বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মানব সভ্যতা এক নজরে – প্রথম পর্ব

‘বিগ ব্যাং’, মহাবিশ্বের সূচনা, মহাবিশ্বের সব কিছুর উৎপত্তি। সকল পদার্থ ও শক্তির সৃষ্টি, সময় ও স্থানের সৃষ্টি যাকে বলা হয় ‘স্পেসটাইম’ বা স্থান-কাল।

আজ থেকে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে পরমাণুর চেয়েও বহুগুণ ক্ষুদ্র প্রায় শূন্য (v→0) আয়তনে ঘটা একটি বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি।

‘বিগ ব্যাং’ এর পর সময়ের পরিক্রমায় ধাপে ধাপে এই মহাবিশ্ব বর্তমান অবস্থায় আসে। গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি সব কিছুর শুরু ‘বিগ ব্যাং’।

স্বল্প পরিসরে দেখা যাক ‘বিগ ব্যাং’ এর পর কী কী ধাপ পার হয়ে আমাদের পৃথিবী, পৃথিবীতে ‘প্রথম প্রাণ’ এবং প্রাণের বিকাশের ধারায় বর্তমান মানব সভ্যতা।

প্রথম পর্বে ‘বিগ ব্যাং’ এর পর পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে ‘প্রথম প্রাণ’ সৃষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ গঠিত হবার সময় পর্যন্ত একটি ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হলো।

  • বর্তমান সময় হতে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে বৃহৎ বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়। তাপমাত্রা প্রায় ১০^২৭  ডিগ্রী সে:।
  • বিগ ব্যাং এর পর ১ সেকেন্ড সময়ের মাঝে প্রায় শূন্য আয়তনের মহাবিশ্ব ছড়িয়ে পরে গ্যালাক্সির চেয়েও বড় এলাকায়। পদার্থ-প্রতিপদার্থ, কোয়ার্ক-প্রতিকোয়ার্ক একে অপরকে ধ্বংস করে শুধু শক্তি হয়ে বিরাজ করে। বাকিরা প্রোটন ও নিউট্রন সৃষ্টি করে। তাপমাত্রা কমে প্রায় ১০^১২ ডিগ্রী সে:।
  • ইলেকট্রন পজিট্রন কে ধ্বংস করে। তাপমাত্রা আরো কমে প্রায় ৩০০ কোটি ডিগ্রী সে: হয় দশ সেকেন্ডের মধ্যে।
  • পরমাণু গঠনের তিন মৌলিক কণা ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন প্রস্তুত হতে সময় নেয় বিগ ব্যাং এর পর তিন মিনিট।
  • এর পর এভাবে সময় বয়ে চলে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হতে থাকে। মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায় ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রনের দল বিচ্ছিন্ন ভাবে।
  • প্রোটনকে কেন্দ্র করে প্রথম ইলেকট্রন ঘূর্ণন শুরু করে বিগ ব্যাং এর প্রায় ৩ লক্ষ বছর পর। তৈরি হয় মহাবিশ্বের প্রথম পরমাণু, হাইড্রোজেন পরমাণু। এভাবে তৈরি হয় অসংখ্য বিচ্ছিন্ন হাইড্রোজেন পরমাণু। যা বর্তমান কালের সকল বস্তুর, সকল পরমাণুর আদি অবস্থা।
  • এ সময় থেকেই শুরু হয় মহাবিশ্ব গঠনে মহাকর্ষের প্রধান ভূমিকা। হাইড্রোজেন পরমাণু মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে মহাকর্ষের প্রভাবে কাছাকাছি আসা শুরু করে। গঠিত হয় গ্যালাক্সি। বিগ ব্যাং এর পর প্রায় ৩০ কোটি বছর থেকে ৫০ কোটি বছর পর্যন্ত চলতে থাকে বিভিন্ন স্থানে গ্যালাক্সির জন্ম ও পূর্ণতা প্রাপ্তির পথে এগিয়ে যাবার সূচনা।
    এসব গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে কাছাকাছি থাকা হাইড্রোজেন মহাকর্ষের প্রভাবে আরো কাছাকাছি এসে একটি কেন্দ্রের দিকে এগুতে শুরু করে। তাদের পারস্পারিক ঘর্ষণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে চাপ এবং বাড়ে সামগ্রিক মহাকর্ষ বল যা আশেপাশের হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে কাছ নিয়ে আসে আরো বেশি পরিমাণে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ডিগ্রী ফারেনহাইট হলে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস মিলে গঠিত হতে থাকে ভারী মৌল হিলিয়াম। সেই সাথে ফিউশনের জন্য বিকিরিত হয় শক্তি। এভাবেই তৈরি হয় মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্র। একই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্র। আমাদের সৌরজগতের সূর্যও এমনই একটি নক্ষত্র।
    এখানে তৈরি হল প্রাথমিক ও হাল্কা দুটি মৌল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। কিন্তু আমাদের পৃথিবীতেই আছে আরো শতাধিক তুলনামূলক ভারী মৌল। সেগুলোও তৈরি হয় নক্ষত্রেই। নক্ষত্রের আকারের উপর নির্ভর করে তুলনামূলক বড় ও ভারী নক্ষত্র গুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে আর সেই সাথে সকল হাইড্রোজেন যুক্ত হয়ে হিলিয়াম হবার পরেও ফিউশন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ভারী থেকে অতি-ভারী নক্ষত্রে একই ফিউশন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় হিলিয়াম থেকে যথাক্রমে, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ম্যাগনেসিয়াম এবং সবশেষে লোহা। নক্ষত্রের সকল পরমাণু লোহাতে পরিণত হবার পর আর ফিউশন চলতে পারে না। বলা যেতে পারে লোহা হল নক্ষত্র নামক চুলার ‘ছাই’। তখন মৃত্যু ঘটে একটি নক্ষত্রের। ছোট নক্ষত্রে এই মৃত্যু শান্ত হলেও মাঝারি ও বৃহদাকার নক্ষত্রে, ফিউশন বা সংযোজন শেষে এরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বিশাল এক বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। আর এই বিস্ফোরণের মাধ্যমেই তৈরি হয় কপার, সীসা এবং ইউরেনিয়ামের মত ভারী মৌল। যেগুলোকে নক্ষত্রের আকার ও ভরের উপর নির্ভর করে বলা হয় ‘নোভা’ ও ‘সুপারনোভা’ বিস্ফোরণ।
  • আজ থেকে প্রায় ১০০০ কোটি বছর পূর্বে সৃষ্টি হয় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। যার অধিবাসী আমরা। এই গ্যালাক্সিতে বারবার নক্ষত্রের জন্ম, মৃত্যু ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্ট ভারী মৌল ও প্রয়োজনীয় হাল্কা হাইড্রোজেন একত্রিত হয় এই সর্পিলাকার গ্যালাক্সির পরিধির কাছাকাছি বর্তমান সৌরজগতের স্থানে।
  • বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৪৫৬ কোটি বছর আগে এই একত্রিত ধুলোর মেঘ তার কেন্দ্রে তৈরি করে একটি নতুন নক্ষত্র। যাকে আমরা বলছি ‘সূর্য’। সৌরজগতের প্রাণ কেন্দ্র।
  • এই সৌরজগতের মোট পদার্থের ৯৯.৯% পদার্থ নিয়েই গঠিত হয় সূর্য। তারপরেও তার আশেপাশে থাকে গ্রহ উপগ্রহ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পদার্থ। যেগুলো সময়ের সাথে মহাকর্ষের টানে কাছাকাছি এসে একত্রিত হয়ে গ্রহের আকার ধারণ করে সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং তৈরি করে সৌরজগত। এই গ্রহগুলোর একটি আমাদের পৃথিবী।
  • আজ থেকে ৪৫৪ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবী গ্রহের আকার ধারণ করে যার ভর ছিল বর্তমান ভরের ৮০% । এ অবস্থায় পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ অর্ধ-তরল গলিত লাভার একটি গোলাকার খণ্ড। তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন ছিল বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি। তখন পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর একবার ঘুরতে সময় লাগত মাত্র ৬ ঘণ্টা।
    দিন অতিবাহিত হতে থাকলো, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ নির্ধারণ করে নিলো। গলিত পৃথিবী ঠাণ্ডা হতে থাকলো। হালকা পদার্থ তরলের উপরে উঠে এসে ভূপৃষ্ঠের আবরণের তৈরি করতে থাকল আর ভারী পদার্থ ডুবে গিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্রে ভারী লোহা ও নিকেলের মিশ্রিত একটি ‘কোর’ তৈরি করলো। এই ধাতব কেন্দ্র থেকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হল যা সূর্য থেকে ধেয়ে আশা আয়নিত কণা থেকে পৃথিবীর জীবজগৎকে এখনো রক্ষা করে চলে প্রতিনিয়ত। তখনো পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ তৈরি হয়নি।
  • ৪৫৩ কোটি বছর পূর্বে প্রায় মঙ্গল গ্রহের সমান একটি বস্তুখণ্ড ঘণ্টায় প্রায় ২৫০০০ কিঃমিঃ বেগে এসে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। এই সংঘর্ষের ফলে আগন্তুকের কিছু অংশ পৃথিবীতে থেকে যায় আর বাকি অংশ ছড়িয়ে পরে মহাকাশে। ছড়িয়ে পরা এই বস্তুর কিছু অংশ মহাকর্ষের টানে একত্রিত হয়ে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। সৃষ্টি হয় পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ।
    চাঁদ সৃষ্টি হওয়া পৃথিবীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই সংঘর্ষের ফলেই পৃথিবীর উলম্ব অক্ষ খানিকটা বেঁকে যায়। যার ফলে আজ আমরা পাচ্ছি ঋতুবৈচিত্র্য। যেটি প্রাণের উদ্ভব ও জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয়। পৃথিবীর আহ্নিক গতি হ্রাস প্রাপ্ত হয়ে ৬ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টায় আসতে চাঁদের আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া বর্তমানেও পৃথিবীর জলবায়ুর উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চাঁদ। তার চাক্ষুষ উদাহরণ জোয়ার-ভাটা।

এই সংঘর্ষ “Giant Impact” নামে পরিচতি।

  • ৪৫০ কোটি বছর পূর্ব থেকে ৩৮০ কোটি বছর পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবী প্রাণের উদ্ভব ঘটার জন্য পর্যাপ্ত স্থিতিশীল অবস্থায় আসে। পৃথিবীর কক্ষপথ সুনির্দিষ্ট হয়, পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি স্থিতিশীল হয়, পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের গতি নির্দিষ্ট হারে এসে পৌঁছায়, চাঁদ অর্ধ-তরল লাভা থেকে ঠাণ্ডা হয়ে কঠিন অবস্থায় আসে।
  • ৪৫০ কোটি বছর পূর্বে, পৃথিবী কিছুটা শীতল হয়ে ভূপৃষ্ঠ কঠিন আকার ধারণ করে। তবে তখনো ভূপৃষ্ঠে চলছে প্রচণ্ড অগ্ন্যুৎপাত। সেসময় পৃথিবীতে তাপমাত্রা এতই বেশি ছিল যে কোন তরল পানি ছিল না, ছিল ‘অত্যন্ত উত্তপ্ত বাষ্প’।
  • ধীরে ধীরে পৃথিবী ঠাণ্ডা হতে থাকে, জলীয়বাষ্পের দরুণ বৃষ্টিপাত হয়। প্রথমে খুবই অল্প পরিমাণে ও পরে বেশি। ভূপৃষ্ঠ পানি তরল অবস্থায় থাকার মত তাপমাত্রায় আসে। বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হয় জলাধার এবং সমুদ্র।
  • আজ থেকে ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় প্রথমবারের মত স্থায়ী সমুদ্র, যা ছিল প্রথম প্রাণের উৎপত্তিস্থল ও আবাস।

প্রথম পর্বে মহাবিশ্বের উৎপত্তি থেকে পৃথিবীতে প্রাণ সঞ্চারের উপযুক্ত পরিবেশ গঠন পর্যন্ত সময়কে ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা হলো।

পরবর্তী পর্বে পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উদ্ভব, ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের ধারায় বর্তমান মানব সভ্যতা গঠন পর্যন্ত অতিক্রান্ত সময়ের আরেকটি অংশ থাকবে।

তথ্যসূত্র:-
১. মহাকাশে কী ঘটছে – আবদুল্লাহ আল-মুতী
২. www.history.com

Comments

S. A. Khan

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাছে পরাজিত সকল বাঁধা।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz