বিবর্তন তত্ত্ব ও ল্যামার্কের মতবাদের পার্থক্য

বিবর্তনতত্ত্ব অনুযায়ী, সকল প্রজাতি একটি সাধারণ প্রজাতি হতে আগত। সময়ের সাথে সাথে প্রজাতির বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটে। সাধারণ প্রজাতি হতে আসলেও নতুন প্রজাতির বৈশিষ্ট্য কিন্তু উক্ত প্রজাতি  হতে ভিন্ন হয়। 

বিবর্তনকে ভুল প্রমাণ করতে গিয়ে অনেক সময় ল্যামার্কের মতবাদটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে, ডারউইন তার বইয়ে Origin of Species-এ যে  প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তন ব্যাখ্যা করেছিলেন তার সাথে এর কোনো মিল নেই। প্রক্রিয়াটির নাম হলো “প্রাকৃতিক নির্বাচন” বা “Natural Selection “.

You often allude to Lamarck’s work; I do not know what you think about it, but it appeared to me extremely poor; I got not a fact or idea from it.

১৮৫৯ সালে চার্লস লায়েলকে লিখা এক চিঠিতে ডারউইন এইকথাগুলো বলেছিলেন। এখান থেকেই বোঝা যায়  যে, ডারউইন ল্যামার্কের মতবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। অনেকে বলে, ডারউইন নাকি তার কোনো বন্ধুকে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, বিবর্তনতত্ত্বের প্রতি তিনি নাকি সন্দিহান ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো চিঠি তিনি লিখেননি। সম্প্রতি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি Darwin Correspondence Project চালু করেছে। আপনি সেখানে তার লেখা সব চিঠি পেয়ে যাবেন। 

যাই হোক,  আমরা আমাদের মূল প্রসঙ্গে ফিরে  আসি। আমরা প্রথমেই বিবর্তন সম্পর্কে ডারউইন কী বলেছেন সে সম্পর্কে আলোচনা করব। তারপর ল্যামার্কের মতবাদ  নিয়ে আলোচনা করব। শেষে ল্যামার্ককে ভুল প্রমাণ করা বিজ্ঞানী ভাইসম্যানের পরিক্ষা নিয়ে আলোচনা করব। 

ডারউইন যেভাবে বিবর্তন তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেছিলেন 

ডারউইনের পর্যবেক্ষণ:

সকল প্রজাতি অধিক সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু প্রকৃতিতে সব সন্তান বেঁচে থাকে না। ডারউইনের হিসাব অনুযায়ী, এক জোড়া হাতি হতে জন্ম নেওয়া সব ক’টি বাচ্চা যদি টিকে থাকে, তাহলে ৭৫০ বছরে পৃথিবীতে হাতির সংখ্যা দাঁড়াতো ১ কোটি ৯০ লাখ। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, একটি কড মাছের ৯৯% ডিম এক মাসের মধ্যেই কোনো না কোনোভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। জন্মগ্রহণ করা ৯০% সন্তান প্রথম বছরেই কোনো না কোনো ভাবে মৃত্যুবরণ করে। 

পৃথিবীর ভূ-ভাগ অনেক ক্ষুদ্র হওয়ায় আমাদের বাসস্থানের আয়তন ও খাদ্য অনেক সীমিত।

বেঁচে থাকার জন্য সকল জীবকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রতিযোগিতা। ডারউইন এটিকে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি তিনটি পর্যায়ে সংগঠিত হয়। 

পরিবেশে নিষ্ঠুর খাদ্যশৃঙ্খলের দিকে খেয়াল করুন। এই খাদ্যশৃঙ্খলের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে যে নিষ্ঠুর সংগ্রাম হয়, এর ফলস্বরূপ অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। একে বলা হয় (Interspecific struggle) আন্ত:প্রজাতিক সংগ্রাম।

নিজ প্রজাতির প্রাণীদের মাঝেও একধরনের লড়াই চলে। এর ফলে যারা শক্তিশালী তারাই টিকে থাকে। একে (intraspecific struggle) অন্ত:প্রজাতিক সংগ্রাম বলা হয়।

বিভিন্ন ধরেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথেও আমাদের লড়াই করতে হয়। এই প্রতিকুল পরিবেশের সাথে যারা খাপ খাওয়াতে পারে, তারাই টিকে থাকে। যেমন, উত্তর ও মধ্যে আমেরিকার কোয়েল পাখি অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।একে বলা হয় পবিবেশের সাথে সংগ্রাম (struggle with environment)।

একই প্রজাতির হলেও উক্ত প্রজাতির সকল জীবের বৈশিষ্ট্য একরকম হয় না। এদের বৈশিষ্ট্যের এই যে পার্থক্য দেখা যায়, একে প্রকরণ (mutation) বলা হয়। 

এরপর রয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচন। এই প্রতিপাদ্যটির জন্যই ডারউইনের দেওয়া বিবর্তন তত্ত্ব গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। 

আমাদের আশে-পাশেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এই যে হাজার বছর ধরে আমাদের কৃষকেরাই নির্বাচকের ভূমিকা পালন করে আসছেন। তারা তাদের পছন্দের প্রাণী ও উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে আসছেন। তাদের প্রিয় গরুটি যেন ভালোমতো বংশবৃদ্ধি করতে পারে এজন্য তাদের বাসস্থানটি বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখছেন। প্রিয় উদ্ভিদটিকে পশু-পাখি থেকে রক্ষার জন্য বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখছেন তাদের ক্ষেত। ফলে নিদিষ্ট প্রজাতি বংশবৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে। এজন্যই বন্য শুকর এবং গৃহপালিত শুকরের মাঝে পার্থক্য খুঁজে পাবেন। আমাদের আশেপাশে থাকা পোষা কুকুরদের পূর্বপুরুষ ছিল বন্য নেকড়ে। একে বলা হয় কৃত্রিম নির্বাচন বা Artificial Selection। আমরা নিজেরাই যদি নির্বাচকের ভূমিকা পালন করতে পারি, তাহলে প্রকৃতি কেন পারবে না!  

প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে ছাঁকনির মতো। আমাদের কাছে মনে হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজাতিটিই টিকে থাকবে। না, এরকম নয়। যতই শক্তিশালী হোক, পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে যাদের বৈশিষ্ট্য গুলো খাপ খাওয়াতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে। তবে প্রাকৃতিক নির্বাচন বাহ্যিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে (জিনোটাইপ)। 

উপরোক্ত প্রক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে নতুন প্রজাতির উদ্ভব হবে। আর যাদের বৈশিষ্ট্য  পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি, তারা পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হাজার বছর পর তাদের ফসিলগুলো পাওয়া যায়। 

[ বিস্তারিতভাবে জানতে এ সম্পর্কিত বই পড়ুন ]

ল্যামার্ক যেভাবে বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেছিল 

উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ফরাসি বিজ্ঞানী জাঁ বাতিস্ত ল্যামার্ক বিবর্তন সম্পর্কিত একটি মতবাদ দিয়েছিলেন। তার মতবাদের দুটি নীতি হলো :

১. কোনো কাজে একটি অঙ্গ বারবার ব্যবহার করা হলে সেটা বড় ও শক্তিশালী হতে থাকে। আর যে অঙ্গটি ব্যবহার করা হয় না; সেটি সময়ের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

২. কোনো অঙ্গের যে বৈশিষ্ট্য ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নতি লাভ করে, তা পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। 

তার এই মতবাদের উপর ভিত্তি করেই সবাই জিরাফের বিবর্তন ব্যাখ্যা করে থাকে। বহু প্রজন্ম ধরে উঁচু ডালের পাতা খেতে থাকার চেষ্ট করার ফলে জিরাফের গলা লম্বা হয়ে গেছে। এটি ভুল।

তাহলে জিরাফের গলা লম্বা হলো কীভাবে? প্রাপ্ত ফসিল অনুযায়ী জিরাফের গলা একসময় অনেক ছোট ছিল। এক্ষেত্রে সেক্সুয়াল সিলেকসন ভূমিকা পালন করে। এই লম্বা গলার জিরাফ নারী জিরাফদের নিকট বেশি আকর্ষণীয় লাগে। এজন্য  লম্বা গলার জিরাফ বংশবৃদ্ধির সুযোগ পেয়েছিল বেশি। নারীর সাথে প্রজননের অধিকার লাভ করার জন্য পুরুষ জিরাফদেরকে লড়াই করতে হয়, আর এই লড়াইয়ের জন্য পুরুষরা গলা ব্যবহার করে। তাছাড়া, সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী লম্বা গলা জিরাফের দেহের তাপমাত্রার ভারসাম্য  বজায় রাখতে সাহায্য করে। 

ডারউইনের মতে জিরাফের গলা হওয়ার কারণ হলো, লম্বা গলার জিরাফ উঁচু গাছের পাতা খেতে সক্ষম। তবে এটিও ভুল। মূলত লম্বা গলা তাদের সঙ্গী নির্বাচনে সাহায্য করেছিল। কিন্তু খাটো গলার জিরাফ এ সুযোগ পায়নি। 

আসুন নিজেরা একটু ভেবে দেখি। মুসলিম ছেলেদের প্রত্যেক প্রজন্মকেই সুন্নতে খতনা দেওয়া হয়। বাঙালি নারীদের নাক-কান প্রত্যেক প্রজন্মে ফুঁড়তে হয়। চীনা এক সংস্কৃতিক রীতি অনুযায়ী, মহিলাদের ছোট জুতা পরিয়ে পরিয়ে পা খাটো করে দেওয়া হয়।  মিয়ানমারের কায়ান লাহুই গোত্রের নারীরা গলায় রিং পরিধান করে। এজন্য এদের গলা লম্বা হয়ে যায়। কিন্তু নতুন জন্মানো বাচ্চারা স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয়। ল্যামার্ক সত্য হলে এমনটা করতে হতো না।

ভাইসম্যানের পরীক্ষা 

“The Origin of Species had excited delight and enthusiasm in the minds of the younger students.”-ভাইসম্যান। 

ভাইসম্যানের এই পরীক্ষাটি দ্বারা মূলত ল্যামার্কের দুটি নীতিকে ভুল প্রমাণ করেন। তিনি ডারউইনের নীতিগুলোকে ভুল প্রমাণ করেননি। কিন্তু অনেকের ভুলবশত বলে থাকেন, ভাইসম্যান ডারউইনকে ভুল প্রমাণ করেছিলেন, তাই বিবর্তন ভুল।

মোটেও না। ল্যামার্কের মিউটেশন সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। এক্ষেত্রে ডারউইনের দেওয়া বিবর্তনতত্ত্বটিই অধিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এটা সত্য যে, ভাইসম্যান ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনকে সমর্থন করতেন, তবে তিনি ডারউইনের প্যানজিন ধারণাকে (ডারউইন তার অরজিন অব স্পিসিজের দ্বিতীয় সংস্করণে কিছুটা ল্যামার্কের মতবাদকে গ্রহণ করেছিলেন। এজন্য তিনি পেনজিনেসিসের ধারণা দেন। যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়) সমর্থন করতেন না। 

জীবের বিবর্তন যে শরীরে চালানো অপারেশনের দ্বারা প্রভাবিত হয় না, এটি প্রমাণ করার জন্য তিনি একটি ছোট্ট পরীক্ষা চালান। তিনি ৫ বংশের ৯০১ টি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান। তিনি ইঁদুরগুলোর লেজ কাটেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের ইঁদুরদের লেজের দৈর্ঘ্য মাপতে থাকেন। কিন্তু দেখা গেল, নতুন ভূমিষ্ঠ বাচ্চা ইঁদুরগুলো লেজহীন হয়নি বা লেজের দৈর্ঘ্য কমেনি। এভাবেই তিনি ল্যামার্কের “অর্জিত গুণাবলীর উত্তরাধিকার” মতবাদটিকে ধসিয়ে দেন।

Comments

Avatar

Khondokar Abu Shihab

I am a Student.

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x