“মানুষের বিবর্তন হচ্ছে?” ——– “জ্বি, হচ্ছে”

বিবর্তন হচ্ছে জেনেটিক মিউটেশনের সামগ্রিক রূপ। মিউটেশন হচ্ছে ডিএনএ-এর গঠনে কোনো পরিবর্তন, বা কপি করার সময় হয়ে যাওয়া ত্রুটি। এটাকে ইংরেজিতে Copying Error বলে, আমরা বাংলায় এটাকে অনুকরণজনিত ত্রুটি* হিসেবে উল্লেখ করবো। মিউটেশন অনেক সাধারণ একটি ঘটনা; একে আপনি টাইপ করার সময় ভুল হিসেবে ধরে নিতে পারেন। প্রতি ১,০০,০০০ কোষের ডিএনএ-এর নিউক্লিওটাইডের একটিতে অনুকরণজনিত ত্রুটি হয়। সেক্ষেত্রে প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় ১,২০,০০০টি করে ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে সব কয়টা মিউটেশন বা অনুকরণজনিত ত্রুটি টিকে না। কারণ ডিএনএ ঠিক করার মেশিন সবসময় অসামঞ্জস্যপূর্ণ অথবা ভাঙ্গা ডিএনএ ঠিক করে দেয়। তারপরও কিছু অনুকরণজনিত ত্রুটি থেকে যায়।

dna-mutation

টিকে থাকা অনুকরণজনিত ত্রুটি গুলোর মাঝে সবগুলো যে উপকারী হয়, তা কিন্তু না। অপকারী অনেক অনুকরণজনিত ত্রুটি ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এদের মধ্যে খুব ছোটো একটা পরিমাণ মিউটেশন বা অনুকরণজনিত ত্রুটি উপকারী হয়। একটি একটি করে এই উপকারী মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির জন্ম হয়। আর বিবর্তনের সবচেয়ে সহজতম সংজ্ঞা এটিই। ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে এক প্রজাতির অন্য প্রজাতিতে রুপান্তরের নামই বিবর্তন।

নিওডারউইনিজমেরও মূল কথা হচ্ছে এটি। মিউটেশনের মাধ্যমে allele এর পরিবর্তন হয়ে অন্য allele এ রুপান্তর জেনেটিক রুপান্তরের জন্ম দেয়। মিউটেশনই একমাত্র উপায় যার মাধ্যমে কোনো প্রজাতিতে একটি নতুন allele আসতে পারে। মিউটেশন ক্ষতিকারক হতে পারে, নিরপেক্ষ হতে পারে, আবার লাভজনকও হতে পারে। কোনটা হবে, সেটা নির্ভর করে পরিবর্তিত জিন একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে কেমন কাজ করবে, তার উপর।

মিউটেশনগুলোই বিবর্তনের কাঁচামাল। এদের উপর ভিত্তি করেই বিবর্তনের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক নির্বাচন এই মিউটেশনগুলোকে ব্যবহার করেই পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করে। আমরা যদি প্রমাণ করতে পারি যে, মানুষের মাঝে এখনো মিউটেশন হচ্ছে, তবেই আমরা প্রমাণ করতে পারবো মানুষ বিবর্তিত হচ্ছে। হোক না উদ্দেশ্যহীনভাবে, তাও হচ্ছে তো!

Apo-AIM

হৃদরোগ মানুষের “সভ্যতার” একটি অভিশাপ। অতীতে আমাদের “অসভ্য” পুর্বপুরুষদের চর্বির প্রতি খুব দুর্বলতা ছিলো। শক্তির আধার আর ক্যালোরির সবচেয়ে সহজ উৎস হলো এই চর্বি। কিন্তু সহজপ্রাপ্য জিনিস সবসময় ভেজাল বাধায়। সেই সূত্রেই চর্বি এখন হৃদরোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহান শিক্ষক কার্ল সেগান তাঁর বই “Pale Blue Dot: The Vision of the Human Future in Space”-এর ১৮তম অধ্যায় The Marsh of Carmina-তে প্রজাতি হিসেবে মানুষের অদূরদর্শিতার একটা উদাহরণ দিয়েছেন।

যাই হোক, আমরা সহজে শক্তি সংরক্ষণের জন্য চর্বি খেয়ে খেয়ে বিরাট বিপদ ডেকে এনেছি। তবে অনেক মানুষই যে বিবর্তনের তত্ত্বকে বিজ্ঞানের অংশ বলে মনে করেন না, সেই বিবর্তনই আমাদের রক্ষা করতে পারে।

সকল মানুষের দেহেই একটা জিন আছে, যার নাম Apolipoprotein AI (Apo-AI)। এটা রক্তের মাধ্যমে কোলেস্টেরল বা চর্বি বহন করার প্রক্রিয়ায় কাজ করে। Apo-AI একটা উচ্চ ঘনত্বসম্পন্ন লাইপোপ্রোটিন। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে জানেন যে, এই লাইপোপ্রোটিন ধমনী থেকে চর্বি সরাতে সাহায্য করে। তবে ইতালির ছোট্ট একটা সম্প্রদায়ে এই লাইপোপ্রোটিনের একটা ব্যতিক্রম পাওয়া গেছে, যার নাম Apolipoprotein AI-Milano বা Apo-AIM। এই Apo-AIM অন্য Apo-AI এর চেয়ে কার্যকরভাবে কোষের চর্বি সরায়, arterial plaque গলাতে সাহায্য করে আর ধমনীর গাঢ় হয়ে যাওয়ার প্রদাহের ক্ষতি কমাতে এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। অন্যদের তুলনায় Apo-AIM বহনকারীদের হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই প্রোটিনের কৃত্রিম রূপ বাজারে ছাড়ার চিন্তা করছে।

এছাড়াও  PCSK9 নামের একটি জিনের মিউটেশনও একই ধরণের কাজ করে। আর এই মিউটেশন বহনকারীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা  ৮৮% কম।

হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি

মানুষের একটি জিন আছে যেটা হাড়ের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। এটার নাম low-density lipoprotein receptor-related protein 5 বা সংক্ষেপে LRP5। এই জিনে মিউটেশন ঘটলে মানুষ osteoporosis নামক হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয়।

osteoporosis

osteoporosis

তবে এর সাথে সম্পর্কিত আরেকটি মিউটেশন আছে যেটা হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায়। আর এটি খুবই বিরল মিউটেশনদের একটি।

এই মিউটেশন আবিষ্কার হয় আকস্মিকভাবে, যখন আমেরিকান মিডওয়েস্টের একটি পরিবার মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে আহত না হয়ে ফিরে আসে। এক্সরেতে দেখা গেলো, তারা-সহ তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের হাড় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী ঘন। যে ডাক্তার তাদের নিয়ে গবেষণা করছিলেন, তিনি দেখলেন, এই পরিবারে ৩ বছর থেকে শুরু করে ৯৩ বছর বয়স্ক সদস্যদের মধ্যে কারোই হাড় কখনো ভাঙ্গেনি। এমনকি তারা বয়সজনিত হাড় ক্ষয়েও ভোগেন না! তাদের কয়েকজনের অবশ্য মুখের তালু থেকে ছোট্ট হাড়ের গঠন লক্ষ্য করা যায়। এটা ছাড়া তারা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও ভোগেন না। কিছু ঔষধ কোম্পানী চাইছে Apo-AIM এর মতো osteoporosis আর অন্যান্য হাড়জনিত রোগের জন্য এরকম কোনো ঔষধ তৈরি করতে।

ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধ

বিবর্তনীয় পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে মানুষের হিমোগ্লোবিনে HbS মিউটেশন, যা লোহিত রক্ত কণিকার আকারে হালকা পরিবর্তন আনে। এই মিউটেশন মানুষের ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

২০০১ সালের এক রিপোর্ট  (এবং আরেকটি) অনুসারে ইতালিয়ান গবেষকরা আফ্রিকার বুরকিনা ফাসোর মানুষের মাঝে আরেকটি মিউটেশনের সন্ধান পান, যার নাম দেয়া হয় HbC। এই জিনের এক কপি মানুষকে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে ২৯% বেশি প্রতিরোধ দেয়। দুটো কপি থাকলে সেই প্রতিরোধ বেড়ে ৯৩% হয়ে যায়। তবে এই মিউটেশন হালকা রক্তশূন্যতা সৃষ্টি করে।

Tetrachromatic  দৃষ্টি

অনেক স্তন্যপায়ীরা আমাদের মত এত ভালো রঙ্গিন ছবি দেখে না। কারণ তাদের চোখে মাত্র দুই ধরনের কোন কোষ আছে (কোন কোষ বা Cone Cell – রেটিনার যে কোষ ভিন্ন রঙ দেখতে সাহায্য করে)। মানুষ, অন্যান্য প্রাইমেটের মতো, তিন ধরণের কোনের মালিক। এটা একটা ঐতিহ্য, যেটার জন্ম হয় পাকা আর উজ্জ্বল রঙের ফল দেখার জন্য। এই সুবিধাটি প্রাচীনকালে আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষদের টিকে থাকাকে নিশ্চিত করেছিলো।

এক ধরণের কোন কোষের জন্য দায়ী হচ্ছে ক্রোমোজোম ৭, যেটা মূলত নীল রঙয়ের আলো দেখতে সাহায্য করে। বাকি দুই ধরণের কোন, যেগুলো লাল আর সবুজ রংয়ের আলো দেখতে সাহায্য করে, সেটা X ক্রোমোজমে থাকে। যেহেতু পুরুষের একটা X ক্রোমোজোম থাকে, একটা মিউটেশন যেটা হয় লাল না হয় নীল রঙয়ের আলো দেখতে সাহায্য করে সেটা লাল বা সবুজ রঙয়ের প্রতি বর্ণান্ধতার জন্ম দেবে। নারীদের যেহেতু X ক্রোমোজম দুইটা আছে, তাদের এই সমস্যা হবে না।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, যদি কোনো মিউটেশন লাল বা সবুজ রঙয়ের বর্ণান্ধতার জন্ম না দিয়ে রঙ দেখার মাত্রা পরিবর্তন করে দেয়? বলে নেয়া ভালো, লাল আর সবুজ রঙ দেখার জন্য দায়ী জিনের জন্ম এভাবেই হয়েছিলো। পূর্বপুরুষদের কোনো জিনের দ্বিতকরণ আর অপসারণের মাধ্যমে।

পুরুষের জন্য এই মিউটেশন তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না, তার ঠিকই তিনটা রঙ গ্রহণ করার ক্ষমতা থাকবে, শুধু অন্যদের চেয়ে ভিন্ন তিনটা। তবে এই মিউটেশন যদি নারীদের মধ্যে হয় তবে…? তবে তার একটা X ক্রোমোজমে তিনটা রঙ দেখার জন্য দায়ী কোন থাকবে, আর অন্য X ক্রোমোজমে থাকবে চতুর্থ রঙ দেখার ক্ষমতা। তিনি হবেন পাখি বা কচ্ছপের মতো “tetrachromat”। তিনি অন্যান্য রঙয়ের ছায়া দেখতে পারবেন, যা আমরা কখনো দেখতে পারবো না।

এটা কল্পকাহিনী না। এমন ঘটনা সত্যি পাওয়া গেছে, যেখানে একজন নারী (আর এখানে) বিজ্ঞানীদের আশামত ফলাফল দেখিয়েছেন।

Tetrachromatic দৃষ্টিমতি শিল্পী Concetta Antico

Tetrachromatic দৃষ্টিমতি শিল্পী Concetta Antico

তো………………… বিবর্তন চলছে, থেমে নেই।

আর ঐ জনপ্রিয় কথাটা আবার মনে করিয়ে দিতে চাই- “বিবর্তন মেনে নেয়া ঐচ্ছিক, বিবর্তনে অংশগ্রহণ ঐচ্ছিক না।”

Theodosius-Dobzhansky-Quotes-2

*************

* সম্পাদকের নোট – অনুকরণজনিত ত্রুটি শব্দদ্বয় এর আগে ব্যবহৃত হওয়ার উদাহরণ পাইনি। এটা এখনই প্রথমবারের মত ব্যবহার করলাম। অন্য কোথাও আগেও ব্যবহৃত হয়েছে, এমন উদাহরণ পেয়ে থাকলে জানাবেন। এটা copying error এর বাংলা হিসেবে আটকে যাবে আশা করছি। – ফরহাদ হোসেন মাসুম

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz