ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন ও আধুনিক মমির গল্প

কী হতো যদি আপনি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখতেন আপনি কোনোভাবে কয়েকশ বছর ঘুমিয়েছিলেন? আপনার আশপাশের পরিচিত সব কিছু বদলে গেছে, হয়ত আপনি পৃথিবীতেই নেই, কয়েকশ আলোকবর্ষ দূরে অন্য কোনো ছায়াপথের অন্য কোনো এক গ্রহে আছেন? যদি দেখতে পেতেন আপনার বয়স ঘুমিয়ে পড়ার সময় থেকে একটুও বেড়ে যায়নি! বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতন লাগছে না?

হাইপার স্লিপ

ছবি-১ঃ হাইপার স্লিপ (সায়েন্স ফিকশন)।

হ্যাঁ, কল্পকাহিনীতে এটাই ক্রায়োজেনিক-স্লিপ, হাইপার-স্লিপ, বা ডেল্টা-স্লিপ বিভিন্ন নামে পরিচিত। না আমরা এখনো বিজ্ঞানের অতটা উচ্চতায় নিজেদেরকে নিয়ে যেতে পারিনি। তবে যতদূর যেতে পেরেছি এখনো পর্যন্ত, সেটাকে বলে ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন।

পার্থক্য হলো, ক্রায়োজেনিক-প্রিজারভেশন করার পর আপনি আবারো জেগে ওঠার মোটামুটি নিশ্চয়তা পাবেন, কারণ সেটা অনেকটা হাইবারনেশন বা শীতনিদ্রার মতন। কিন্তু শুনতে একটু দুঃখ জনক হলেও সত্যি, ক্রায়োনিক-প্রিজারভেশনের ক্ষেত্রে আপনি সেই নিশ্চয়তাটা আপাতত পাচ্ছেন না। মানে ক্রায়োনিক ঘুমের জগতে গেলে আপনাকে হয়ত আর জাগিয়ে তোলা যাবে না, অন্তত আমাদের বিজ্ঞান এখনো যে পর্যন্ত পৌঁছেছে তার সহায়তায়।

তাহলে সময় নষ্ট করে এটা আপনি কেন পড়ছেন আর আমিই বা লিখতে গেলাম কেন?

কারণ মজার ব্যাপার হলো, ২২ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত ১৩৮ জনেরও বেশি মানুষ ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনের মাধ্যমে নিজেদের দেহকে সংরক্ষণ করেছেন। আর সবার ক্ষেত্রে সরকার দেহকে ক্রায়োনিক সংরক্ষণের অনুমোদন না দেওয়ায় অনেকেই আবার এটা করেছেন আইনের অনুমতি না নিয়েই। তাদের সংখ্যাটা অজানা। এছাড়াও ইতোমধ্যে ৯৮৪ জন মানুষ মরার পর নিজেদের দেহকে এভাবে সংরক্ষণের জন্য নিবন্ধন করেছেন।

ছবিঃ ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনে রাখা মানুষের তালিকা (সংক্ষিপ্ত)

ছবি-২ঃ ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনে রাখা মানুষের তালিকা (সংক্ষিপ্ত)।

ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন

যেহেতু ক্রায়োনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আপনাকে আপাতত জাগিয়ে তুলতে পারা সম্ভব না, তাই রাষ্ট্র সাধারণত সুস্থ এবং জীবিত মানুষের ক্ষেত্রে এটা চর্চা করার অনুমতি প্রদান করে না। তবে ক্যান্সার আক্রান্ত, খুব বেশি অসুস্থ অথবা অন্য কোনো ভাবে মারা যাবার পর কেউ যদি তার দেহকে সংরক্ষণ করে রাখতে চায়, তবে এই ব্যবস্থার শরণাপন্ন হতে পারে। যেমন – সম্প্রতি সময়ে ইংল্যান্ডে এক ১৪ বছরের ক্যান্সার আক্রান্ত বালিকা কোর্টে রায় পেয়েছে তার দেহকে ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার। মেয়েটি জর্জ বরারবর একটি চিঠি লেখে, সেখানে লেখা ছিলো,

I think being cryo-preserved gives me a chance to be cured and woken up, even in hundreds of years’ time. I don’t want to be buried underground … I want to live and live longer and I think that in the future they might find a cure for my cancer and wake me up.”

“যদি শত বছরের পরেও হয় তবুও আমি মনে করি ক্রায়ো-প্রিজারভেশনের মাধ্যমে আমি সুস্থ হবার এবং আরো একবার জেগে ওঠার সুযোগ পাবো। আমাকে মাটির নিচে রাখা হোক তা আমি চাই না …আমি বাঁচতে চাই, অনেক অনেক দিন বাঁচতে চাই এবং আমি আশা করি ভবিষ্যতে তারা আমার ক্যান্সার সারিয়ে তোলার একটি পথ খুঁজে পাবে এবং হয়ত আমাকে জাগিয়ে তুলতে পারবে।”

ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনের কী এবং এর পেছনের যুক্তি

এটা আসলে এক কথায় আধুনিক সময়ের মমি। মিশরের পিরামিডের সময়ে যেমন রাজা এবং ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের দেহ পরকালে নিয়ে যাবার জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে চাইত অনেকটা সেই রকম। তবে এই ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো এখানে যাকে ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনে রাখা হবে, তার দেহের বেশিরভাগ টিস্যু যাতে নষ্ট না হয়, অক্ষত থাকে সেই দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে করে ভবিষ্যতে যদি চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি হয় এবং যেহেতু দেহের কোষগুলির তেমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে না সেহেতু হয়ত এই দেহে আবারো হৃদ-ক্রিয়া চালু করা যাবে এবং তাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হবে।

এই ধারণা যে একদম ভিত্তিহীন তা কিন্তু না, কারণ এ পর্যন্ত ক্রায়োপ্রিজারভেশনে রাখার পর খরগোশের কিডনি পুনরায় সফল ভাবে ব্যবহার করা গেছে। নেমাটোড ওয়ার্ম (এক ধরনের কৃমি), এবং কিছু পোকামাকড়ও নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে।

এবং মানুষ বা বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দেহ কে এভাবে এখনো পর্যন্ত সংরক্ষণের পর পুনর্জীবিত করা না গেলেও মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- ভ্রূণ থলি, শুক্রাণু, স্টিম-কোষ, গর্ভাশয় এর টিস্যু, ভ্রুণ, ডিম্বাণু, শুক্রাশয়ের টিস্যু ইত্যাদি কে ক্রায়ো-প্রিজারভেশনে রাখার পর তা সফল ভাবে পুনরায় সংযোজন করে কর্মক্ষম করে তোলা সম্ভব হয়েছে। তাই আশা রাখা যায় যে ভবিষ্যতে চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়ন হলে এক সময় মানুষকেও পুনর্জীবিত করে তোলা সম্ভব হবে।

ছবি-৩ঃ আধুনিক ক্রায়োনিক চেম্বার।

ছবি-৩ঃ আধুনিক ক্রায়োনিক চেম্বার।

কীভাবে করা হয় ক্রায়োপ্রিজারভেশন

জীবিতদের জন্য যেহেতু সরকারি অনুমোদন নেই সেহেতু মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে বরফের ভিতরে রাখা হয় কিছুক্ষণ, এবং অঙ্গগুলোকে ভালো রাখতে কৃত্রিমভাবে রক্ত সঞ্চালন করা হয় শরীরের ভিতর দিয়ে, তারপর ক্রায়োপ্রিজারভেশনের জন্য শরীরের ভিতর থেকে রক্ত এবং অন্য জলীয় অংশ যত বেশি পরিমাণ পারা যায় বের করে ফেলা হয়, তারপর রক্ত এবং জলীয় অংশের পরিবর্তে অঙ্গ সংরক্ষণের জন্য যে মেডিকেল গ্রেড এন্টি-ফ্রিজ দ্রবণ ব্যবহার করা হয়, সেটা শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে পরবর্তীতে মৃত শরীর কে ঠাণ্ডা করা হলেও কোষের ভিতরে স্ফটিক তৈরি হতে না পারে, কারণ স্ফটিক তৈরি হলে শরীরের কোষ নষ্ট হয়ে যায়। এরপর একজন মেডিকেল সার্জন বুকের অংশ উন্মুক্ত করে এবং প্রধান রক্তবাহী নালীগুলো থেকেও রক্ত বের করে ফেলার ব্যবস্থা করে এবং সেখানে একই ভাবে মেডিকেল গ্রেড এন্টি-ফ্রিজ দ্রবণ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যখন মৃতের শরীরের সবগুলো রক্তনালী যথেষ্ট এন্টি-ফ্রিজ দ্রবণে ভর্তি হয়, তখন প্রাথমিক ভাবে ড্রাই আইস (শুষ্ক কার্বন-ডাই-অক্সাইড) ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ে মৃত শরীরের তাপমাত্রা শূন্যের ৭৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নিয়ে আসা হয়, এরপর শুরু হয় তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করে শরীরকে ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়া। এবং প্রতি ঘণ্টায় শরীরের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস করে কমানো হয় এবং এভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ পরে শরীরের তাপমাত্রা -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে আসা হয় এবং এই তাপমাত্রায় শরীরকে একটা সিলিন্ডারের মতন চেম্বারে রেখে দেওয়া হয়।

ছবি-৪ঃ এলকর ক্রায়োল্যাবে সংরক্ষিত শরীর।

ছবি-৪ঃ এলকর ক্রায়োল্যাবে সংরক্ষিত শরীর।

কোথায় করা যাবে ক্রায়োপ্রিজারভেশন

এমেরিকার এরিজোনা রাজ্যের এলকর (Alcor) ফ্যাসিলিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ক্রায়োব্যাংক, ক্রায়োব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল সহ এরকম বেশ কয়েকটি জায়গাতে আপনি নিজেকে সংরক্ষণ করতে পারবেন। এলকর ল্যাবে খরচ পড়বে পুরো শরীর সংরক্ষণের জন্য $২০০,০০০ এবং শুধু মস্তিষ্ক সংরক্ষণের জন্য $৮০,০০০। ক্রায়োনিক্স ইন্সটিটিউট ল্যাবে খরচ কম; পুরো শরীর $২৮,০০০ এর মতন। এছাড়াও সম্প্রতি এমেরিকার ‘হলব্রুকে (Holbrook) পৃথিবীর ২য় বৃহত্তর ক্রায়োনিক ফ্যাসিলিটি বানানোর প্রস্তাব সম্প্রতি গৃহীত হয়েছে।

মরার পর এভাবে শরীরকে সংরক্ষণের ফলে যেহেতু আপনার শরীরের বেশিরভাগ কোষই নষ্ট হবে না তাই যদি ভবিষ্যতে কখনো মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের উপায় খুঁজে পাওয়া যায়, তখন হয়তো আপনাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হলেও হতে পারে।

বিঃদ্রঃ সম্প্রতি নাসাও তাদের দূর মহাকাশে অভিযানগুলোর জন্য মানুষকে শীতনিদ্রায় রাখার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। এবং অভিযানের নাবিকদেরকে কীভাবে ১৪ দিন শীতনিদ্রায় রাখা যায় সেরকম একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে।

ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন সম্পর্কে আরো জানতে…

রেফারেন্সঃ

১। এলকর ক্রায়োনিক ল্যাব

২। http://www.cryonics.org/

৩। Cryosleep: It’s not just science fiction anymore

৪। BBC: i will be frozen when i die.

৫। https://en.wikipedia.org/wiki/Cryopreservation

৬। Crayonic Facilities List

৭। Asleep for 14 Days: NASA Developing Cryosleep Chamber for Distant Travel

৮। A Brief History of Cryosleep

৯। 14-year-old girl who died of cancer wins right to be cryogenically frozen

Comments

Rajib

I'm still thinking!

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz