশ্বরকে বড় ও শক্তিশালী প্রমাণ করতে চেয়েছি। নগর ও দেবালয় সব পুড়িয়ে এসে প্রার্থনায় বসেছি।

ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস ছিলো আমাদের আদি পূর্বপুরুষ। সেই ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস কাজে লাগিয়ে ধ্বংস করেছি, সামনে যা পেয়েছি সব। ইচ্ছামতো, অযৌক্তিকভাবে খুন করেছি মানুষ,উদ্ভিদসহ সব ধরণের প্রাণ। মহাবিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ প্রাণ। খুব সহজে পাওয়া যায় না এটা। সেই সম্পদকেই আমরা ইচ্ছামতো শেষ করেছি। সব হারিয়ে এখন আমরা মাত্র ১৪৩ জন বেঁচে আছি, তাও নিজ বাড়ি ছেড়ে। পৃথিবীটা শেষ করেছি আমরা। শুধু কিছু এককোষী প্রাণ হয়তো টিকে আছে। হয়তো বিবর্তনের ঘূর্ণিপাকে ওরাই আবার নতুন কিছু উপহার দিবে পৃথিবীকে।

এখানে এসে দেখছি অনেকে আরেক দফা অনুসন্ধান শুরু করেছে! বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যস্ত সবাই। আমরা পারবো এই নতুন বাড়িকে মনের মত করে সাজাতে। পারতেই হবে। এছাড়া উপায়ও যে নেই!

দূরে বসে বিষ্ণু মাটিতে কী যেন দেখছে। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠলো, “সোহান, কার্ল, সাইমন! এদিকে এসো! মনে হচ্ছে আমি পরিচিত কিছু পেয়েছি! ব্যাক্টেরিয়া মনে হচ্ছে।”

একে একে সবাই ছুটে যাচ্ছে পরিচিত কিছুর টানে! সভ্যতাকে নতুন করে সাজাতে হবে। এ কাজে এই ১৪৩ জন কে ছাড়া E-07 আর কাউকে পাবে না। কার্ল আর সাইমনের সাথে আমি ছুটে চলেছি দ্রুত পায়ে। এই তো সময়, সব নতুন করে ভাবার, নতুন করে সাজানোর।

Comments

MHLikhon

বর্তমানে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও ভ্রমণ নিয়েই চলে যায় দিন! লেখালেখিও এগুলো নিয়েই।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
2 Comments
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
Inline Feedbacks
View all comments
সাফায়াত
সাফায়াত
4 বছর পূর্বে

অনেক অনেক সুন্দর লেখা

Mhlikhon
Mhlikhon
Reply to  সাফায়াত
4 বছর পূর্বে

ধৈর্য সহকারে পড়ার জন্য ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। ?

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x