কসমসঃ এ পার্সোনাল ভয়েজ – রিভিউ

সিরিজ – কসমসঃ এ পার্সোনাল ভয়েজ (১৯৮০)
জনরা – সায়েন্স ডকুমেন্টরি, ক্যাটাগরী – মিনি সিরিজ
ক্রিয়েটর – কার্ল সেগান, অ্যান ড্রুইয়ান, এবং স্টিভেন সোটার
উপস্থাপক– কার্ল সেগান
এপিসোড সংখ্যা – ১৩, সিজন সংখ্যা – ১
বাংলা সাবটাইটেল – অনুবাদকদের আড্ডা
সিরিজ এবং বাংলা সাবটাইটেল ডাউনলোড লিংক – অনুবাদকদের আড্ডা
ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর/সাউন্ডট্র্যাক লিংক- ইউটিউব
(বাংলায় সবগুলো এপিসোডের টাইটেল এবং কার্ল সেগানের উক্তি দুটো নেয়া হয়েছে কসমস-এর বাংলা সাবটাইটেল থেকে।)

কার্ল সেগানের কসমস সিরিজ নিয়ে সারা পৃথিবীতে এতো ভাষায় এতো কিছু লেখা হয়েছে, যে আর কী লেখার বাকী আছে, সেটা ভেবে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্ত তখনই মনে পড়লো সিরিজের প্রথম লাইন – ‘‘কসমস হচ্ছে, যা কিছু বর্তমান,যা অতীতে ছিলো,বা ভবিষ্যতে আসবে।’’ যে সিরিজের শুরুই এই বাক্য দিয়ে (অ্যান ড্রুইয়ানের বক্তব্য অরিজিনাল কসমস-এ ছিলো না। কার্ল সেগানের মৃত্যুর পর তা যুক্ত করা হয়েছে) সেটা নিয়ে যতোই লেখা হোক না কেন, তা কখনোই যথেষ্ট নয়।

এ মুহূর্তে আপনি যেখানে আছেন, আপনার হাতের তালু থেকে শুরু করে ওই দূর আকাশ পার হয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ – এই ক্রমপ্রসারমান মহাবিশ্ব, এর গঠন-উপাদান-ইতিহাস-ভবিষ্যৎ, সবই কসমস-এর অংশ। কাজেই প্রশ্ন হচ্ছে উল্টো। এতো বড় রিভিউতেও কসমসঃ এ পার্সোনাল ভয়েজ নিয়ে কতটুকু বলা সম্ভব?

সিরিজ পরিকল্পনাঃ
কসমস সিরিজের কাঠামো অনেকটা ক্লাসিক ওল্ড স্কুল টাইপের। ‘যা শিখবে, তার ইহকাল-পরকাল-মহাকাল সব জানবে’- এমন। এক এপিসোডে শতেক বিষয়ের মারদাঙ্গা নেই। আমাদের সাথে নিয়ে কাল্পনিক জাহাজে করে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন সেগান, তার পথে যখন যা দেখেছেন, এক এপিসোডে তাতেই ফোকাস করেছেন। মানুষের ইতিহাস ও বিবর্তন, পৃথিবী, তার ছায়াপথের অবস্থান, নক্ষত্রপুঞ্জের জন্ম-মৃত্যু-দ্বৈরথ, পদার্থবিজ্ঞান, শরীরবিজ্ঞান বা বিজ্ঞানের কোনো একটি শাখার কোনো একটি অংশ হাতে নিয়ে – তার অতীত থেকে শুরু করে, তাকে নিয়ে মানুষের মাঝে গড়ে ওঠা কল্পনা/মিথ, বিজ্ঞানীদের কৌতুহল, অনুমান, অন্বেষণ, গবেষণা, তার সত্য মিথ্যা যাচাই আলোচনা, তার আজকের অবস্থান, ভবিষ্যৎ, কোনো সিদ্ধান্তে পৌছুনো বা প্রশ্ন জারি রাখা, এবং এপিসোডের সেই বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সাথে কসমস-এর যোগাযোগ করিয়ে দেয়া- এভাবেই একেকটি এপিসোড এগিয়েছে। সেগান সতর্ক ছিলেন একবারের জন্যও যেনো তাকে শিক্ষক না মনে হয়। মনে হয়েছে কাল্পনিক জাহাজে আমরাও তার সহযাত্রী, একই সাথে কসমসকে একটু একটু করে আবিষ্কার করছি। আমাদেরই আবিষ্কার তাঁর জবানীতে শুনছি।

এপিসোডভিত্তিক বিষয়বস্তঃ

এপিসোড ১, মহাজাগতিক সমুদ্রের সৈকত – কাল্পনিক জাহাজে করে আট বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকে রওনা হলেন সেগান; লোকাল গ্রুপ, ওরিয়ন নেবুলা, অ্যান্ড্রোমিডা, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি’র পরিচয় দিতে দিতে আসলেন পৃথিবীতে। যে আশ্চর্য উপায়ে প্রায় দু হাজার বছর আগে এরাটোসথিনিস পৃথিবীর পরিধি বের করেছিলেন, তার বর্ণনা এবং লাইব্রেরি অফ আলেকজান্ড্রিয়ায় জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের কথা বললেন। মহাজাগতিক ক্যালেন্ডার এবং তাতে মানুষের অবস্থানের সাথে আমাদের পরিচয় করালেন।

কল্পনার আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি

এপিসোড ২, মহাজাগতিক সুরের ঐকতান – এপিসোডের শুরুতে সেগান জাপানের হেইকে সভ্যতার সামুরাইদের গল্প দিয়ে কৃত্রিম নির্বাচন প্রকৃয়া বোঝালেন, তারপর ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনবাদ, মানবদেহে জিন, ডিএনএ, ও বিবর্তনের সাহায্যকারী হিসেবে মিউটেশনের কাজ আলোচনা করেছেন।

এপিসোড ৩, সকল জগতের সামঞ্জস্য – জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জ্যোতিষীদের ভন্ডামির কথা দিয়ে শুরু হয়েছে এই এপিসোড। এসেছে পৃথিবীকেন্দ্রিক ও সূর্যকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের থিওরী নিয়ে টলেমী আর কোপার্নিকাসের বিবাদের কথা। সেগান আরও বলেছেন, ইয়োহানেস কেপলার নামে এক প্রায় উদ্বাস্তু জার্মান গণিতবিদ-জ্যোতির্বিদ তার সারা জীবনের সাধনায় কিভাবে বের করলেন গ্রহের গতি সংক্রান্ত তিনটি সূত্র।

এপিসোড ৪, স্বর্গ আর নরক – এপিসোড শুরু হয়েছে তুঙ্গুসকা ইভেন্টের সঠিক কারণ অনুসন্ধান, এ বিষয়ে বিভিন্ন ধারণা ও মতবাদের আলোচনা নিয়ে। পর্যায়ক্রমে এসেছে, ধূমকেতু নিয়ে প্রাচীন কাল থেকে মানুষের ভীতি, কুসংস্কার, ক্যান্টারবীউরি সন্ন্যাসীদের অভিজ্ঞতা থেকে চাঁদের ওপর আঘাতের গল্প, শুক্রের ভূ-পৃষ্ঠ ও বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলের কথা এবং পৃথিবীতে গ্রিনহাউজের প্রভাব।

এপিসোড ৫, রক্তিম গ্রহের জন্য সুনীল ছোঁয়া – সেগানের প্রিয় বিষয়, মঙ্গল গ্রহ-এর প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে পুরো এপিসোড। এখানে আছে মঙ্গল নিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষের কৌতুহল, সায়েন্স ফিকশন, এডগার রাইজ বারৌস-এর রগরগে নভেলে মঙ্গলবাসীদের নিয়ে অদ্ভুতুড়ে কল্পনার কথা। এসবের মাঝখানে আছে, পৃথিবীর প্রথম তরল জ্বালানীর রকেট উদ্ভাবন করার উদ্দেশ্যে রবার্ট গডার্ডের যাত্রা, মঙ্গলের ভূ-পৃষ্ঠ, আগ্নেয়গিরি, পিরামিড আর পর্বতমালার কথা, এবং ভাইকিং ১ এবং ২-এর মঙ্গলভ্রমণের বর্ণনা।

শিল্পীর চোখে এডগার রাইজ বারৌস-এর 'বারসুম'

শিল্পীর চোখে এডগার রাইজ বারৌস-এর ‘বারসুম’

এপিসোড ৬, অভিযাত্রীদের গল্প- দুই সময়ের দুই দল অভিযাত্রীদের গল্প আছে এতে। একদল, সপ্তদশ শতাব্দীর ডাচ- যারা স্থাপত্যশিল্প, বিজ্ঞান, অনুবাদ সাহিত্য, সঙ্গীতে অগ্রগামী ছিলো; যারা সমুদ্রাভিযান করতো অজানা সব দেশের উদ্দেশ্যে। আরেকদল এদেরই ভবিষ্যৎ কর্ণধার, যারা কয়েকশ বছর পর, অন্য আরেক অজানার উদ্দেশ্যে ভয়েজার ওয়ান এবং টু ভাসিয়েছে মহাকাশে।

এপিসোড ৭, রাতের মেরুদণ্ড– প্রাচীনকাল থেকে রাতের রহস্যময় আকাশের তারাদের প্রতি মানুষের কল্পনা, মিথ ও জিজ্ঞাসা অবলম্বনে তৈরি এই এপিসোড। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং তারাদের নিয়ে গ্রীক আয়োনিয়ান বিজ্ঞানীদের ধারণাগুলো দেখাতে, আমাদের নিয়ে সেগান চলে গিয়েছিলেন ডেমোক্রিটাস আর অ্যারিস্টার্কাসের জন্মস্থান, মাইলিটাস আর এবডেরাতে। আর একইসাথে গিয়েছিলেন ব্রুকলিনে, নিজের স্কুলে – বাচ্চাদের চমৎকার সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।

backbonenight_600x337

গ্রীসের উপকূলে কার্ল সেগান

এপিসোড ৮, স্থান ও কালের অভিযাত্রীগণ– পাওলো ও ভিনচেজো দুই ভাইয়ের গল্প দিয়ে, উত্তর ইটালির টাসকানিতে বসে সেগান বললেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা সূত্রের মতো জটিল জিনিস, টাইম ডায়লেশন প্যারাডক্স, আলোর গতির সাপেক্ষে আমাদের গতি-সীমাবদ্ধতা, কী হবে আলোর গতির অর্ধেকের চেয়ে বেশি বা কাছাকাছি গতিতে গেলে, সময়ই বা চলবে কী গতিতে। বলেছেন ওয়ার্মহোলের বেসিকস এবং এর ওপর ভিত্তি করে লেখা তার উপন্যাস ‘কনট্যাক্ট’-এর কথা।

এপিসোড ৯, নক্ষত্রদের জীবন –  একটা সামান্য অ্যাপেল পাইয়ের টুকরো থেকে সেগান আমাদের নিয়ে গেছেন বস্তুর পরমাণুর গঠন, এর বৈশিষ্ট্য, পরমাণুর আবিষ্কারের ইতিহাস, বস্তুর মৌলিক কণা- নিউক্লিয়াস, ইলেকট্রন ও প্রোটনের কথা; নিউক্লীয় ফোর্স যাদের আলাদা হতে দেয়না। বড় সংখ্যা নিয়ে ‘গুগল’ এবং গুগলপ্লেক্স-এর মজার গল্প করতে গিয়ে বিস্তর দৌড়ঝাঁপও করেছেন! এরপর ছোঁ মেরে উঠিয়ে নিয়েছেন মহাবিশ্বে। বলেছেন নক্ষত্রের বুকে জন্ম নেয়া পরমাণুর কথা, তারার জন্ম-মৃত্যুতে কেমিক্যাল এলিমেন্টের ভূমিকা, তার মাঝখানে রেড জায়ান্ট, সুপারনোভা, নিউট্রন স্টার, পালসার, এবং ব্ল্যাক হোলের কথা।

9

এপিসোড ১০, নিরন্তরের প্রান্ত – এ পর্বে আছে বিগ ব্যাং, এবং মহাবিশ্বের গঠন, বিভিন্ন ছায়াপথের রুপ, একাকীত্ব এবং ছায়াপথগুলোর সংঘর্ষ। সরস ভাষায় কাল্পনিক ‘ফ্ল্যাটল্যান্ড’ দিয়ে বিভিন্ন ডাইমেশন সম্বন্ধে ধারণা দিয়েছেন। গিয়েছেন ভারতে, শিবের তাণ্ডবনৃত্য দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও ধ্বংসের ধারণার কথা বলেছেন আমাদের।

এপিসোড ১১, স্মৃতির স্থায়িত্ব – শুরুতেই সেগান সাগরতলের তিমিদের জীবনধারা, তাদের মধ্যে যোগাযোগ, বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়েছেন কাব্যিক ভাষায়। এরপর এসেছেন মানব মস্তিষ্কের গল্প বলতে। বলেছেন, মস্তিষ্ক কী,এর বিভিন্ন অংশের কাজ, মস্তিষ্কের বিবর্তন, কিভাবে এখানে লাইব্রেরীর মতো কোন স্মৃতি, কোথায় রয়ে যায় এবং কিভাবে বই, কম্পিউটার, ও গ্রন্থাগারের সাহায্যে আমরা সমষ্টিগত জ্ঞান সংরক্ষণ করে চলেছি।

Cosmos-11-Persistence-of-Memory[06-05-47]

সেগান বোঝাচ্ছেন, আমাদের ব্রেইন নিয়ে।

এপিসোড ১২, ছায়াপথের জ্ঞানকোষ – সেগানের আরেক প্রিয় বিষয়- পৃথিবীর বাইরের বুদ্ধিমান সভ্যতা/এলিয়েন। বলেছেন, সঠিক কসমিক রেডিও সোর্স ডিটেক্ট করার মাধ্যমে কিভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব। অন্যদিকে দেখিয়েছেন,UFO নিয়ে মানুষের ভুয়া গল্প, কুসংষ্কার! গল্পের মত বলে গেছেন কিভাবে হায়ারোগ্লিফিকস-এর পাঠোদ্ধার করেছেন শ্যাম্পোলিয়ন, হায়ারোগ্লিফিকস পড়ার পদ্ধতি! আর সবশেষে, সেগানের কল্পনায় এসেছে ভিনগ্রহবাসীদের তৈরি বিভিন্ন বিশ্বের তথ্য সমৃদ্ধ এনসাইক্লোপেডিয়া গ্যালাক্টিকা।

Cosmos-12-Encyclopaedia-Galactica[06-10-19]

তরুণ শ্যাম্পোলিয়নের চরিত্র বিস্মিত হচ্ছে হায়ারোগ্লিফিকস দেখে; এমন এক ভাষা দেখে, যার অর্থ ঐ সময়ে কেউই জানতো না। যে ভাষার অর্থ একদিন সেই বের করবে।

এপিসোড ১৩, পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করবে কে? – পুরো সিরিজের সারমর্ম বলা চলে এই শেষ এপিসোডকে। একটু একটু করে বার বার বলে গেছেন, যা দেখিয়েছেন গত বারো পর্বে। আলেকজান্ড্রিয়া লাইব্রেরির ধ্বংস, এর শেষ কিউরেটর হাইপেশিয়ার হত্যা থেকে শুরু করে, বর্তমান পৃথিবীর নিউক্লিয়ার টেকনোলজি- এই লোভ এবং যুদ্ধবাজ প্রবৃত্তি মানুষকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম/পৃথিবীকে কিভাবে নরক বানাতে পারে, তা নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন। মানবজাতি তার মৃত্যুর স্বার্থে যুগের পর যুগ ধরে যে অর্থ ঢেলে যাচ্ছে, সেটা বিজ্ঞানচর্চায় উৎসর্গ করলে একদিন আমাদের আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণের স্বপ্ন সত্যি হবে, আমরা ছড়িয়ে পড়বো দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের সবখানে, কার্ল সেগান সেই আশার আলো দেখিয়েছেন।

বাংলা সাবটাইটেল by অনুবাদকদের আড্ডা
কসমস-এর বাংলা সাবটাইটেল, এক কথায় ম্যাজিক! কোথাও সেগান বা তার ভাষাকে ছাপিয়ে যাবার চেষ্টা ছিলো না। অনুবাদে সাবধানতা, সংযম, বিনয় এবং সেগানের প্রতি শ্রদ্ধা- এই চার বৈশিষ্ট্যই চমৎকারভাবে চোখে পড়ে। অরিজিনাল এবং অনুবাদ সাংঘর্ষিক ছিলো না কোথাওই; বরং প্রতিটি বাক্যের গঠন এমন, যেনো কার্ল সেগানের কথা শোনা এবং সাবটাইটেল পড়া- দুটো কাজই আপনি সমানভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। এছাড়াও, যেখানে প্রয়োজন, তথ্যের আপডেট হিসেবে বা আরেকটু ভালো করে বোঝার সুবিধার্থে, অনুবাদের পাশাপাশি সম্পাদকের ছোট্ট ছোট্ট নোটও আছে।

উপস্থাপনাঃ
কার্ল সেগান ছিলেন এক প্রেমিক বিজ্ঞানী! সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে, ভালোবাসার টানে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন বার বার! শুক্রের উত্তপ্ত বায়ুমণ্ডলের কথা বলতে গিয়ে পৃথিবীতে গ্রীনহাউজ প্রভাব নিয়ে আতংকিত হয়েছেন। লাল গ্রহ মঙ্গলের গান গেয়েছেন নীল পৃথিবীর সুরকে সাথে নিয়ে। কাল্পনিক জাহাজে চড়ে, ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও বুদ্ধিমান প্রাণের স্বপ্ন দেখতে দেখতে পৃথিবীর সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছেন তিমিদের মহাকাব্য শোনার আশায়, ভয়েজার ১ তার অনন্ত যাত্রার আগে শেষবারের মতো সৌরগ্রহগুলোর যে ছবি তুলে পাঠিয়েছিলো, তাতে পৃথিবীর ছবির কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন! আবার, কল্পনায় ভিনগ্রহবাসীদের তৈরী ‘ছায়াপথের জ্ঞানকোষ’-এ হাতড়ে হাতড়ে লক্ষ বিশ্বের মাঝখানেও পৃথিবীর নাম খুঁজেছেন, এই গ্রহ সংক্রান্ত তথ্য খুঁজেছেন!

কসমস সিরিজের একটি এপিসোডের আপডেট অংশ।

কার্ল সেগান এক অদ্ভুত শান্ত প্রকৃতির বিজ্ঞানী ছিলেন। বিপ্লবী, কিন্ত বিদ্রোহীদের মতো আচরণ ছিলো না তার। কোনো মতবাদই, যা আজ ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তা শুরুতেই ঝেড়েঝুড়ে ফেলে দেননি। সাথে রেখেছেন। বলেছেন, “বিজ্ঞান একটা সমন্বিত প্রচেষ্টা, যার বিস্তৃতি অনেক প্রজন্ম জুড়ে”। তা সে যুগের পর যুগ ধরে আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জে ঘটিবাটি দেখা মানুষ হোক, তুঙ্গুসকা ইভেন্টের ব্ল্যাকহোল-অ্যান্টিম্যাটার-অ্যালিয়েন স্পেসশিপ থিওরিবাজ লোকজন হোক, ভিনগ্রহবাসীদের আকৃতি বা জ্ঞানচর্চা নিয়ে ক্রিশ্চিয়ান হইগেনস-এর মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানীর অদ্ভুত সব কল্পনা হোক, হেইকে সামুরাই কাঁকড়া নিয়ে জেলেদের বিশ্বাস, বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতার ফলাফল স্বরুপ শুক্রে ডায়নোসরের উপস্থিতি বিষয়ক রুপকথা হোক, বা বাইবেলের ঘটনাবলীতে ধুমকেতুর প্রভাব সংক্রান্ত ইমানুয়েল ভেলিকভস্কির ধারণা!

সেগান সব ঝুলিতে নিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায়, তার অপ্রতিম কণ্ঠে গল্পের মতো বলে গেছেন একটার পর একটা। নম্র ভাষায় প্রশ্ন করতে করতে ধীরে ধীরে তার পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ হাজির করেছেন। এমনকি ব্রহ্মাণ্ডে উন্নত সভ্যতার সাথে যোগাযোগের বিষয়ে নিজের আজীবন উত্তেজনাকে শেষ পর্যন্ত লাগাম পরিয়ে বন্দী করেছেন ফ্র্যাংক ড্রেক ইকুয়েশনের খাঁচায়!

কসমস সিরিজ নিয়ে সেগানের এই সাধনা অব্যাহত ছিলো বহু বছর ধরে। এই সিরিজ প্রচার হওয়ার দশ বছর পরেও বিভিন্ন বিষয়ের আপডেট রেকর্ড করে, ওই সংক্রান্ত এপিসোডে যুক্ত করেছেন কার্ল সেগান।

লোকেশন ও মিউজিকঃ
কার্ল সেগান একদম প্রথম এপিসোডে বলেছিলেন, তাকে সুযোগ দেয়া হলে তিনি দু হাজার বছর আগের রয়্যাল লাইব্রেরী অফ আলেকজান্ড্রিয়ায় চলে যেতে চান। তাদের রেকর্ডিং প্রসেস, দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতি নিজের চোখে দেখতে চান। বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করার বিলাসিতা নয়, এর ভিত্তি হতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই অন্বেষণে কসমস সিরিজ সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন আলেকজান্ড্রিয়ার রাজপথ থেকে নাসা’র জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি পর্যন্ত।

ডেথ ভ্যালীতে কসমস শ্যুটিং এর ছবি।

ডেথ ভ্যালীতে কসমস শ্যুটিং এর ছবি।

আরামদায়ক, সাজানো রয়্যাল বোট্যানিক গার্ডেন অফ ইংল্যান্ড থেকে নিউ মেক্সিকোর জ্বলজ্বলে সূর্যের নিচে। কখনও কোলাহল মুখর গ্রীসে, আবার ইটালির শান্ত গ্রাম টাসকানিতে। ব্রুকলিনের ব্যস্ত রাস্তা থেকে ‘রেজিনা ম্যারিস’ জাহাজে! নীল নদ পার হয়ে, শ্যাম্পোলিয়নের ভূত ঘাড়ে নিয়ে গিয়েছেন মিশরের সেই গ্রেট টেম্পল অফ কারন্যাক-এ! আবার এসেছেন আমাদের ঘরের কাছে ইন্ডিয়ায়।

পেছনে কখনও কসমস-এর বিশালতা, কখনও পৃথিবীর জন্য হাহাকার করে বেজে চলেছে বাখ, বিটোফেন, স্ট্যাকোভিক, টেডি লারসি, হেলডন, পিঙ্ক ফ্লয়েড, ট্র্যাডিশনাল জাপানিজ সুর এবং আরও অসামান্য সব মিউজিক! বিশেষ করে  ইভ্যাঞ্জেলোস ওডেসিয়াস পাপাথানাসিউ (ভ্যাঞ্জেলিস নামে পরিচিত) এর কথা বলতে হয়, যার অপূর্ব সুন্দর কিছু মিউজিক, যেমন আলফা, ক্রিয়েশন, পালস্টার… কসমস এর সঙ্গীতকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

মিউজিক কম্পোজার ভ্যাঞ্জেলিস

শুধু তা-ই নয়। কসমস এর টাইটেল এবং এন্ড ক্রেডিটের মিউজিকও নেয়া হয়েছে এই অসাধারণ মেধাবী গ্রীক কম্পোজারের এর কম্পোজ করা মিউজিক ‘হেভেন অ্যান্ড হেল’ এর লাস্ট মুভমেন্টের অংশ থেকে (3rd movement)। 

অরিজিনাল কসমস-এর শেষ দৃশ্যে (আপডেট ছাড়া অংশে) ড্যান্ডেলায়ন বীজের মতো দেখতে, সেই কাল্পনিক জাহাজের ক্যাপ্টেনের সিটটা শূন্য ফেলে চলে যান কার্ল সেগান। অসম্ভব কষ্টকর একটা মুহূর্ত! এবং অসম্ভব আনন্দেরও… চলে গিয়ে সেগান যেনো বুঝিয়ে দেন, তার আলাদা কোনো সত্তা নেই, কসমসের সাথে একাত্ব হয়ে গেলেন তিনি, ঠিক যেভাবে ড্যান্ডেলায়ন বীজটাকে একদিন বাতাসে উড়িয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন।
এই যাত্রা চলবে!

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

3 মন্তব্য on "কসমসঃ এ পার্সোনাল ভয়েজ – রিভিউ"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
রাইসুল মুশফেক সিদ্দিকী
অতিথি

আজ কসমস এর প্রথম পর্ব দেখলাম। এতটা তথ্যসমৃদ্ধ আর আবেগে ভরা ভিডিও সম্ভবত এই প্রথম দেখলাম। পরবর্তি পর্ববগুলোও দেখার আশায় রয়েছি (ডাউনলোড হয়ে গেলে)।

Haruka
অতিথি

Free knowledge like this doesn’t just help, it promote deyacrocm. Thank you.

trackback

[…] আগেই তিনি তেরো পর্বের পিবিএস সিরিজ কসমসের যুগ্মস্রষ্টা এবং উপস্থাপক হয়ে কোটি […]

wpDiscuz