সময়ের অভিশপ্ত জগৎ

১. 

“Doubtless there is a desire in human beings to exist everywhere in space, but there seems to be a much stronger desire to exist everywhere in time, or at least in future time.” – J.N. Islam

অনেকটা উদাসীন হয়ে হাঁটছে এল নিনো। মাথায় ঘোরাঘুরি করছে নানা চিন্তাভাবনা। ২১৩৬ সাল। পৃথিবী অনেক আধুনিক। হাঁটতে হাঁটতে রেললাইনে উঠে পড়ল সে। নিরাপত্তাও বেশ উন্নত। কোনো সমস্যা নেই বললেই চলে। নিনো একজন বিজ্ঞানী; তার সব জায়গায় প্রবেশের অনুমতি আছে। রেল চলার সময়ও সে রেল লাইনে থাকতে পারবে, কারণ সিস্টেম জানে যে বিজ্ঞানীরা ভুল করে না। যাই হোক, নিনো বেখেয়ালি মনে হেঁটেই চলেছে। হঠাৎ খেয়াল করলো- একটা ট্রেন চলে এসেছে। অতি নিকটে এসে গেছে! বড় বড় চোখে ট্রেনের দিকে তাকিয়ে আছে। মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। বড় বড় শ্বাস ছেড়ে সে হাঁপিয়ে উঠেছে  ট্রেনের আওয়াজ আর ইঞ্জিনের গন্ধ ছাড়াও অন্য একটি গন্ধ তার নাকে আসছে। বেশি ভয় পাওয়ায় রেল লাইন থেকে পা সরাতে পারছে না সে। মনে মনে ভাবছে- এ ভাবেই শেষ হবে তার জীবন!

ট্রেনের সাথে ধাক্কা খাবে খাবে, এমন সময় মনে হল কে যেন তাকে ডাকছে।

কোনোকিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে অস্থির অবস্থায় চোখ মেলে সে। চোখ মেলে অবাক হয়ে দেখে- কিছুই হয়নি তার! রেল লাইনে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে!

কী হল? কোনো স্বপ্ন দেখল কি সে!

হয়তো বেশি ক্লান্ত হয়ে উল্টাপাল্টা দেখেছে। সামনে দূর থেকে একটা ট্রেন ঠিকই আসছে। লাইন থেকে নেমে পড়ল সে। ট্রেনটা তাকে অতিক্রম করে যাওয়ার সময় ট্রেনের নাম্বারটা তার নজর কাড়ে। আজব! সেই একই নাম্বার! কাকতালীয় ব্যাপার ভেবে উড়িয়ে দেয় নিনো। খুবই ক্লান্ত সে, বাসায় যেতে হবে। আগামীকাল বিজ্ঞানসভা আছে।

বাসায় আসতে যানবাহন ব্যবহার করা যেত, তবে সে হাঁটতে ভালোবাসে। অবশ্য আজকাল হাঁটাহাঁটিও অস্বাভাবিক কাজ, কেউই তেমন হাঁটে না। তবে কাজ কম করে মোটা না হবার জন্য নানা ট্যাবলেট রয়েছে, তা নিনোর অপছন্দ। তাই যানবাহনে কম চড়ে একটু বেশিই হাঁটে সে। এই বারো প্যাক বডিকে চব্বিশ প্যাক বানাতে চায় না নিনো। নিনো শৌখিনও বটে, বাসায় অনেক পুরাতন জিনিসও রাখে৷ আর পকেটে মানিব্যাগ- তাতে অতি পুরাতন টাকা রেখেছে শখের বশে। অবশ্য সব কালেকশনই তার দাদার-দাদার আমলের। তার দাদা আর বাবার এই শখটা তারও হয়েছে। এই যুগে সবই ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম। এত কৃত্রিমতা নিনোর ভালো লাগে না। বাসায় যাবার জন্য পা আগাতেই দেখে মাটিতে কী যেন পড়ে আছে৷ সে তুলতে গিয়ে অবাক। এটা কার ছবি? তাও কোনো এক মেয়ের! আগে তো দেখেছে বলে মনে পড়ছে না। তবুও মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে তার। কে এই মেয়ে? এই যুগে আবার পাসপোর্ট সাইজ ছবি! তবে এটা কোনো পুরাতন ক্যামেরা দিয়ে তোলা তা নিনো নিশ্চিত। বাসায় গিয়ে তার পুরাতন সংগ্রহের ক্যামেরাটা চেক করে সে। সপ্তাহখানেক আগে ঠিক করেছে এটা। মেয়েটির ছবি দেখে মনে হয় এই ক্যামেরায় তোলা। মেয়েটি দেখতে সুন্দর। তবে এটি যদি তার ক্যামেরাতেই তোলা হয়, তবে নিজের ছবি কেন আগে নয়? আসলেই কি এই ছবি তার ক্যামেরা দিয়ে তোলা? আর কেনই-বা এই মেয়েটি তার পরিচিত লাগছে? আসলেই কি নিনো তাকে চিনে? ট্রেনের উদ্ভট ঘটনার পর এসব আর ভাবতে ভালো লাগছে না নিনোর। পরে মেয়েটির ব্যাপারে হিউম্যান ডাটাবেস থেকে জেনে নেবে ভেবে ঘুমাতে গেল সে। আগামীকাল সকাল সকাল মিটিং-এ যেতে হবে। তবে ঘুমানোর চেষ্টা করতে চাইলেও আজকের ঘটনা দু’টো ভাবাচ্ছে তাকে। ভাবতে ভাবতে নিনো চলে যায় গহীন ঘুমের রাজ্যে।

২.
“People like us, who believe in physics, know that the distinction between past, present and future is only a stubbornly persistent illusion.” – Albert Einstein.

পুরাতন অ্যালার্ম ক্লকের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে নিনোর। এক সময় এ ঘড়িটা অনেক জোরে শব্দ করে বাজতো, তা এখনকার এই আওয়াজেই বোঝা যায়। যাইহোক, বিছানা ছেড়ে গোসল সেরে নেয় সে। তারপর প্রাতঃরাশ করে মিটিং এ যাবার সময় বের হতেই দেখে গাড়ি এসে হাজির। গাড়িটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত। প্রতি মিটিং-এ সময়মত বিজ্ঞানীদের নিয়ে যায়। গাড়িতে ওঠার সময় ছবিটির কথা মনে হতেই সেটি পকেটে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসে নিনো। ৫-৬ মিনিটেই পৌঁছে যাবে। যেতে যেতে গাড়ির কম্পিউটারে নিউজের হেডলাইন চেক করতে থাকে। একটি হেডলাইন তাকে প্রচুর হাসায়।

কিছুদিন আগে ড. মরিসের সাথে অনেকটা ঝগড়ার মতো হয় নিনোর। ড. মরিস টাইম ট্র্যাভেলের ওপর রিসার্চ করছিলেন। এতে নিনোকে আমন্ত্রণ করেন তিনি। নিনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে বয়স ও পদমর্যাদা উভয় দিক থেকেই ছোট। বিজ্ঞানীমহলে প্রবেশের পর মোটামুটি টাইম ট্র্যাভেলের যত গবেষণায় তাকে ডাকা হয়েছে সবটায় গিয়েছে সে। এমনকি নিজেও গবেষণা করেছে নিনো। তবে কোনো এক্সপেরিমেন্টই সফল হয়নি। তাই নিনো জানে যে টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব নয়। ফলে ড. মরিসের সাথে গবেষণা করে সময় অপচয় করতে চায় না সে। তবে নিনোর অভিজ্ঞতার জন্যে ড. মরিস নিনোকে অন্যদের থেকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। কিছুদিন আগেও বড় করে নিউজ বের হয়েছিল যে, ড. মরিস ও তাঁর টিম টাইম ট্র্যাভেলের সত্যতা প্রমাণের অতি নিকটে পৌঁছে গেছেন। টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে দুজনের দ্বিমত থাকায় বেশ কথা কাটাকাটিও হয়েছিল তাদের মাঝে। নিনো অতীতের থেকে শিক্ষা নিয়ে টাইম ট্র্যাভেলের বিপক্ষে। আর আজকেই নিউজে দেখে ড. মরিস ও তার টিম বলেছেন টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব নয়।

মিটিংয়ে পৌঁছাতেই একটি এ.আই. স্বাগত জানায় তাকে। সকলেই চলে এসেছেন। মিটিং-এ নতুন একজন বিজ্ঞানী এসেছেন আজকে। নাম- ডেলিসা লিওন্সকি। ২ বছর হল বিজ্ঞান মহলে প্রবেশ করেছে। নিনো থেকে ১-২ বছরের বড়, পদমর্যাদা নিনো থেকে একটু বেশি৷ সবার চেয়ে ছোট দেখে নিনোর মনে কষ্ট নেই। কারণ, তার কথায় কেউ কান দেয় না বলে মিটিং এ শুধু সে আসে আর যায়। তবে আজকের মিটিং-এর মূল হল মিস ডেলিসা। তিনি টাইম ট্র্যাভেলিং এর উপর রিসার্চ করছেন এবং তিনি সফল হবেন বলে আশাবাদী । এই কারণে আজকের মিটিং বসা। এর আগে কখনো আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সভায় টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে আলোচনা করেনি কেউ । ড. মরিস ভালোমানের বিজ্ঞানী হলেও তিনি ফেলোশিপ গ্রহণ করেননি ৷ টাইম ট্র্যাভেলিং নিয়ে মিটিং হবে শুনে বিরক্তি লাগে নিনোর । এই নিয়ে যে এই যুগে কখনো আন্তর্জাতিক সভা হবে কল্পনাও করেনি সে। মিটিং শুরু হয়, আর নিনো চলে যায় তার ভাবনার জগতে। এরকম বেকার মিটিং শুনে কান পচাতে চায় না নিনো। বিষয়টা ডেলিসার নজর কাড়ে।

মিটিং শেষ। নিনো তার অফিসে বসে ছবিটার দিকে উদাসীনভাবে তাকিয়ে আছে। স্ক্যান করে হিউম্যান ডাটাবেস থেকে কোনো তথ্য পায়নি সে। এমন সময় মিস ডেলিসা নিনোর সাথে দেখা করতে এল।
ডেলিসা – ‘আসতে পারি কি?
নিনো – অবশ্যই।
ডেলিসা – আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।
নিনো -জ্বি,বসুন। আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?
ডেলিসা – শুনলাম আপনার টাইম ট্র্যাভেলের উপর গবেষণার অভিজ্ঞতা অনেক?
নিনো – হুম।
ডেলিসা – আসলে আমি আপনার সাথে টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে গবেষণা করতে চাই। শুনেছি আপনি নাকি এখন এইসব নিয়ে আর গবেষণা করার ইচ্ছেতে নেই! ড. মরিসের সাথে কাজ করতে আপত্তি করেছিলেন। অবশ্য উনার প্রজেক্ট ফেইল হয়েছে।
নিনো – হ্যাঁ। আজ সকালেই পড়লাম।
ডেলিসা – আমি আমার গবেষণার কিছু পেপার নিয়ে এসেছি। আপনি দেখে নিন। মিটিং-এ তো আপনার কোনো মনোযোগ ছিল না। পেপারগুলো পড়েই দেখেন। ভালো লাগলে একত্রে গবেষণা করা যাবে।

এই বলে মুখে এক মলিন হাসি দিয়ে পেপারগুলো নিনোর দিকে এগিয়ে দেয় ডেলিসা। পেপার চেক করতে থাকে নিনো একের পর এক, তবে পৃষ্ঠার যেন শেষ নেই। ভালোই গবেষণা চালিয়েছেন ডেলিসা। তার গবেষণাপত্রটি অন্যদের চেয়ে আলাদা। নিনোর ভালো লাগে সেটি৷ তবে যদি এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে মিস ডেলিসার মনের অবস্থা কী হবে ভেবে কষ্ট লাগে নিনোর।
নিনো- ঠিক আছে। আমি সাহায্য করতে রাজি।
ডেলিসা- অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। তা কালকে থেকে আসছেন?
নিনো- না, পরশু থেকে।
ডেলিসা- কারণ জানতে পারি?
নিনো- আজ ২২শে এপ্রিল, তাই লাইরিডস উল্কা বৃষ্টি দেখব। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হবে।
ডেলিসা- মানে? এই যুগে সরাসরি আকাশে তাকিয়ে দেখবেন? মানে, লাইট পলুশন তো আছেই, তারপর এত বছরে মানুষের অসতর্কতায় বায়ুমণ্ডলে যে লেয়ার পড়েছে, এতে তো ভালোভাবে তারাই দেখা যায় না।
নিনো- আমার বাসা থেকে ১ কিমি এর মতো পথ হাঁটলে আমার দাদার একটা জায়গা পড়ে। অনেকটা জঙ্গলের মতো। তিনি আর্টিফিশালিটি অতো পছন্দ করতেন না৷ তাই ওখানে তেমন আর্টিফিশাল জিনিস নেই। শুধু গেটটা আর্টিফিশাল। তাও আমাদের পরিবারের সদস্য ছাড়া বাহিরের কেউ সেখানে যেতে পারে না৷
ডেলিসা- বাহ! আমারও উল্কাঝড় দেখার অনেক ইচ্ছে। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমিও কি আপনার সাথে যেতে পারি?

প্রশ্নটি শুনে নিনো ঠুক করে ধাক্কা খেল। একজনকে প্রথম সাক্ষাতেই কোনোকিছুতে না করা যায় না। কিন্তু যদি ডেলিসা আসে, তাহলে আর উপভোগ করা যাবে না । তাছাড়া কেউ পাশে থাকলে কোনোকিছুতে মনোযোগ দেওয়াটা বেশ কষ্টকর হয়। তবে মানিয়ে নেয় নিনো।

নিনো – উম, ওকে। আমার কোনো আপত্তি নেই। রাতে বাসায় চলে আসুন।
ডেলিসা – ঠিক আছে।

এই বলে এক মিষ্টি হাসি দিয়ে রিসার্চ পেপার গুছিয়ে বিদায় নেয় মিস ডেলিসা। নিনোও বাসায় যাবার প্রস্তুতি নেয়।

রাত ১২ টা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নিনো। শীত শীত লাগছে তাই হাতে থাকা কফির মগে চুমুক লাগাচ্ছে সে। ডেলিসা আদৌ কি আসবে নাকি আসবে না ভাবছে সে। তবে বাসার সামনে গাড়ি থামার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে ডেলিসা চলে এসেছে। ডেলিসা তো প্রথমে নিনোর বাসাকে মিউজিয়াম ভেবে বসে। দেখতে যেমন পুরোনো, ভেতরেও তেমন পুরাতন জিনিস । এরপর দুজন তাদের স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা দেয়।
জঙ্গলে গিয়েই স্লিপিং ব্যাগ বের করে আকাশে তাকিয়ে শুয়ে পড়ে তারা। এখন শুধু উল্কার অপেক্ষা। তবে নিনোর মনে আবারও ভূত চেপে উঠেছে । তার কেন জানি মনে হচ্ছে এর আগে সে কাউকে নিয়ে এমন ভাবে উল্কাবৃষ্টি দেখেছিল৷ আসলেই কি দেখেছিল, নাকি শুধুই মনের ভুল? ভাবছে সে। ভাবতে ভাবতে দুটা উল্কা তার চোখে পড়ে। তখন ডেলিসা’র খুশি দেখে কে! প্রথমবার উল্কাঝড় দেখার সুযোগ হয়েছে তার। সাথে অনেকগুলো চেনা-অচেনা তারাও। তবে নিনোর ভালো লাগছে না। কারও সাথে আগে আদৌ উল্কাবৃষ্টি দেখেছে, নাকি শুধুই কল্পনা- তার মাথায় ঠেকছে না । তার কেন জানি মনে হয় সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। তিন নম্বর উল্কাটা বেশ বড় ছিল। এটি দেখেই ঘুমে চোখ লেগে আসে তার।

৩.
“Once confined to fantasy and science fiction, time travel is now simply an engineering problem.” – Michio Kaku

ভোরের আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভাঙে ডেলিসার। নিনো এখনো ঘুমিয়ে আছে৷ পরে ডেলিসাই তাকে জাগিয়ে তোলে।
ডেলিসা- আপনার ঘুম কেমন হলো?
নিনো- এইতো ভালো। তবে আপনি এত তাড়াতাড়ি জেগে গেলেন যে?
ডেলিসা- হুম। আসলে ঘুম কেটে গেছে। রাতে ৯টার মতন উল্কা দেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । তবে আপনি বোধহয় আরো আগে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
নিনো- হুম। তা, বাড়ি যাওয়া যাক। আজকে বিকালটা আমার বাসায় কাটান।
ডেলিসা- ঠিক আছে। অনেক গল্প করা যাবে৷

এই বলে বাসার দিকে হাঁটা দেয় তারা। বাসায় এসে গোসল করে অন্য সব সেরে উঠতে উঠতেই দুপুর গড়িয়ে আসে। নিনো সাধারণত নিজেই খাবার রান্না করে। যদিও এখন খাবার মানেই রেস্তোরা বা ট্যাবলেট। যা হোক, তবে ডেলিসা আজকে নিনোর হাতে খাবার বানানো দেখবেই । তবে নিনোর কোনো কাজ কেউ দেখলে তার ইতস্তত বোধ হয় । ডেলিসাও ছাড়বার পাত্র নয়। সেও আজ নিনোর বানানো খাবার চেখে দেখবে।

যাই হোক, নিনো খাবার বানালো । ঘরের মেহমানের আবদার ফেলতে নেই। খাবারের স্বাদ নিয়ে ডেলিসা তো অবাক; এমন রান্না একজন প্রফেশনালই পারেন।

ডেলিসা- বাহ! চমৎকার! কার কাছে শিখেছেন?
নিনো- আম্মুর কাছে।
ডেলিসা- ওহ। আন্টি ও আঙ্কেলরা কোথায় থাকেন?
নিনো- উনারা অন্য প্রান্তে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ৬ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় মারা যান। আর মা ৫ বছর আগে শরীর অসুস্থ হয়ে মারা যান। বাবার মৃত্যু মাকে কাতর করে তুলেছিল। তাই হয়তো তাড়াতাড়ি বাবার কাছে চলে গেলেন।
ডেলিসা- আমি সত্যিই দুঃখিত।
নিনো- সমস্যা নেই। তা আপনি টাইম ট্র্যাভেলের প্রতি আগ্রহী কেন?
ডেলিসা- ছোটবেলায় আমি মাকে দেখিনি। আমাকে জন্ম দিয়েই মারা গিয়েছেন। মা অনেক সুন্দরী আর মায়াবী ছিলেন, প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন। এদিকে এক গল্পের বইতে পড়লাম- একজন টাইম ট্র্যাভেল করে তার প্রেমিকাকে বাঁচিয়েছেন! সেখান থেকেই মা-কে দেখার জন্য টাইম ট্র্যাভেল এর চিন্তা মাথায় এল। তা আপনি কেন টাইম ট্র্যাভেলের জন্য এত কাজ করলেন?
নিনো- অতীতের নানা নিদর্শন দেখার জন্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন একটা জানার ইচ্ছা নেই।
ডেলিসা- ওহ।

এইসব ছোটখাটো কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ডেলিসা চলে যাবার সময় হলো। কাল ল্যাবে দেখা হবে এই বলে ডেলিসা সেদিনের মতো বিদায় নিলো । আর নিনো ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দিলো। তার বাসায় আগের সকল টাইম রিলেটেড রিসার্চ পেপার একত্র করতে লাগল। কালকে থেকে শেষবারের মত টাইম ট্র্যাভেলের ওপর গবেষণা করবে সে। এইবারে হলে হবে, আর না হলে নেই। সব ফাইল একত্র করে গুছিয়ে শুয়ে পড়লো নিনো।

১ম দিন
নিনো-ডেলিসা’র টিম প্রস্তুত। বৈজ্ঞানিকভাবে মানব আচরণ সম্মত যেকোনো কাজ করতে গেলেই দুটো বিষয় প্রয়োজন: তথ্য এবং চিন্তা। পরীক্ষালব্ধ তথ্য আর যুক্তিপূর্ণ চিন্তার সাহায্যে অগ্রসর হওয়া। নিনো ও তার টিম তাদের প্রাপ্ত সকল তথ্য নিয়ে চিন্তায় বসে। আগে কেন সম্ভব হয়নি, কী কী ত্রুটি ছিল। ত্রুটিগুলো একে একে বের করতে থাকে তারা। ত্রুটিগুলো মূলত সূত্রের। এক একটা পেপার অনেক বড় বড়। টিমে সবাই ভাগ হয়ে দেখে শেষ করতে অনেক সময় লাগবে। তবে নিনো আর ডেলিসা থাকায় যে আজকে কাজটা অনেক আগেই শেষ হবে বলে টিমের অনেকেই আশাবাদী। যাই হোক, দুপুরের মধ্যে তথ্যের অনেকটা কাজই শেষ। তবে ত্রুটির সমাধান করা এবং তা সমাধান হলে কী হত বা হতে পারত তা জানা বাকি। নিনো খেয়াল করে- সূত্রগুলোর সাফল্য এই কারণে ঘটেনি যে, সেগুলো বাস্তব বিশ্বজগৎ থেকে পাওয়া গেছে ; বরং সেগুলো দিয়ে যে সম্ভাব্য ভুবনটি সম্পর্কে অনুমান করা যায়, তা আমাদের জানা এই ভুবনটির মতোই। তবে এতে অবশ্য নিনো অবাক হয়নি । ডেলিসাও অনেক ভালোভাবেই এগোচ্ছে।
সন্ধ্যা পাড়ি দিয়ে রাত ঘনিয়ে এল। আজকের মতো ল্যাবের কাজ শেষ। কাল মূলত আগের সব তথ্যের উপর ভিত্তি করে, নতুন কোনো সিদ্ধান্তে পৌছাবে। সকলেই বাড়ি চলে যায়। যাবার আগে ডেলিসা নিনোর কাছে রিসার্চ-এ রাজি হবার জন্য আরও একবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নেয়। কালকে থেকেই মূল কাজ শুরু হবে৷ নিনোও বাসায় যাবার উদ্দেশ্যে ল্যাব থেকে বের হয়।
ল্যাবটির এরিয়া বৃহৎ। ওই জায়গায় আরো অনেক ল্যাব রয়েছে। নানান বিজ্ঞানীর নানান ল্যাব। এর আগেও নিনো এখানে তিন বার এসেছে। তবে হঠাৎ ছবির সেই মেয়েটির কথা মনে হয় তার। পকেট থেকে ছবিটা বের করে সে। ঠিক তখনই বাতাসের সাথে ছবিটা বাম দিকে উড়ে যায়। নিনোও ছবিটার পেছনে ছোটে, অবশ্য ধরে ফেলে সে। তবে ছবিটা ঠিক ড. মরিসের ল্যাবের সামনে গিয়ে পড়ে। নিনোর মনে আসে সে মরিসের গবেষণাপত্র দেখে নি। তাই সে মরিসের ল্যাবে ঢুকে পড়ে। সেখানে মেইন টেবিলের উপর সব পেপার রয়েছে। আর সেখানের কম্পিউটারে বিজ্ঞানীদের প্রধান পাসোয়ার্ড দিয়ে নানা তথ্য নিনোর পেনড্রাইভ এ নিয়ে নেয়। কোনো এক্সপেরিমেন্ট ফেইল হলে তখন আইনতভাবে তার থেকে তথ্য নিতে দোষ নেই৷ তবে ল্যাবের মধ্যে নানা গন্ধের মাঝে একটি মিষ্টি গন্ধ পায় সে। সেই রেললাইনে যেমনটা পেয়েছিল ঠিক সেই একই গন্ধ। তবে এতে তার অস্বস্তি লাগছে। কারণ রেললাইনের আগেও সে এই গন্ধটা পেয়েছে। খুবই পরিচিত গন্ধ। যেন কোনো দামী পারফিউম, কিন্তু কার? এই ল্যাবে একই গন্ধ পাওয়া আসলেই কি স্বাভাবিক? বেশি রাত হয়ে যাচ্ছে । কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি বাসার দিকে রওনা দেয় নিনো।

৪.
“When we see the shadow on our images, are we seeing the time 11 minutes ago on Mars? Or are we seeing the time on Mars as observed from Earth now? It’s like time travel problems in science fiction. When is now; when was then?” – Bill Nye.

চারিদিকে অন্ধকার। কোথা থেকে যেন নিনোকে কেউ টাইম ট্র্যাভেল করতে নিষেধ করছে। অন্ধকারে কাউকে দেখছে না নিনো। এত আঁধারে কোথা হতে যেন হালকা আলো আসছে। সামনে এগিয়ে সে অবাক! ছবির সেই মেয়েটির মতই হুবুহু একটি মেয়ে। আচ্ছা, এই মেয়েটিই কি তাকে নিষেধ করছে? জিজ্ঞাসা করতে চাইলেই সে দেখে মেয়েটির চোখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে। ভয় পেয়ে যায় নিনো। তারপর চোখ খুলে বুঝতে পারে যে এটি নিছক একটি দুঃস্বপ্ন। আজ উঠতে দেরি হয়েছে তার। কাল রাতে দেরিতে বাসায় আসায় আর এলার্ম দেয়নি সে। ফ্রেশ হয়ে রিসার্চ সেন্টারের উদ্দেশ্যে বের হয় সে৷ অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজকে থেকে প্রধান কাজ শুরু।

দ্বিতীয় দিন

আগের সব তত্ত্ব দেখা হয়েছে৷ এখন নতুন থিওরির কাজ চলছে। আবার সে অনুযায়ী টাইম ট্র্যাভেল যন্ত্র বানানোর কাজও আছে। নিনো ল্যাব এ গিয়ে দেখে ডেলিসা ও তার টিম আগে থেকেই কাজে লেগে আছে। ডেলিসা জটিল এক সমস্যার সমাধানে মগ্ন। তাই কথা বলে তাকে ডিস্টার্ব করতে চায়নি নিনো৷ তবে ডেলিসাকে আজ বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। আরও সুন্দর লাগছে তার লম্বা চুলের জন্য৷ কাজ করতে করতে যখন চুল কপালে চলে আসে, ডেলিসা আবার সেগুলোকে পেছনে পাঠিয়ে দেয়। নিনো ডেলিসার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে৷ পরে নিনোর সামনে রিসার্চ টিমের একজন ‘স্যার’ বলে রিসার্চ পেপার এগিয়ে দেয়৷ থিওরির কিছু জিনিস একটুখানি করে সংশোধন করে সে৷ তবে তিনটা বড় সমস্যা দেখা দেয়। তার মধ্যে একটার নিচে দাগ দেখে নিনো ধরে নেয় যে এটির সমাধান ডেলিসা করছেন। তাই সে অন্য দুটি সমস্যার মধ্যে আপেক্ষিকভাবে সহজটি আগে বেছে নেয়। ল্যাবে কিছুক্ষণ কাজ করে নিনো বুঝতে পারে যে সমস্যাটি যত সহজ ভেবেছিল প্রকৃতপক্ষে ততটা সহজ নয়। নিনো এইসব কাজ একা করতে ভালোবাসে৷ কাজের সময় আশেপাশে বেশি মানুষ থাকলে তার অস্বস্তি বোধ হয়। রিসার্চ ল্যাবটি মূলত বিজ্ঞানীদের সাধারণ অফিসের নিচে অবস্থিত। নিনো সমস্যাগুলো অফিসে নিয়ে যায়। আর সমাধানে মনোনিবেশ করে।

মনোযোগ সহকারে কাজ করছে নিনো৷ পেছন থেকে ‘হাই নিনো’ বলে ওঠে ডেলিসা। অংকের মাঝে ডাক দাওয়া নিনোর মোটেও পছন্দের নয়। অনেকটা বিরক্তিকর মুখে ডেলিসার দিকে তাকাল নিনো। তবে ডেলিসার হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে তার সকল বিরক্তি গুম না হলেও কিছুটা দূর হয়। ডেলিসা এমনিতেই সুন্দরী, আর হাসলে তাকে আরও সুন্দর দেখায়৷

নিনো- হাই।
ডেলিসা- কখন এলেন আপনি?
নিনো- একটু দেরি হয়েছিল। আপনাকে কাজে দেখে ডিস্টার্ব করিনি।
ডেলিসা- ওহ।
নিনো- তা আপনাকে এত খুশি দেখাচ্ছে যে?
ডেলিসা- ৩ টা সমস্যার মাঝে ১ টার সমাধান শেষ তাই। তা আপনিও মনে হয় একটা সমাধানের চেষ্টা করছেন নাকি?
নিনো- হুম। তবে এটা যতটা সহজ ভেবেছিলাম ততটা সহজ নয়। সময় লাগবে৷
ডেলিসা- কী বলেন! রাত হয়ে গেল যে!
নিনো- রাত কখন হলো! ক্যালকুলেশনে ছিলাম। তাই খবর নেই।
ডেলিসা- হা হা! সমস্যা নেই। তা আজকে তো আমাদের সিনিয়র কলিগের মেয়ের বিবাহবার্ষিকী । পার্টিতে যাবেন না?
নিনো- দেখি, সমস্যাটা সমাধান করে আসব। এর আগে নয়।
ডেলিসা- আসলে সবাই একত্রে বের হব। তাই আপনাকে বলতে এলাম। মেসেজ দিয়েছিলাম, কিন্তু দেখেননি হয়তো। পরে ল্যাবের একজনের কাছ থেকে জানলাম আপনি অফিসে। তাই জানাতে এলাম৷ এখন ১০ টা বাজে। ১১: ৪৫-এ ল্যাব ছাড়বো৷ ভাবলাম একসাথে যাই।
নিনো- ওহ ৷ আপনারা চলে যান। আমি সমস্যাটা সমাধান না করে আপাতত উঠছি না।
“ঠিক আছে”, বলে নিনোর অফিস ছাড়ে ডেলিসা।

নিনোর এই অভ্যাস কখনো যাবে কিনা, কে জানে! রিসার্চ করার সময় একটা ব্ল্যাকহোল পাশে বসিয়ে দিলেও নিনোকে তার সমস্যার সমাধান হবার আগে জায়গা থেকে নড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ।

অন্যদিকে ,
অনেকদিন ধরেই এন্টিসায়েন্স ও ইকো-টেরোরিস্টরা একটি বড় প্ল্যান বুনেছে। এন্টিসায়েন্স-এর বিশ্বাসীরা কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে রাজি নয়। তারা প্রকৃতিতে বিশ্বাসী, আর্টিফিশালিটি নাকি প্রকৃতি ধ্বংস করে। আর ইকো-টেরোরিস্ট? তারা গায়া থিওরিতে বিশ্বাসী। তারা মনে করে পৃথিবী জীবিত। পৃথিবীকে আঘাত করলে পৃথিবী ব্যথা পায়। তাই প্রকৃতিকে সরিয়ে একে ডিজিটাল বানানোর কোনো মানে হয় না। তারা প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য সবকিছু করবে৷ তারা জানে, এই আর্টিফিশালিটির পেছনে সব দোষ বিজ্ঞানীদের। তাই আজকে তারা একত্রিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে আঘাত আনার। যদিও ভেতরে সিকিউরিটির জন্য যাওয়া যাবে না, তবে ১-২ টা সায়েন্টিস্ট মারতে পারলেই তাদের মনে শান্তি আসবে আজ। তাই নীরব ঘাতকের মত বিজ্ঞান মহলের বাহিরে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষায় আছে তারা৷

নিনোর সমস্যা প্রায় সমাধানের পথে। এখনই সমাধান হয়ে যাবে৷ ১১: ৪৫ হবার কিছু সময় বাকি৷ ডেলিসা ও অন্যান্য বিশ্ব কাঁপানো বিজ্ঞানীরা এখন বের হবে একত্রে পার্টিতে যাবার জন্য। ১২টায় পার্টি। প্রথমেই একজন বের হয়। ঘাতকরা তার দিকে বন্দুক তাক করে। শুট করার প্রিপারেশন নিতে গিয়ে দেখে তার পেছনে আরও কয়েকজন আসছে৷ মনে হয় তারাও বের হবে। এখন গুলি ছুড়লে পেছনের মানুষগুলো সতর্ক হয়ে যাবে। এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। তাই অপেক্ষায় আছে তারা। ২-১ জন কে মারার প্ল্যানে আসলেও আজকে তারচেয়েও বেশি মারবে৷ তাদের চোখে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি । কারণ বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে নীরবে, তিলে তিলে ধ্বংস করছে। প্রাকৃতিক থেকে কৃত্রিম করে ফেলছে জনজীবন । তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই , এদের মরা উচিত।

মহলে ভায়োলেন্স ডিটেক্টর আছে। কোনো ভায়োলেন্সকারীর মাইন্ড ডিটেক্ট করতে পারলে মহলের ভেতর ও বাইরে কড়া সিকিউরিটি চালু হয় আর অটো টাস্কফোর্সে ইনফর্ম যায়। ভায়োলেন্সকারীদের থেকে রক্ষার জন্য এটা বানানো। তবে ঘাতকরা মনকে ট্রেনিং করে নিয়েছে যেন এতে ধরা না পড়ে। পেছনের বিজ্ঞানীগুলো বেরিয়ে আসে। ডেলিসাও তাদের সাথে আছে৷ তারা বেরিয়ে এলে মহলের দরজা বন্ধ হওয়া মাত্রই আঘাত হানে তারা; গুলি ছুড়তে শুরু করে৷ প্রথম আঘাতেই তিনজন নিহত। প্রথমে না বুঝলেও পরে সকলে বুঝতে পারে যে এটা টেরোরিস্টদের কাজ। প্রথম রাউন্ডে কয়েকজন নিহতসহ অনেকেই আহত অবস্থায় আছে। ডেলিসা প্রথম বারে পার পায়; তবে পরেরবার ভাগ্য সায় দিল না। বুকে গুলি লেগে ফুসফুস ছিদ্র হয়ে যায় তার। ডেলিসা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চোখে সব অন্ধকার হয়ে আসছে। চোখের সামনে যেন তার মা-কে দেখছে সে। আস্তে আস্তে শেষ আলোকবিন্দুটাও অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

টেরোরিস্টদের মাঝে দু’জন নতুন । তারা তাদের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। হিংস্রতা বেড়ে যায় তাদের। ফলে রাডার ডিটেক্ট করে ফেলে, তীব্র এলার্ম বেজে ওঠে, টাস্কফোর্সের কাছে খবর চলে যায়৷ এলার্ম বাজতেই পালিয়ে যায় তারা।

হিসাব মিলিয়ে মাত্র টেবিল থেকে ওঠে নিনো। সিকিউরিটির জন্য পুরো মহল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে লকড হয়ে যায়, যেন ভেতরে কেউ প্রবেশ করতে না পারে৷ নিনোসহ আরও তিনজন ভেতরে ছিল৷ ডেলিসাকে ভেতরে না পেয়ে অনেকটা অস্থির হয়ে যায় সে। টাস্কফোর্স স্পটে আসলে মহল আনলকড হয়। বেরিয়ে এসে নিনো দেখে তার অনেক কলিগদের লাশ মাটিতে পড়ে আছে। তার থেকে কিছু দূরেই পড়ে আছে ডেলিসার নিথর দেহ। তার মৃতদেহ দেখেই বোঝা যায় বেঁচে থাকার আকুলতা। তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে নিনো৷ মুখ দিয়ে কিছু বলতে চেয়েও পারে না৷ টাস্কফোর্সের প্রধান নিনোর অনেক কাছের এক বন্ধু৷ নিনোকে দেখে তার অনেক খারাপ লাগে। তবে নিনোকে কিছু বলার নেই তার। শুধু সামনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে সরি জানায় সে৷ রাত ১২টা বেজে ১৫ মিনিট। স্পট থেকে বাড়ির দিকে রওনা দেয় নিনো। ভারি মুখে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে হাঁটছে, নানা বিষয় ভাবছে সে । টাস্কফোর্স নিনোর সিকিউরিটির জন্য গার্ড দিতে চেয়েছিল। নেয়নি নিনো। আজকে সকালের সেই দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়ে তার। সময় অভিশাপ নিয়ে আসে, বিরাট অভিশাপ। বাসার সামনে এসে ভেতরে না গিয়ে পেছনের জঙ্গলে যায় সে। সেখানে এক গাছের নিচে হেলান দিয়ে ভাবে- কী করবে! তার পরিচিত কলিগরা মারা গেল৷ ডেলিসাও চলে গেল। নিনো ডেলিসাকে হয়তো ওভাবে ভালোবাসতো না, কিন্তু ডেলিসা কম সময়ে সবচেয়ে বেশি পছন্দের হয়ে গিয়েছিলো তার । ডেলিসার শেষবারের মতো টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে কাজের প্রস্তাবসহ নানা পুরোনো কথা আকাশে তাকিয়ে ভাবেছে নিনো। একটা বড় উল্কাপিণ্ড সাঁই করে উড়ে যেতে দেখে সে। বড় একটা শ্বাস ফেলে। ভাবাভাবি শেষ; কী করবে জানে সে! টাইম মেশিন! সে টাইমট্র্যাভেল করে অতীতে যাবে! দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগে। গিয়ে সকলকে সাবধান করবে। টাস্কফোর্সে খবর দিয়ে উগ্রবাদীদের ধরিয়ে দেবে। কেউই মরবে না, সবই ঠিক থাকবে। ডেলিসাও প্রাণ হারাবে না।

উঠে দাঁড়ায় নিনো। দৌড়ে বের হতে থাকে জঙ্গল থেকে। সময় নষ্ট করার মত সময় আজ তার নেই। হাতের স্মার্ট ব্যান্ড দিয়ে তার বন্ধু মানে টাস্কফোর্স এর হেডকে ফোন দেয় সে । জানায়- সে ল্যাবে আসছে। যেন সব ক্লিয়ার থাকে। তাকে মানা করলেও আজকে সে যাবেই। হেড অনেক বোঝালো; তবুও বন্ধু বলে কথা। শেষমেশ নিনোকে সব ক্লিয়ারের ওয়াদা করে সে। তবে ল্যাবের আশেপাশে গার্ড থাকবে৷ এতে সমস্যা নেই- জানায় নিনো। ফরেস্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেছে। হেঁটে হেঁটে আজকে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।

৫.

“If time travel is possible, where are the tourists from the future?” – Stephen Hawking

তৃতীয় দিন

সূক্ষ্ম একটা হিসাব। খুবই ছোট একটা গ্যাপ৷ মেলাতে পারছে না নিনো। ডান-বাম সবদিকে কলকাঠি নাড়িয়েও কাজ হচ্ছে না। শেষ সমস্যাটা এই সূক্ষ্ম হিসেবের জন্যই আটকে আছে৷ শুধু একটা ক্লু দরকার। একটা ক্লুই নিনোর জন্য যথেষ্ট। অনেকবার চেষ্টা করতে থাকে সে৷ এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে পেপারগুলো টেবিল থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় নিনো৷ হাতে ঠেস দিয়ে বসে থাকে৷ দৃষ্টি অন্য টেবিলে, যেথায় সকালে নিনো ব্যাগ রেখে গিয়েছিল। হুট করে মনে পড়ে, তার ব্যাগে পেনড্রাইভে ড. মরিসের রিসার্চ ফাইলগুলো কপি করা আছে। সে এগুলো এখনো দেখেনি ৷ পেনড্রাইভটি কম্পিউটারে লাগাল নিনো, যদি কিছু পাওয়া যায়! ফাইলগুলো এক এক করে সব দেখলো সে। তবে এখানে কোনো ক্লু পাবে বলে তার মনে হয় না।

মরিসের কাজগুলো লেইম৷ তাই ভালোভাবে না দেখে মরিসের টিমের ফাইলে ঢুঁ মারে নিনো। চেক করতে করতে হঠাৎ একটি জায়গায় চোখ আটকে যায় তার৷ বিষয়টা অনেকটা নিনোর সমস্যার মতই, তবে একটু ভিন্ন। আর সেই সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াটি নিনোর অনেক চেনা। সমাধানের প্রতিটি পদ নিনোর খুবই পরিচিত কারো নিয়মে বাঁধা। তবে তা মনে করতে পারছে না সে। তা ভাববার সময়ও নিনোর নেই। তবে নিনো তার ক্লু পেয়ে গেছে। এই কাজটি পুরোটাই ক্লু। কাজটা যে কে করেছে, জানলে ভালো হতো নিনোর৷ তবে যে-ই করুক না কেন, সে আসলেই মেধাবী৷ ছুঁড়ে ফেলা পেপারগুলো একত্র করে সে। কম্পিউটারের ফাইলের তথ্যসহ আবারও টেবিলে বসে নিনো। এই একটাই ক্লু। আর সর্বশেষ প্রচেষ্টা। সমস্যাটির আবার গোড়া থেকে সমাধানের শুরু করে নিনো। সমাধানের পথে চলে এসেছে সে৷ একটু, আরেকটু … অবশেষে সমাধান হল। স্বস্তির এক বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিনো। এতক্ষণে অবশ্য ভোর হয়ে গিয়েছে। টাইম মেশিনের সামনে গিয়ে ছোটখাটো কাজগুলো সেরে ফেলে সে। যা পূর্বে অনেকে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা করতে পারেনি, সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে চলেছে সে। সব কাজ শেষ। এবার শুধু টাইম ট্র্যাভেল করার পালা।

টাইম মেশিনে টাইম সেট করে নেয় নিনো। এখন ভোর ৭টা বাজে। ঠিক যে সময়ে ডেলিসাসহ অন্যান্যরা ল্যাব থেকে বের হচ্ছিল তার ঠিক ৫ মিনিট আগের সময় দেয় সে। এবার মেশিন চালু করার পালা। নিনোর মনে অনেক প্রশ্ন ঘুর-ঘুর করছে৷ মেশিন চালু হবে কি হবে না, টাইম ট্র্যাভেল সত্যিই কি হবে নাকি হবে না, যদি কোনো সমস্যা হয় ইত্যাদি। তবে তাকে আজ ট্র্যাভেলে সফল হতেই হবে। শ্বাস আটকে ট্র্যাভেলের সুইচে চাপ দেয় নিনো। চালু হবার কিছুক্ষণ পরেই চারদিকে সব কাঁপতে থাকে। নিনো একটু ভয় পেয়ে যায়। আর তার মাথা ভোঁ-ভোঁ করতে শুরু করে। নিনো চোখ বন্ধ করে দুহাত দিয়ে তার মাথা শক্ত করে ধরে রাখে। চারদিক এখনো কাঁপছে। একটু করে চোখ মেলে দেখে – চারদিকে অন্ধকার। কিছুই দেখছে না সে। সবকিছু এখনো কাঁপছে। আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। এরপর কি হলো কিছুই জানা নেই নিনোর।

আস্তে আস্তে চোখ খুলে নিনো। গত রাতে অফিসে তার চেয়ারে যেভাবে বসে ছিল ঠিক সেভাবে বসে আছে। মাথা এখনো ভোঁ-ভোঁ করছে৷ ঘড়িতে সময় দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিনো। টাইম ট্র্যাভেল সাকসেসফুল। রাত ১০টা ৫৫ বাজে। আর ৫ মিনিট পর সবাই ল্যাব ছাড়বে৷ অনেকে মারা যাবে। নিজের অফিস থেকে বের হয়ে যায় নিনো, সকলকে জানাতে হবে। কেউ যেন ল্যাব থেকে বের না হয়। অনেক বড় ভবন। নিনো তার ফ্লোরে কাউকে না পেয়ে নিচের ফ্লোরে যায়। সেখানে প্রথমেই চোখে পড়ে প্রফেসর হ্যারি। নিনোর চোখে ভেসে ওঠে হ্যারির মৃত দেহ। সামনে গিয়ে তাকে ডাক দেয় নিনো। তবে হ্যারি কোনো সাড়া দিল না৷ নিনো আরো কয়েকবার চেষ্টা করে। কোনো লাভ হল না৷ নিনোকে যেন সে পাত্তাই দিচ্ছে না। নিজের কাজ আপন গতিতে করে যাচ্ছে হ্যারি। হ্যারির পেছনে সময় অপচয় না করে অন্য জনকে খোঁজে নিনো।

সামনে মিস জিলি-কে পেয়ে যায় সে। এখানেও সেই একই ঘটনা ঘটে। জিলিও যেন নিনোকে পাত্তা দিচ্ছে না। নিনোর মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। সে বুঝতে পারে কেউ তাকে শুনতে পাচ্ছে না , দেখতে পাচ্ছে না৷ তবে দমে যাবার পাত্র নিনো নয়৷ এসময় দেখে ডেলিসা লিফটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নিনোও ডেলিসার পেছনে ধাওয়া করে৷ ডেলিসার সাথে সেও লিফটে উঠে পড়ে৷ লিফট নিচে নামার আগমুহূর্ত পর্যন্ত নিনো ডেলিসার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে৷ তবে কোনো লাভ হয় না। নিনোর এখন কাঁদোকাঁদো অবস্থা। লিফট থেকে বের হবার সময় নিনো ডেলিসার হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করে। তার হাত ডেলিসার হাতকে ছুঁতে পারলো না। অবাক হয় নিনো। নানা ভাবে ডেলিসাকে ধরতে চাইল সে, এমন কি ডেলিসার হাটার পথে সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। তাও লাভ হল না৷ ডেলিসা নিনোর শরীরের একপাশ দিয়ে এসে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে কষ্টে চিৎকার করতে থাকে নিনো। কেউ তাকে দেখছে না, শুনছে না। যেন সে কিছু থেকে আলাদা হয়ে আছে৷ শুধু সময়ের সাথে সকলের পরিবর্তন দেখছে সে৷ হাতে আর মাত্র ১ মিনিট সময়। কী করবে তা ভাবছে নিনো।

ডেলিসা লিফট থেকে নামার কিছুক্ষণ পর নেমে আসেন মিস মেলিকা। মেলিকাকে দেখে ড. স্যাম এগিয়ে যায়।
স্যাম- হাই, মিস মেলিকা।আপনাকে উইয়ার্ড দেখাচ্ছে যে?
মেলিকা-হাই। আসলে একটা বাজে জিনিস দেখলাম। ঠিক কি বুঝতে পারলাম না।
স্যাম- কোনো স্বপ্ন কি?
মেলিকা- হয়তো৷ কোনো দুঃস্বপ্ন হবে হয়তো।
স্যাম- তাই? তা কী দেখলেন বলে ফেলুন। কোথায় যেন পড়েছি যে খারাপ স্বপ্ন দেখলে তা বলে ফেলা উচিৎ। তাহলে নাকি তা ফলার সম্ভাবনা কমে যায়।
মেলিকা – আপনি এ যুগেও এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন?
স্যাম – হাহা! নাহ। তবে বলতে তো আপত্তি নেই।
মেলিকা – আসলে দেখলাম আমিসহ অনেকে মারা গিয়েছি৷
স্যাম – কী! এ কীভাবে সম্ভব!
মেলিকা – কেন কী হয়েছে?

স্যাম- আমিও যে একটু আগে একই জিনিস দেখলাম! দু’জন একই জিনিস কীভাবে দেখে!

এমন সময় মিস আস্ট্রেয়া তাদের দিকে এগিয়ে আসে।
আস্ট্রেয়া – কী বেপার! কী নিয়ে কথা হচ্ছে?
মেলিকা – আসলে আমরা দু’জন একই স্বপ্ন দেখেছি।
আস্ট্রেয়া – কি দেখেছেন?
মেলিকা – আমরা মারা গিয়েছিলাম। তবে এটা স্বপ্ন ছিল না। মনেহয় জাগ্রত হয়েই দেখেছি।
আস্ট্রেয়া – হোয়াট! আমিও তো একটু আগে একই জিনিস দেখলাম৷

(মিস আস্ট্রেয়ার স্বামী প্রফেসর হান কোথা থেকে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।)

আস্ট্রেয়া- উফ্! হান। সকলের সামনে এটা কী করছ?
হান- যাই করি না কেন আমার আপত্তি নেই। একটা ভয়ংকর জিনিস দেখে তোমাকে সারা বেইসমেন্ট খুঁজে এলাম। আর তুমি এখানে?
আস্ট্রেয়া- কী দেখলে শুনি?
হান- তুমি মারা গিয়েছিলে। মেঝেতে তোমার মৃত দেহ পড়ে ছিল।
এ কথা শুনে আস্ট্রেয়া, মেলিকা, স্যাম সকলেই নির্বাক হয়ে যায়। ডেলিসা দৌড়াচ্ছে। কোথা থেকে যেন গুলি ছুটে আসছে। প্রথমে পার পায় সে। কিন্তু পরে বুকে গুলি লাগে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। তার চোখও আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছে। ভয়ার্ত অবস্থায় চোখ মেলে সে। দেখে ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে দাঁড়িয়ে আছে ডেলিসা। কী দেখল এটা? কোনো স্বপ্ন কি? ডেলিসাকে এরূপ অবস্থায় দেখে তার কারণ জানতে চাইলে সে তা খুলে বলে। আজব ব্যাপার। ল্যাবের সকলেই এমনটি দেখেছে৷ এটি স্বপ্ন নয়, তা ডেলিসা নিশ্চিত। তবে কী সেটা সে মিলাতে পারছে না। এমন সময় প্রফেসর ডেভিড বলে ওঠে, “আচ্ছা যা হবে হোক। এখন বেরিয়ে পড়ি। বের হলেই যে মারা পড়ব এ তো একেবারেই নিশ্চিত নয়”।
ডেলিসা- ওয়েট প্রফেসর ডেভিড। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন কি?
ডেভিড- কী জিনিস?
ডেলিসা- যারা যারা পার্টিতে যাবার কথা, তারা তারা মরতে দেখেছে৷ আর যারা আজ অফিসে থাকার কথা, তারা দেখেছে অন্যদের মৃত দেহ।
ডেভিড- তো?
ডেলিসা- আমার মনে হয়। আমাদের বের হবার আগে চারপাশ দেখে নেওয়া উচিত। সিসি ক্যামেরার রুমে গিয়ে চারপাশে দেখা যেতে পারে৷ যদি কিছু পাই।

ডেলিসা সহ আরো অনেকে সিসি ক্যামেরা রুমে যায়৷ নিনোও তাদের পেছনে পেছনে চলে। তবে এই ঘটনা থেকে তার মনে পড়ে সেই রেলওয়ের কথা। তারও ঠিক এমনটিই মনে হয়েছিল যে- সে ট্রেনের সাথে ধাক্কা খায়। পরে দেখে ট্রেন অনেক দূর থেকে আসছিল, এখনো ধাক্কা খায়নি। তবে এ বিষয় নিয়ে এখন ভাবতে চায় না নিনো। তারা কী করবে, তা দেখার আশায় আছে সে। সিসি ক্যাম রুমে গিয়ে দেখে গার্ড গভীর ঘুমে মগ্ন। তাকে অনেকেই ঝাড়ি দিয়ে তোলে । তারা দেখে, সিসি ক্যামেরার কম্পিউটার স্ক্রিন কালো হয়ে আছে। সম্ভবত জ্যামার দিয়ে করা হয়েছে। তাদের আর বোঝার বাকি থাকে না যে এখানে আসলেই কোনো অঘটন ঘটতে চলেছে। তাড়াতাড়ি করে ডেলিসা ভবনের এলার্ট বাটনে টিপ দেয়। সাথে সাথে ভবনটি লক হয়ে যায়। আর টাস্কফোর্স খবর পেয়ে তাদের টিম নিয়ে ছুটে আসে।

টেরোরিস্টরা অপেক্ষায় আছে । কিন্তু এখনো একজনও বের হল না। ভবনের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে সায়েন্টিস্টরা ভেতর থেকে সতর্ক হয়ে গিয়েছে। তারা পালিয়ে যেতে চাইল, তবে এতক্ষণে টাস্কফোর্স-এর লোকেরা চলে এসেছে। ধরা পড়ে যায় তারা। পরে টাস্কফোর্সের প্রধান ভেতরে এসে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রত্যেকে এবারের যাত্রায় বেঁচে যায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সবাই। নিনো শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সব। সেও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ভবনের সকলে এরপর বাড়ির দিকে রওনা দেয়। এমন ঘটনার পর পার্টিতে যাওয়ার ইচ্ছে কারোরই থাকে না।

ভবন থেকে বের হয়ে যাবে নিনো, এমন সময় এটেনডেন্টসের দিকে তার চোখ যায়। সকলের নাম লিস্টে আছে। শুধু তার নামটি নেই। তবে তার মনে আজ কোনো কষ্ট নেই। ডেলিসাসহ সকলে বেঁচে গিয়েছে। নিনো বের হয়ে যাচ্ছে, এমন সময় ডেলিসার মনে হয় বেরোবার গেইটে কেউ একজন আছে, সেদিকে তাকায় সে। তবে কাউকে দেখছে না ডেলিসা। নিনোও ডেলিসার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়। তার পর ‘গুড বাই’ বলে বেরিয়ে যায় নিনো।

রাস্তার ধারে হাঁটছে নিনো। অনেক রাত হয়েছে। এখন বাসায় যাবে। তবে সে হঠাৎ লক্ষ্য করে তার শরীর থেকে সোনালী রঙের কোনো আভা যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তার শরীর একটু পর পর হালকা হয়ে যাচ্ছে। হিসাব কষে বের করে সে, ঠিক যে সময় টাইম ট্র্যাভেল করেছিল সেই সময়ের মধ্যে তার পুরো শরীর হালকা হয়ে মিলিয়ে যাবে। হয়তো তার অস্তিত্বই আর থাকবে না নিজের কাছে। এসব ভাবতে ভাবতে বাসায় চলে আসে নিনো। অনেক ক্লান্ত সে। এখন তার দরকার শুধু একটি গভীর ঘুম।

৬.

“Time is the only thief we can’t get justice against.” – Astrid Alauda

অনেক তৃষ্ণা পায় নিনোর। গ্লাস ধরার জন্য অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরে সময় নিয়ে হাতের মধ্যে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে গ্লাস ধরে পানি পান করে সে। শরীর অনেক হালকা হয়ে এসেছে। বাহিরের দরজা না লাগিয়ে বিছানায় যায় সে। তবে ভালোভাবে ঘুমাতেও পারছে না। বিছানায় পড়ে এদিক সেদিক ছটফট করছে। পরে আস্তে করে ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এল তার।
বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারেনি। ভোর ৬টায় ঘুম ভেঙে যায়। শরীরের অবস্থা করুণ। ঘুম থেকে উঠে হাতের দিকে তাকাল নিনো। হাতের ওপারে কী আছে- তা অনেকটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ৭টায় টাইম ট্র্যাভেল করেছিল। হয়তো চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে আর এক ঘণ্টার মধ্যে। এই এক ঘণ্টা কী করবে, তা ভাবছে সে। ঠিক করে সেই রেলওয়ের রেললাইনে যাবে, যেখান থেকে হয়তো এই সব শুরু হয়েছে৷ দরজার সামনে এসে ভাবে- দরজা খোলার চেষ্টা করে কী লাভ; রাতে লক করেনি। দরজার একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বের হয় সে৷ নিনো নিজেকে ভূত বলে দাবি করলেও কোনো অসুবিধা নেই। ভূতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় সে। অতৃপ্ত আত্মাও বলা যায়। তাকে কেউ দেখছে না, শুধু এটাই ভূতুড়ে। যাওয়ার পথে নানান কথা ভাবছে সে। সারা জীবনের ইতিহাস স্মরণ করছে নিনো, ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সব রকম কথা। অনেক ধীরে হেঁটে হেঁটে সেই রেললাইনের সামনে আসে নিনো৷ আস্তে হাঁটায় অনেক সময়ও কেটে যায় তার। ৬টা বেজে ৫০ মিনিট। নিনোকে অনেকটা অন্ধ মানুষও বলা যায় ৷ চোখে তেমন কিছুই দেখছে না। সেই রেললাইনটার উপর বসে পড়ে সে। বসে থেকে গত রাতের ঘটনা এবং ওই দিন তার সাথে রেললাইনে ঘটে যাওয়া ঘটনার মিল খোঁজার চেষ্টা করছে। অবশ্য ভাবার অবস্থায় একটি ট্রেন তার উপর দিয়ে চলে গেছে। সে ভাবে- যদি রেলের ঘটনাটি রিসার্চ সেন্টারে ঘটনার মতো হয় তাহলে কি তার ব্যাপারটাকে কাকতালীয় বলে ধরে নেবে? আর যদি কাকতালীয় না হয়, তাহলে হিসেব মতে সে প্রথম টাইম ট্র্যাভেলার নয়। তারও আগে কেউ টাইম ট্র্যাভেল করেছে। কিন্তু কে? তারও কি একই অবস্থা হয়েছে? এই সব ভাবতে ভাবতে কি মনে করে নিনো পকেটে হাত দিল। পকেটে সেই ছবিটা রয়ে গেছে৷ ট্র্যাভেলের সময় বের করতে মনে ছিল না। ছবিটারও ঠিক নিনোর মত অবস্থা, হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। নিনোর চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে৷ নিজেকে নিজে দেখতে পাচ্ছে না সে। না পারছে কিছু অনুভব করতে। যেন সময়ের আপন গতিতে মুছে যাচ্ছে নিনো। যেন টাইম ট্র্যাভেল করা ছিল সময় ও প্রকৃতির বিপরীত। হয়তো এটিই তার অভিশাপ। ৭টা বেজে গেছে। যেন চিরতরে হারিয়ে গেল নিনো। কে নিনো? কীইবা তার পরিচয়। আদৌ কি নিনো বলে কেউ আছে? নাকি সবই মিথ্যে স্মৃতি? হয়তো এইভাবেই লেখা ছিল তার জীবনের শেষ পরিণতি।

সকাল থেকেই কেমন অস্বস্তি বোধ করছে ডেলিসা। ল্যাবে কাজ করার সময় বার বার মনে হচ্ছে, সে ও তার ল্যাব মেম্বারস ছাড়াও ল্যাবে কেউ একজন ছিল। কিন্তু কে তা বের করতে পারছে না সে। টাইম ট্র্যাভেলর মত এত বড় একটা প্রজেক্ট তার একা সামলানো সম্ভব নয়। এমন সময় বিজ্ঞান কাউন্সিলে মিটিং এর ডাক আসে। ডেলিসা সেখানে চলে যায়। মিটিং মূলত গতকালের বিষয়টি নিয়ে। কীভাবে সবাই একই ধরনের জিনিস দেখল, যা হয়তো ঘটে যেতে পারত। একেক জন একেক রকম ধারণা দেয়। কেউ কেউ তো সৃষ্টিকর্তা তাদের বাঁচানোর জন্য ভবিষ্যৎ দেখিয়ে দিয়েছে বলে বিশ্বাস আনে। এমন সময় মিস আস্ট্রেয়া বলে ওঠে, ” উফফ! ও থাকলে ভালো হতো। ” সবাই তার দিকে তাকায়। ডেলিসা বলে, “কে থাকলে, মিস আস্ট্রেয়া?”

আস্ট্রেয়া- ইয়ে… মানে… আসলে ঠিক মনে পড়ছে না । তবে সকাল থেকে কে যেন আমাদের মাঝে নেই নেই মনে হচ্ছে। আবার ঠিক কে নেই তাও বলতে পারছি না।
ডেলিসা- আসলে আমারও ল্যাবে কাজ করার সময় এই জিনিসটা মনে হচ্ছে। যেন কেউ আমার সাথে ল্যাবে ছিল।
ডেলিসা বলার পর আরো অনেকে জানায় তাদেরও এমনটাই মনে হচ্ছে।
এমন সময় মিটিং এর হেড সায়েন্টিস্ট আলবাস ডেলিসাকে বলে, “মিস ডেলিসা, আপনি টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে কাজ করছেন না? আর আপনার ল্যাবে কেউ নেই নেই মনে হচ্ছে? ”
ডেলিসা- জ্বি।
আলবাস- আচ্ছা, এমন কি হতে পারে না যে গতকালের সাথে টাইম ট্র্যাভেলের কোনো মিল আছে?
ডেলিসা- আমিও এতক্ষণ ধরে এ কথা ভাবছি। আমার মনে হয় যাকে আমাদের মিসিং মনে হচ্ছে সে কোনোভাবে টাইম ট্র্যাভেলে সফল হয়েছে। তাই আমরাও হয়তো ঘটে যাওয়া ঘটনার একটা প্রতিচ্ছবি দেখেছি।
আলবাস- ধরে নিলাম আপনি সঠিক। তাহলে, তাকে মিসিং কেন মনে হচ্ছে?
ডেলিসা- সেটাই তো বুঝতে পারছি না । ঠিক কী ঘটেছিল, যার ফলে সে মিসিং? যে টাইম ট্র্যাভেল করেছে, সে সরাসরি সেদিন আমাদের কাউকে কিছু বলেনি। তাহলে কি সে ট্র্যাভেল করেই হারিয়ে গেল? কোনো সাক্ষাৎ ছাড়াই! যেহেতু আমাদের পরিচিত একজন মিসিং, তাই আমাদের বাঁচানোর জন্যই যে সে টাইম ট্র্যাভেল করেছে- সেটা ধরা যেতে পারে। কারণ ঘটে যাওয়া ঘটনার সময় হয়তো তিনি বেঁচে ছিলেন।

আলবাস- হুম। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

যে তাদের বাঁচিয়েছে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য কী করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকেই নানা মতামত দেয়। তবে কোনো কূল পায় না। ডেলিসা কিছু বলতে পারছে না। ভালো ভাবনা নিয়ে আসার জন্য সময় লাগবে তার। আজ সারাটা দিন মিটিং চলে। কোনো ভালো ক্লু পায়নি তারা। তবে মিটিং-এ সিদ্ধান্ত নেয় যে টাইম ট্র্যাভেলারকে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত মিটিং অব্যাহত থাকবে। আর যারা বর্তমানে যে বিষয়ে কাজ করছে তারা ট্র্যাভেলারকে না পাওয়া পর্যন্ত সব বন্ধ রাখবে।

মিটিং শেষ। সকলে বেরিয়ে যায়। ডেলিসা গাড়িতে উঠবে এমন সময় রাস্তার বাম দিকে চোখ যায় তার। যতটুকু মনে পড়ে এ দিকটায় কখনো যায়নি সে। কী মনে করে আজ সেদিকে যেতে ইচ্ছে হয় তার। কেন জানি মনে হচ্ছে এদিকটায় সে আগে গিয়েছে। ডেলিসার স্মৃতি শক্তি প্রখর। আজকে গাড়িতে না, হেঁটে হেঁটেই যেতে ইচ্ছে হয় তার। অনেকক্ষণ হাঁটার পর খেয়াল করে সে এ দিকটা অত আধুনিকতার ছোঁয়া আসেনি। হাটতে হাটতে চোখের সামনে একটি বাড়ি পড়ে। বাড়িটা পুরাতন, অতো আধুনিক নয়। তার মনে হয় – এই বাড়িতে সে আগেও এসেছে৷ দরজার সামনে নাম লিখা আছে এল.নিনো। আগেও সে এই নামটি শুনেছে, কিন্তু কার নাম মনে পড়ছে না। নক করতেই দরজা খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করে সে। খুবই পরিচিত লাগে তার। প্রথমেই দেখে পুরাতন রেকর্ড কালেকশন। ডেলিসা নিশ্চিত সে আগে এগুলো দেখেছে। টেবিলে চোখ যেতেই সে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দেয়। টেবিলে টাইমের উপর নানা বই আছে, নানা পেপার আছে টাইম ট্র্যাভেলের উপরে। পাশের রুমে যাওয়া মাত্র একটা ছবি তার চোখে পরে। দেওয়ালে টাঙানো। ডেলিসা তাকে চেনে। কিন্তু মনে আসছে না। ডেলিসা ভাবছে, “আচ্ছা, উনিই সেই টাইম ট্র্যাভেলার নন তো?” সে ছবিটির একটি ছবি তুলে নেয়৷ যে করেই হোক, এনাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কী করবে ভাবছে সে। এমন সময় সোফায় মুক্ত ভাবে বসার সময় সোফার নিচে পড়ে যায় সে। অবাক হয়ে আছে ডেলিসা। তার শরীরের উপরের অংশ সোফার উপরে আর বাকি অংশ সোফার নিচে৷ আর সোফার বসার অংশটির ভেতর তার বাকি অংশ। তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ায় সে৷ কী হলো, তার মাথায় ঠেকছে না। তবে তার কী যেনো সন্দেহ হল। তাই বাড়ির দেয়ালের কাছে এসে প্রথমে আস্তে করে হাত দিয়ে ধাক্কা দেয় । কিচ্ছু হয় না। পরে একটু জোরে দিতেই হাত দেওয়াল ভেদ করে বাহিরে চলে যায়। তার আর বোঝতে বাকি থাকে না- ট্র্যাভেলারের সাথে সাথে ট্র্যাভেলারের সকল জিনিসই বিলীনের পথে। ডেলিসা আরো কিছু সময় নিয়ে হিসেব কষে। নানা হিসেব করে বের করে যে, আগামী ৫ মাস পর এ বাড়ি বিলীন হয়ে যাবে। যা করার তা হয়তো এই ৫ মাসের ভেতরে করতে হবে। নাহলে ট্র্যাভেলারকে হয়তো ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগই থাকবে না। তার পরবর্তী কাজের জন্য টেবিল থেকে পানির গ্লাসটি নিয়ে নেয়। বাড়ি যাবার জন্য বের হচ্ছে সে৷ আজ সারারাত ট্র্যাভেলারকে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো না কোনো উপায় করতেই হবে তাকে।

যথা সময়ে মিটিং শুরু হয়। একেক জন একেক উপায় বলে৷ কারোরটিই তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। সবার শেষে আসে ডেলিসার পালা।

আলবাস – মিস ডেলিসা, আপনার কাছে আজ কোনো উপায় আছে কি?
ডেলিসা – জ্বি। আপনারা কি এই ছবির মানুষটাকে চিনতে পারছেন?
ছবি দেখাতেই সকলে জানালো ছবির মানুষকে আগে দেখেছে। কিন্তু কেউ মনে করতে পারছে না।
ডেলিসা – উনিই সম্ভবত নিনো। আমার মনে হয় উনিই সেই ট্র্যাভেলার । আমাদের মেমোরি সময়ের সাথে তাকে হারিয়ে ফেলছে।
আলবাস- কিন্তু এনাকে ফিরিয়ে আনবে কিভাবে?
ডেলিসা – আমার কাছে তার ডি.এন.এ আছে। তার পানি খাবার গ্লাস থেকে নিয়েছি। কীভাবে? সে এক লম্বা ইতিহাস- তা বলে সময় অপচয় করতে চাই না। আমার প্ল্যান – একটা যন্ত্র বানাতে হবে অনেকটা টেলিপোর্টেশনের মতো। আগে ডি.এন.এ দিয়ে তাকে কোনো উপায়ে ডিটেক্ট করতে হবে। তারপর সে যেখানেই থাকুক না কেন তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। তারপর তাকে এই যন্ত্র দিয়ে ফিরিয়ে আনবো৷ তবে, সে আমাদের এই জগতে নেই। কোনোভাবে অন্য জগতে হারিয়ে গেছে৷ তাই আমাদের মেমোরি থেকে সে মুছে যাচ্ছে৷ কে জানে কেমন জগতে আছেন তিনি। সে জগৎ অভিশপ্ত নাকি সুখময়! তিনি বেঁচে আছেন নাকি নেই। আমার কাছে শুধু এই একটি উপায়ই আছে।

আলবাস – ওকে, ডেলিসা৷ কেউ কি তার বিপক্ষে আছেন?

( কোনো উত্তর এলো না)

আলবাস – ঠিক আছে। ডেলিসা উইল গো এহেড। ডেলিসাকে এই প্রজেক্টের প্রধানের দায়িত্ব দিলাম। আশা করি আমাদের টাইম ট্র্যাভেলারকে শীঘ্রই ফেরত পেতে যাচ্ছি।

এই বলে মিটিং শেষ হয়। আজকে থেকেই কাজ শুরু করে দেয় তারা। যে করেই হোক টাইম ট্র্যাভেলারকে তারা ফিরিয়ে আনবেই।

৭.
“You’ve pretty much figured it all out by now, right? That there is no absolute justice in this world. The opposite of justice is… another justice. Choosing the past through Time Leaps is just choosing between these justices. Can you say that your justice is correct? – Makise Kurisu (A fictional character from ‘’Steins;Gate’’)

নিজ অস্তিত্ব টের পাচ্ছে নিনো। হারিয়ে যায়নি সে। কিছু একটার উপর পড়ে আছে তার দেহ। আস্তে আস্তে চোখ খুলে। শরীর খুব ভারী, নড়তে কষ্ট হচ্ছে তার। চারিদিক নীরব। পাশে কেউ আছে, অনুভব করে সে। একটু নড়ে তাকাতেই চোখে পড়ে একটি বৃদ্ধ মহিলা তার পাশে বসা। একটু পড়ে সেই মেয়েটি যেন ছোট বাচ্চার মত হয়ে এল । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নিনো। ভূতে নিনো বিশ্বাসী নয়। তবে এই ভূতুড়ে কাণ্ড দেখে নিনোর মনে ভয় বাসা বাঁধছে। একটু পর এই ছোটো মেয়েটি তরুণী হয়ে ওঠে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে নিনো। ছবির সেই আবছা পরিচিত মেয়েটি। নিনোর আর চিনতে দেরি হয় নি। ইনি হলেন বিজ্ঞান মহলের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানী, মিস জেনোবিয়া। নিনো তাকে অনেক ভালোবাসে। জেনোবিয়া নিনোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেয়। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে নিনো। জেনোবিয়া নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে, “কেমন আছো নিনো?”

(নিনোর মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। নিজের শরীরে তাকিয়ে দেখে তার শরীরও একবার পিচ্চি বাচ্চার মতো হচ্ছে, আবার বৃদ্ধও হচ্ছে। সব কিচ্ছু বিরক্তিকর লাগছে তার , সাথে ভয়ংকরও)

নিনো – জানি না।
জেনোবিয়া – হাহা। এরকম উদাসী উত্তরগুলো দেয়া ছাড়তে পারবে না, তাই না?
নিনো – হয়তো। তোমার কী খবর?
জেনোবিয়া – সে তো দেখতেই পাচ্ছ। এতক্ষণ একা ছিলাম৷ তোমাকে দেখে ভালো লাগছে। তা তুমি এখানে যে? টাইম ট্র্যাভেল করেছ নাকি?
নিনো – (অবাক হয়ে) তুমি কী করে জানলে?
জেনোবিয়া – এখনো বোঝনি?
নিনো – তুমিও টাইম ট্র্যাভেল করেছো? কিন্তু আমি ছাড়া যে এই কাজ করা হচ্ছিল, তা তো জানা ছিল না।
জেনোবিয়া – ড. মরিসের কথা মনে আছে?
নিনো – হুম।
জেনোবিয়া – তুমি উনার প্রস্তাব ত্যাগ করার পর ২য় সর্বোচ্চ অভিজ্ঞ হিসেবে উনি আমাকে প্রস্তাবনা দেন। আমার হাতে অন্য কোনো প্রজেক্ট না থাকায় ভাবলাম এটা নিই৷ সাকসেস রেট কম, তাও ভাবলাম যদি কোনোভাবে সাকসেসফুল হয়ে তোমাকে ইম্প্রেস করা যায়৷
নিনো – কিন্তু প্রজেক্টটি তো ফেল হয়েছিল৷ নিউজে দেখেছিলাম।
জেনোবিয়া – অহ তাই? তুমি রেলওয়ে লাইন থেকে ফেরার পর দেখেছিলে?
নিনো – হুম। কিন্তু কীভাবে কী ? আমি রেলওয়ে লাইন-এ ছিলাম তুমি কী করে জানো? সব খুলে বলো।
জেনোবিয়া – ড. মরিস ব্যাক্তিগত কাজে ৬-৭ দিন ব্যস্ত থাকবেন বলে আমাকে দায়িত্ব দিয়ে চলে যান। এদিকে আমারও টিমের অনেক কাজই শেষ হয়ে এসেছিল৷ কিন্তু…
নিনো – কিন্তু কি?
জেনোবিয়া – কিন্তু প্রজেক্ট চলাকালীন সময়ে তোমার মৃত্যুর খবরটা আসে। ট্রেনের সাথে ধাক্কা লেগে নাকি তুমি মারা যাও। খবরটা পাওয়া মাত্র আমার যেন সব ভেঙ্গে পড়ে। সেদিন রাতে অনেক কেঁদেছি, আমার জীবনে আমি এর আগে এভাবে কাঁদিনি । (বলতে বলতে চোখের পানি মুছছে জেনোবিয়া। নিনো নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে আর কথা গুলো শুনছে)

সারা রাত তোমার স্মৃতিগুলো চোখে ভাসছিল। পরেরদিন আমার জন্মদিন ছিল। তোমাকে ছাড়া তা পালনের প্রশ্নই আসে না। তাই রাতে সিদ্ধান্ত নেই- টাইম ট্র্যাভেল করে ফিরিয়ে আনব তোমায়। না খেয়ে না ঘুমিয়ে টাইম মেশিন বানিয়েছিলাম। সব শেষে যখন ট্র্যাভেল সাকসেস হল – তোমার জন্য রেলওয়েতে গেলাম। বিশ্বাস কর অনেক ডেকেছি তোমায়। কিন্তু একটুও শোনোনি আমায়। তোমার হাত ধরে রেলওয়ে থেকে সরাতে চেয়েছি৷ হাতটাও আর ধরতে পারলাম না। যেন আমি থেকেও নেই। ভেবেছিলাম তোমাকে আর বাঁচাতে পারব না। পরে দেখি তুমি নিজেই রেললাইন থেকে নেমে গেলে৷ আর তার একটু পর একটা ট্রেন লাইন দিয়ে চলে গেল। আমি ঘড়িতে সময় দেখলাম। যে সময়ে মরে যাবার কথা ছিল তা অতিক্রম হয়ে গেছে৷ বুঝলাম আর কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে ঠিক করার মত কেউ নেই৷ তাই এ জগতে আসার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার সাথে ছিলাম৷ তোমার সাথে অফিসে গেলাম। উল্কা দেখার সময় তোমার পাশেই শুয়েছিলাম। তোমার সাথে ওই মেয়েটিকে দেখে নিজেকে একা তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। প্রতিদিন তো আমায় কল করতে; তবে সেদিন কোনো কল করনি। ভাবলাম ভুলে গেলে আমায়। তবে এটা বুঝেছি যে তোমার দোষ নেই। এরপর সময়ের সাথে চলে এলাম এই অভিশপ্ত জগতে।

(কথা শেষে এক দীর্ঘ বেদনাময়ী হাসি দেয় জেনোবিয়া)

মাথা নিচু করে আছে নিনো৷ তার চোখের এক কোণে পানি এসেছে৷ পানি মুছে জেনোবিয়ার দিকে তাকায় সে৷ সে জানতো আপন কাউকে হারিয়েছে সে। কিন্তু তার ভালোবাসার এই মানুষটাকে যে হারাবে কল্পনায়ও সে ভাবেনি । নিজের উপর ক্ষোভ আর লজ্জা হচ্ছে তার৷ সময় আসলেই অভিশপ্ত৷ জেনোবিয়ার দিকে তাকিয়ে নিনো বলে, ” আমি দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করো৷ ”
জেনোবিয়া – হাহা! তুমি কেন ক্ষমা চাইছো? এতো তোমার দোষ নয়। হয়তো আংশিক দোষ তোমার৷ তবে যাইহোক এখন তো আমার সাথে এখানে আছো, আর একা একা লাগছে না৷
নিনো – হুম

এই বলে উপরে তাকায় নিনো। তাকিয়ে তার চোখ ভরে যায়। আকাশে তারারা আলো ছড়াচ্ছে৷ এত তারা এক সাথে নিনো আগে দেখেনি। যেন আকাশের উপরের তল কেউ মুছে দিয়েছে৷ শত শত তারা যেন আকাশকে আলোকিত করে রেখেছে৷ যেন সৃষ্টিকর্তা আকাশে আঁধার দূর করবার জন্য আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

এমন সময় জেনোবিয়া বলে ওঠে, “আচ্ছা আমার জন্মদিনে না তোমার সাথে নাচবার কথা ছিল কিন্তু এর আগের দিন তুমি মারা গিয়েছিলে । ”
নিনো- ইয়ে মানে, কই এমন কোনো কথা তো ছিল না।
জেনোবিয়া – লুকাবার চেষ্টা করবেন না বুঝলেন। (এই বলে দাঁড়িয়ে যায় জেনোবিয়া তার পর নিনোকে টেনে তোলে)। চলো, আজ এই গভীর রাতে শত তারার আলোতে দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের ভালোবাসাময়ী নাচ করি।
নিনো – আমি পারি না, সত্যিই পারি না।
জেনোবিয়া – শুধু তাল মেলাবে আমার সাথে।
এই বলে নাচ শুরু করে দেয় তারা। জেনোবিয়া গুণগুণ করে গান গাইছে তার মধুময় সুরে।

নাচ করার ফাঁকে একসময় নিনো আকাশের দিকে তাকায়৷ কী যেন তার চোখে পরে, একটা ঘড়ি, কিন্তু সেটা কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে৷ জেনোবিয়াকেও দেখায় সে। এরপর তারা একে ফলো করে। এটার পিছু ধাওয়া করতে করতে দেখে ঘড়িটা এক জাগায় থেমে যায়৷ নিনো ও জেনোবিয়া আরও সামনে গিয়ে তারা দেখে অনেকগুলো ছোট ছোট ঘড়ি উড়ে বেড়াচ্ছে ঠিক পাখির মতন, দুপাশে দুটো ডানা আছে। তারা আরো সামনে গিয়ে দেখে – একটা বিশাল ঘড়ি। তার ঠিক উপরে কেউ একজন বসা। অনেকটা মানুষ আকৃতির। তবে তার পাখা আছে।

নিনো বলে ওঠে, “কে আপনি? ”
উপর থেকে আওয়াজ আসে – “আমার জগতে এসে আমাকে প্রশ্ন কর আমি কে?” আমি ক্রোনাস, গড অফ টাইম। এখানে কী তোমাদের? কেন এসেছ?
নিনো – আমরা টাইম ট্র্যাভেল করেছিলাম।
ক্রোনাস – সময় নিয়ে খেলার সাহস কি করে হয় তোমাদের? এটা তোমাদের অভিশাপ। তোমাদের শাস্তি।
নিনো – আপনি যদি আসলেই গড অফ টাইম হয়ে থাকেন – আমাদের ফেরত পাঠান। আমাদের ভুল হয়েছে।
ক্রোনাস – হুম। তবে শুধু একজনকে পাঠাব। কে যাবে নিজেরাই বেছে নাও।
জেনোবিয়া – নিনো, তুমি চলে যাও। আমি একা থাকতে পারব, কোনো সমস্যা নেই।
নিনো – না, তুমি আমাকে একবার বাঁচিয়েছ, আমাকে এর প্রতিদান দিতে দাও। এই বলে নিনো গড অফ টাইমকে বলে,
“ক্রোনাস, আমি এখানে থাকব।”
ক্রোনাস – ঠিক আছে।
এই বলে জেনোবিয়ার ওপর একটা আলোকরশ্মি আসে৷

জেনোবিয়া- না, প্লিজ নিনোকে পাঠান।
ক্রোনাস – সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছে৷
জেনোবিয়া কাঁদছে। ঠিক যেভাবে এখানে এসেছিল সেভাবে চলে যাচ্ছে সে। নিনোর দিকে তাকিয়ে কাঁদছে, নিনো তার দিকে তাকিয়ে একটা চওড়া হাসি দেয়। তার চোখের সামনেই জেনোবিয়া চলে যায় আপন জগতে। নিনো তার পর আকাশে তাকিয়ে সজোরে হাসতে থাকে৷

৩ মাস হয়ে গেল। ডেলিসা ও তার টিমের টাইম টেলিপোর্টেশন মেশিন বানানোর কাজ শেষ। এখন শুধু ট্র্যাভেলারকে ফিরিয়ে আনার পালা৷ ট্র্যাভেলারের ডি.এন.এ. ডিটেক্টরে দেয়৷ ডিটেক্টর অনেকক্ষণ সার্চ করে। অনেক অপেক্ষার পর ডি.এন.এ ম্যাচ হয়। এখন শুধু মেশিন অন করবার বাকি৷ অন করা হলো, সকলেই অপেক্ষমান। খুবই ভারী মেশিন, অনেক বিদ্যুৎ টানছে। ওপারে নিনো জেনোবিয়াকে মাত্র ফেরত পাঠিয়ে ভারী মনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ বিরাট এক ঝাঁকুনি খেয়ে সে নিচে পড়ে যায়৷ তার শরীর আগের মত হালকা লাগছে। একটু পর খেয়াল করে হাতের দিকে তাকালে অপর দিকে সব দেখা যাচ্ছে, আগে এভাবে এ জগতে এসেছে, কিন্তু এবার কোন জগতে যাবে সে বুঝছে না। এমন সময় ক্রোনাস, গড অফ টাইম নিনোর সামনে এসে বলে – ” হুম, আপন জগতে চলে যাচ্ছ৷ ভালো, ওপার থেকে অনেকেই ডাকছে তোমায়। যাক, যেহেতু চলে যাচ্ছ, তাই শুনে রাখো – এখান থেকে গিয়ে তোমার বাসায় এই ঘড়িটা পাবে৷ ( এমন সময় একটা ঘড়ি উড়ে এসে নিনোর সামনে হাজির। ) এই ঘড়ির উপরের বাটনে টিপ দিলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে৷ ভাবলাম অভিশাপ মুক্ত করে দিই। তোমরাই প্রথম যারা এ জগতে এসেছ, তাই এ যাত্রায় ছেড়ে দিলাম।

নিনো – ধন্যবাদ।

(বলা শেষ করতে না করতেই টেলিপোর্ট হয়ে যায় নিনো)

টেলিপোর্ট করা শেষ। এখন তাদের শুধু খুলে দেখার অপেক্ষা। সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে, যে মানুষটি তাদের বাঁচিয়েছে তাকে দেখবার জন্য। যন্ত্রের মুখ খোলা মাত্রই নিনোকে দেখে সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে। নিনোর শরীর খুবই দুর্বল , হাটতে পারছে না ভালোভাবে৷ ডেলিসা এগিয়ে তাকে সাহায্য করে। সবাই নিনোকে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ জানায়। তাকে নানা পরীক্ষা করায়। সব ঠিকঠাকই আছে। সবশেষে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানানো হয় তাদের বাঁচানোর জন্য, আর টাইম ট্র্যাভেল সাকসেসফুল হবার জন্য অভিনন্দন জানানো হয়।

ডেলিসা নিনোকে বলে, “এত দিন না খেয়ে কীভাবে ছিলেন আপনি?”
নিনো- কই এত দিন? কিছুক্ষণই তো হল মাত্র। তবে আপনি আগের থেকে শুকিয়ে গেছেন।
ডেলিসা – কিছুক্ষণ না, ৩ মাস হয়ে গেছে আপনি এখানে ছিলেন না৷
নিনো – ৩ মাস! ওহ বুঝলাম, টাইমশিফট এর ফলে এইসব হয়েছে।
ডেলিসা – হুম। আপনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন।
নিনো – না৷ বাসায় যেতে হবে একটা জরুরি কাজ আছে।
এই বলে বেরিয়ে যায় নিনো। আজকে বেশি হাঁটার শক্তি নেই। অন্য বিজ্ঞানীরা তাকে রেস্ট নিতে বললেও শোনে না সে। গাড়িতে চড়ে বসে নিনো।

বাসায় গিয়ে সেই ঘড়িটি খোঁজার কাজে লেগে যায় সে। বিছানার এক কোণে সেই ঘড়িটি দেখতে পায় নিনো। ঘড়িটি হাতে নিয়ে সুইচটি দেখে নিনো৷ অজানা কোনো এক ভাষায় কিছু একটা লেখা আছে৷ শ্বাস চেপে রেখে সুইচে চাপ দেয় সে৷ কী হবে কিছুই তার জানা নেই। ক্রোনাস বলেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে৷ চাপ দেবার পর ঘড়িটি বাতাসে মিলিয়ে যায়। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে। নিনোর মাথা ভোঁ-ভোঁ করে। জ্ঞান হারায় সে৷ জ্ঞান ফিরে চোখ খুলতেই দেখে সে রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে । সামনে একটা ট্রেন আসছে এখনি তাকে হিট করবে।
রেলাইনের একপাশে লাফ দিয়ে নিজেকে বাঁচায় নিনো৷ কেউ তাকে অনেক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছে। মাটিতে পড়ে থেকেই ফোন ধরে সে৷ জেনোবিয়া ফোন দিচ্ছে ড. মরিসের ল্যাব থেকে। রিসিভ করে সে৷

জেনোবিয়া – কোথায় তুমি?
নিনো – এইতো রেলওয়েতে।
জেনোবিয়া – এখনই বের হও ওখান থেকে। আর আমরা এখানে কেন? আর তুমি তো অন্য জগতে ছিলে।
নিনো – হুম৷ যাচ্ছি ৷ সমস্যা নেই আমার সব মনে আছে। বাড়িতে আসো। সব বলছি।

মাটি থেকে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার। অনেক টায়ার্ড সে। অনেক খাটুনি হয়েছে তার। আবারও খাটতে হবে। কাল জেনোবিয়ার জন্ম দিন। আবার কাল মিটিং আছে, ডেলিসা নামের একটি মেয়ে আসবে , উল্কাবৃষ্টি দেখা বাকি। আবার এর তিন দিন পর টেরোরিস্ট আঘাত আনবে সেখান থেকে তার কলিগদের বাঁচাতে হবে। অনেক কাজ। উঠে দাঁড়ালো নিনো। জেনোবিয়ার তোলা ছবিটা নিচে পড়ে থাকতে দেখে সে, হাটার সময় যেটা হাতে ধরেছিল। বেখেয়ালে হয়তো হাত থেকে পড়ে গেছে। ছবিটা তুলে নেয়। বাসায় গিয়ে দেখে জেনোবিয়া আগে থেকেই হাজির। সকল ঘটনা খুলে বলছে নিনো। আসলেই সব ঠিক হয়ে গেছে। আর এর জন্য গড অফ টাইমকে মনে মনে ধন্যবাদ দেয় সে।

যত দূর জানা জায়, নিনো আর জেনোবিয়া-ই ছিল প্রথমদিকের টাইম ট্র্যাভেলারস। এরা একবারই টাইম ট্র্যাভেল করেছিল। এরপর আর কখনো তারা টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে কাজ করেনি। হয়তো এদের পরে আরো অনেকে সফল হয়েছে যারা হয়তো আর ফিরে আসবে না। হয়তো-বা কেউই সফল হয়নি। হয়তো আর কেউই সফল হবে না।

(সমাপ্ত)

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
1 Comment
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
Inline Feedbacks
View all comments
Apon Roy
6 মাস পূর্বে

Review লেখক : হৃদয় হক সাই-ফাই নাম : সময়ের অভিশপ্ত জগত রেটিং : ৯.৫ আউট অফ ১০ রিভিউ শুরুর আগে কিছু কথা বলি এটি টাইম ট্রাভেল,বায়োলজি সম্পর্কিত। তবে অন্য সব টাইম ট্রাভেল সাই-ফাই যেরকম এটি তার বিপরীত।পুরোপুরি ভিন্ন লেভেলের একড়া সাই-ফাই।প্রতিটি পর্বের শুরুতে রয়েছে বিজ্ঞানীদের উক্তি।লিখায় ছিল অনন্য চিন্তাধারা।বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য যে তথ্য এবং চিন্তা প্রয়োজন তা এক ছোট ব্যাখার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে লিখায় একটু শব্দ বানান ভুল ছিল আর দুএকটা শব্দের গ্যাপ ছিল।কিন্তু এগুলো অত সমস্যা না। রিভিউঃ ২১৩৬ সালের আধুনিক পৃথিবীর একজন বিজ্ঞানী এল নিনো।একদিন একটা রেললাইনে অসতর্কভাবে হাঁটছিল।সামনে থেকে ট্রেন আসছে।অতি নিকটে। নিনো ভয়ে ট্রেন লাইন… আরো পড়ুন

Last edited 6 মাস পূর্বে by AponRoy
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x