হাবল টেলিস্কোপ হাজির করলো এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম ছায়াপথ GN-z11

মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। সেটা আমরা জেনেছিলাম এডউইন হাবল থেকে (অবশ্য জর্জ লেমেটারও বলেছিলেন আলাদা করেই)। ভদ্রলোক প্রথমে ছিলেন আইনজীবী, পরে তিনি জ্যোতির্বিদ্যাতে এসে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরি থেকে তিনি দেখেন মহাবিশ্বের সব কিছু একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হাবলের সূত্র বলে একটা আইন আছে যা ছায়াপথগুলোর দূরে সরে যাওয়ার গতি মাপতে কাজে লাগে। ওহ, হ্যাঁ, তিনি এটা করেছিলেন ১৯২৯ সালে, আর এটাকে বিগ ব্যাঙ-এর প্রত্যক্ষ প্রমাণগুলোর একটি বলে ধরে নেয়া হয়। এডউইন হাবলের সম্মানার্থে ১৯৯৫ হাবল ডিপ ফিল্ড, ২০০৪ হাবল আলট্রা ডিপ ফিল্ড, আর ২০১০ সালে হাবল ডিপ ফিল্ড আইআর-এর নামকরণ করা হয়।

hubblefargalaxy-2

এই দুইটি টেলিস্কোপ চোখ ধাঁধানো সব ছবি দিয়ে  আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে অনেক কিছু জানায়। এবার হাবল স্পেইস টেলিস্কোপ আর স্প্লিটজার  দিয়ে জ্যোতির্বিদেরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গ্যালাক্সী বা ছায়াপথের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বলা হচ্ছে, GN-z11 নামের এই ছায়াপথের বয়স আমাদের মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে ৪০০ মিলিয়ন বছর কম, বা এর বয়স ১৩.৪ বিলিয়ন বছর।

কিভাবে জানা গেলো এর বয়স?

১৮৪২ সালে ক্রীশ্চিয়ান ডপলার একটা প্রস্তাবনা দেন, যেখানে বলা হয় কোনো বস্তু থেকে নিঃসৃত তরঙ্গ (বা অন্য কোনো ক্রমিক ঘটনা) দর্শক আর উৎসের অবস্থানের সাথে আপেক্ষিকভাবে পরিবর্তিত হবে, একে বলা হয় ডপলার ইফেক্ট। সহজ একটা উদাহরণ হচ্ছে- ধরুন আপনার সামনে থেকে একটি গাড়ি হর্ন বাজাতে বাজাতে আসছে। গাড়িটি আপনার যত কাছে আসবে হর্ণটি তত তীক্ষ্ণ হতে থাকবে, আবার আপনাকে অতিক্রম করে যাওয়ার সাথে সাথে হর্নের শব্দে একটা মারাত্মক পরিবর্তন আসবে; শব্দটা ভোঁতা হয়ে যেতে থাকবে, আর সেটা দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে দুর্বলতর হতে থাকবে। খেয়াল করুন, কীভাবে উৎসের কাছে আসা বা দূরে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে শব্দ তরঙ্গের পরিবর্তন হচ্ছে! এই প্রস্তাবনা ব্যবহার করে দ্রুতগামী গাড়ির গতি নির্ণয় করা হয়। আর এই একই প্রস্তাব ব্যবহার করে ছায়াপথগুলোর দূরে সরে যাওয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের গতিও নির্ণয় করা হয়।

আলোর উৎস যখন দূরে সরতে থাকে তখন সেই উৎস থেকে নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য (দুইটি তরঙ্গের মাঝের দূরত্ব) বাড়তে থাকে, একে বলা হয় রেড শিফটিং বা লালমুখিতা, আর আলোর উৎস যখন কাছে আসতে থাকে তখন সেই উৎস থেকে নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমতে থাকে, এটাকে বলা হয় ব্লু শিফটিং বা নীলমুখিতা। হাবল দেখেছিলেন পাশের ছায়াপথ এন্ড্রোমিডা থেকে নির্গত আলো নীলমুখী, মানে এন্ড্রোমিডা আমাদের কাছে আসছে। সোজা কথায়, এন্ড্রোমিডা আর আকাশগঙ্গা সংঘর্ষের রাস্তায় আছে।

2000px-Redshift_blueshift.svg

এই ডপলার শিফটিং ব্যবহার করে জ্যোতির্বিদেরা (যারা Yale University, the Space Telescope Science Institute (STScI), and the University of California তে নিযুক্ত আছেন) নিশ্চিত হয়েছেন যে এই ছায়াপথের বয়স ১৩.৪ বিলিয়ন বছর।

GN-z11 কেমন?

ছবিটা সাইটেই ছিল, যারই ছিল, ধার নিলাম। :p

এটাকে দেখতে হলে প্রথমেই তাকাতে হবে Ursa Major বা বিরাট ভল্লুকের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে। এরপর চোখ যা দেখতে পায় না, সেই কাজটা টেলিস্কোপ করবে। অনেক দূরের এই ছায়াপথের লালমুখিতার পরিমাণ ১১.১। পূর্বের রেকর্ডধারী ছায়াপথের লালমুখিতা ছিল ৮.৬৮। আগের সর্বপ্রাচীন ছায়াপথের চেয়ে এটি আরো ২০০ মিলিয়ন বছর পুরোনো। হাবল আর স্প্লিটজারের ছবি একসাথে করে দেখা গেছে এটি আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গার চেয়ে ২৫ গুণ ছোট আর এর ভর আকাশগঙ্গার ১ শতাংশের ভরের সমান। তারপরও GN-z11 এর নক্ষত্র উৎপাদনের হার ২০ শতাংশ বেশি। তাই এই দূ-উ-উ-উ-রের ছায়াপথটি আমাদের জ্যোতির্বিদেরা দেখতেও পাচ্ছেন, এবং এটা নিয়ে গবেষণাও করতে পারছেন।

University of California, Santa Cruz এর Garth Illingworth মনে করেন এই ছবি আমাদের মহাবিশ্বের ছোটবেলা সম্পর্কে ধারণা দেয়,

“নক্ষত্রের জন্মপ্রক্রিয়া শুরু হতে পারার ২০০ বা ৩০০ মিলিয়ন বছর পরেই এই মাপের ছায়াপথের জন্ম আসলেই আশ্চর্যজনক। এর বৃদ্ধির হার অনেক বেশি হতে হবে, নক্ষত্র উৎপাদনের হারও অনেক বেশি হতে হবে, তা না হলে এরকম মাপের ছায়াপথের সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব”।

Pascal Oesch of Yale University বলেন- “এটি অতীতে দেখা আমাদের দূরতম বস্তু, হাবল টেলিস্কোপ থেকে আমরা যে আশা রেখেছিলাম তার চেয়ে অনেক বড় পাওয়া এটা। আমরা GN-z11 কে এমন একটা সময়ে দেখছি যখন মহাবিশ্বের বয়স এর বর্তমান বয়সের মাত্র ৩% ছিল।

Image Courtesy- NASA Goddard

Image Courtesy- NASA Goddard

তিনি মনে করেন ২০১৮তে চালু হতে যাওয়া জেমস ওয়েব স্পেইস টেলিস্কোপের (JWST) আসার আগেই এবার হাবল স্পেইস টেলিস্কোপ আর স্প্লিটজার এর এলাকায় হানা দিয়েছে, Illingworth বলেন-

“জেমস ওয়েব থেকে আমরা এমন তরুণ ছায়াপথের আরো ছবি পাবো, হয়তো প্রথম ছায়াপথের ছবিও পেয়ে যেতে পারি”।

হাবল দিয়ে জ্যোতির্বিদেরা প্রথম প্রজন্মের ছায়াপথের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, তবে কারিগরী সীমাবদ্ধতার জন্য সেটা হয়তো সম্ভবপর নাও হতে পারে।

জেমস ওয়েব ছাড়াও  Wide-Field Infrared Survey Telescope (WFIRST) একই ধরনের ছবি তুলতে সক্ষম হবে।

যেখান থেকে আর্টিকেলটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে-
Hubble Team breaks cosmic distance record

হাবলের অন্যান্য রেকর্ড ভাঙ্গা ছবি দেখুন-
১) Distance record
২) Sn Wilson
৩) Farthest lensing galaxy

হাবল সম্পর্কে আরো জানতে দেখুন-
http://www.nasa.gov/hubble

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz