বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মানব সভ্যতা এক নজরে – পঞ্চম পর্ব

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় চতুর্থ পর্বে পর্যায়ক্রমে বিগ ব্যাং থেকে মানুষের লৌহযুগে আগমনের ধারাবিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে পঞ্চম পর্বে লৌহ যুগ থেকে মানব সভ্যতার বর্তমান সময় অর্থাৎ একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ঘটনাক্রম সংক্ষেপে উঠে আসবে।

  • প্রায় ২৬০০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পৃথিবীতে প্রথমবারের মত মল্লযুদ্ধে নতুন একটি বাহিনী সংযোজিত হয়। ‘অশ্বারোহী বাহিনী’। মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা শুরু করে যা যুদ্ধের গতি ও ধরনে নিয়ে আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন। যুদ্ধযান হিসাবে ঘোড়া আর যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে সফল লৌহ নির্মিত অস্ত্র পুরো পৃথিবীর সকল মানব বসতির শাসনকার্যেই নিয়ে আসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। ছোট ছোট মানবগোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়ে সৃষ্টি হতে থাকে বিশাল বিশাল সাম্রাজ্য যার একচ্ছত্র অধিপতি হয় একজন সম্রাট। বিস্তৃত ভূখণ্ডের মালিক হয় সৈন্য-সামন্তে সমৃদ্ধ একজন সম্রাট।পারস্য সাম্রাজ্য, আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এর সাম্রাজ্য, চাইনিজ সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্যের মত সুবৃহৎ সাম্রাজ্য একের পর এক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সম্রাটগণ তাদের সময়কালে এসব অঞ্চলের মোট প্রায় ২০-৩০ লক্ষ বর্গমাইলের মত ভূমিতে নিজ নিজ এলাকায় কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
  • নতুন নতুন সাম্রাজ্য সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে একেক সাম্রাজ্যে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন ‘বিশ্বাস’। মানুষ ঝুঁকতে থাকে ‘একেশ্বরবাদ’ এর দিকে। বর্তমান পৃথিবীর বৃহত্তর ‘বিশ্বাস’ গুলোর ভিত্তি এই সময়ের উৎপত্তি যার পরিবর্তিত রূপ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে।
  • চায়না, এশিয়ার ভেতর দিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের সাথে নতুন ‘ট্রেড নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলে। খ্রিস্টপূর্ব ১০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে পৃথিবীতে প্রথমবারের মত সর্ববৃহৎ বাণিজ্য ও পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটে এই ‘ট্রেড নেটওয়ার্ক’ ধরে।
  • ২০০০ বছর পূর্বে প্রায় সারা পৃথিবী এসে পড়ে বৃহত্তর ‘ট্রেড নেটওয়ার্ক’ এর আওতায়। কিন্তু বিধিবাম! এই উন্নত বাণিজ্যব্যবস্থা যা সবাইকেই সমৃদ্ধি দিয়ে যাচ্ছিলো, তাঁর পেছনে পেছনে চলে এলো ভয়ানক বিপদ। যেসকল রোগশোক স্থানীয় অংশেই বিরাজ করতো, সেগুলো এই নেটওয়ার্ক বেয়ে ছড়িয়ে পড়লো সংশ্লিষ্ট সকল সাম্রাজ্যে। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লো নানা ধরনের রোগ। যারা সুদূরপ্রসারী ফলাফলে চাইনিজ হান এবং রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংসের সম্মুখীন হলো।
  • আগের চাইনিজ ট্রেড নেটওয়ার্কের বাইরেও মানুষ খুঁজে বের করলো নতুন নতুন আরো বাণিজ্য পথ।এরই মধ্যে আবির্ভূত হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম দখল করে নিলো ইউরোপ অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাসের স্থান যার ফলে এখনো সে অঞ্চলে প্রধান ধর্ম হিসাবে আছে খ্রিস্ট ধর্ম। এর বেশ কিছুদিন পর এলো আরব অঞ্চলে ‘ইসলাম’।আরবদের বাণিজ্যের জন্য দুটো সুবিধা ছিলো। একটি হলো তাদের ভৌগলিক অবস্থান; যাতে তাঁরা এশিয়ার এমন এমন জায়গায় সহজে পৌঁছে গেলো যেখানে আগে মানুষ তেমন একটা যায়নি। আর তাদের হাতে ছিলো একটি গুরুত্বপূর্ণ গৃহপালিত জন্তু উট। যাকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ। একে তাঁরা ঘোড়ার মতই কাজে লাগাতে সক্ষম হল। ছয়টি উটের একটি দলের সাহায্যে প্রায় দুই টন মালামাল দিনে ষাট মাইল বয়ে নিয়ে যাওয়া যায় যা গাধার তুলনায় দ্বিগুণ, তাও অর্ধেক সময়ে। এই সুবিধায় তাদের বাণিজ্য এশিয়ার ছড়িয়ে পরল দ্রুত, আর বাণিজ্যের সাথে স্বভাবতই ‘বিশ্বাস’।
  • ১১৭০ সালে ইটালির গণিতবিদ ফিবোনাচি’র জন্ম। তাঁর আবিষ্কৃত গণনা পদ্ধতি ও গণিত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে যা আন্ত-আঞ্চলিক বাণিজ্য আরো সহজ করে দেয়।

ফিবোনাচি : যার আবিষ্কৃত গণিত প্রকৃতিময় ছড়িয়ে

  • একাদশ শতাব্দীর আরেকটি বিস্ময়কর একইসাথে বিধ্বংসী আবিষ্কার ‘গান-পাউডার’। চীনে তৈরি এই গানপাউডারের পূর্ণ সুবিধা নিতে শুরু করে এ অঞ্চলের মুসলিম সেনারা পশ্চিমের ক্রিশ্চিয়ান সেনাদের বিরুদ্ধে। তাঁরা কামানের সাহায্যে গানপাউডারের বড় বড় গোলা নিক্ষেপ করে। পশ্চিমের সেনারা এই আইডিয়া সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। তাঁরা বড় গোলার স্থলে তৈরি করে ছোট ছোট গোলা ও ছোট আকৃতির ‘হ্যান্ড হেল্ড ক্যানন’ যাকে আমরা বর্তমানে বলি বন্দুক বা পিস্তল। এভাবেই মানব সভ্যতায় আগ্নেয়াস্ত্রের সূত্রপাত।
  • ১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন। আসলে তার ৫০০ বছর আগেই Lief Eriksson উত্তর আমেরিকা মহাদেশে পদার্পণ করেছিলেন। যাই হোক, কলম্বাসের আসার পরে সৃষ্টি হয় বহুদিনের অনাবিষ্কৃত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রেড নেটওয়ার্ক’। এরপরেই আবার দ্রুত বদলাতে থাকে মানব সভ্যতার দৃশ্যপট।

আমেরিকার মালিক (প্রয়াত)

  • ১৭০০ সাল পর্যন্ত ৭০ শতাংশ কাজ হত মানুষের পেশীশক্তির সাহায্যে, বাকিটা পশুশক্তির সাহায্যে। ১৭১২ সালে Thomas Newcomen এর আবিষ্কৃত পাম্প বাণিজ্যিকভাবে কয়লা খনিতে পানি-নিষ্কাশন কাজে লাগানো হতে থাকে। এটিই মূলত ব্যবহারিকভাবে কাজে লাগানো পৃথিবীর প্রথম বাষ্পীয় ইঞ্জিন। তবে এর যান্ত্রিক দক্ষতা খুবই কম ছিল। পরবর্তীতে অধিক যান্ত্রিক দক্ষতাসম্পন্ন বাষ্পীয় ইঞ্জিন সফলভাবে আবিষ্কার করেন ও কার্যক্ষম করে তোলেন জেমস ওয়াট।বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের সাথে সাথে দূর হলো মানুষের পেশীশক্তির সাহায্যে অতি ভারী কাজ করতে না পারার দুর্বলতা। যা পৃথিবীর চেহারা আমূল বদলে দেয়। শুরু হয় মানুষের প্রযুক্তিগত উন্নতির দ্বার, বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর যুগের সূচনা।
  • জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষে এই কয়লা খনির পানি উত্তোলককে কাজে লাগিয়ে আবিষ্কৃত হল আন্তদেশীয় ‘বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত রেলগাড়ি’।
  • আবিষ্কৃত হয় IC Engine. যার অত্যাধুনিক সংস্করণ ব্যবহৃত হচ্ছে আজকের দিনের ভারী ট্রাক থেকে শুরু করে উচ্চগতিসম্পন্ন রেস-কার পর্যন্ত।
  • পর্যায়ক্রমে এই ইঞ্জিন মাটিতে থেকে উঠে যায় আকাশে। মানুষ ইঞ্জিনের সাথে পাখা লাগিয়ে আকাশে উড়তে শেখে।
  • টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ সংবাদবাহককে মুক্তি দেয়। সংবাদ পৌঁছে যায় ‘আলোর গতিতে’।
  • বিদ্যুতের সাহায্যে অন্ধকারকে জয় করে মানুষ রাতেও নিয়ে আসে ‘সূর্যের আলো’।
  • বিংশ শতাব্দীতে এসে একসময় মানুষকে কাজের হাত থেকে মুক্তি দেয়া ইঞ্জিন হয়ে দাঁড়ায় মানুষের জন্য ‘জল্লাদ’। ইঞ্জিন চালনায় প্রয়োজনীয় ‘জ্বালানি তেল’ এবং ইঞ্জিন চালিত যুদ্ধযান যুদ্ধকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। বিংশ শতাব্দীতে ঘটা বিশ্বের যুদ্ধ সমূহে এর পূর্বের ২০০০ বছরে যুদ্ধে নিহত মানুষের চেয়ে প্রায় তিনগুণ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

আমরা একবিংশ শতাব্দীর মানুষ। পৃথিবীতে ৭০০ কোটি জনসংখ্যার সর্ববৃহৎ শাসকগোষ্ঠী। বর্তমানে আমরা ১০ হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষদের তুলনায় আনুমানিক ৫০ হাজার গুণ বেশি শক্তি ব্যবহার করছি। মানুষের পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও যন্ত্রমানব। মহামারী এখন প্রায় যাদুঘরে।

পুরো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ তো আছেই, এখন মহাকাশপানে মানুষের দৃষ্টি। চন্দ্রবিজয় শেষে এখন হাতছানি মঙ্গলের। সর্বাধুনিক অন্যতম সর্ববৃহৎ প্রযুক্তি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব যেন সেই ২০০০ বছর আগের বৈপ্লবিক ‘ট্রেড নেটওয়ার্ক’ যেটি সেটির চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে মানবসভ্যতা বিকাশে।

এই হল বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা। পাঁচ পর্বেই মূল ধারাক্রম বর্ণনা করা হলেও এই সিরিজের পরবর্তী পর্ব, ষষ্ঠ ও শেষ পর্বে থাকবে পুরো সিরিজের সারমর্ম খুবই অল্প কথায় এবং আরো কিছু তথ্যসূত্র।

 তথ্যসূত্র –
১. history.com
২. metmuseum.org
৩. A Descriptive History of the Steam Engine – Robert Stuart
৪. bbc.co.uk

Comments

S. A. Khan

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাছে পরাজিত সকল বাঁধা।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

1 মন্তব্য on "বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মানব সভ্যতা এক নজরে – পঞ্চম পর্ব"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
চন্ডাল
অতিথি

এই প্রবন্দ গুলো পিডিএফ করে ডাওনলোড করে নেয়া শুবিধা থাকলে ভালো হত

wpDiscuz