ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা বহুমূত্র রোগঃ বাংলাদেশের জন্য এক আশংকার নাম

বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত ডায়াবেটিস রোগটি আমাদের খুব পরিচিত। এদেশে ডায়াবেটিসের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। মূল কারণ হল, শারীরিক পরিশ্রম আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অনুপস্থিতি।

complications-diabetes-mellitus-such-as-blindness-heart-disease-kidney-failure-high-blood-pressure-46253965

ডায়াবেটিস কী?

Diabetes mellitus বা ডায়াবেটিস একটি ক্রনিক রোগ। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিন্তু সারানো সম্ভব নয়, তাকে ক্রনিক রোগ বলে। এসব রোগ ছোঁয়াচে নয়। আরেকটি উদাহরণ হল, ক্যান্সার।

প্যানক্রিয়াসে যখন ইনসুলিন নামক হরমোন উৎপন্ন হয় না কিংবা উৎপন্ন হলেও দেহ সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন ডায়াবেটিস দেখা দেয়।

আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্য গ্রহণের পর সে খাদ্য ভেঙ্গে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় এবং রক্তে অবস্থান করে। ইনসুলিন হরমোনটি রক্ত থেকে গ্লুকোজকে দেহকোষে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। কোষে এই গ্লুকোজ ভেঙ্গে শক্তি উৎপন্ন হয় যার সাহায্যে আমরা কাজ করে থাকি। প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় এই ইনসুলিন উৎপন্ন করে। যদি কোন কারণে ইনসুলিন উৎপাদিত হতে না পারে বা উৎপাদিত হলেও তাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা দেহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এ অবস্থাকে বলে Hyperglycemia (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)। এই অবস্থাটি ডায়াবেটিস রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।  দীর্ঘদিন ধরে হাইপারগ্লাইসেমিয়াতে ভুগতে থাকলে বিভিন্ন অঙ্গকে তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে দেখা যায়।

প্রকারভেদ

প্রধানত ৩ ধরণের ডায়াবেটিস আছে –

১) টাইপ ১ ডায়াবেটিসঃ দেহের রোগ প্রতিরোধ সিস্টেম যখন ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষসমূহকে (যারা Beta Cell হিসেবে পরিচিত) আক্রমণ করে, তখন এই ধরণের ডায়াবেটিস দেখা যায়। এই আক্রমণের পিছনের কারণটি এখনো স্পষ্ট নয়।

এ রোগে আক্রান্তদের দেহ অত্যল্প পরিমাণে বা একদমই ইনসুলিন উৎপন্ন করে না। যেকোনো বয়সীদেরই এটি হতে পারে তবে সবচেয়ে বেশী দেখা যায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে। এক্ষেত্রে রোগীদের প্রতিদিন ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিতে হয়। না নিলে পরিণাম মৃত্যু।

২) টাইপ ২ ডায়াবেটিসঃ মোট ডায়াবেটিস রোগীর ৯০ ভাগ এই প্রকারের অন্তর্গত। প্রাপ্তবয়স্কদের ভেতর এই টাইপের হার বেশী। এতে শরীরে ইনসুলিনের প্রতি বাধা সৃষ্টি হয় (যাকে বলে insulin resistance) অথবা দেহে ইনসুলিনের অভাব ঘটে। দুটো ঘটনা একসাথেও ঘটতে পারে।

এ ধরণের ডায়াবেটিসের পেছনে স্থূলতা একটি প্রধান কারণ। তাই নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস আর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু একসময় oral drugs এবং/অথবা ইনসুলিন গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে।

৩) জ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিসঃ গর্ভাবস্থায় (Gestational Period) এই টাইপের ডায়াবেটিস দেখা দেয়। প্রতি ২৫ জন গর্ভবতীর মধ্যে একজনের এই অবস্থা ঘটে যা মা এবং সন্তান – উভয়ের জন্যেই হুমকিস্বরূপ।

যদিও এই ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থা শেষে চলে যায় কিন্তু যারা এতে ভুগেন তাদের, এবং তাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর।

এগুলো ছাড়াও আরো কয়েক ধরণের ডায়াবেটিস আছে। যেমন –

  • Prediabetes
  • Latent autoimmune diabetes of adults (LADA)
  • Congenital Diabetes
  • Cystic fibrosis-related Diabetes,
  • Steroid Diabetes
  • Monogenic Diabetes

ঝুঁকির কারণসমূহ

১) টাইপ ১ ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে কী কী বিষয় দায়ী, সেটা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে পরিবারের কারো এই রোগের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের সামান্য ঝুঁকি থাকে। এছাড়া পরিবেশগত কারণ এবং ভাইরাসঘটিত কিছু ইনফেকশনকেও এ রোগের জন্য দায়ী করা হয়।

২) টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে অনেক কারণ দায়ী –

পারিবারিক ইতিহাস, ওজনাধিক্য (বিশেষ করে তলপেটে মেদ জমা), অস্বাস্থ্যকর খাওয়া দাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, বয়স বাড়া, উচ্চ রক্তচাপ, জাতিস্বত্বা (Ethnicity), Impaired glucose tolerance (IGT), জ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিসে ভোগার ইতিহাস, গর্ভাবস্থায় যথাযথ পুষ্টি না পাওয়া ইত্যা্দি।

৩) গর্ভবতীদের মধ্যে যারা স্থূল, যাদের IGT আছে অথবা ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাদের GDM এ ভোগার সম্ভাবনা বেশী।

আপনি ঝুঁকিগ্রস্ত কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন IDF এর ওয়েবসাইটে উল্লিখিত কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। এমন লিংক আরো একটা আছে, যেটা থেকে সহজেই ঝুঁকি নির্ধারণ করা সম্ভব।

লক্ষণসমূহ

ডায়াবেটিসের প্রধান চারটি লক্ষণ হল –

  • ঘন ঘন প্রস্রাব করা ( polyuria)
  • বার বার পিপাসা পাওয়া ( polydipsia )
  • ঘন ঘন ক্ষুধা লাগা ( polyphagia )
  • ওজন কমে যাওয়া

এছাড়াও যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে তার মধ্যে আছে –

ক্লান্তি অনুভব করা, কোনোকিছুর প্রতি মনোযোগ এবং আকর্ষণের অভাব, চোখে ঝাপসা দেখা, বমি করা এবং পেটে ব্যথা (যাকে অনেক সময় ফ্লু মনে করা হয়), হাত-পা অনুভূতিহীন হয়ে পড়া, ক্ষত ধীরে ধীরে শুকানো, ঘন ঘন ইনফেকশন হওয়া, চামড়ায় চুলকানি, ফুসকুড়ি উঠা ইত্যাদি।

টাইপ ১ ডায়াবেটিসে এসব লক্ষণ খুব দ্রুত দেখা দেয় (কয়েক সপ্তাহ বা মাসের ভেতর)। কিন্তু টাইপ ২ ডায়াবেটিসে লক্ষণগুলো খুব ধীরে ধীরে পরিলক্ষিত হয়, অনেক সময় একেবারেই দেখা দেয় না। ফলে এ ধরণের ডায়াবেটিস শনাক্ত করা বেশ কষ্টকর।

জটিলতাসমূহ

ডায়াবেটিকরা বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে রক্তে উচ্চ পরিমাণে গ্লুকোজ উপস্থিত থাকলে তা হৃদপিণ্ড, রক্তনালী, কিডনি, স্নায়ু এবং দাঁতের রোগ তৈরি করতে পারে। এর সাথে ইনফেকশন সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

হৃদরোগ (Cardiovascular disease): ডায়াবেটিস হৃদপিণ্ড এবং রক্তনালীর উপর প্রভাব ফেলে। এর ফলে coronary artery disease (যা থেকে হার্ট এটাক হয়) এবং স্ট্রোক হতে পারে। ডায়াবেটিকদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী।

কিডনির রোগ (diabetic nephropathy): ডায়াবেটিস কিডনিতে উপস্থিত রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় বা কিডনিকে অকেজো করে দেয়। ডায়াবেটিসহীন ব্যক্তির তুলনায় ডায়াবেটিকদের কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশী।

স্নায়ুরোগ (diabetic neuropathy): যখন রক্তচাপ এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যায়, তখন সারাদেহের স্নায়ুকে ডায়াবেটিস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে হজমে সমস্যা, ইরেক্টাইল ডিস্ফাংশন, হাতে পায়ে অনুভূতিশুন্যতা ইত্যাদি দেখা দেয়। বিশেষ করে “অনুভূতিশুন্যতা” খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ফলে অনেক ইনজুরি টের পাওয়া যায় না, পরিণামে ছোট একটা ক্ষত থেকে বিরাট বড় ইনফেকশন তৈরি হতে পারে এবং অঙ্গ কেটে ফেলতে হতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটে থাকে পায়ের সাথে (তখন একে বলে Diabetic Foot) কারণ পা-ই মাটির কাছাকাছি থাকে সবচেয়ে বেশী। ফলে ইনজুরিতে পড়ার সম্ভাবনাও এর সবচেয়ে বেশী।

চোখের রোগ (diabetic retinopathy): বেশীরভাগ ডায়াবেটিক কোনো না কোনো সময় চোখের রোগে ভুগেন। হয়ত চোখে ঝাপসা দেখেন বা চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন।

প্রতিরোধ

টাইপ ১ ডায়াবেটিসের কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই কারণ এর পেছনের কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায় নি।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ –

যারা স্থূল তাদের ওজন কমানো, শারীরিক পরিশ্রম করা, নিয়ন্ত্রিত এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, ধূমপান ত্যাগ, দুঃশ্চিন্তা এবং হতাশা থেকে দূরে থাকা, ঘুমের প্যাটার্ন ঠিক করা (<৬ ঘণ্টা কিংবা >৯ ঘণ্টা ঘুমালে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে)।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা

যেহেতু ডায়াবেটিস সারাজীবনের রোগ, তাই একে সঠিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। রক্তের গ্লুকোজ যেন বেড়ে না যায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। আবার গ্লুকোজের পরিমাণ সঠিক রাখতে গিয়ে তা যেন স্বাভাবিকের চেয়ে কমে না যায়।

যেহেতু খাদ্য এই রোগ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে, তাই কী ধরণের খাদ্য এখানে উপকারী সে বিষয়ে কিছু বলা দরকার।

ডায়াবেটিস রক্তের গ্লুকোজের আধিক্যের সাথে জড়িত। তাই যেসব খাবার খুব সহজে ভেঙ্গে রক্তে গ্লুকোজ মুক্ত করে (কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাদ্য), সেসব খাবার খাওয়ার উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। যেমন – চিনি, গুড়, মিষ্টি, ভাত, আলু, সাদা পাউরুটি, মধু, সিরাপ, জুস, ঠাণ্ডা পানীয়, চিনি মিশ্রিত শরবত, এনার্জি ড্রিঙ্ক ইত্যাদি। কারণ এসব খাদ্যে থাকে সরল শর্করা (সুক্রোজ, ফ্রুকটোজ)। যেসব খাদ্যে জটিল শর্করা থাকে, সেসব খাদ্য ধীরে ধীরে ভাঙ্গে এবং ধীরে ধীরে রক্তে গ্লুকোজ মুক্ত হয়। ফলে হঠাৎ করে বেড়ে না গিয়ে ধীরে ধীরে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এসব খাবারের মধ্যে আছে আটার রুটি, ব্রাউন ব্রেড, খোসাসহ ফল, সিদ্ধ চাল ইত্যাদি।

এটা শুধুমাত্র কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের বর্ণনা। ফ্যাট এবং প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের জন্যেও আছে বিশেষ নির্দেশনা।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা প্রায় ৮৪ লাখ। এটা বেশ হুমকিজনক পরিসংখ্যান।

তাই নিজে সচেতন হোন, অন্যদেরকেও করুন, ডায়াবেটিসমুক্ত থাকুন!

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz