মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা- দ্বিতীয় পর্ব

প্রথম পর্বে আমরা ইন্দ্রিয় কী, আমাদের জানা ৫টি ইন্দ্রিয়, এবং পাশাপাশি ৫টি কম পরিচিত ইন্দ্রিয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এই পর্বে আরো কিছু অপ্রচলিত ইন্দ্রিয় নিয়ে কথা বলবো।

১১। ভারসাম্যেন্দ্রিয় (Equilibrioceptor): এই ইন্দ্রিয়টিও খুব মজার, এটি আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। আমাদের ত্বরণ ও দিক পরিবর্তনকেসনাক্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে তার তথ্য প্রেরণের মাধ্যমে এটির কাজ সম্পন্ন হয়। এই ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই আমরা মাধ্যাকর্ষণের (gravity) অনুভূতি লাভ করি। এই ইন্দ্রিয়ের সংজ্ঞাবহ ব্যবস্থার নাম তরলপূর্ণ কায়াস্থিতি ব্যবস্থা (fluid filled vestibular system) যা আমাদের অন্তঃকর্ণে অবস্থিত। আসলে সত্যিকারের ভারসাম্য রক্ষায় এবং চলমান অবস্থায় কোনো বস্তুর প্রতি দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত (focused) রাখতে এই ইন্দ্রিয়টি দর্শনেন্দ্রিয় ও আত্মেন্দ্রিয়ের সাথে একাত্মভাবে কাজ করে। কায়াস্থিতি ব্যবস্থা মূলত ভিন্ন ভিন্ন অক্ষে (axis) সজ্জিত তিনটি তরলপূর্ণ অর্ধচন্দ্রাকৃতি নালীর (semicircular canal) সম্মিলন (converge) এবং তাদের মধ্যস্থিত ওটোলিথ অঙ্গ (otolith organ) নিয়ে গঠিত। এই নালী তিনটিকে বলা হয় সম্মুখ নালী (anterior canal), পশ্চাৎ নালী (posterior canal), ও অনুভূমিক নালী (horizontal canal) এবং তরলটিকে বলা হয় অন্তর্মেদক (endolymph)।

কর্ণে তরলপূর্ণ কায়াস্থিতি ব্যবস্থার অবস্থান (বামে) ও তার গঠন (ডানে)

কর্ণে তরলপূর্ণ কায়াস্থিতি ব্যবস্থার অবস্থান (বামে) ও তার গঠন (ডানে)

১২। রসায়নেন্দ্রিয় (Chemoceptor): রসায়নেন্দ্রিয় মূলত কিছু সংজ্ঞাবহ গ্রাহক যেগুলো রাসায়নিক সংকেতকে ক্রিয়া বিভবে (action potential) পরিবর্তন (transduction) করতে পারে। এই ইন্দ্রিয়ের একটি নির্দিষ্ট গ্রাহক পরিবেশের একটি নির্দিষ্ট (বা নির্দিষ্ট গ্রুপের) রাসায়নিক পদার্থের উদ্দীপনা সনাক্ত করতে সক্ষম। আসলে ঘ্রাণেন্দ্রিয় এবং স্বাদেন্দ্রিয়ের গ্রাহকগুলোই হচ্ছে প্রধান দুই শ্রেণীর রসায়নেন্দ্রিয়। তবে এছাড়াও আমাদের দেহের অভ্যন্তরীণ কিছু সংজ্ঞাবহ নিউরন রাসায়নিক সংকেতকে ক্রিয়া বিভবে পরিবর্তন এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ু তন্ত্রের মেডুলা (medulla) অঞ্চলকে নির্দেশ প্রদান (trigger) করে থাকে যেটি মূলত রক্তবাহিত গ্রন্থিরস (hormone), ঔষধ (drug), লবণ, কার্বন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদির পরিমাণ শনাক্তকরণে নিয়োজিত। বমি প্রতিবর্তী ক্রিয়ার (vomiting reflex) সাথেও রসায়নেন্দ্রিয় জড়িত।

মানব শরীরে এক ধরণের রসায়নেন্দ্রিয়ের অবস্থান

মানব শরীরে এক ধরনের রসায়নেন্দ্রিয়ের অবস্থান

১৩। চৌম্বকেন্দ্রিয় (Magnetoceptor): এটি এমন একটি সংজ্ঞা (sense) যেটি কোনো জীবকে চৌম্বকক্ষেত্র সনাক্তকরণের ক্ষমতা দান করে যা দিক, উচ্চতা, ও অবস্থান নির্ণয়ের কাজে লাগে। আসলেই এই ইন্দ্রিয়টি মানুষের আছে কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। ক্রিপ্টোক্রোম (cryptochrome) নামের একটি প্রাচীন (ancient) প্রোটিনের ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ (version) প্রায় সকল প্রাণী শাখায় বিদ্যমান, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যার মূল কাজ দেহের দৈনন্দিন ছন্দ (daily rhythm) নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু পাখিসহ আরো কিছু প্রাণীর চোখে এই প্রোটিনের উপস্থিতির কারনেই তারা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দেখতে পায় (কিছু প্রাণী দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারে); যেমন- হোমিং কবুতর (Columba livia domestica), ড্রসোফিলা মাছি (Drosophila melanogaster), বড় বাদামী বাদুড় (Eptesicus fuscus),  সমুদ্র স্লাগ (Tochuina tetraquetra), স্বচ্ছ গোলকৃমি (Caenorhabditis elegans) ইত্যাদি। আর এর মাধ্যমেই পাখিরা অনেক উঁচুতে থেকেও (নিচে ভালোমত রাস্তা না দেখেও) ঠিকঠাক চলাফেরা করতে পারে।

মানুষের চোখেও ক্রাই-১ (CRY-1) ও ক্রাই-২ (CRY-2) নামে ক্রিপ্টোক্রোমের দুটি সংস্করণ রয়েছে যেগুলো আমাদের দেহঘড়ি (body clock) নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, কিন্তু এগুলো দিয়ে আমরা আদৌ চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করতে পারি কিনা এবং না পারলে কেন পারি না তা এখনো গবেষণার বিষয়। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষের ক্রাই-২ প্রোটিন তৈরির জিন (gene) ত্রুটিপূর্ণ জিন সম্বলিত ড্রসোফিলা মাছিতে (Drosophila melanogaster) প্রবেশ করালে তাদের চৌম্বকক্ষেত্র দেখার ক্ষমতা সফলভাবে পুনরোদ্ধার হয়! কিছু বিজ্ঞানী আবার মনে করেন যে আমাদের কিছুটা হলেও চৌম্বকক্ষেত্রের অনুভূতি রয়েছে, তবে এর ক্রিয়াকৌশল এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি; তবে তাঁরা ধারণা করেন যে এর জন্য দায়ী আমাদের নাসারন্ধ্রে সঞ্চিত ফেরিক লৌহ (ferric iron), যার শক্তিশালী চৌম্বকধর্ম (magnetism) রয়েছে।

মানব চোখে ক্রিপ্টোক্রোমের অবস্থান

মানব চোখে ক্রিপ্টোক্রোমের অবস্থান

১৪। সময়েন্দ্রিয় (Chronoceptor): সময়েন্দ্রিয় এখনো বিতর্কের বিষয় হলেও কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্যও জানা গিয়েছে বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে। মানুষ কিভাবে সময়ের অনুভূতি লাভ করে তার কোনো একক কৌশল (singular mechanism) এখনো পাওয়া যায়নি, তবে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের যে যথাযথ সময়ের অনুভূতি আছে তা জানা গেছে। আমরা সময়ের অনুভূতি কোনো প্রান্তীয় গ্রাহকের পরিবর্তে সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমেই অনুভব করি যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের আলাদা আলাদা অঞ্চলের আলাদা আলাদা কার্যসম্পাদনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়; অঞ্চলগুলোর মধ্যে সেরেব্রাল কর্টেক্স (cerebral cortex), সেরেবেলাম (cerebellum), ও ভিত্তিগত গ্যাংলিয়া (basal ganglia) উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে যে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কিছু অঞ্চল সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে (explicit timing) নিয়োজিত (যেখানে বর্তমানের কোনো ঘটনার অন্তর্গত সময়কাল তা অতিবাহনের অভিজ্ঞতাপূর্বক হিসাব করা হয়) এবং অন্য অঞ্চলগুলো সূচিত সময় নির্ধারণে (implicit timing) কর্মরত (যেখানে ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার অন্তর্গত সময়কাল শুধুমাত্র অনুমানপূর্বক হিসাব করা হয়)। তবে কিছু অঞ্চল রয়েছে যা উপরোক্ত দুধরনেরই সময় নির্ধারণে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীদের মতে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন ধরণের বিপুল সংখ্যক ঘড়ি ব্যবস্থা (clock system) রয়েছে যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন হারে টিক-টিক করে (tick-tocking); যেমন- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কিছু অংশ মিলিসেকেন্ডের হিসাব কষে, কিছু অংশ যুগের হিসাব বজায় রাখে।

এবং উপরোক্ত ঘড়ি ব্যবস্থাগুলোর ফলাফলগুলোর একীভূতকরণের মাধ্যমেই আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বহির্বিশ্বকে আমাদের নিকট ঠিকঠাক প্রতিফলিত করে। আপনার যে সময়েন্দ্রিয় আছে এবং তার গুরুত্ব কতটুকু তা এটি ঠিকঠাক কাজ না করলেই বুঝতে পারবেন। মজার বিষয় হচ্ছে যে এইরকম ত্রুটিপূর্ণসময়জ্ঞানের উদাহরণ কিন্তু কমনয়। এই ধরণের ত্রুটি (সাময়িক/স্থায়ী) বয়স বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরণের ঔষধ, মাদকদ্রব্য, রোগ, আবেগ ইত্যাদির জন্য হতে পারে; উদাহরণস্বরুপ- যথাক্রমে স্টিমুলেন্ট, কোকেইন, সিজোফ্রেনিয়া, ও ভয়। এই ধরনের ত্রুটির (সাময়িক) কারণেই একজন মারিহুয়ানা নেশাগ্রস্তের কাছে ২০ মিনিটকে ২ ঘণ্টার মত লাগে, বা আমাদের কাছে সুখের সময়কে দ্রুত মনে হয়, কিংবা অনেকেই অফিসের কাজের/একাডেমিক ক্লাসের সময়কে ধীরগতির বোধ করেন!

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে নিয়োজিত অঞ্চল (বামে) ও সূচিত সময় নির্ধারণে নিয়োজিত অঞ্চল (ডানে)

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে নিয়োজিত অঞ্চল (বামে) ও সূচিত সময় নির্ধারণে নিয়োজিত অঞ্চল (ডানে)

 

১৫। খিদেন্দ্রিয় (Esurioceptor): খিদের (hunger) বিপরীত শব্দ পরিতৃপ্তি (satiety), খিদে লাগলে যেমন খাওয়ার ইচ্ছা জাগে তেমনি পরিতৃপ্তির ফলে খাওয়ার ইচ্ছে চলে যায়। এই খিদে ও পরিতৃপ্তি নিয়ন্ত্রণে দুইটি গ্রন্থিরস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাদের নাম যথাক্রমে ঘ্রেলিন (ghrelin) ও লেপটিন (leptin); ঘ্রেলিনকে বলা হয় খিদে গ্রন্থিরস এবং লেপটিনকে পরিতৃপ্তি গ্রন্থিরস। এই ঘ্রেলিন ও লেপটিনের তারতম্যের উপরেই আমাদের খিদে লাগা বা না লাগা নির্ভর করে। সংক্ষেপে ব্যপারটা অনেকটা এরকম যে যখন আমরা খাই, তখন আমাদের দেহে উৎপন্ন শক্তি চর্বিকোষ (adipocytes) রুপে সঞ্চিত হয়। আমরা খেতে থাকলে সঞ্চিত চর্বিকোষগুলো সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধি একটি মাত্রা পার হলে তারা লেপটিন নিঃসৃত করে। এই লেপটিন রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাসে (hypothalamus) অবস্থিত  আর্কুয়েটনিউক্লিয়াসের (arcuate nucleus) লেপটিন-গ্রাহকে যুক্ত হয়। অতঃপর তা শক্তির ভারসাম্য (energy homeostasis) নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিতৃপ্তির উদ্রেক করে।

উল্লেখ্য যে এই আর্কুয়েট নিউক্লিয়াস হলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মেডিওবেসাল (mediobasal) হাইপোথ্যালামাসের নির্দিষ্ট একগুচ্ছ নিউরন। কয়েক ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে রক্তে লেপটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় ও ঘ্রেলিন নিঃসৃত হয়, ফলে আমাদের খিদে পায়। এই লেপটিনের লেপটিন-গ্রাহকে যুক্ত হওয়ার হার কোনো ত্রুটির কারণে কমে গেলে আপনার শরীরে যথেষ্ট সঞ্চিত চর্বিকোষ থাকা সত্ত্বেও আপনার ক্রমাগত খিদে পাবে এবং আপনি দিন দিন স্থূলতর হতে থাকবেন!

এবার দেখি ঘ্রেলিন কী করে। লেপটিনের কারণে যখন আমরা খাওয়া বন্ধ করে দেই এবং আমাদের পাকস্থলীর খাদ্যও পরিপাক হয়ে পাকস্থলী খালি (empty) হয়ে যায়, তখন পরিপাকতন্ত্রের ঘ্রেলিনার্জিক কোষগুলো (ghrelinergic cells) ঘ্রেলিন নিসৃত করে ও আমাদের খিদে পায়।অন্যদিকে খাদ্য গ্রহণের ফলে পাকস্থলী প্রসারিত (stretched) হলে ঘ্রেলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। ঘ্রেলিন-গ্রাহকও কিন্তু লেপটিন-গ্রাহকের মতই ওই আর্কুয়েট নিউক্লিয়াসেই অবস্থিত। ঘ্রেলিন তার গ্রাহকের সাথে যুক্ত হয়ে শুধু খিদেরই উদ্রেক করে না, সাথে পরিপাক অম্ল ক্ষরণ (gastric acid secretion) ও পরিপাকতন্ত্রের নড়াচড়া (gastrointestinal motility) বৃদ্ধি করে যা খাদ্যকে অন্ত্রে পরিশোষণের উপযুক্ত করতে সাহায্য করে। ঘ্রেলিন যদি কোনো ত্রুটির কারণে বেশি নিঃসৃত হয় তবে লেপটিন তার গ্রাহকে যুক্ত কম হওয়ার ত্রুটির মত এক্ষেত্রেও শরীরে যথেষ্ট সঞ্চিত চর্বিকোষ থাকা সত্ত্বেও ক্রমাগত খিদে পাবে, ফলে আপনার দেহ দিন দিন স্থূলতর হতে থাকবে; আর কোনো ধরণের ত্রুটির কারণে এই দুই ঘটনার উল্টো ঘটলে আপনার শরীরে খাদ্যের প্রয়োজন থাকলেও কম কম খিদে পাবে এবং আপনি দিন দিন শীর্ণতর হতে থাকবেন! উপরোক্ত আলোচনায় লক্ষণীয় যে ঘ্রেলিন ও লেপটিন এখানে প্রাণরাসায়নিক সংবাদ বাহক (biochemical messenger), আর এখানে খিদেন্দ্রিয় হিসেবে মূলত হাইপোথ্যালামাসের আর্কুয়েট নিউক্লিয়াসে অবস্থিত লেপটিন ও ঘ্রেলিন গ্রাহকগুলোই বিবেচিত।

খিদে ও পরিতৃপ্তি নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি

খিদে ও পরিতৃপ্তি নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

১৬। তৃষ্ণেন্দ্রিয় (Osmoceptor): আমাদের শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে আমাদের তৃষ্ণা পায় এবং তার সাথে মূত্র ত্যাগের পরিমাণও কমে যায়, তবে মূত্রের ঘনত্ব বেশী হয়। আমাদের শরীরে তরলের ঘাটতি হলে দেহাভ্যন্তরের তরলগুলোর (রক্ত, কোষমধ্যস্থ তরল, আন্তঃকোষীয় তরল ইত্যাদি) ঘনত্ব বেড়ে যায় ও আয়তন কমে যায়, এবং দ্রবের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে রক্ত পরিবহন ব্যবস্থায় (systemic) অভিস্রবণিক চাপের তারতম্য (tonicity) অন্ত-অভিস্রবণিক (hypotonic) হয়। এই পরিবর্তনগুলো সনাক্তকরণের মাধ্যমেই আমাদের মস্তিস্ক তৃষ্ণার অনুভূতি জাগায় ও কম মূত্র ত্যাগের সংকেত দেয়। কম মূত্র ত্যাগের জন্য একটি প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যার নাম আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন (arginine vasopressin); এটি নিঃসৃত হয় কেন্দ্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত পশ্চাৎ পিটুইটারি (posterior pituitary) গ্রন্থি থেকে এবং বৃক্ককে (kidney) নিয়ন্ত্রণ করে কম পরিমাণে কিন্তু ঘন মূত্র উৎপাদন করতে। কিন্তু আমাদের শরীর কিভাবে বুঝে যে দেহাভ্যন্তরের তরলের ঘনত্ব, আয়তন, অভিস্রবণিক চাপ ইত্যাদির পরিবর্তন হয়েছে?

এখানেই আসে তৃষ্ণেন্দ্রিয়ের কথা। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে এসব পরিবর্তন শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত অর্গানাম ভাস্কুলোসাম অব দ্যা ল্যামিনা টার্মিনালিস (organum vasculosum of the lamina terminalis) বা সংক্ষেপে ওভিএলটি (OVLT) এবং সাবফরনিকাল অঙ্গ (subfornical organ) বা সংক্ষেপে এসএফও (SFO) নামের গহ্বরপরিবৃত্ত অঙ্গ (circumventricular organ) দুটিই প্রধান গ্রাহক অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এরাই দেহাভ্যন্তরের তরলের উপরোক্ত পরিবর্তনগুলো রক্ত পরিবহন ব্যবস্থা হতে শনাক্ত করে এবং আমাদের তৃষ্ণার অনূভুতি জাগায় ও সাথে আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন নিঃসরণের সংকেত প্রদান করে। সুতরাং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই গ্রাহক অঙ্গ দুটিই প্রধানত আমাদের তৃষ্ণেন্দ্রিয়ের কাজ করে। তবে আলাদাভাবে তৃষ্ণার সংকেত ও আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন নিঃসরণের সংকেতের জন্য এদের মধ্যস্থিত একই ধরনের নাকি ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহক দায়ী তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ওভিওএলটি ও এসএফও এর অবস্থান (উপরে) এবং তৃষ্ণা ও আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিনের জন্য একীভূত ও আলাদা গ্রাহকের ধারণা (নিচে)

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ওভিওএলটি ও এসএফও এর অবস্থান (উপরে) এবং তৃষ্ণা ও আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিনের জন্য একীভূত ও আলাদা গ্রাহকের ধারণা (নিচে)

 

১৭। বর্জ্য-নিষ্কাশনেন্দ্রিয় (excretioceptor): সময়মত যে আমাদের মল-মূত্র ত্যাগ করার ইচ্ছা জাগে তার জন্যেও আলাদা ইন্দ্রিয় রয়েছে, অন্যথায় আমাদের মল-মূত্র ত্যাগ করার ইচ্ছা জাগতো না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মল-মূত্র ত্যাগ বন্ধ হয়ে যেতো, বরং আমাদের ত্যাগ করার ইচ্ছার অনুভূতি হওয়া ছাড়াই এইসব কার্য সম্পাদন হতো! মল ত্যাগের অনুভূতি জাগানোর জন্য দায়ী গ্রাহক ও মূত্র ত্যাগের অনুভূতি জাগানোর গ্রাহক আলাদা আলাদা হওয়ার পরও তাদের একই ইন্দ্রিয় হিসেবে উপস্থাপনের কারণ-দুটির গ্রাহকই অবস্থানগত দিক থেকে ভিন্ন হলেও গঠনগত ও কার্যপদ্ধতির দিক থেকে প্রায় একই। এরা মূলত প্রসারণ (stretch) গ্রাহক। এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে মূত্র ত্যাগ ও মল ত্যাগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান; যেমন- মূত্র নিস্কাশনের ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত স্ফিংটার পেশী (urethral sphincter) এবং মল নিষ্কাশনের ঐচ্ছিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত স্ফিংটার পেশী (anal sphincter) শুধুমাত্র একই সাথেই সংকুচিত হতে পারে এবং মূত্র নিষ্কাশনের সময় একসাথে দুটিই শিথিল (relax) থাকে।

মূত্র-নিষ্কাশন: যখন মূত্রথলি (urinary bladder) অপূর্ণ থাকে তখন তার মধ্যে চাপ কম থাকে। মূত্রথলির মসৃণ পেশীর কিছু নিজস্ব সংকোচণজনিত কর্মকান্ড (contractile activity) থাকে, কিন্তু যখন মূত্রথলি প্রায় পূর্ণ হয়ে যায় তখন তার ভেতর উচ্চচাপের উদ্ভবের ফলে পেশীগুলোর স্বাভাবিক সংকোচন কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটে যার কারণে মূত্রথলির দেয়ালে অবস্থিত প্রসারণ গ্রাহকে ক্রিয়া বিভবের (action potential) উৎপত্তি হয় যা প্রসারণ গ্রাহক হতে সংজ্ঞাবহ নিউরনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছায় এবং আমাদের মূত্র ত্যাগের ইচ্ছা জাগ্রত করে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের যে অঞ্চলগুলো মূত্র ত্যাগের সাথে জড়িত তার মধ্যে পন্টাইন মাইকচুরিশান কেন্দ্র (potine micturition center), পেরিএকুইডাক্টাল গ্রে (periaqueductal gray), এবং সেরেব্রাল কর্টেক্স (cerebral cortex) অন্যতম।

মল-নিষ্কাশন: মল নিষ্কাশনের অনুভূতির উদ্রেককরণ পদ্ধতি মূত্র নিষ্কাশনের অনুভূতি জাগানোর পদ্ধতির প্রায় অনুরূপ। যখন মলাধার (rectal ampulla) অপূর্ণ থাকে তখন তার মধ্যে চাপ কম থাকে, কিন্তু যখন মলাধার প্রায় পূর্ণ হয়ে যায় তখন তার ভেতর উচ্চচাপের উদ্ভবের ফলে পেশীগুলোর স্বাভাবিক সংকোচন কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটে যার ফলে মূত্রথলির দেয়ালে অবস্থিত প্রসারণ গ্রাহকে ক্রিয়া বিভবের উৎপত্তিহয় যা প্রসারণ গ্রাহক হতে সংজ্ঞাবহ নিউরনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছায় এবং আমাদের মল ত্যাগের ইচ্ছা হয়।

মূত্র-নিষ্কাশনের স্নায়বিক ব্যবস্থা (বামে) ও মল-নিষ্কাশনের স্নায়বিক ব্যবস্থা (ডানে)

মূত্র-নিষ্কাশনের স্নায়বিক ব্যবস্থা (বামে) ও মল-নিষ্কাশনের স্নায়বিক ব্যবস্থা (ডানে)

এই ছিলো এখনো পর্যন্ত গবেষণাপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য মানব ইন্দ্রিয়সমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। তৃতীয় পর্বে ইন্দ্রিয় নিয়ে আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করবো।

Comments

রকি চৌধুরী

--- অজ্ঞতা হচ্ছে স্বপ্নের মত। যতক্ষণ আপনি স্বপ্ন দেখবেন আপনি বুঝতে পারবেন না যে আপনি স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু যখনি আপনার ঘুম ভাঙবে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনি স্বপ্ন দেখছিলেন!

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz