সূর্যালোকের ধাক্কায় চালিত মহাকাশযানের গল্প

maxresdefault

সূত্রপাত – আলো কিভাবে ধাক্কা দেয়

১৮৬৫ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বললেন, আলো নাকি শক্তির প্যাকেট দিয়ে তৈরি, যেটাকে বলে ফোটন। এখন এই ফোটন নামক ব্যাপারটার কোনো ভর নেই। কিন্তু যখন সেটা প্যাকেটের মধ্যে ভ্রমণ করে, তখন তার এনার্জি বা শক্তি থাকে, আর থাকে মোমেণ্টাম বা ভরবেগ। এই ফোটন যদি কোনো প্রতিফলকের গায়ে এসে পড়ে, তখন এটা সামান্য পরিমাণ ধাক্কা দেয়।

1

আমরা প্রতিদিনই সেই ধাক্কা খাচ্ছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না। অনেকটা গায়ে মাছি বসলে যেমন আপনি কোনো ভর অনুভব করেন না, তেমনি। কিন্তু এটা দিয়ে চমৎকার সব কাজ করা সম্ভব, যদি প্রতিফলকের পুরুত্ব একদম কম হয়। এমনকি মহাশূন্যযানও তৈরি সম্ভব। যাই হোক, ম্যাক্সওয়েলের সময় এতো কিছু চিন্তা হয়নি।

 

তৈরি হলো গাঠনিক রুপ

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, এক জোড়া রাশিয়ান বিজ্ঞানী এই ধারণাটাকে একদম ইনজিনিয়ারিং একটা রুপ দিলেন। ১৯২৪ সালে, তাদের একজন, ফ্রাইডরিখ স্যাণ্ডার বললেন, “আমি অত্যন্ত পাতলা একটা প্রতিফলক পর্দা ব্যবহার করে গ্রহ থেকে গ্রহতে উড়াল দেয়ার ধারণা নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, ঐ পর্দাটা আশানুরুপ ফল আনতে পারবে।”

১৯৫১ সালে, একটা সায়েন্স ফিকশন ম্যাগাজিনের মধ্যে এই ধারণাটা আরো জনপ্রিয়তা পেলো। ম্যাগাজিনের নাম Astounding Science Fiction. লেখকের নাম Russell Saunders. নামের মধ্যে ফিকশন থাকলেও এটা অন্যান্য ফিকশনের মত না। এখানে বিজ্ঞান ভবিষ্যতে কী কী করে দেখাবে, কিভাবে করে দেখাবে, তা নিয়ে ডিটেইলসে কথা হতো।

১৯৭০ সালে, নাসা একজনকে দায়িত্ব দিলো, সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য। তার নাম জেরোমে রাইট (Jerome Wright). আরেক এরোনটিক্যাল ইনজিনিয়ার, লুইস ফ্রাইডম্যান (Louis Friedman) যোগ দিলেন নাসা’র জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে। নাসা চাচ্ছিলো, ১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতু যখন আবার আসবে, তখন সেখানে এমন কিছু পাঠানো যায় কিনা।

১৯৭৩ থেকেই টাকাপয়সা নিয়ে ঘাটতি চলছিলো নাসা’তে। ১৯৭৮ এর পর, ১৯৯০ পর্যন্ত নতুন কোনো প্রজেক্টই অনুমতি পায়নি আমেরিকার হোয়াইট হাউস বা কংগ্রেস থেকে। যাই হোক, ১৯৭৮ এ এই প্রজেক্টটা অনুমতি পেয়েছিলো। কিন্তু ঘড়ি তো থেমে নেই। ১৯৮২ সালেই প্রজেক্টটাকে মহাশূন্যে পাঠিয়ে দিতে হতো, যদি হ্যালির ধূমকেতুর সাথে মোলাকাত করতে হয়। কিন্তু এটা হয়, তো ওটা হয় না। মেইন ডিজাইন, পাশাপাশি যে শাটলে করে মেইন যন্ত্রকে মহাশূন্যে নিয়ে যাওয়া হবে, এমন শাটল কোনোটাই ১৯৮১ এর আগে তৈরি হয়নি। ফাইন্যালি অপারেশনাল মিশন যখন তৈরি হলো, তখন দেরি হয়ে গেছে।

 

দ্যা প্ল্যানেটারি সোসাইটি

সবাই তখন হ্যালির ধূমকেতুর পেছনে ছুটছে। রাশিয়ানরা তো মাত্র ৬০০ কিলোমিটার দূর থেকে এর ছবিও তুলে আনলো। অথচ নাসাকে এই খাতে কোনো বরাদ্দ দেয়া হলো না। জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরীর তৎকালীন পরিচালক ডক্টর ব্রুস ম্যুরে আলোচনা করলেন কার্ল সেগান-এর সাথে। সেগান, ম্যুরে, আর ফ্রাইডম্যান মিলে, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন The Planetary Society. সেগানের কাজের ফোকাস সবসময়েই ছিলো, সাধারণ জনগণ। তাদের মধ্যে বিজ্ঞান জনপ্রিয় করার জন্য তিনি কাজ করছিলেন অনেকদিন ধরেই। ১৯৭৬ সালে তিনি এই প্রজেক্টকে জনপ্রিয় করার জন্য হাজির হয়েছিলেন, The Tonight Show তে। যাই হোক, সোসাইটি প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই, অর্থাৎ ১৯৮১ সালেই জনগণের বেশ সমর্থন পেয়ে গেলেন তারা। সেই বছর, নিজেদের প্রথম ম্যাগাজিন (The Planetary Report)-এর মধ্যে কার্ল সেগান লিখলেন,
“যদি আমরা সফল হই (অন্তত কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আমরা হবো), তাহলে আমরা যে শুধু গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ভ্রমণের ব্যাপারে জনগণের সমর্থনটা দেখাতে পারবো, তা নয়; পাশাপাশি, আমরা এমন কিছু বিশেষ খাতে অর্থ বরাদ্দ করতে পারবো, যা ঐ জরুরি কাজগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।”

 

কসমস-১

সেগান মারা গেলেন ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৯ সালে, রাশিয়ান সহকর্মীরা এগিয়ে এলো। বললো, ওরা একটা রকেটের কাঁধে করে এই প্রজেক্টটাকে নিয়ে যাবে। প্ল্যানেটারি সোসাইটির কাছে মনে হলো, বাজেট কিছুটা বড় হলেও কাজটা করা যাবে। কার্ল সেগানের অসাধারণ বিজ্ঞানভিত্তিক টেলিভিশন সিরিজ “কসমস” এর নামে মিশনের নাম রাখা হলো কসমস-১। আর বাজেট দিলো কার্ল সেগানের স্ত্রী অ্যান ড্র্যুইয়ান (Ann Druyan)- এর স্টুডিও, নাম – কসমস স্টুডিওস। এটার প্রোমোশনাল ভিডিওতেও বারবার স্মরণ করা হয়েছিলো কার্ল সেগানকে। সবার মধ্যে কী এক অসাধারণ প্রাণশক্তি সঞ্চার করে গিয়েছিলেন এই লোকটা, সেটা অন্যদের (ম্যুরে, ফ্রাইডম্যান, অ্যান – এদের) কথা থেকেই বোঝা যায়।

প্রজেক্টের টেকনিক্যাল দিকগুলো রাশিয়ানরাই দেখলো, যদিও প্ল্যানেটারি সোসাইটি দেখভাল করছিলো। অনেক ঝক্কি-ঝামেলার পর, ২০০৫ সালের দিকে এসে, তারা মোটামুটি তৈরি হলো রকেট নিক্ষেপ করতে। এই রকেট সোলার সেইলকে নিয়ে যাবে মহাশূন্যে, এরপর সেখানে জিনিসটা পাখা মেলবে – এমনটাই হবার কথা। সে বছর, জুনের ২১ তারিখ, নিক্ষেপের ৮২ সেকেন্ড পর, রকেটটা ধ্বংস হয়ে গেলো। কেউ জানতে পারলো না, মহাকাশে পৌঁছানোর পর সোলার সেইল কাজ করতো কি করতো না! কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এই সোসাইটি সিদ্ধান্ত নিলো – ওরা পিছু হটবে না।

 

শুরু হোক নতুন করে

অ্যান ড্র্যুইয়ান নতুন করে অর্থ সংগ্রহ করতে লেগে পড়লেন। লুইস ফ্রাইডম্যান এর সাথে জোট বাঁধলেন চেকোস্লোভাকিয়া থেকে আগত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেকে পিএইচডি করা বিশেষজ্ঞ টম স্‌ভিটেক (Tom Svitek). ২০০৯ এর মাঝামাঝি এসে যেন এক সুমধুর কাকতাল ঘটলো। টেক্সাসের এক ব্যবসায়ী প্রজেক্টে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ফ্রাইডম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যদি আপনাদেরকে এক মিলিয়ন ডলার দেই, আপনারা কি এটা করতে পারবেন?
ফ্রাইডম্যান হড়বড় করে বলে ফেললেন, “হ্যাঁ”।

২০১২ সালের মে মাসেই তারা তৈরি করে ফেলেছিলেন মূল জিনিসটা। কিন্তু, এরপর তারা অপেক্ষা করতে লাগলেন, কবে কেউ এমন একটা রকেট ধার দেবে, যার কাঁধে চড়ে এটা মহাকাশে যেতে পারবে। তখনো সফটওয়্যার আর রেডিও নিয়ে কিছুটা ঝামেলা ছিলো। সেগুলো সমাধান করা হয়েছে আরো এক দেড় বছর পর, এবং ২০১৬ সালে এটা রওনা দেবে। পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে, যদিও প্ল্যানেটারি সোসাইটিই এই আইডিয়াটাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলো, আমেরিকান সরকার এর কাছ থেকে সমর্থন না পাওয়ার ফলে তারা প্রথম Solar Sail প্রজেক্ট হিসেবে গিনেস বুকে নাম লেখাতে পারেনি। তাদের এই আইডিয়াটাকে সিরিয়াসলি নিয়েছিলো জাপান সরকার। এবং ২০১০ সালে তারা IKAROS নামে একটা সোলার সেইল মহাশূন্যে পাঠায়। তবে আজ আমরা প্ল্যানেটারি সোসাইটির গল্প করতে এসেছি। চলুন, সেটা চালিয়ে যাই।

 

২০১৫ সালের ২০শে মে, Test Flight

সেগান যখন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, সেখানেই তখন এক ছাত্র ছিলো – বিল নায়ি (Bill Nye). প্ল্যানেটারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পরপরই সেখানে জয়েন করেছিলেন তিনি। আজ বিল নায়ি ঐ সোসাইটির CEO. আর তার নেতৃত্বে, ২০১৫ এর ২০শে মে, সফলভাবে পাঠানো হলো সোলার সেইলের প্রোটোটাইপ।

জিনিসটা ছোটো (৩০ সেমি x ১০ সেমি x ১০ সেমি), কিন্তু মহাকাশে যাওয়ার পর নিজের পাখা মেলে দিয়েছে। পালের ক্ষেত্রফল – ৩২ বর্গমিটার বা ৩৪৪ বর্গফুট। পালের পুরুত্ব মাত্র সাড়ে চার মাইক্রন। মানে, ময়লা ফেলার পলিথিন ব্যাগেরও ৪ ভাগের এক ভাগ।

 

Source - http://sail.planetary.org/story-part-2.html

মূল জিনিসটা ছোটো, (১০ x ১০ x ৩০), Source – http://sail.planetary.org/story-part-2.html

শুরুর দিকে প্রধানত কিছু সংখ্যাভিত্তিক ডেটা পাঠিয়েছে লাইট সেইল। নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে, যেমন ব্যাটারীর কী অবস্থা, তাপমাত্রা কত, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্ল্যানেটারি সোসাইটি জানিয়েছে, সব নাকি ঠিকই চলছে। মাঝে দুইবার সে একদম নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিলো। পরে নিজেকে রিবুট করেছে, আবার খবর-টবর দিয়েছে। আর ২০১৫ এর জুনের ৭ তারিখ, সে পাখা মেলে দিয়েছে।

আমরা খুবই আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি ২০১৬ এর দিকে।

 

Reference:
Based on Story of Lightsail – 1, 2, 3 by Louis Friedman

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz