এক মিনিট! আগে কী দেখেছি? দেজাভুঃ বিভ্রম নাকি সত্যি?

আমার মনে হয় আমার বয়সী অনেকেই এটা অনুভব করেছেন যে, কখনো কখনো একটি ঘটনা ঘটার পর মনে হয় “আরে এটা তো মনে হয় আগে দেখেছি!” যারা কখনো এটা অনুভব করেননি, তারা হয়তো এই কথাটাকে হাস্যকর ভাবতে পারেন, তবে আমার কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হয় না। এইরকম ঘটনাকে বলা হয় দেজাভু (Deja -vu)। শব্দটা বহুল প্রচলিত একটা ফরাসি শব্দ। Deja vu-কে ইংরেজীতে ব্যাখ্যা করে বলা যায়, “The odd feeling you get when you sense you’ve already experienced something that you know you are doing for the first time” (একটি অদ্ভুত অনুভূতি যেখানে মনে হয় ঘটনাটা আগেও আপনার জীবনে ঘটেছিলো, অথচ আপনি জানেন যে, এটা আপনি প্রথমবারের মত করছেন)।

ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। তবে ইন্টারনেটে এই ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও এই বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, তবু কেন এটা ঘটে সেটার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এই অনুভূতি নিয়ে আজ পর্যন্ত ৪০টিরও অধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্নায়ু বিশেষজ্ঞরা। মেডিকেল সায়েন্সের জন্য এটি একটি রেকর্ড। অথচ একটিরও প্রমাণ সম্ভব হয়নি।

অধিকাংশ জরিপ অনুযায়ী দেজাভু অনুভূত হয় ব্যক্তির বয়স যখন ১৫ থেকে ২৫ এর মধ্যে থাকে তখন। প্রায় ৭০ শতাংশ লোক এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করে। প্রতিটি অনুভূতির সময় ভিকটিমকে হঠাৎ অদ্ভুত ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে এটা দ্রুতই কেটে যায়। পরে যখন কেউ এটা নিয়ে ভাবে, তার মনোজগতের বড় অংশ সেটা দখল করে রাখে। কিছু সময়ের জন্য হলেও সারাজীবনই সে এটা নিয়ে ভাবতে থাকে।

অধিকাংশ সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মতে, দেজাভু বা পূর্বদেখার অনুভূতি আসলে আমাদের জীবনের একটি অংশের স্মৃতির হঠাৎ করে জেগে উঠা। যে স্মৃতি হয়তো কোনো কারণে আপনি ভুলে গেছেন কিন্তু হুবহু একই ঘটনা ঘটার সময় মস্তিষ্কের টেমপোরাল অংশ আপনার পূর্বের ওই স্মৃতিটাকে জাগিয়ে তুলছে। কিন্তু মস্তিষ্ক কবে সেই স্মৃতি ধারণ করেছিলো ঐ তথ্য না থাকায়, কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ধরনের অনুভূতি হল মস্তিষ্কের উর্বরতার ফসল। পরবর্তীতে কী ঘটবে সেটা আমরা কিছুটা আগেই আন্দাজ করে ফেলি। আর যখন তা মস্তিষ্কের এই আন্দাজ/প্যাটার্ন অনুযায়ী মিলে যায়, তখন অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম হয়। “আরে এইটা কি আগে ——–?”

কিছু থিওরি বলে হেলুসিনেশন যখন নিয়ন্ত্রণের ভেতরে থাকে, তখনও এই অনুভূতি হতে পারে। কোনো কোনো নিউরোসাইকোলজিস্ট এমনও বলেছেন যে, যাদের দেজাভু অনুভূত হয় তাদের সিজোফ্রেনিয়া, এপিলেপসি বা মৃগী রোগের মত মারাত্মক মানসিক ব্যাধিও হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই ধারণাটি কখনোই হালে পানি পায়নি। এটিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

কিছুদিন আগে অবশ্য পদার্থবিদ “মিশিও কাকু” দেজাভু ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন একটা ধারণা সামনে এনেছেন। তিনি এটাকে ব্যাখ্যা করেছেন প্যারালাল ইউনিভার্সের মত জটিল একটা ব্যাপার দিয়ে। উনি বলেছেন, দেজাভুর ব্যাপারগুলো হয়তো সত্যিই ঘটে, তবে সেটা হয়ত অন্য কোনো এক ভুবনে [যেটাকে উনি প্যারালাল ইউনিভার্সের অন্তর্গত হিসেবে বুঝিয়েছেন]। তার ধারণা বলে, মানুষ তখনই দেজাভু অনুভব করে, যখন অন্য ইউনিভার্স এবং আমাদের ইউনিভার্সের convergence ঘটে. Convergence-কে বলতে পারেন এক ধরনের আপাতন বা উপরিপাতন। তার এই ধারণাটা বেশ জটিল এবং এটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তবে একটি ব্যাপার সুনিশ্চিত, দেজাভু আমাদের মস্তিকেরই কোনো রহস্যময় অধ্যায়। এর মর্মার্থ বুঝতে হয়তো মনুষ্যপ্রজাতির আরো কিছু সময় দরকার। একটা ব্যাপার আশা করাই যায় যে, এর প্রকৃত কারণটা খুব চমকপ্রদই হবে।

Comments

Md. Abdullah Al Zaman (Proyash)

লিখতে ভালোই লাগে। আর বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির জন্য বিজ্ঞানযাত্রা একটা চমৎকার জায়গা। তবে নিয়মিত লেখালেখি করা হয়ে ওঠেনা। চেষ্টা করি তবুও।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...