ধূমকেতু, গ্রহাণু, আর উল্কার মধ্যে পার্থক্য

edu_comet_large

ধূমকেতু (Comet)

ধূমকেতু হচ্ছে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা এক ধরণের লেজ বিশিষ্ট বস্তু যা শূন্য থেকে হঠাৎ উদয় হয়ে আবার রহস্যজনকভাবে শূন্যেই মিলিয়ে যায়। সৌরজগতের অন্যান্য বস্তুর মত এরা পাথর দিয়ে তৈরি নয়, বরং এরা মহাকাশে মজুত ধুলিকণা, গ্যাস ও বরফ দিয়ে তৈরি। তবে বরফের সাথে কিছু পরিমাণে মিথেন, অ্যামোনিয়া, ও কার্বন ডাইঅক্সাইডও মিশ্রিত থাকে। সচরাচর এরা কয়েক কিলোমিটারের চেয়ে বেশি বড় হয় না। ধূমকেতুকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
১। স্বল্পকালীন ধূমকেতু (Short period Comet): সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে ধূমকেতুগুলোর ২০০ বছরের কম সময় লাগে তাদেরকে বলা হয় স্বল্পকালীন ধূমকেতু। এদের উৎপত্তি হয় মূলত নেপচুন গ্রহের কক্ষ পথের বাইরের একটা এলাকা থেকে যাকে বলা হয় কুইপার বেল্ট (Kuiper belt).
 ২। দীর্ঘকালীন ধূমকেতু (Long period Comet): সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এদের হাজার থেকে কোটি বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। বেশির ভাগ দীর্ঘকালীন ধূমকেতুর উৎপত্তি হয়ে থাকে সৌরজগতের একদম শেষ প্রান্তের অন্য একটা এলাকা থেকে যাকে বলা হয় ওর্ট ক্লাউড (Oort Cloud). মাঝে মাঝে দীর্ঘকালীন ধূমকেতুগুলো সূর্যের কাছাকাছি এসে গ্রহগুলোর টানে কক্ষপথ বেঁকে গিয়ে স্বল্পকালীন ধূমকেতুতে পরিণত হতে পারে
ধূমকেতুর কক্ষপথ এত বড় হয় যে পৃথিবী থেকে খালি চোখে সহজে এদেরকে দেখা যায় না তবে এরা যখন সূর্যের কাছাকাছি চলে আসে তখন এদের বাইরের স্তরের বরফ গলতে শুরু করে এবং এর চারপাশে একটা ধূমায়িত আবহ তৈরি করে যেখানে ধুলিকণা ও গ্যাস থাকে। একে বলা হয় Coma. সূর্যের শক্তিশালী বিকিরণের প্রভাবে এই ধুলিকণাগুলো সম্প্রসারিত হয়ে একটা লেজের আকৃতি ধারণ করে যার দৈর্ঘ্য ১ কোটি কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ধূমকেতুর সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে তার লেজ। সূর্যের বেশি কাছে চলে আসলে এদের লেজের ধুলিকণা ও গ্যাসের মধ্যে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয় আর দেখে মনে হয় লেজটা জ্বলছে। এমন অবস্থায় এদেরকে খালি চোখেও দেখা যায়। তবে ধূমকেতুর লেজ যে সাধারণ সব লেজের মত পেছন দিকেই থাকবে তেমন কিন্তু নয়। ধূমকেতু যেদিকেই যাক না কেন এর লেজটা কিন্তু সব সময় সূর্যের উল্টো দিকেই থাকে যার কারণে অনেক সময় দেখা যায় যে ধূমকেতু যেদিকে যাচ্ছে, লেজটা তার পেছনে না থেকে বরং তার সামনে সামনে চলছে।
অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর সাথে কোনো এক পানিবাহী ধূমকেতুর সংঘর্ষেই মূলত পৃথিবীতে প্রথম পানির আবির্ভাব ঘটে। হয়তো সেখানে প্রাণের কণাও ছিলো, যেখান থেকে পরবর্তীতে প্রাণ বিকশিত হয়।

গ্রহাণু (Asteroid)

গ্রহ+অণু = গ্রহাণু। ছোটো আকৃতির গ্রহদেরকে গ্রহাণু বলে। এরা সৌরজগতে অবস্থান করে এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। আকৃতিতে অনেক ছোট হওয়ার কারণে এদেরকে খালি চোখে দেখা যায় না তবে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এদেরকে অস্পষ্ট তারকারাজির মত দেখা যায়। এদের আকৃতি কয়েক মিটার থেকে শুরু করে এত বড় হতে পারে যে এরা নিজেদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রহাণুদেরকে চাঁদ হিসেবে আটকে রাখতে পারে, যেভাবে আমাদের চাঁদ প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবীকে। তবে এদের মাধ্যাকর্ষণ বল যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ার কারণে এরা গ্রহগুলোর মত গোলাকৃতি ধারণ করতে পারে না, বরং অনিয়মিত আকৃতিরই রয়ে যায়। এদের কোন বায়ুমণ্ডল থাকে না এবং ভূতাত্ত্বিক ভাবেও এরা সক্রিয় নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী সৃষ্টির প্রাক্কালে মঙ্গল গ্রহের (Mars) প্রায় সমান আকৃতির অপর এক গ্রহাণুর (এই প্রস্তাবিত গ্রহাণুর নাম দেয়া হয়েছে Theia) সংঘর্ষে পৃথিবীর বড় একটা অংশ ছিটকে পড়ে আর সৃষ্টি হয় আমাদের চাঁদ (Moon)।

মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী একটা বিস্তীর্ণ এলাকায় (প্রায় ৫৫ কোটি কিলোমিটার) অনেকগুলো গ্রহাণু অবস্থান করছে। এই এলাকাটাকে Asteroid Belt বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, অন্যান্য গ্রহগুলো সৃষ্টি হওয়ার সময় মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী অংশে আরো একটি গ্রহ সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিলো; কিন্তু দুটো কারণে এখানে নতুন কোনো বামন গ্রহও (Dwarf Planet) সৃষ্টি হতে পারেনি। এক, সম্মিলিত গ্রহাণুপুঞ্জের ভর (পৃথিবীর চাঁদের সমান মাত্র) ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অত্যাধিক স্বল্পতা; এবং দুই, বৃহস্পতি গ্রহের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব। এযাবৎ আবিষ্কৃত সর্ব বৃহৎ গ্রহাণুর নাম হল সিরেজ (Ceres)। এটার ব্যাস ৯৪৫ কিলোমিটার।

উল্কা (Meteoroid)

উল্কা বা Meteoroids আসলে ধূমকেতু আর গ্রহাণুর খণ্ডাবশেষ। মহাকাশে ছুটে বেড়াচ্ছে এই শিলা বা ধাতব পদার্থগুলো। এদের ব্যাস ধূলিকণার সমান থেকে এক মিটার সমান পর্যন্ত হতে পারে। যখন এগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকে, তখন এদের গতি থাকে ঘণ্টায় ৭০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। প্রচণ্ড গতি আর বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণের ফলে এরা অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে, আর তার গতি পথে একটা আগুনের ধারা তৈরি করে। এদেরকে উল্কা বা Meteoroid বলে। রাতের আকাশে ছুটে চলা উল্কার কণাগুলোকে অনেকে Shooting Star ও বলে। আসলে এগুলো মোটেও নক্ষত্র নয়।
ছোট উল্কাগুলো চোখে পড়ার আগেই দুই-এক সেকেন্ডের মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু অপেক্ষাকৃত বড় উল্কাগুলো আরও অনেকক্ষণ ধরে জ্বলে এবং দেখতেও অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়। অত্যাধিক উজ্জ্বল উল্কাগুলোকে বলা হয় Fireballs. কিছু Fireballs এত উজ্জ্বল হয় যে দিনের আলোতেও তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়। বড় আকৃতির কিছু Fireballs পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভিতরের (Core) অংশে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং এক সময় বিষ্ফোরিত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এরা শূন্যে থাকা অবস্থায়ই পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
মাঝে মাঝে কিছু উল্কা এত বড় হয় যে এরা সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার আগেই পৃথিবী পৃষ্ঠে এসে আঘাত করে। এদেরকে বলা হয় Meteorites বা পতিত উল্কা। যেহেতু চাঁদের কোন প্রতিরক্ষামূলক বায়ুমণ্ডল নেই, তাই প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে মহাশূন্য থেকে আগত অসংখ্য উল্কাপিণ্ডের (এবং গ্রহাণু ও ধূমকেতুর) আঘাতে মিলিওন মিলিওন বছর ধরে চাঁদের বুকে সৃষ্টি হয়েছে ছোট বড় অসংখ্য গর্তের।

Comments

Mamun Khandaker

I'm not a writer, rather I'm good a reader.

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz