বিবর্তন নিয়ে আরিফ আজাদের মিথ্যাচার

ঢাকার লোকাল বাসে চলাফেরা করেছেন অথচ ‘মনের মানুষকে বশে আনা’, ‘স্বামী-স্ত্রীর অমিল’, ‘যৌন দুর্বলতা’, ‘স্মৃতিশক্তি বাড়ানো’, ‘যাদু-টোনা থেকে মুক্তি’ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দেয়া বিজ্ঞাপন দেখেননি, এমন মানুষ পাওয়া কঠিন হবে। বেশিরভাগ সময়ে এইসব বিজ্ঞাপনে ‘সম্পূর্ণ কোরান এবং হাদিসের আলোকে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়ে থাকে। ঢাকার রাস্তায় ফুটপাতে কোরান হাদিসের নাম নিয়ে জোঁকের তেল, কেঁচোর তেল, সাপ-গিরগিটি চামড়া-খুলি, ইত্যাদির বিক্রি করতেও আমি দেখেছি নানা সময়। এইসব ধর্মব্যবসায়ীদের মূল টার্গেট হলো সামাজিকভাবে বঞ্চিত দরিদ্র অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত জনগণ। শিক্ষিত মানুষেরা সাধারণত এসবে ভোলেন না।

তবে বাংলাদেশ বিজ্ঞানে খুবই অনগ্রসর একটি দেশ। এদেশে বিজ্ঞানচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব রয়েছে, এদেশের স্কুল কলেজে ঠিকমতো বিজ্ঞান পড়ানোও হয় না। ফলাফল, বিজ্ঞানের খুব সাধারণ বিষয়গুলো সম্পর্কেও এদেশের স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি পাশ করা মানুষেরও ধারণা খুবই অস্বচ্ছ। বিজ্ঞানে মানুষের এই অজ্ঞানতাকে পুঁজি করেই ইদানিং নতুন এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ীর উদ্ভব হয়েছে।

আমাদের নতুন প্রজন্মের এই চতুর ধর্মব্যবসায়ীদেরই এক প্রতিনিধি হলেন আরিফ আজাদ সাহেব। ফেসবুকে তার চল্লিশ হাজারের বেশি ফলোয়ার রয়েছে (২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত)। বিজ্ঞানের কোনো আলোচনাতেই ধর্মের কথা আসা উচিত নয়। কারণ দুটোর আলোচনার ক্ষেত্র ভিন্ন। তবে আরিফ আজাদ তার পোস্টে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে, একপ্রকার জোর করে ধর্ম টেনে আনেন, অনেকটা রাস্তার জোঁকের তেল আর সাপের মণি বিক্রেতারা তাদের কথার মাঝে ধর্মকে নিয়ে আসার মতো করে। ব্যাপারটা যেনো, ধর্মকে ব্যবহার না করলে মানুষ তার পণ্য কিনবে কেন?

বাংলাদেশের মতো দেশে বিবর্তন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিবর্তন সম্পর্কে ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা খুবই সহজ। তিনি একের পর এক মনগড়া পোস্ট দিয়ে, মানুষের অজ্ঞানতা আর ধর্মের আবেগকে পুঁজি করে অপবিজ্ঞান প্রচার করেছেন, আর এর মাঝে দিয়ে ফেসবুকে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন। প্রবলভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অপবিজ্ঞানে ভরা এই ধর্মব্যবসায়ীর একটি বিশেষ পোস্ট ফেসবুকে ৪০০ এর অধিক শেয়ার হয়েছে, যা সত্যিকারের বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য দুঃখজনক। জনপ্রিয় সোশ্যাল-মিডিয়ার মাধ্যমে এদেশে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে পীর-ফকির সাজা লোকেদের মতো তারও রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। তবে আরিফ আজাদের দুর্ভাগ্য যে, বিজ্ঞানযাত্রা তাকে এতো সহজে ছেড়ে দেবে না। আমাদের এই বিজ্ঞানে অনগ্রসর দেশটিতে মানুষের মাঝে বিজ্ঞানের সঠিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং সকল রকম অপবিজ্ঞান প্রচারকারীদের গোমর আমরা ফাঁস করে দেবো। আসুন, শুরু করি।

রেফারেন্স নিয়ে ভাঁওতাবাজি

একটা বৈজ্ঞানিক আলোচনায় সব কথা বলতে হয় বৈজ্ঞানিক জার্নালের রেফারেন্স দিয়ে, তবে আরিফ আজাদ কোথাও কোনো পিয়ার রিভিউড জার্নালের সাইটেশন দেননি। তার সব রেফারেন্স হলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার, অনলাইন ব্লগের, কিংবা ক্রিয়েশনিস্ট নামের অপবিজ্ঞান প্রচারকারীদের বইয়ের।

শুরুতে আরিফ আজাদ সাহেবকে জানিয়ে রাখি যে, পত্র-পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বিজ্ঞান হয় না। উনি যে কোনো জার্নালের সাইটেশন না দিয়ে পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে কাজ সেরেছেন, এটা প্রমাণ করে যে ওনার পড়াশোনা নেই, এবং উনি আসলে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার অযোগ্য। পক্ষপাতদুষ্ট ওয়েবসাইট দিয়েও বিজ্ঞান হয় না। ওনার রেফারেন্সের মধ্যে evolutionnews আর ideacenter এর নাম দেখা যাচ্ছে, এরা intelligent design এর সমর্থক, এবং বিবর্তনকে ভুয়া প্রমাণ করার জন্য যা যা করা দরকার, সেগুলো অনুসরণ করে লেখা ছাপায়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান কিন্তু আগে থেকে লক্ষ্য ঠিক করে নিয়ে কাজ করে না। বিজ্ঞান যে কোনো বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করে, এবং যেদিকে যুক্তি পায়, সেটাকেই প্রচার করে।

এখানে আরেকটা মজার ব্যাপার আছে – উনি Science Mag আর Live Science এর যে রেফারেন্সগুলো দিয়েছেন, ওরা কিন্তু বিবর্তন তত্ত্বের সমর্থনে প্রায়ই পোস্ট দিয়ে থাকে। ওনার সুবিধা হচ্ছে বলে একটা পোস্ট নেবেন, অন্যগুলো গ্রাহ্য করবেন না – এটা এক ধরনের কুযুক্তি (ফ্যালাসি), pick and choose fallacy. এটা নিয়ে পরবর্তীতে আরেকটু ডিটেইলস দেয়া হবে। আপাতত আসুন, তার তথ্যসংক্রান্ত মিথ্যাচারগুলোর দিকে এগোই।

জাংক ডিএনএ নিয়ে মিথ্যাচার

আরিফ আজাদ সাহেবের পোস্টটি অতিরিক্ত মাত্রায় ফাঁপা, সার অংশ খুবই কম। যেটুকু তথ্য দেয়া হয়েছে, তার সবই আবার ভুল। আমরা ওর স্ট্যাটাসের ভুল অংশটুকু (যে অংশে কোনো তত্ত্বীয় দাবি করা হয়েছে) দেখাবো এবং সেটার সঠিক তথ্যগুলো তুলে ধরবো।

আরিফ আজাদ সাহেবের ভাষ্যমতে,

বিশুদ্ধ আবর্জনাময় কথাবার্তা এবং স্পষ্ট মিথ্যাচার!

প্রথমত, ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলেই এগুলো বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ’ এই কথা কোথায় পেয়েছেন উনি? ধুমধাম ডকিন্সের ‘The Selfish Gene’ এর নামটা যে বলে বসলো, তা ঐ বইয়ের কোথাও কি এই কথা আছে? উনি কি “দ্যা সেলফিশ জিন” বইটা জীবনে খুলছেন, নাকি নিজের স্ট্যাটাসে ভারিক্কী বইয়ের নাম নিয়ে জ্ঞানী সাজার চেষ্টা করলেন? ওনার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে উনি একটা বই না পড়েই “কনফিডেন্সের” সাথে চাপা পিটাতে ওস্তাদ। ঠিক এখানেই ওনার সাথে ফুটপাতে বসে ষাণ্ডার তেল বিক্রি করা বাটপারের মিল। তারাও কিছু না পড়েই এভাবে চাপা পিটায়।

জনাব, জাঙ্ক ডিএনএ সম্পর্কে আপনি কতটুকু ধারণা রাখেন? জাঙ্ক ডিএনএ কে আগে অকেজো ভাবা হতো, এখন তার কিছু কাজ আবিষ্কৃত হয়েছে, এটুকুই তো? কথায় যেটা বলে আরকি, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী। জাংক ডিএনএ-এর যে কাজগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো কী উনি সেটা জানেন না।

জাঙ্ক ডিএনএ-এর অনেক কাজ আছে ঠিকই। যেমন, জাঙ্ক ডিএনএ বহুকোষী প্রাণীদের কোষে মিউটেশনের লোড কমাতে সাহায্য করে। জাঙ্ক ডিএনএ গাঠনিক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তবে, জাঙ্ক ডিএনএ-এর অন্যতম কাজ হলো, এটি প্রাণীদের বিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখে। ২০০৬ সালে নেচারে প্রকাশিত এক প্রবন্ধ বলেছে যে, Transposable Element (TE), যাকে আগে কেবল জাঙ্ক ডিএনএ ভাবা হতো, সেটা আসলে জেনেটিক বৈচিত্র্যর উৎস হিসেবে কাজ করে বিবর্তনে ভূমিকা রাখে। জার্নাল পড়ার মতো বিদ্যে ওনার পেটে আছে কিনা জানি না, তবে পাঠকদের সবাইকে নেচারের জার্নালটিতে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ রইলো।

এপিজেনেটিক্স শুধু জাংক-ডিএনএ-এর কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করে না। জেনেটিক-এক্সপ্রেশনের ওপর পরিবেশের প্রভাবও এপিজেনেটিক্সের গণ্ডির মধ্যে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে জাংক-ডিএনএ নিয়ে উনি এত বুলি কপচালেন, সেই জাংক ডিএনএ কিংবা এপিজেনেটিক্স দুটোই বিবর্তনের সত্যতা নিশ্চিত করে। তবে ওনার জ্ঞানের দৌড় যেহেতু জাংক-ডিএনএ পর্যন্ত তাই, শুধু জাঙ্ক-ডিএনএ নিয়েই একটু বলি। আশা করি, এ থেকে জাংক-ডিএনএ এবং বিবর্তনের মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্ট হবে।

মানুষের জেনোমের প্রায় ৮% হচ্ছে প্রাচীন ভাইরাসের ফসিল, এদের বলে HERV (Human endogenous retroviruses)। এখন পর্যন্ত মানব জেনোমে বিশটিরও বেশি শ্রেণীর HERV পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ফ্রান্সের একদল বিজ্ঞানী মানব জেনোম থেকে পাঁচ মিলিয়ন বছরের পুরোনো একটি রেট্রোভাইরাস পুনর্নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে, এই ভাইরাসের নাম দেয়া হয় “ফিনিক্স”

HERV-এর পাশাপাশি, মানব জিনোমের ৪০%য়েরও বেশি চার শ্রেণীর পুনরাবৃত্তিমূলক সিকোয়েন্স (interspersed repetitive elements) দিয়ে গঠিত:

1. SINEs (short interspersed repetitive elements),
2. LINEs (long interspersed repetitive elements),
3. LTR (element with long terminal repeat), এবং
4. DNA transposons.

তবে, HERV মতো এই পুনরাবৃত্তিমূলক সিকোয়েন্সগুলোও ফসিল পরজীবী। এদের বেশিভাগ প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো, যখন প্ল্যাসেন্টাল-স্তনপায়ীরা অন্যান্যদের থেকে আলাদা হতে শুরু করে। সবচেয়ে নবীনটিও প্রায় ২৫ মিলিয়ন বছরের পুরোনো, যখন মানুষের পূর্বপুরুষ old-world-monkey বা Cercopithecidae পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায়। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, এই পুনরাবৃত্তিমূলক সিকোয়েন্সগুলো চিরস্থায়ী নয়, যেমন স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এদের অর্ধজীবন (half-life) প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বছর, ফ্রুট-ফ্লাইয়ের ক্ষেত্রে ১২ মিলিয়ন বছর, ইত্যাদি। (Reference: “Junk DNA: A Journey Through the Dark Matter of the Genome” by “Nessa Carey”)। জাংক ডিএনএ কাজের নাকি অকাজের সেটা পরের কথা, প্রশ্ন হলো বিবর্তন ভুল হলে অতিপ্রাচীন পরজীবী ধরনের এই বিপুল পরিমাণের ডিএনএ সিকোয়েন্স মানব জিনোমে এলো কীভাবে?

পূর্বপুরুষ নিয়ে তথ্যগত ভুল

আরিফ আজাদ সাহেব যে বিবর্তন সম্পর্কে কোনরকম পড়াশোনা না করেই সেটা ‘ভুল’ প্রমাণ করতে এসেছেন, এটা বোঝা যায় বিবর্তন সম্পর্কে তার দেয়া একদম বেসিক ইনফরমেশনগুলো দেখলে। নিচের লাইনটি খেয়াল করুন। আরিফ আজাদ বলেছেন,

প্রথমত, ‘বিবর্তনবাদী’ শব্দটা অর্থহীন, যেমনটা ‘অভিকর্ষবাদী’ অথবা ‘মহাকর্ষবাদী’ শব্দটা অর্থহীন। সব পদার্থবিদই মহাকর্ষের অস্তিত্ব স্বীকার করেন, এজন্য তাদেরকে ‘মহাকর্ষবাদী’ ট্যাগ দেয়া হয় না। তেমনিভাবে, সব জীববিজ্ঞানীই বিবর্তন তত্ত্বকে স্বীকার করেন। এজন্য, ‘বিবর্তন তত্ত্ব ভুল’ এরকম দাবি করা কোনো বৈজ্ঞানিক জার্নাল আপনি পাবেন না (আবারো মনে করিয়ে দিচ্ছি, বিজ্ঞানে সঠিকতার পরিমাপ হয় বৈজ্ঞানিক জার্নাল দিয়ে, কোন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আর্টিকেল দিয়ে নয়)। কোনো বিজ্ঞানী যদি আদতেই বিবর্তনতত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে যথোপযুক্ত প্রমাণ সহ কোন বৈজ্ঞানিক জার্নালে নিজের গবেষণা প্রকাশ করেন, আজকের যুগে তার খ্যাতি ডারউইন বা আইনস্টাইনকেও ছাড়িয়ে যাবে।

কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যকে ভুল প্রমাণিত করতে চান, ভালো কথা। আগে যে তথ্যকে ভুল প্রমাণিত করবেন, সেটি অন্তত ঠিকমতো জানুন। রেফারেন্সের কোনো নামগন্ধ নাই, ধুমধাম বলে বসলেন ‘মানুষ শিম্পাঞ্জি থেকে এসেছে’। এই কথা নাকি আবার ‘বিবর্তনবাদীরা বলে’।  বিবর্তন নিয়ে যে জীববিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন তারা ওনার মতো এতো বেকুব নন যে কোনো রেফারেন্স, পড়াশোনা ছাড়া মনগড়া কাল্পনিক কথা বলবেন।

জ্বি না, মানুষ শিম্পাঞ্জি থেকে আসেনি। সঠিক তথ্য হলোঃ মানুষ, শিম্পাঞ্জি, বোনোবো, ওরাং ওটান, আর গরিলা প্রজাতিগুলো একই পূর্বপুরুষ-প্রজাতি থেকে এসেছে। বিভিন্ন প্রজাতির জিন বিশ্লেষণ করে জীববিজ্ঞানীরা বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় প্রজাতির উৎপত্তিকে সচিত্র ব্যাখ্যা করার জন্য যে ‘ট্রি অফ লাইফ’ তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অবস্থান দেখুন অক্সফোর্ডের এই জার্নালে। জীববিজ্ঞানীরা সবাই যেখানে গবেষণা করে বলছেন, শিম্পাঞ্জি আর মানুষের পূর্বপুরুষ এক আদি পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে, সেখানে উনি তাদের চেয়ে বড় বিজ্ঞানী এসেছেন, যিনি তথ্য নাই, প্রমাণ নাই, নিধিরাম সর্দারের মতো দাবি করে বসলেন যে মানুষ শিম্পাঞ্জি থেকে এসেছে!

এটা নিয়ে একটু টেকনিক্যাল তথ্য জানতে চান? আসুন দেখি তাহলে – শিম্পাঞ্জি এবং মানুষ যে একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ডিএনএ থেকে। মানুষের জিনোমের একটি বিশেষ অংশে (β-globin gene cluster) পাঁচটি জিন পাশাপাশি রয়েছে, এই জিনগুলো ভ্রূণ থেকে বিকাশের বিভিন্ন ধাপে হিমিগ্লোবিনের সেকেন্ড-চেইন (বেটা-চেইনের মতো) হিসেবে কাজ করে। জিনোমের এই অংশটির মাঝামাঝি অঞ্চলে বিটা-চেইন জিনের মতো একটি অংশ আছে, যাকে বলে সিউডো-জিন। একে সিউডো বলার কারণ হলো, মিউটেশনজনিত কারণে জিনটি কোনো কার্যকরী প্রোটিন তৈরি করতে পারে না। মজার ব্যাপার হলো, শিম্পাঞ্জি জিনোমের একই অংশে হুবুহু একই সিউডো-জিন পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, এই মানব সিউডো-জিনে দুটি নিউক্লিওটাইড substitute-মিউটেশন, এবং একটি নিউক্লিওটাইড deletion-মিউটেশন রয়েছে। এই মিউটেশনগুলোর প্রতিটিই শিম্পাঞ্জি সিউডো-জিনেও একই জায়গায় রয়েছে। শুধু বেটাগ্লোবিন জিনই নয়, ভিটামিন-সি তৈরির জন্য দায়ী GLO (বা GULO) জিনের মিউটেশন মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে এই রকম, তাই মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি কেউই ভিটামিন-সি তৈরি করতে পারে না। প্রশ্ন হলো, মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি পূর্বপুরুষ যদি একই না হয় তবে এদের জিনোমে মিউটেশনের চিহ্নগুলো এতো নিখুঁত কেনো?

মিসিং লিংক নিয়ে মিথ্যা বুলি কপচানো

আরিফ আজাদের মতো বিবর্তনকে ব্যবহার করা ধর্মব্যবসায়ীরা তাদের ভাষণের একটা বড় অংশ ব্যয় করে তথাকথিত ‘মিসিং লিংক’ নিয়ে। আসুন মিসিং লিংক নিয়ে এই ধর্মব্যবসায়ীর ভাষ্য দেখা যাক –

“সাজিদ আবার বলতে লাগলো, ‘বিবর্তনবাদ তখনই সত্যি হবে যখন এরকম সত্যিকার মিসিং লিঙ্ক পাওয়া যাবে।পৃথিবীতে কোটি কোটি প্রাণী রয়েছে। সেই হিসাবে বিবর্তনবাদ সত্য হলে কোটি কোটি প্রাণীর বিলিয়ন বিলিয়ন এরকম মিসিং লিঙ্ক পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু মজার ব্যাপার, এরকম কোন মিসিং লিঙ্ক আজ অবধি পাওয়া যায়নি। গত দেড়শো বছর ধরে অনেক অনেক ফসিল পাওয়া গেছে কিন্তু সেগুলোর কোনটিই মিসিং লিঙ্ক নয়। বিবর্তনবাদীরা তর্কের সময় এই মিসিং লিঙ্কের ব্যাপারটা খুব কৌশলে এড়িয়ে যায়। কেউ কেউ বলে, ‘আরো সময় লাগবে। বিজ্ঞান একদিন ঠিক পেয়ে যাবে,ইত্যাদি।’

ওনার মিসিং-লিংক খোঁজার ধরন দেখেই বোঝা যায় যে, কথাগুলো হারুন-ইয়াহিয়ার কাছ থেকে কপি-পেস্ট করা। যা হোক, ডেভোনিয়ান যুগের ফসিল ichthyostegaকে সর্বসম্মতিক্রমে সবচেয়ে পুরোনো উভয়চর প্রাণীর ফসিল ধরা হয়। এই ichthyostega ছিলো চার পেয়ে মাছের মতো। ichthyostega-সহ sarcopterygians গ্রুপের মেরুদণ্ডীদের সরাসরি পূর্বসূরী ধরা হতো এমন একটি প্রাণীকে যেটা দেখতে মাছের মতো, কিন্তু পায়ের মতো অঙ্গের পরিবর্তে তাদের ছিলো স্ফীত অবয়ব (fleshy lobe)। বিবর্তনের সমালোচকরা তখন এই স্ফীত অবয়বযুক্ত মাছকে বলতেন মিসিং-লিংক (যেটার টেকনিক্যাল নাম transitional fossil বা মধ্যবর্তী জীবাশ্ম), এবং তারা এর ফসিল হাজিরের দাবি জানাতেন।

২০০৪ সালে নীল শ্যুবিন (Neil Shubin) এবং তার সহকর্মীরা কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের কঠিন পলির আস্তর থেকে বের করে আনেন আঁশ ও ফুলকাসহ আস্ত tiktaalik কে। tiktaalik হলো সেই মিসিং-লিংক যেটা বিবর্তনের ধারায় মাছ এবং টেট্রাপোড শারীরিক কাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। tiktaalik ফসিলটি ছিলো প্রায় তিন ফুট লম্বা, আকৃতি অনেকটা কুমিরের মাথা ও চ্যাপ্টা পাখাযুক্ত ray-fin মাছের মতো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, tiktaalik শরীরে বিশেষ ধরণের দৃঢ় হাড় ছিলো, যেটা দিয়ে সে অগভীর পানিতে পাখাকে (fin) লাঠির মতো অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করতো। প্রশ্ন হলো, tiktaalik আবিষ্কারের এক যুগ পরও আপনার মিসিং-লিংক খোঁজা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

যা বুঝলাম, ওনার অন্যান্য প্রজাতির মিসিং লিংক নিয়ে আগ্রহ কম, মানুষ নিয়ে বেশি। শিম্পাঞ্জি থেকে যে মানুষ আসেনি, এটা তো আগেই বলেছি। তাহলে এই দুটোর মধ্যে মিসিং লিংক এর প্রশ্ন উঠছেই না। আর মানুষ (গণ – হোমো, প্রজাতি – সেপিয়েন্স)-এর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া হোমো গণের মধ্যে যে এতগুলো প্রজাতির ফসিল প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেগুলো কি উনি একেবারেই দেখবেন না? আর বিবর্তন তো এক লাইন ধরে কাজ করে না। অর্থাৎ, এক প্রজাতি গেলো, আরেক প্রজাতি এলো, এমন তো না। একই প্রজাতি থেকে অনেক প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়। অর্থাৎ, কাজিন পাওয়া যাবেই। নিচে হোমো সেপিয়েন্সের কোন কোন পূর্বপুরুষ বা কাজিনের ফসিল কোন কোন সালে পাওয়া গেছে, সেটার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা দিলাম।

Homo habilis – ১৯৬০
Homo gautengensis – ২০১০
Homo rudolfensis – ১৯৭২
Homo erectus – ১৮৯১
Homo naledi – ২০১৩
Homo heidelbergensis – ১৯৯৭
Homo neanderthalensis – ১৮২৯
Homo floresiensis – ২০১৪
Homo sapiens – কবর খুঁড়লেই পাবেন, পাশাপাশি আমরা আছি এখনো দুনিয়ায়।

বোঝাই যাচ্ছে যে, এগুলোর একটা ছাড়া বাকি সবগুলোই আবিষ্কৃত হয়েছে চার্লস ডারউইনের বিখ্যাত বই “অরিজিন অফ স্পিসিস” প্রকাশ হবার অনেক পরে, এমনকি এই তো কয়েক বছর আগে পর্যন্ত। তাই, ডারউইনের সময়ে যে সমালোচকেরা “মিসিং লিংক কই, মিসিং লিংক কই” বলে চিল্লাচিল্লি করতো, তাদের আসলে একটু ঠাণ্ডা হয়ে আসা উচিৎ। মানে, অনেক তো হলো, দেড়শো বছর চলে গেলো, এবার একটু মিসিং লিংক নিয়ে ক্ষ্যামা দেন, একটু ঘুমাই।

আর আগেই বলেছিলাম যে, আরিফ আজাদ সাহেব pick and choose fallacy তে আক্রান্ত। উনি যেসব নামীদামী সায়েন্স জার্নালের কথা বললেন, ওরা কিন্তু নিয়মিতই বিবর্তনের প্রমাণসহ প্রবন্ধ ছাপাচ্ছেন। সেই সায়েন্স জার্নাল পর্যন্ত উনি যাননি। উনি যে অনলাইন ব্লগের রেফারেন্স দিয়েছেন, সেই livescience এর পোস্টেই গিয়ে দেখি, পাশে মিসিং লিংকের তিনটা খবর ঝুলছে।

আরিফ আজাদ দুটো ঘটনার কথা বলেছেন যেখানে ভুল ফসিলকে মিসিং লিংক বলে প্রচার করা হয়েছিলো – ১) Ida, ২) Piltdown Man. তিনি Ida এর ব্যাপারে লিখেছেন,

“২০০৯ সালে বিবর্তনবাদীরা একটা মিসিং লিঙ্ক পেয়ে গেলো যা প্রমাণ করে যে মানুষ শিম্পাঞ্জী গোত্রের কাছাকাছি কোন এক প্রাণী থেকেই বিবর্তিত। এটার নাম দেওয়া হলো- Ida………. বিবর্তনবাদীদের কান্নায় ভাসিয়ে ২০১০ সালের মার্চে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি, ডিউক ইউনিভার্সিটি আর ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো’র গবেষক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে দেখালেন যে, এই Ida কোন মিসিং লিঙ্ক নয়। এটা Lamour নামক একটি প্রাণীর ফসিল।”

১৯১২ সালে আবিষ্কৃত Piltdown Man এর ব্যাপারে লিখলেন,

“কিন্তু ১৯৫৩ সালে কার্বণ টেষ্ট করে প্রমাণ করা হয় যে, এটি মোটেও কোন মিসিং লিঙ্ক নয়। এটাকে কয়েকশো বিলিয়ন বছর আগের বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।গবেষণায় দেখা যায়, এই খুলিটি মাত্র ৬০০ বছর আগের আর এর মাড়ির দাঁতগুলো ওরাং ওটাং নামের অন্য প্রাণীর। রাতারাতি বিবর্তন মহলে শোক নেমে আসে।”

উনি বললেন, Ida ২০০৯ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিলো, আসলে সেটার ফসিল পাওয়া গিয়েছিলো ১৯৮৩ সালে। আবার, ২০১০ সালে যে Ida নিয়ে যে গবেষণার কথা বললেন, সেটা আসলে হয়েছিলো ২০০৯ সালে। আর সেই গবেষণা যারা করেছিলেন, তারা বিবর্তনীয় তাত্ত্বিক এবং বিবর্তনের সমর্থক দল। যিনি এটাকে Exaggerated Hoax বলেছিলেন, সেই Nils Christian Stenseth হলেন Centre for Ecological and Evolutionary Synthesis এর পরিচালক। অর্থাৎ, আরিফ আজাদ সাহেব এটা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন যে, এই বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের একটা ভুয়া প্রমাণকে পর্যুদস্ত করলেও অন্যান্য অসংখ্য প্রমাণে ঠিকই সমর্থন দেন।

পরের ঘটনাটাও একই। উনি ১৯১২ সালের Piltdown Manয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবর্তনকে ধোঁকাবাজি বলেছেন। কিন্তু, কারা এই Piltdown Manয়ের ধাপ্পাবাজি ধরিয়ে দিয়েছেন তাদের নাম ও পেশার কথা বলেননি। Piltdown Man এর ফসিলকে মিথ্যা প্রমাণ করেন Joseph Weiner, Kenneth Oakley, এবং Wilfrid Le Gros Clark ১৯৫৩ সালে। মানব-বিবর্তন গবেষণায় ওনাদের তিনজনেরই অসামান্য অবদান রয়েছে। অর্থাৎ, Piltdown Man কেলেঙ্কারি যারা উন্মোচন করেছেন তারা নিজেরাও বিবর্তন গবেষক, সুতরাং এখানে বিবর্তনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন? বিজ্ঞান এর পদ্ধতি এমন যে সে নিজেই সকল তথ্যকে যাচাই করে। এখানে বিবর্তন-তাত্ত্বিকেরাই সকল প্রমাণ যাচাই করে কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল বের করেছেন। এই ফসিলটা মিথ্যা প্রমাণ করেছেন বলে অন্যান্য ফসিলের উদাহরণগুলো তো মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে না।

এখানে প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে ছোট্টো একটা উদাহরণ দেই, যাতে বিজ্ঞানের মধ্যে নিরপেক্ষ থাকার প্রবণতাটা পরিষ্কার হয়। যারা ভিনগ্রহে প্রাণ আবিষ্কারের জন্য গবেষণা করছেন, তারাই কিন্তু “এলিয়েন_মহাকাশযান_পৃথিবীতে_এসেছে” এমন দাবির সবচেয়ে কঠিন সমালোচক। ঠিক তেমনি, যারা বিবর্তন-সমর্থক বিজ্ঞানী, তারা এমনি এমনি বিবর্তনকে সমর্থন করেন না, যথেষ্ট প্রমাণ আছে বলেই করেন।

অ্যাপেন্ডিক্স সংক্রান্ত মিথ্যাচার

অ্যাপেন্ডিক্স নিয়ে আরিফ আজাদের বক্তব্য হচ্ছে,

অ্যাপেন্ডিক্স নিয়ে আরিফ সাহেব এক ধরনের চোট্টামি করেছেন; ঠিক যে ধরনের চোট্টামি জাদুকররা তাসের জাদুতে বা টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করাতে দেখিয়ে থাকে। তার পাঞ্চ লাইন ছিল এটাঃ “বিবর্তনবাদীরা কি আমাদের এ ব্যাপারে কোনকিছু নসীহত করতে পারে? এখনো কি বলবে অ্যাপেন্ডিক্স অকেজো? বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ?'” পাঠক একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেই দেখতে পারবেন যে এরকম দাবি তো বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা কখনই দেননি। তারা তো কখনই দাবি করেননি যে অ্যাপেন্ডিক্সের মানবদেহে উপস্থিতি তার বিবর্তনের সপক্ষে প্রমাণ। আদতে অ্যাপেন্ডিক্সের উপস্থিতি তেমন কিছুই প্রমাণ করে না।

তাহলে আরিফ আজাদ এটি বললেন কেন? কারণ এভাবে বিজ্ঞানীদের কথাকে টুইস্ট করলে সেটা খণ্ডন করতে তার সুবিধা হয়। আসলে ডারউইন বিবর্তনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব দেয়ার অনেক আগে থেকেই অ্যাপেন্ডিক্সের কাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন। দেখা গেছে এই অঙ্গটির বিষাক্ত হলে বা তাতে কোন রোগ দেখা দিলে সেটা ফেলে দিতে হয়। এবং সুস্থ অঙ্গ ফেলে দিলেও মানুষটি বহাল তবিয়তেই বসবাস করে। এর পাশাপাশি সিকামের পাশেই এই অঙ্গটির আর কোনো ফাংশন পাওয়া যায়নি। অনেক সময়ই তাই সার্জনরা অন্য সার্জারি করার সময় সুস্থ অ্যাপেন্ডিক্সকে ফেলে দেন, ভবিষ্যৎ বিষক্রিয়া এড়াতে। তাতেও রোগীর কোনো ক্ষতি হয় না। এরকম নিশ্চিতভাবে জানার পরেও এটি নিয়ে গবেষণা জারি ছিল। সম্প্রতি যে গবেষণাপ্রাপ্ত ফলাফল, তাতে দেখা গেছে অ্যাপেন্ডিক্সে পেটের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার আছে। আরেক গবেষণায় পাওয়া গেছে যে এখানে লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের বি আর টি কোষগুলো থাকে। অন্ত্রের ঐ অংশে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে এই কোষগুলো প্রতিরক্ষা দেয়। অ্যাপেন্ডিক্স না থাকলে যে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো মানুষের দেহে থাকতো না, এমন নয় কিন্তু। ওগুলো অ্যাপেনডিক্সের আশেপাশের অঞ্চলেই জমা হতো। তাই এটা নিশ্চিত করে বলা যায়নি যে অ্যাপেন্ডিক্সই উক্ত কোষগুলোর অবস্থানের জন্য দায়ী। যে বিজ্ঞানীগণ এই গবেষণা করেছেন, তারাও জোরের সাথে এটা দাবি করছেন না। অথচ সে গবেষণার অংশীদার না হয়েই আরিফ আজাদ এই শক্ত দাবি করে বসলেন! আশ্চর্য আত্মবিশ্বাস তো!

এরকম আত্মবিশ্বাস আসতে পারে দুইভাবে। এক, তিনি কোরিলেশন আর ক’জেশনের (correlation and causation) পার্থক্য বুঝেন না। একটাকে আরেকটার সমতুল্য মনে করেছেন। অথবা হতে পারে তিনি নিজে বুঝেন, কিন্তু একটা সুযোগ নিলেন, ‘হয়তো আম-পাবলিক বুঝে না’। আমরা অনেক সময়ই দুটো পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাকে একটা আরেকটার কারণ বলে ধরে নিই। ধরুন রাত বারোটার দিকে আপনার বাসার বাইরে একটা কুকুর কেঁদে উঠলো। পরের দিন সকালেই বাইরে বেরিয়েই একটি দুর্ঘটনায় পড়লেন। রাতের ঘটনা মনে করে ভাবতে পারেন যে হয়তো ঐ কুকুরটা কেঁদে ওঠার কারণেই এমন হয়েছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তি দিলে দেখা যাবে অন্য অনেক ঘটনার কারণে এমন ঘটেছে, যার সাথে সেই কুকুরের ডেকে ওঠার কোনো সম্পর্কই নেই। এক্ষেত্রে তাই প্রচুর হিসাবনিকাশ ও নিরীক্ষার অবকাশ রয়েছে। অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যাপারটিও অনেকটা এমনই। সেখানে ব্যাকটেরিয়া আছে, আর সেগুলো উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এর মানে এই যা যে সেই ওটি না থাকলে ব্যাকটেরিয়া কোনোভাবেই অন্ত্রে থাকতো না।

অ্যাপেন্ডিক্সের এই গবেষণার ফলাফলগুলো এখনো প্রস্তাবনা বা হাইপোথিসিস হিসেবেই আছে। এই বিষয়ে বিশ্বের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন, যাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একদিন নিশ্চিতভাবেই জানা যাবে যে এই অঙ্গটি কোনো কাজে আসে কিনা, বা এলে কোন কাজে আসে। এখন প্রশ্ন হলো, এতো কিছু থাকতে উনি অ্যাপেন্ডিক্সকে নিয়েই কেন পড়লেন? মানবদেহে বিভিন্ন ত্রুটি বা বিচ্যুতি আছে, যেমন চোখের অন্ধ বিন্দু আছে যেখানে আলো পড়লে আমরা দেখতে পাই না। অনেক গাড়ির ড্রাইভার লেইন বদলানোর সময় সাইড ভিউ মিররে পেছনের গাড়ি দেখতে পায় না, যদি সেই গাড়ি থেকে আসা আলো চোখের অন্ধ বিন্দুতে পড়ে। অবধারিতভাবেই তখন দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়াও আমাদের মেরুদণ্ডের একদম শেষে টেইলবোন আছে, যেটার কোনো দরকারই আমাদের নেই। ওটা থাকার কারণে অনেক ব্যথাবেদনাতেও ভুগতে হয়। আমাদের দেহের খাদ্যনালী আর শ্বাসনালী দুটোই একই জায়গায় গিয়ে মিশেছে। যে কারণে প্রায়ই বেখেয়ালে খাবার শ্বাসনালীতে আটকে গেলে আমরা বিষম খাই। এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে, যেগুলোর যে কোনো একটাই ওনার প্রস্তাবিত ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনারের দ্বারা ডিজাইনের হাইপোথিসিস বা প্রস্তাবনাকে নাকচ করে দেয়। অ্যাপেন্ডিক্সকেও সেসব ত্রুটির একটি ধরা হয়েছে, কারণ এর প্রয়োজনের পক্ষে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় নি। উনি দুই-তিনটি প্রস্তাবিত গবেষণার ভিত্তিতে বলেই বসলেন যে অ্যাপেন্ডিক্স নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজনীয়। আর এই স্টেটমেন্ট থেকে লাফ মেরে বিবর্তনকেই নাকচ করে দিচ্ছেন! সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন অন্য অনেকগুলো ত্রুটিকে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে অ্যাপেন্ডিক্স একটি প্রয়োজনীয় অঙ্গ, তারপরেও অন্যান্য গাঠনিক ত্রুটিগুলোর জন্য তার প্রস্তাবিত ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন ধোপে টেকে না।

বিজ্ঞান ধর্মের মুখাপেক্ষী নয়, ধর্মও বিজ্ঞানের মুখাপেক্ষী নয়। বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্টিফেন হকিং, রিচার্ড ডকিন্স এর মতো নাস্তিক বিজ্ঞানী রয়েছেন; আব্দুস সালাম, জেমস কলিন্সের মতো ধর্মবিশ্বাসী বিজ্ঞানীও রয়েছেন; আবার আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গের মতো প্রচলিত ধর্মমতের বাইরে গিয়ে রূপক অর্থে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন এমন বিজ্ঞানীও রয়েছেন। সকলেরই নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস চর্চার অধিকার আছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা বিজ্ঞানের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে চলে যায়, অথবা অপরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে অনলাইনে আরিফ আজাদের মতো চতুর ধর্মব্যবসায়ী, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্ট্যাটাসে লাইকের ব্যবসা করে যায়, আর এর সাথে অপবিজ্ঞানের প্রচার করে যায়, এদের কাছ থেকে সাবধান থাকুন।

সমাপনী বক্তব্য

আরিফ আজাদ সাহেব, সরাসরি আপনাকে বলছি – আপনার কি মনে হয় যে বিবর্তন তত্ত্ব ভুল? বেশ তো। বিজ্ঞান তো সবসময়েই সবার জন্য উন্মুক্ত। আপনার যদি বিবর্তন তত্ত্বকে ভুল মনে হয়, আপনি ধুরন্ধর ধর্মব্যবসায়ীর মতো অযাচিতভাবে ধর্মকে না টেনে আপনার মতের পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করে একটি গবেষণাপত্র লিখে ফেলুন, তারপর সেটি পাঠিয়ে দিন কোনো বৈজ্ঞানিক জার্নালে। আপনার যুক্তি-প্রমাণ যদি নিখাদ হয়ে থাকে, যে কোন ভালো জার্নাল অবশ্যই প্রকাশ করবে আপনার গবেষণাপত্র। আপনি যদি বিবর্তন তত্ত্বের মতো এতো যুগান্তকারী একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করতে পারেন, আপনার নাম জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তা না করে আপনি বিজ্ঞানের জ্ঞানহীন সাধারণ মানুষের কাছে আকাশকুসুম ভুলভাল যুক্তি উপস্থাপন করে মানুষের লাইক শেয়ার কামিয়ে যাবেন, এটা কি খুব নৈতিক?

মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অপবিজ্ঞানের প্রচার আর হাল জামানার পীর-ফকির ইন্ডাস্ট্রির দিন শেষ। উপরের মতো আমরা আবারও বলছি, আমাদের এই বিজ্ঞানে অনগ্রসর দেশটিতে মানুষের মাঝে বিজ্ঞানের সঠিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং সকল রকম অপবিজ্ঞান প্রচারকারীদের গোমর আমরা ফাঁস করে দেবো।

#বিজ্ঞানযাত্রা_চলবে

Comments

বিজ্ঞানযাত্রা

বিজ্ঞানযাত্রা

বিজ্ঞানযাত্রা কর্তৃপক্ষ।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

2 মন্তব্য on "বিবর্তন নিয়ে আরিফ আজাদের মিথ্যাচার"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
পিন্টু
অতিথি

এরকম একটি লেখা প্রকাশ করার জন্য বিজ্ঞানযাত্রা কে অশেষ ধন্যবাদ।

Harun
অতিথি

ধন্যবাদ

wpDiscuz