Google এর সূত্রপাত, টাইমলাইন, আর সার্চ ইঞ্জিনের ক্রিয়াকৌশল

একবার আমার এক বন্ধু ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে সব ঠিকঠাক আছে কিনা পরখ করতে গুগলে হাবিজাবি কিছু লিখে সার্চ করলো। গুগল জানালো তার কাছে ওই বিষয়ে যে তথ্য আছে তা-ই। বন্ধুটি অবশ্য কিছু সার্চ করতে না, কানেকশন চেক করতেই সার্চ করেছিলো। তখন, মাথায় একটা বিষয় ঘুরছিলো, গুগল মামা এমন হাবাগোবার মতো আচরণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিমিষেই কিভাবে করে? সেই গুগল মামার সহায়তায় অনেক কিছু পেলাম। যা সহজ ভাষায় এক জায়গায় করার প্রয়াস পেলাম। ? যাই হোক, বকবকানি বাদ দিয়ে কাজের কথায় আসি। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গুগল কিন্তু কেবলই একটা সার্চ ইঞ্জিন নয়। গুগল যে কত কিছু করে, সেই আলাপ না হয় আরেকদিন হবে। তবে, আজকে শুধু ওদের প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পরিচয় আর সার্চ ইঞ্জিনের ক্রিয়াকৌশল নিয়েই কথা বলবো।

Google এর শুরু

Google….. কথাটা শোনেনি এমন লোক খুব কমই আছে। যখন এটা লিখছি, এক ছোট ভাই আসলো রুমে। জানতে চাইলো, কি লিখছি। উত্তর দেওয়ার আগে ব্যাটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, GOOGLE মানে কী? বলতে পারলো না। জানি আপনি পারবেন। হ্যাঁ, যদি জেনে থাকেন তো ধন্যবাদ। না জেনে থাকলে জেনে নিন। গুগল বা গুগোল (Googol) একটি সংখ্যা নির্দেশক শব্দ। ১০^১০০ সংখ্যাটিকে এক গুগল বলা হয়। অর্থাৎ, এক লিখে তার পরে একশটি শূন্য বসালে যে বৃহৎ সংখ্যাটি পাওয়া যায় তা-ই এক গুগল। কী সুন্দর! নাকি, কী ভয়ংকর!

এই Googol থেকেই সার্চ ইঞ্জিন Google.com এর নামকরণ। তবে, বানান আলাদা কেন? মজার ব্যপার হলো, গুগলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ তার স্কুল জীবন থেকেই গণিতের গুগল শব্দটি দেখে বেশ আগ্রহ বোধ করেছিলেন। স্কুল জীবনে বন্ধুরা মিলে এই নামটিকে পছন্দ করেন। কিন্তু বানান ভুল করে তারা googol-এর বদলে google লিখেন। পরবর্তীতে তাঁরা বানানটি ঠিক করার প্রয়োজনীয়তা দেখাননি। একটু ব্যতিক্রম হলেও যদি ভাল হয়, ঠিকঠাক বানানের কি দরকার! সার্চ ইঞ্জিনটির আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা হলেন সের্গেই ব্রিন। দুজন মিলে সাদামাটা একটা ওয়েবসাইট তৈরি করেন। এখানে একটা কথা বলা দরকার, গুগলের নাম কিন্তু শুরু থেকেই এমন না! এর পূর্ব নাম ছিল “ব্যাকরাব”। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাকরাব ডোমেইন নাম গুগল হিসেবে নিবন্ধিত করা হয় ১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭ সালে এবং কর্পোরেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮ সালে। এখন নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত সার্চ ইঞ্জিন Google.com

গুগলের মূলমন্ত্র হলো “বিশ্বের তথ্য সন্নিবেশিত করে তাকে সবার জন্য সহজলভ্য করে দেয়া”, যেখানে গুগলের অপ্রাতিষ্ঠানিক মূলমন্ত্র হলো “Don’t be evil”। গুগল সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ডেটা সেন্টারে প্রায় এক মিলিয়ন সার্ভার চালায় ও প্রতিদিন এক বিলিয়নের উপর সার্চের অনুরোধ পায়! বর্তমান তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বকে দ্রুত এগিয়ে নিতে গুগলের অবদান অপরিসীম। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর অনুযায়ী এলেক্সা আমেরিকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা ওয়েবসাইটের তালিকায় স্থান দেয় গুগলকে। আমরা বর্তমানে গুগলের যে হোম পেইজটি দেখতে পাই সেটি আপডেট করা হয়েছিল ২০১১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি। আমরা যারা ইন্টারনেটে সকাল, দুপুর বা রাতের খাবারের মজা পাই ও তথ্য গোগ্রাসে গিলি, তারা সবাই অন্তত দিনে কয়েকবার গুগলে সার্চ দিয়ে থাকি, এবং নিজেদের পছন্দমত ফলাফল পাই। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে “আপনার অনুসন্ধান কোনো পৃষ্ঠাতে পাওয়া যায়নি।” এটা আপনার পছন্দ নাও হতে পারে!

IMG_20151207_043832

গুগলের টাইমলাইন-

১৯৯৬- “ব্যাকরাব” নামে এক সাদামাটা সাইটের আত্মপ্রকাশ।

১৯৯৭- ১৫ই সেপ্টেম্বরে Googol এর পরিবর্তে ভুল করে Google নামকরণ। এবং, পুনরায় পরিবর্তনের চেষ্টা না করা।

১৯৯৮- ৪ঠা সেপ্টেম্বরে কর্পোরেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ।

১৯৯৯- ৭ই জুন $২৫ মিলিয়নের অর্থায়ন ঘোষণা করা হয় যাতে প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে মূলধন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ক্লাইনার পারকিনস কওফিল্ড এবং বেয়ারস ও সিকোইয়া ক্যাপিটাল অর্ন্তভুক্ত ছিল।

২০০১- গুগল পেজ rank এর জন্য পেটেন্ট নেয়।

২০০৩- প্রাতিষ্ঠানিক কার্য বৃদ্ধির ফলে কোম্পানিটি একটি অফিস কমপ্লেক্স লিজ নেয় সিলিকন গ্রাফিক্স থেকে। যেটির ঠিকানা ছিল ১৬০০ এম্পিথিয়েটার পার্কওয়ে, মাউন্টেন ভিউ, ক্যালিফোর্নিয়া।

২০০৪- ১৯শে আগস্ট এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়

২০০৫- ইয়াহু! এর সাথে বিরোধ।

২০০৬- কোম্পানিটি মাউন্ট ভিউতে স্থানান্তরিত হয়।

২০০৯- সেপ্টেম্বর অনুযায়ী এলেক্সা আমেরিকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা ওয়েবসাইটের তালিকায় স্থান দেয় গুগলকে।

২০১০- ২১ জুলাই, বিং সার্চ ইঞ্জিনকে টেক্কা দিতে, ছবির থাম্বনেইলে মাউস পয়েন্টার রাখলে বড় হয় এমন একটি বৈশিষ্ট্য যোগ করে। ২০১০ সালেরই ২৩ জুলাই আরেকটি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়, বিভিন্ন ইংরেজি শব্দের সংজ্ঞা সংবলিত পাতা যা সার্চ দিলে লিঙ্কগুলো উপরে দেখা যায়।

২০১১- মে মাসে প্রথমবারের মত এক মাসে গুগলে ইউনিক ভিজিটর এক বিলিয়ন পার হয়।

২০১২- $৫০ বিলিয়ন বার্ষিক আয় করে।

২০১৩- গুগল তার ১৫তম বার্ষিকী পালন করে সেপ্টেম্বর ২৭ তারিখে। যদিও এটি আগে অন্য তারিখে দাপ্তরিক জন্মদিন পালন করেছে। কেন এটি তারা বেছে নিয়েছে তা পরিষ্কার নয় এবং প্রতিযোগী সার্চ ইনজিন ইয়াহু! সার্চের সাথে ২০০৫ সালে হওয়া একটি বিরোধকে কারণ ধরা হচ্ছে।

২০১৪- জানুয়ারিতে এর বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়ায় $৩৯৭ বিলিয়ন।

সার্চ ইঞ্জিনখানা কাজ করে ক্যামনে!

১. গুগলবট নামে গুগলের এক ধরনের ওয়েব ক্রলার (we crawler) আছে, যার কাজ হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বের সবধরনের ওয়েবপেজ ভিজিট করা। অবশ্য আপনি যদি আপনার সাইটের সার্চিং বন্ধ করে রাখেন, তাহলে গুগল সার্চ ইঞ্জিন আপনার সাইট সার্চ করতে পারবে না।

২. এই বটগুলো সর্বদা আপনার পছন্দের ফলাফল দিতে ব্যস্ত থাকে। তাই তারা প্রতিনিয়ত প্রত্যেকটি ওয়েবসাইটের পেজগুলো ক্রলিং করে, এমনকি একই পেজ পুনরায় ক্রলিং করে, যাতে কোনো তথ্য বাদ না যায়।

৩. গুগলবট সবচেয়ে বেশি সে সাইটটি ক্রল করে, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। যেমন একটি কোম্পানির সাধারণ ওয়েবসাইট থেকে একটি নিউজ সাইট সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ক্রলিং হয় (কারণ, নিউজসাইটগুলো প্রতিনিয়ত আপডেট হয়ে থাকে)।

৪. গুগলবট একটি সাইটের প্রত্যেকটি লিংক সনাক্ত করে রাখে। এই লিংকগুলোকে গুগলবট তাদের একটি লাইনে বিন্যস্ত করে রাখে এবং পরে কোনো এক সময় এই লিংকগুলো ভিজিট করে। তাই ওয়েবসাইটে বেশি লিংক ব্যবহার করলে তা পেজের Rank বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

৫. গুগলবট তাদের ভিজিট করা প্রত্যেকটি পেজকে একটি সূচিপত্রে সাজিয়ে রাখে। এই সূচিপত্রটি আমাদের বইয়ের সূচিপত্রের মত। যেমন- অধ্যায় একঃ বিজ্ঞানযাত্রার ইতিহাস- পেজ নম্বরঃ ১, ঠিক এমনভাবেই গুগলবট প্রত্যেকটি পেজকে এক একটি ক্যাটাগরির সূচিপত্রে সাজিয়ে রাখে।

৬. যখনই আপনি কোনো অনুসন্ধান করেন, সেই অনুসন্ধান অনুযায়ী সূচিপত্র থেকে তথ্য নিয়ে সার্চের ফলাফলে প্রকাশ করে। যেমন, মনে করুন আপনি কোন দোকানে গিয়ে বললেন, ভাই বিজ্ঞানভিত্তিক কিছু বই লাগবে। তখন দোকানদার বিজ্ঞানযাত্রা, কসমস, সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ইত্যাদি বইগুলো আপনার সামনে রাখলো। ইচ্ছামত বেছে নিন! তেমনি হয়তো আপনি গুগলে সার্চ দিলেন, “বিজ্ঞানযাত্রা” শব্দটি দিয়ে। এবার গুগল তার সূচিপত্রে রাখা “বিজ্ঞানযাত্রা” ক্যাটাগরি থেকে আপনাকে সব তথ্য খুঁজে দিবে। এবার আপনি পছন্দমত লিংকে প্রবেশ করুন!

৭. বলার অপেক্ষা রাখে না, গুগল সার্চ ইঞ্জিন প্রত্যেকটি সাইটের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে রাখে, যা সার্চিং-এর সময় দেখানো হয়। আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আপনি কোনো কিছু সার্চ দিলে অনেকগুলো সাইটের নামের নিচে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া থাকে।

৮. গুগল তার একই ক্যাটাগরির সূচিপত্রে একই ধরনের ওয়েবসাইটকে রাখার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় লক্ষ্য করে। গুগলের এই ওয়েবসাইট ranking কিসের ভিত্তিতে হয়, তা অজানা। (কিছু বিষয় লুকিয়ে রাখা মঙ্গল!) তবে বলা হয়ে থাকে ২০০টি ফ্যাক্টরের দিকে গুরুত্ব দিয়ে গুগল এই ranking। এর মধ্যে একটি হচ্ছে গুগল পেজ rank। কতগুলো ওয়েবসাইট একটি পেইজের মধ্যে লিঙ্ক করা আছে, এবং সেই লিঙ্ক করা সাইটগুলোর গুণ কতটা ভালো, তার উপর ভিত্তি করে পেজ rank করা হয়।

১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত গুগল ১০০ মিলিয়ন গিগাবাইট তথ্য সংগ্রহ করেছে। যখন আমরা গুগলে কিছু সার্চ দিই তা আমরা ১ সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময়ের মধ্যে চোখের সামনে পেয়ে যাই। (তবুও আপনার যদি ১ সেকেন্ড বা ১ মিনিটও লাগে, গুগলরে দোষ দিয়েন না। কচ্ছপগতির ইন্টারনেটই দেরির কারণ।) শুধু তাই না, গুগল প্রতি মুহুর্তে স্প্যাম পেজগুলোকে তার ইন্ডেক্স থেকে মুছে ফেলছে। আপনি ইচ্ছা করলে এখান থেকে দেখে আসতে পারেন মুছে দেওয়া পেজগুলো। ২০১৩ সালে অধীনস্ত মোটরোলা কোম্পানীসহ সব মিলিয়ে গুগলে ৪৭,৭৫৬ জন কর্মী রয়েছে, যাদের মধ্যে ১০,০০০ হাজারেরও বেশি সফটওয়্যার ডেভেলপার রয়েছে ৪০টি অফিসে!

বর্তমান তথ্য বিকাশে ও প্রচারে গুগল অনন্য ভূমিকা পালন করছে। ইন্টারনেট ছাড়া যেমন এখন একটা দিন অচল, তেমনি গুগলও যেন জীবনের অংশ! গুগল এমন আরো কিছু কাজ করে যাবে ও বিজ্ঞান বা তথ্য-প্রযুক্তিতে মানবজাতিকে এগিয়ে নিবে, এই আশাবাদ ব্যক্ত করি।

 

Comments

MHLikhon

বর্তমানে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও ভ্রমণ নিয়েই চলে যায় দিন! লেখালেখিও এগুলো নিয়েই।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz