জ্বর, পর্ব-১ঃ জ্বর কী? কেন? কীভাবে?

জ্বর কেন হয়? কীভাবে হয়? কীভাবেই বা জ্বর ওষুধে ভালো হয়ে যায়? এসব বিষয় জানার আগে চলুন জেনে নিই আমাদের দেহের তাপমাত্রা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, সে ব্যাপারে।

শরীরের তাপমাত্রা বা Body Temperature বলতে আমাদের দেহের ভিতরের (Core) অঙ্গের (যকৃত, মস্তিষ্ক, ফুসফুস ইত্যাদি) তাপমাত্রাকে বোঝায়। একে Core body Temperature বলে। এই Core Temperature-এর স্বাভাবিক সীমা সাধারণত ৩৬°C-৩৭.৫°C (97° to 99.5°F)। 

আমাদের দেহের তাপমাত্রা প্রধানত নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশের “থার্মো রেগুলেটরি সেন্টার (তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র)” থেকে। হাইপোথ্যালামাসের এই অংশের কাজ হলো আমাদের পুরো দেহে তাপমাত্রা সংবেদনশীল/পরিমাপক যে রিসেপ্টরগুলো ছড়িয়ে আছে, সেখান থেকে তথ্য নিয়ে দেহকে গরম অথবা ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়া চালু রাখা। আমরা উষ্ণ রক্তের প্রাণী। ঠাণ্ডা আমাদের সহ্য হয় না। তাই ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় আমাদের দেহের তাপমাত্রা পরিমাপক/সংবেদনশীল রিসেপ্টরগুলো মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে তথ্য পাঠায় যে, বাইরে খুব ঠাণ্ডা, শরীর শীতল হয়ে যাচ্ছে! তখন হাইপোথ্যালামাসের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র দেহের তাপ উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। খুব সহজ একটা চিহ্ন আছে যেটা দিয়ে বুঝা যায় দেহের তাপ বেড়ে যাচ্ছে। চিহ্নটা হল কাঁপুনি (Shivering)। দেহের কংকালপেশী অল্প অল্প নড়াচড়ার মাধ্যমে শক্তি খরচ করে উৎপন্ন করে তাপ। পেশীর এই নড়াচড়াই আমরা কাঁপুনি হিসেবে টের পাই। দেহের বিপাক ক্রিয়া/মেটাবলিজম বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও হাইপোথ্যালামাস তাপ উৎপন্ন করে।

দেহের তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়া

বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম (Metabolism) হলো দেহের তাপমাত্রা উৎপাদনের প্রধান উৎস। কোষের ভেতর খাদ্য ভেঙে শক্তি ও তাপ উৎপাদন করার প্রক্রিয়াকে বিপাক ক্রিয়া বলে।যখন দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়, তখন সিম্প্যাথেটিক নিউরোট্রান্সমিটার (Sympathetic neurotransmitters) নামে পরিচিত Epinephrine এবং Nor-epinephrine নিঃসৃত হয়। এই নিউরোট্রান্সমিটার একদম কোষীয় পর্যায়ে কাজ করে। এরা বিপাক ক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন কমায়, তাপ উৎপাদন বাড়ায়। জ্বর হলে যে শরীর দুর্বল হয়, তার সম্ভাব্য কারণের মধ্যে এটা একটা। কারণ তখন বিপাক ক্রিয়া থেকে শক্তি উৎপাদন কমে যায় কিন্তু শরীরের তাপ উৎপাদন বেড়ে যায়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় আর কম শক্তি উৎপাদিত হওয়ার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। বিপাক ক্রিয়া থেকে শক্তি উৎপাদন বাড়িয়ে দুর্বলতা কমানোর জন্য থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ বাড়ে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি কার্যকরী হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এজন্য জ্বর ভালো হলেও শরীর কিছুদিন দুর্বল থাকে। তো, শরীরের তাপ কমে গেলে তাপ উৎপাদন বাড়াতে কী কী ঘটে?
১। শরীর কাঁপুনি দেয়
২। শরীর তাপ উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় (অনৈচ্ছিক)
৩। Epinephrine এবং Nor-epinephrine-এর নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়
৪। ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়।

দেহ থেকে তাপ নিঃসরণ প্রক্রিয়া

দেহের অধিকাংশ তাপ উৎপন্ন হয় মাংসপেশীতে আর অন্ত্রে। এসব অঙ্গ সাবকিউটেনিয়াস টিস্যু দিয়ে আবৃত থাকে, যা তাপ বাইরে যেতে বাধা দেয়। দেহ থেকে অধিকাংশ তাপ বের হয়ে যায় ত্বকের মাধ্যমে। তাছাড়া নিম্নোক্ত পদ্ধতিতেও তাপ বের হতে পারে, যার সবগুলোই নিয়ন্ত্রিত হয় হাইপোথ্যালামাসের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকেঃ
১. ঘামের মাধ্যমে
২. শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে
৩. পায়খানা ও প্রস্রাবের মাধ্যমে
৪. বিকিরণের (radiation) মাধ্যমে
৫. পরিবহনের মাধ্যমে (রক্ত বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের তাপ পরিবহন করে ত্বকে নিয়ে আসে। তারপর ত্বক থেকে তাপ বের হয়ে যায়)
৬. বাষ্পীভবনের মাধ্যমে।

জ্বর/Fever/Pyrexia

জ্বর (যা পাইরেক্সিয়া নামেও পরিচিত) হচ্ছে শারীরিক অসুস্থতার একটি প্রধান লক্ষণ, যা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সীমার ৩৬.৫–৩৭.৫ °সে (৯৭.৭–৯৯.৫ °ফা) চেয়ে বেশি তাপমাত্রা নির্দেশ করে। জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার পরও সাধারণত ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। উচ্চ নির্দিষ্ট সূচক (set point) থেকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে গরম অনুভূত হয়। হাইপোথ্যালামাসের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কাজ হলো এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা বা অস্বাভাবিক তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসা। কিন্তু তা না করে জ্বর হলে সে তাপমাত্রা আরও বাড়াতে সাহায্য করে! কারণ কী? কারণ সে হ্যাকিংয়ের শিকার হয়! কীভাবে? চলুন দেখি।

Set point হলো হাইপোথ্যালামাসের একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, যেটাকে সে স্বাভাবিক মনে করে আর ওই অনুযায়ী দেহের তাপমাত্রা কমায় বা বাড়ায়। স্বাভাবিক set point হলো ৩৬°C-৩৭.৫°C। অর্থাৎ দেহের তাপমাত্রা ৩৬°C বা ৩৭.৫°C-এর কম বা বেশি হলে সে তাপ বাড়াতে বা কমাতে সাহায্য করবে। কিন্তু যেসব কারণে জ্বর হয়, যেমন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের আক্রমণে, এরা হাইপোথ্যালামাসের Set point বাড়িয়ে দেয়। ধরা যাক কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া Set point 36°C থেকে 40°C করে দিলো। এখন হাইপোথ্যালামাস এই নতুন Set Point-কে (40°C) স্বাভাবিক মনে করে দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে 40°C-এ নিয়ে যাবে এবং জ্বর হবে। Set Point বাড়িয়ে দেয়াকেই আমি হ্যাকিং বলেছিলাম।

জ্বর কেন হয়? কীভাবে হয়?

জ্বর হতে পারে অনেক ধরনের Microorganism এবং কিছু Substances-এর কারণে, যাদেরকে একত্রে পাইরোজেন/Pyrogen বলে। এছাড়া কিছু প্রোটিন, এবং প্রোটিন থেকে উদ্ভূত পদার্থের কারণেও জ্বর হতে পারে। আবার ব্যাকটেরিয়ার কোষঝিল্লি থেকে নিঃসৃত লিপোপলিস্যাকারাইড নামক বিষের কারণেও Hypothalamic Thermostat-এর Set point বৃদ্ধি পায়। কিছু Pyrogen সরাসরি হাইপোথ্যালামাসের তাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে আক্রমণ করে, আবার কিছু Pyrogen অপ্রত্যক্ষভাবে আক্রমণ করে Set Point বাড়িয়ে দেয়।

প্রকৃতপক্ষে জ্বরের কারণ অনেক। প্রচলিত কারণ হিসেবে চিন্তা করা হয় সংক্রমণকে। কিন্তু সংক্রমণ নিজেই তো অনেক ধরনের! ভাইরাসের সংক্রমণ, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, দেহে বাসরত পরজীবীর সংক্রমণ। আবার যে শুধু সংক্রমণ থেকে জ্বর হবে, এমন কথাও নেই। প্রদাহজনিত অনেক কারণে জ্বর আসতে পারে। ক্যানসারজনিত কারণেও জ্বর আসতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফেকশন (যেমন যক্ষ্মা রোগ), মহিলাদের জননতন্ত্রের প্রদাহ (অ্যান্ডোমেট্রাইটিস, সার্ভিসাইটিস, ওফোরাইটিস, সালপিনজাইটিস), পুরুষদের জননতন্ত্রের প্রদাহ (প্রস্টেটাইটিস, এপিডিডিমাইটিস, অরকাইটিস), প্রস্রাবে ইনফেকশন, প্রস্রাবের নালিতে ইনফেকশন ।ইত্যাদি কারণে জ্বর হতে পারে।

জ্বরের প্রকার 

জ্বর সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকেঃ
# কন্টিনিউড (Continued) : জ্বরের মাত্রা যখন ২৪ ঘণ্টায় ১ সেন্টিগ্রেড বা ১.৫ ফারেনহাইট তারতম্য হয়; কিন্তু জ্বর কোনো সময় স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না, তখনই তাকে কন্টিনিউড জ্বর বলে।
# রেমিটেন্ট (Remitent) : যখন জ্বরের মাত্রা ২৪ ঘণ্টায় ২ সেলসিয়াস বা ৩ ফারেনহাইট তারতম্য হয়, তাকে রেমিটেন্ট জ্বর বলে।
# ইন্টারমিটেন্ট (Intermitent) : যখন জ্বর দৈনিক কয়েক ঘণ্টা শরীরে উপস্থিত থাকে, তখন তাকে ইন্টারমিটেন্ট জ্বর বলে।

জ্বর হলে করণীয়

উন্মুক্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে ফ্যান থাকলে সেটিও মধ্যগতিতে চালিয়ে দিতে হবে। তারপর একটি তোয়ালে বা গামছা, পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে নিংড়ে নিয়ে তা দিয়ে সারা শরীর আস্তে আস্তে মুছে দিতে হবে। এভাবে বেশ কয়েকবার করলে তাপমাত্রা কমে আসবে। ইচ্ছে করলে মাথায়ও পানি ঢালতে পারেন। এরপরও জ্বর না কমলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

জ্বর কীভাবে ওষুধে ঠিক হয়, সেটা নিয়ে আলাপ হবে দ্বিতীয় পর্বে।

তথ্যসূত্রঃ 

1. Fantone J.C., Ward P.A. (1999). Inflammation. In Rubin E., Farber J.L. (Eds.), Pathology (3rd ed., pp. 37–75). Philadelphia: Lippincott Williams & Wilkins.
2. Mitchell R.N., Cotran R.S. (2003). Acute and chronic inflammation. In Kumar V., Cotran R.S., Robbins S. (Eds.), Basic pathology (7th ed., pp. 33–59). Philadelphia: W.B. Saunders.
3. Chandrasoma P., Taylor C.R. (1998). Concise pathology (3rd ed., pp. 31–92). Stamford, CT: Appleton & Lange. General Pharmacology
4. Guyton A.C., Hall J.E. (2000). Textbook of medical physiology(10th ed., pp. 822–833). Philadelphia: W.B. Saunders.
5. Saper C.B., Breder C.D. (1994). The neurologic basis of fever. New England Journal of Medicine330, 1880–1886.
6. Roberts N.J. (1979). Temperature and host defenses. Microbiological Reviews43(2), 241–259.
7. Mackowiak P.A. (1998). Concepts of fever. Archives of Internal Medicine158, 1870–1881.
8. Blatteis C.M. (1998). Fever. In Blatteis C.M. (Ed.), Physiology and pathophysiology of temperature regulation (pp. 178–192). River Edge, NJ: World Scientific Publishing.

Comments

Dibakor Roy

HSC: 2016 (Science) Cantonment Public School & College, Rangpu. Studying: 3rd year, Department of Pharmacy, University of Rajshahi.

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz