ইন্টারস্টেলার মুভি রিভিউ এবং প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান

আমরা সবসময়ই নিজেদেরকে সংজ্ঞায়িত করেছি, অসম্ভবকে সম্ভব করার সামর্থ্য দিয়ে। সেই মুহূর্তগুলোকে আমরা শ্রদ্ধা করি, যখন আমরা দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম, আরো উঁচুতে উঠতে চেয়ে; সকল বাধা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে, নক্ষত্রের পানে, অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে। আমরা এগুলোকে স্মরণ করি, আমাদের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত হিসেবে। কিন্তু সেগুলো অতীতের গল্প। হয়তো আমরা ভুলে গেছি, যে আমরা শুধুই পথপ্রদর্শক। যাত্রা শুরু করেছি মাত্র। আর আমাদের সর্বোচ্চ সাফল্য অতীতের গুলো নয়। কারণ, আমাদের নিয়তি অপেক্ষা করছে সুদূর উচ্চতায়, নক্ষত্রের মাঝে।

এই কথাগুলো বলা হয়েছিলো ইন্টারস্টেলার মুভির প্রথম ট্রেলারে। এরপরে আমি আর কোনো ট্রেলার দেখিনি। চেয়েছিলাম, একেবারে ভার্জিন অবস্থায় মুভিটা দেখতে। পুরো রিভিউটা টেক্সট এর বদলে ভিডিও দেখতে পারেন,

আমি মুভির কাহিনী নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করিনা। তাই, শুরুর দিকে সামান্য একটু বলে অফ যাবো। ভবিষ্যত পৃথিবী খুব ক্রিটিক্যাল একটা অবস্থার মধ্যে আছে। খাদ্য সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই অবস্থায় স্পেস রিসার্চ করার মত কোনো পরিস্থিতি নেই। প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ারদেরকেও কৃষিকাজ করতে হচ্ছে। এমন সময় একটা সিগন্যাল আসে, from the unknown. একটা ওয়ার্মহোল পাওয়া যায় শনি গ্রহের কাছাকাছি কোথাও।

ওয়ার্ম হোল, টাইম-স্পেস কন্টিনিউয়ামের মধ্যে একটা বাইপাস, একটা শর্টকাট, নিয়ে যাবে অজানা কোথাও, এমনকি অজানা কোনো ছায়াপথে। এই ওয়ার্মহোল একটা সম্ভাবনা, যা হয়তো মানবসভ্যতাকে রক্ষা করবে পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়া থেকে।

Wormhole, in Interstellar

Wormhole, in Interstellar

এটুকু আপনারা ট্রেলারেই দেখেছেন।

এই মুভিটা এমন কিছু টপিক নিয়ে ডীল করে, যেগুলো আমরা খুব সহজে বুঝে উঠতে পারিনা। এজন্য অনেকেই বলে, এই মুভি বোঝা যাবেনা সহজে। কিন্তু, মুভি বুঝতে হলে আপনাকে astrophysicist হতে হবে, এমন মুভি নিশ্চয়ই বানাবেনা কেউ। অবশ্যই কিছু কিছু ব্যাপার হয়তো আছে, যেগুলো বুঝতে হলে আপনাকে কিছুটা পড়াশোনা থাকতে হবে। তো, একটা মুভির খাতিরে হলেও যদি কিছুটা জানার আগ্রহ জাগে, খারাপ কী?

বিজ্ঞানের যে কয়েকটা জিনিস আমাদের অনেকের মাথার ওপর দিয়ে যায়, তার মধ্যে দুটো হচ্ছে টাইম আর স্পেস। এই দুটোই আসলে একসূত্রে গাঁথা। একটা পর্যায়ে গিয়ে সময়ও একটা বস্তুর মত আচরণ করে। জিনিসটা বুঝতে হলে আমাদেরকে ডাইমেনশন বা মাত্রা জিনিসটা বুঝতে হবে।

বিজ্ঞানের অন্যতম ইন্টেরেস্টিং একটা টপিক হচ্ছে ডাইমেনশন বা মাত্রা। আমরা আছি থ্রি ডাইমেনশনে, এবং আমাদের দৃষ্টি চলে টু-ডাইমেনশনে। আমরা যততম ডাইমেনশনে থাকবো, আমাদের দৃষ্টি চলবে তার চেয়ে এক ডাইমেনশন কমে। আমরা যখন ফোর্থ ডাইমেনশনে চলে যাবো, যেখানে সময় একটা মাত্রা। আরো হায়ার ডাইমেনশনে গেলে আমরা বস্তুর মধ্যে দিয়ে দেখতে পাবো। ফিফথ ডাইমেনশনে গেলে আমরা চতুর্থ মাত্রা অর্থাৎ সময়ের মধ্যেও দৃষ্টিপাত করতে পারবো। এটা নিয়ে আমাদের সাইটে সহজ ভাষায় বস্তুর মাত্রাসমূহ নামে একটা নোট আছে, পড়ে নিতে পারেন

রিলেটিভিটি (আপেক্ষিকতা) আরেকটা চরম ব্যাপার। সময়ের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অন্য সবকিছুর মত এটাও আপেক্ষিক। সবার জন্য, স্পেসের সব জায়গায় টাইম একভাবে চলে না। ঐ যে বললাম, সময়ও বস্তুর মত আচরণ করে! আপনাকে যদি হাওয়ার বিপরীতে দৌড়াতে বলা হয়, অথবা স্রোতের বিপরীতে দাঁড় বাইতে বলা হয়, তাহলে আপনি যেমন স্লো চলবেন। গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষের বিপরীতে চলতে হলে সময়কেও ধীরে চলতে হয়।

তাই, যারা মহাকাশে দূর পাল্লার যাত্রাতে যাবেন, তারা ফিরে এসে দেখবেন, তাদের পরিচিত মানুষেরা অনেক বেশি বুড়িয়ে গেছে। কারণ, তারা মহাকর্ষকে ছিন্ন করে দ্রুতগতির যাত্রার মধ্যে ছিলেন। সময়কে চলতে হয়েছে মহাকর্ষের বিপরীতে। কিন্তু পৃথিবীর মানুষদের জন্য সময় চলেছে স্বাভাবিকভাবেই (মানে, আমাদের জন্য সবসময় যেভাবে চলে এসেছে, সেভাবে)……

ইন্টারস্টেলারে নায়ক কুপার (ম্যাথিউ ম্যাককোনাহেই) তার ছেলেমেয়েকে রেখে যাত্রা করেছে সেই ওয়ার্মহোলের দিকে। কোথায় যাবে সে, কোন গ্যালাক্সিতে গিয়ে পৌঁছাবে, বস্তুর কোন মাত্রার মুখোমুখি হবে সে – এই জিনিসগুলো নিয়ে ইন্টারস্টেলারের কাহিনী এগিয়ে যাবে। মুভির প্লটের জন্য জোনাথন নোলান ক্যালটেকে রিলেটিভিটি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। স্ক্রিপ্ট রাইটিং এর সময় সাথে রাখা হয়েছিলো তাত্ত্বিক পদার্থবিদ কিপ থর্নকে। থর্ন হচ্ছে একদম প্রথম দিকের বিজ্ঞানীদের একজন যিনি থিওরেটিক্যাল সায়েন্টিফিক রিসার্চ করেছিলেন, যে বিজ্ঞান কি আসলেই আমাদেরকে টাইম ট্র্যাভেল এর সূত্র দিতে পারবে কিনা; ব্ল্যাক হোল কসমোলজি নিয়ে তার নিজস্ব রিসার্চ আছে।

ম্যাথিউ ম্যাককোনাহেইকে এতো স্বাভাবিক লেগেছে স্ক্রীনে, যেন সে স্ক্রীনেরই একটা অংশ। অ্যান হ্যাথাওয়ে, স্যার মাইকেল কেইন, এরা তো আমার খুবই প্রিয় অভিনেতা। মার্ফ এর চরিত্রে পিচ্চি ম্যাকেঞ্জি ফয়কেও এতো ফাটাফাটি লেগেছে, যে বলার মত না। প্রথম ট্রেলার বাদে, আমি আর অন্য কোনো ট্রেলার দেখিনি বলে জানিও না, আর কে কে ছিলো। আমার মত যদি কেউ থেকে থাকেন, তাহলে ওদের কথা চিন্তা করে জেসিকা চ্যাস্টেইন আর ম্যাট ডেমন কী কী চরিত্র করেছে, সেগুলো আর বললাম না।

স্ক্রীন রাইটিং এর জন্য জোনাথন নোলান তার ভাইয়ের চেয়ে ভালো বলেই আমার মতামত। সে থাকলে বেশি ভালো হয়, আমার মতে। এটাতেও ব্যতিক্রম হয়নি। হ্যান্স জিমার এর মিউজিক নিয়ে আর কী বলার আছে। উত্তেজনায় গায়ের লোম খাড়া হবে, ব্রেইনের ওপর চাপ পড়বে, ইমোশনাল হয়ে যাবেন, I mean, the usual.  ফটোগ্রাফি was excellent, basic Christopher Nolan stuff. ব্যাটা ৩-ডি তে বিশ্বাস করে না, for good reasons. So, IMAX is the way to go, for best experience. কিছু কিছু সীন এতো বেশি ইলাবোরেট, এগুলো বিগ স্ক্রীনে দেখলে হারায়ে যেতে ইচ্ছে করে।

প্লটহোল নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু একটা জিনিস যেটা একটু বেশি চোখে বেজেছে, সেটা হচ্ছে, আমার মতে এখানে ব্ল্যাকহোলের শক্তিকে কিছুটা আন্ডার-এস্টিমেট করা হয়েছে। আর ব্ল্যাকহোলের ভেতরে কী আছে, সেটা নিয়ে ওদের আন্দাজের সাথেও মতভেদ আছে। কার্ল স্যাগান বা নীল টাইসন, দুজনেই তাদের দুই কসমসের মধ্যে বলেছেন, if you want to know what’s inside a black hole, look around. অর্থাৎ, there will be another universe, galaxies and planets, compacted within it. In a sense, it’s no different than a worm hole. দুইটা দিয়েই অন্য কোথাও যাওয়া যায়। পার্থক্যটা হচ্ছে, worm hole দিয়ে আপনি এই ইউনিভার্সেরই অন্য জায়গায় পৌঁছাবেন, আর ব্ল্যাক হোল দিয়ে অন্য আরেক ইউনিভার্সে চলে যাবেন।

সিনেমা শেষ করে হল থেকে বের হলাম, যেন কিছুটা মাতাল অবস্থায় অন্য এক গ্যালাক্সী থেকে আবার পৃথিবীতে ফিরে এলাম। সাথে করে একটা…… ফ্রি পোস্টার নিয়ে এলাম। Overall experience, এক শব্দে বলতে গেলে, ম্যাজিক্যাল।

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz