বিবর্তনের প্রমাণাদি (পর্ব-১)

ভূমিকা

প্রমাণ ছাড়া কিছুই মেনে নেয়া উচিৎ নয়। এবং যারা বিবর্তনের প্রমাণ চান, তাদের সেই প্রশ্নটিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। এমন কিছু প্রমাণ নিয়ে এই সিরিজটা শুরু করছি –

জীবাশ্মঘটিত ও ভূ-তাত্ত্বিক প্রমাণ

বিবর্তনের স্বপক্ষে এটি অত্যন্ত জোরালো প্রমাণ। আদি শিলাস্তরে প্রস্তরীভূত অথবা পাললিক শিলাস্তরে জীবদেহের ছাপ বা রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা সৃষ্ট জীবের অনুরূপ কাঠামোকে জীবাশ্ম (fossil) বলে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মাটি খুঁড়ে বিভিন্ন প্রাণীর যেসব জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন। সেগুলো পর্যালোচনা করে নিঃসন্দেহে বলা যায় সরলতম আদি জীব হতে বিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জটিল জীবের উদ্ভব হয়েছে।

১) জীবাশ্ম থেকে বিবর্তনের সম্পূর্ণ ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় ঘোড়ার উদ্ভাবনে। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি বছর আগে ঘোড়ার আদি পূর্বপুরুষ “ইয়োহিপ্পিয়াস” প্রায় ১১ ইঞ্চি উঁচু ছিলো। এর সামনের পায়ে চারটি এবং পিছনের পায়ে তিনটি নখযুক্ত আঙুল ছিল। “ইয়োহিপ্পিয়াস”এর পরবর্তি ধারা “মেসোহিপ্পাস”এর উচ্চতা ছিলো ২ ফুট এবং পায়ে তিনটি করে নখযুক্ত আঙুল ছিল। পরবর্তী স্তরে ৪০ ইঞ্চি উঁচু “মেরিচিপ্পাস”এর তিনটি আঙুলের মধ্যে একটি মাত্র কর্মক্ষম ছিল। এর পরে আগমন ঘটে ৫০ ইঞ্চি উঁচু “প্লিওহিপ্পাস” জাতীয় ঘোড়ার। এর সামনে ও পিছনের পায়ে একটি মাত্র আঙুল দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিক কালের ৬০ ইঞ্চি ঘোড়া “ইকুয়াস” এই প্লিওহিপ্পাসের বংশধর।

images(2)

২) জীবাশ্ম অনেক সময় দুটি ভিন্ন শ্রেণীর জীবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। এধরনের জীবাশ্মকে সংযোগকারী জীবাশ্ম বলে। এমনই এক জীবাশ্ম Archaeopteryx. Archaeopteryx এর কিছু বৈশিষ্ট্য সরীসৃপের মতো ও কিছু পাখির মতো।

Archaeopteryx সরীসৃপের বৈশিষ্ট্যঃ

১। দাঁতযুক্ত চোয়াল।
২। লম্বা লেজ।
৩। অস্থি পুরু ও ভারী।
৪। ডানা নখরযুক্ত।
৫। বুকের হাড়ে কিল (keel) নেই।

Archaeopteryx  পাখির বৈশিষ্ট্যঃ

১। লেজ ও ডানায় পালক বিদ্যমান।
২। ঠোঁট চঞ্চুতে রূপান্তরিত।

উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো নিরীক্ষা করে বিবর্তনবিদগণ এই মত দিয়েছেন যে, সরীসৃপ হতে পাখি জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব হয়েছে। সুতরাং, Archaeopteryx-এর জীবাশ্ম বিবর্তনের স্বপক্ষে জোরালো দলিল বিশেষ।

images

৩) এছাড়া আরেকটা ব্যপার লক্ষণীয়, জীবন্ত জীবাশ্ম।  যেসব প্রাণী সুদূর অতীতে উৎপত্তি লাভ করে আজও অঙ্গসংস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় কাজের অপরিবর্তিত রূপ নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছে অথচ এদের সমসাময়িক ও সমগোত্রীয় সকলেরই বিলুপ্তি ঘটেছে এবং যারা পর্ব থেকে পর্ব ও শ্রেণী থেকে শ্রেণির উদ্ভবের নিদর্শন বহন করে চলেছে, তাদেরকে জীবন্ত জীবাশ্ম বা living fossil বলে। Platypus(প্লাটিপাস) এ ধরনের একটি জীবাশ্ম! এর কিছু বৈশিষ্ট্য (ডিম, রেচন-জননতন্ত্র) সরীসৃপ শ্রেণীর মতো, আবার কিছু বৈশিষ্ট্য (স্তনগ্রন্থি, লোম) স্তন্যপায়ীর মতো। এছাড়া Limulus, Peripatus, Sphenodon, Lamtimaria ও জীবন্ত জীবাশ্ম। পৃথিবীতে অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এককোষী অত্যন্ত সরল জীব থেকে শুরু করে নানা রকম জটিল জীবও দেখা যায়। এছাড়াও বহু রকমের জীব বিলুপ্ত হয়ে গেছে।  এসব জীবের মাঝে বৈসাদৃশ্য থাকলেও প্রাথমিক গঠনের সামঞ্জস্য চোখে পড়ার মতো! এই বৈচিত্রপূর্ণ জীবনের উদ্ভব যে বহুযুগ ধরে জৈব বিবর্তনের মাধ্যমে হয়েছে তার স্বপক্ষে বিভিন্ন শাখা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়।

শ্রেণীবিন্যাসগত প্রমাণ

(Evidences of Taxonomy)

পারস্পরিক সম্বন্ধতার ভিত্তিতে জীবজগতের আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস গড়ে উঠেছে। একই ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নতুন প্রজাতি (species) একটি গণে (genus), কতকগুলো সম্পর্কযুক্ত গণ-কে একটি বর্গে (order), কতকগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ বর্গকে একটি শ্রেণীতে (class), এবং কতকগুলো শ্রেণীকে একটি পর্বে (phylum) বিন্যাস করার যে কাঠামো তা বিবর্তনের স্বপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি বহন করে। একই গণের বিভিন্ন প্রজাতিতে সামঞ্জস্য সর্বাপেক্ষা বেশি। ভার্টিব্রাটা উপপর্বের বিভিন্ন প্রাণী মাছ, উভচর, সরীসৃপ,পাখি, ও স্তন্যপায়ী শ্রেণীতে বিভক্ত হলেও এরা একই ছাঁচে গড়া! এদের হৃৎপিণ্ড, চোখ, কান, ইত্যাদি অঙ্গের মৌলিক গঠন একই রকম। কারণ, এরা একই পূর্বপুরুষ হতে এসেছে।

01. Science

জীবভৌগোলিক প্রমাণ

(Evidences from Biogeography)

আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস ১৮৭০ সালে জীবজন্তু ও গাছপালার বিস্তারের উপর ভিত্তি করে সমগ্র পৃথিবীকে ছয়টি ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করেন। ছয়টি অঞ্চলের জীবের মধ্যে মিল ও অমিল উভয়ই বিদ্যমান। উত্তর গোলার্ধের প্রাণীদের মধ্যে সাদৃশ্য বেশি। দক্ষিণ গোলার্ধের প্রাণীদের বৈচিত্র্য বেশি।

সুদূর অতীতে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগ একসঙ্গে যুক্ত ছিলো। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একারণে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের প্রাণীদের মধ্যে সাদৃশ্য দেখা যায়। অতীতে গ্যালাপাগোস (Galapagos) দ্বীপপুঞ্জ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলো। পরে আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দ্বীপপুঞ্জটি তার জীবজন্তু নিয়ে মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে প্রাণীসমূহ অন্তরিত হয়ে পড়ে। এই অন্তরিত (Isolated) প্রাণীরা পরিবেশের প্রভাবে নিজস্ব ধারায় বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করে। দ্বীপপুঞ্জটিতে ১৩ প্রজাতির ফিঞ্চ পাখি (finches) পাওয়া যায়। এদের সকলের ঠোঁট একরকম না। বিবর্তনের ফলেই এমন বৈষম্য ঘটে।

images(6)

চলবে…..

Comments

MHLikhon

বর্তমানে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও ভ্রমণ নিয়েই চলে যায় দিন! লেখালেখিও এগুলো নিয়েই।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz