মাস্টারবেশন নিয়ে কিছু কথা

মাস্টারবেশন কি ক্ষতিকর? এর ফ্রিকুয়েন্সি কেমন হওয়া উচিৎ?

-সেক্সুয়ালিটি/ মাস্টারবেশন নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আমরা ভাঙতে যাচ্ছি। মাস্টারবেশন ছোটবেলা থেকে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। শিশুরাও মাস্টারবেট করে, বয়স্করাও মাস্টারবেট করে। আমরা ভাবি যে, পুরুষরা মেয়েদের তুলনায় বেশী মাস্টারবেট করে, কিন্তু সঠিক তথ্য হচ্ছে নারী পুরুষ সমান হারে মাস্টারবেট করে। কিশোররা সপ্তাহে ৩/৪ বার, প্রাপ্ত বয়স্করা সপ্তাহে ১/২ বার, এমনকি বিবাহিতরা মাসে ১/২ বার মাস্টারবেট করে। এরচেয়ে বেশী করলেও সেটি অস্বাভাবিক নয়। এটি তখনই অস্বাভাবিক যখন মানুষের সেক্সুয়াল এবং সামাজিক সম্পর্কে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যদি একটি কারো সম্পর্কের জন্য পীড়াদায়ক হয়, বা তার কর্মজীবনের জন্য বাধা দেয়, যদি মাস্টারবেশনের কারণে কেউ শিক্ষা, পড়াশোনা, চাকরী, এসব ক্ষেত্রে ঠিকমতো কাজ করতে না পারে তাহলেই শুধুমাত্র মাস্টারবেশন ক্ষতিকর।

উদাহরণ স্বরূপ , একজন চল্লিশ বছর বয়স্ক লোক আসলো একজন ডাক্তারের কাছে দেখা করতে, বললেন, “ডাক্তার সাহেব আমি কি করব আমি জানিনা, আমার একটা সমস্যা আছে, আমি প্রতিদিন মাস্টারবেট করি, কখনও কখনও দিনে দুবার ও করি, সপ্তাহে চারবার আমার স্ত্রীর সাথে মিলিত হই, এমনকি আমার রক্ষিতাও আছে, যার সাথে আমি সপ্তাহে দুবার মিলিত হই, আমি কী করব?’’ খোঁজ নিয়ে জানা গেল, লোকটার কর্মজীবন চমৎকার, সে খুব সফল একজন মানুষ, ফ্যামেলী রিলেশন, পারিবারিক জীবন ও খুব সুন্দর।
তাহলে সেক্ষেত্রে উনার সেক্সুয়াল লাইফে কোন সমস্যা নেই। তার শুধুমাত্র যৌনচাহিদা বেশী। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি কোন সম্পর্কের জন্য বাধাদায়ক হয়ে দাঁড়াচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত মাস্টারবেশন স্বাভাবিক।

অনেক রোগী মাস্টারবেশন নিয়ে খারাপ বোধ করে। তাঁদেরকে যা বোঝানো উচিৎ সেটি হচ্ছে মাস্টারবেশন স্বাভাবিক।
তথ্যসূত্র-  কেপলান লেকচার সিরিজ

কেপলানের সোর্স কতটূকু অথেনটিক?
এটি পুরোপুরি অথেনটিক। কারণ কেপলান সবসময় তথ্য আপডেটেট রাখে। আধুনিক মেডিসিন যে পর্যায়ে আছে কেপলান সবসময় সেখানে পৌঁছোয়, সে পর্যায় থেকে তথ্য নিয়ে তারা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে। কেপলানের তথ্য যদি ভুল হত তাহলে আমেরিকায় ডাক্তার হতে যাচ্ছে যারা তারা সবাই ভুল তথ্য জেনে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যেতেন, তারা ভুল উত্তর দিয়ে আসতেন, এবং ফেল খেয়ে আমেরিকার ডাক্তার হতে পারতেন না। কিন্তু ব্যাপারটা তা না। কেপলান থেকে পড়ে প্রতি বছর বিশাল একটা অংশ ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছে। যাঁদের জ্ঞানের উৎস হচ্ছে কেপলান। তারা কেপ্লান জেনে, কেপলান পড়ে ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছে। কাজেই আমেরিকান ডাক্তারদের নলেজ বেজ অনেকাংশেই কেপলান থেকে আসা। কাজেই এটি ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া কেপলান প্রতি দুবছর পর পর আপডেট করে।

কেউ একজন গুগল করে কি সঠিক তথ্য পেতে পারে? রিসার্চ কতটা অথেনটিক হতে পারে?
গুগল করে সবকিছু জানা সম্ভব। সার্চ করে আপনি অনেক তথ্য পেতে পারেন, তবে এর সবকিছু যে সঠিক হবে এমন কোন কথা নেই। যেমন আপনি কলা খাওয়ার উপকারীতা নিয়ে জানতে চাইছেন, আপনি এমন অনেক লিংক পাবেন যেগুলো আপনাকে দেখাবে কলা খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে। আবার কলা খাওয়ার অপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আপনি সেটিও পাবেন। এরমানে আপনি গুগলে কিছু নিয়ে সার্চ করলে আপনি সেটিই পাবেন, তবে সেটি যে সঠিক হবে এমন কোন কথা নেই। এটি একধরনের অবজারভার বায়াস। মানে আপনি যা খুঁজতে চাইছেন সেটি খুঁজে নেয়া। আপনি যখন গুগল থেকে কিছু তথ্য খুঁজতে যাচ্ছেন আপনি নিজেই Observer Bias (পর্যবেক্ষকের পক্ষপাতিত্ব) নিয়ে আসছেন। এখন তাহলে আপনি অথেনটিক তথ্য কীভাবে পাবেন- এখানে হচ্ছে পড়াশুনার প্রয়োজনীয়তা। সঠিক তথ্য জানতে হলে আপনাকে আরো পড়তে হবে, আরো জানতে হবে, যে বইয়ের রেফারেন্স পাচ্ছেন সেই বইগুলো পড়তে হবে। এবং তখন আপনার উপলব্ধি হবে- না, এই লিখাটি ভুল হতে পারে! তখন আপনাকে অন্য বই দেখতে হবে। এভাবে আপনি সঠিক একটি তথ্যে পৌঁছোতে পারেন।

হয়তো আপনি গুগল করে অনেক পরিসংখ্যান পেলেন কোনো একটি বিষয় নিয়ে। তাহলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান কীভাবে আসে?

পরিসংখ্যান আসে বিভিন্ন রিসার্চের ভিত্তিতে। রিসার্চগুলো হয় কিছু জনসংখ্যা বাছাইয়ের মাধ্যমে, যাদেরকে বলা হয় স্টাডি পপুলেশন । সেই বাছাই করা জনসংখ্যায় গবেষণা চালানো হয়। চালিয়ে একটা ফলাফলে পৌঁছানো হয়। এখন পপুলেশন বাছায়ের উপর নির্ভর করে এর ফলাফল কেমন আসবে। যেমন- বিবাহিত দম্পতির যৌনজিবন নিয়ে যদি একটি গবেষণা চালানো হয় এবং এর জন্য আমরা বেছে নিতে পারি ১৩ হাজার দম্পতিকে তাহলে এর ফলাফল কী আসবে? এটা নির্ভর করে আমরা ১৩ হাজার দম্পতি যে নিচ্ছি, তাঁদের ওপর। সেটি কি বাংলাদেশের ১৩ হাজার দম্পতি (যাঁদের সেক্স লাইফ বেশ ভাল)? নাকি এটি জাপানের ১৩ হাজারের দম্পতি যারা সেক্স করার সময় ই পায় না? নাকি সেটি কেনটাকির ১৩ হাজার দম্পতি, এই ১৩ হাজার দম্পতির মধ্য ‘জিহোভা’স উইটনেস’ কয়জন, যারা মাস্টারবেশন করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ মনে করে? এ সবকিছুর উপর নির্ভর করবে এই ফলাফল কেমন আসবে। রিসার্চের রেজাল্ট আসলে পুরোপুরি নিখুঁত হবেনা, কারণ যখনই আমরা একটা নির্দিষ্ট একটা পপুলেশন বাছাই করব, তখনই সেখানে সিলেকশন বায়াস চলে আসবে (একে আমরা এভাবে বলতে পারি যে – এই রিসার্চে খাদ আছে, যেই খাদ কে বলা হয় বায়াস) । আমি কাদেরকে নিয়ে গবেষণা করছি ,সেটির উপর নির্ভর করে আমার ফলাফল কী আসবে।

আমি যদি ১৩ হাজার ছেলের উপর গবেষণা করি, তাঁদের সেক্স লাইফ কেমন, কিন্তু সে ছেলেমেয়ে হচ্ছে বাংলাদেশের ১২/১৩ বছরের ছেলেমেয়ে শহরের ছেলেমেয়ে যাঁদের জীবন কড়া শাসনে আবদ্ধ, তাহলে আমরা দেখব তাঁদের সেক্স শূন্য, মাস্টারবেশন করার সুযোগ ও তেমন পায় না, কিন্তু সেটি যদি গ্রামের ১২/১৩ বছরের ছেলেমেয়ে হয়, দেখবো তাদের অলরেডি যৌন অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। এগুলো হচ্ছে সিলেকশন বায়াস।

পক্ষপাতিত্ব ছাড়া কোন গবেষণা হওয়া সম্ভব নয়। আমরা চাইলে পক্ষপাতিত্ব কমাতে পারি। কিন্তু একেবারে কমানো বাস্তবে সম্ভব নয়। কাজেই রিসার্চের যে রেজাল্টগুলো আসে, সেগুলো আমরা থিউরিটিক্যাল রেজাল্ট ধরে নেই। এগুলো আসলে পুরোপুরি প্র্যাক্টিকাল না। এবং স্ট্যাসিস্টীকস ও পুরোপুরি গড় বিষয়টিকে নির্দেশ করে।

এসব রিসার্চ কারা করে? স্পষ্ট করে বলতে গেলে, এসব ক্লিনিকাল রিসার্চ কারা করে?
কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সি এসব গবেষণা পরিচালনা করেন। রিসার্চের আরেকটা বড় ত্রুটি হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠান সচরাচর গবেষণায় তাই প্রচার করে ছাড়ে যা তারা প্রমাণ করতে চায়। এ পরিস্থিতিকে বলা হয় পর্যবেক্ষকের পক্ষপাতিত্ব বা অবজার্ভার বায়াস।

অবজারভার বায়াস হচ্ছে যে গবেষণা টি পরিচালনা করছে সে তার মনমানসিকতা, ইচ্ছা গবেষণার উপর প্রভাব ফেলা (পিগ্মালিয়ন ইফেক্ট) । যেমন ধরি কোন কন্টাক্ট লেন্স কোম্পানি গবেষণা করে দেখতে চাইল তাঁদের লেন্স ভাল তখন তারা লেন্সের ভাল দিক গুলো নেবে, খারাপ দিক গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। অবজারভার বায়াস একেবারে সাধারণ জিনিস। এটি এড়াবার জন্য আমরা যেটা করতে পারি সেটি হচ্ছে Double Blind Study Method। এই পদ্ধতি হচ্ছে যার উপর গবেষণা হচ্ছে তিনিও জানেন না তার উপর কীভাবে গবেষণা (বা পর্যবেক্ষণ) চলছে, যিনি গবেষণা করছেন তিনিও জানেন না ঠিক কাদের নিয়ে গবেষণা করছেন, শুধুমাত্র থার্ড পার্টি জানেন, কী গবেষণা হচ্ছে, কার উপর গবেষণা হচ্ছে।

কিন্তু এভাবে করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা গবেষণা চালাতে পারি না। এটি শুধুমাত্র সম্ভব ল্যাবে, বা একটা রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে অল্প কিছু মানুষ নিয়ে গবেষণা করলে । অন্যথায় বায়াস চলে আসছেই! এর মানে হচ্ছে রিসার্চ স্ট্যাটিস্টিক্স একটা গড়পড়তা ধারণা দেবে , কিন্তু নিখুঁত ধারণা দিতে পারে না।

বাংলাদেশে মাস্টারবেশন বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন নাকি সহজ? কেন?

  • খুব কঠিন!

মূলত বাংলাদেশে এবিষয়ে আমরা শিক্ষা পাই ছেলেবেলায় বন্ধুর কাছ থেকে শুনে! অথবা ক্যানভাসারের মজমার আসর থেকে যারা উল্টা পাল্টা বলে বিভিন্ন যৌন রোগের ঔষধ বিক্রি করে। বাংলাদেশে সেক্স এডুকেশন ট্যাবু হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি নিয়ে স্কুল কিংবা পরিবারে কোথাও আলোচনা করা হয় না। যারা ভাল জানেন তাঁদের অনেকেই সময় পান না সেসব বিষয় শেয়ার করার। ডাক্তারের কাছ থেকে যাওবা জানার একটু সুযোগ থাকে কিন্তু বেশির ভাগ ডাক্তার সেক্স বিষয়ে ব্যাকডেটেড নলেজ নিয়ে পড়ে থাকেন। সুযোগ অথবা সময়ের অভাবে নিজেদের আপডেট করেন না। ফলাফল হচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে সঠিক তথ্য কোথাও জানার উপায় নেই কিংবা যা জানা হচ্ছে তা বেশির ভাগ ভুল তথ্য। ধন্যবাদ!

লিখাটি ডাঃ Tunazzina Mehjabin এর সৌজন্যে!

Comments

রবিউল হাসান

রবিউল হাসান

বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়। বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে। বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো। অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায় অনায়াসে সম্মতি দিও না। কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়, তারা আর কিছুই করে না, তারা আত্মবিনাশের পথ পরিস্কার করে।” -নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

9 মন্তব্য on "মাস্টারবেশন নিয়ে কিছু কথা"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
আমিন
অতিথি

“কিন্তু সেটি যদি গ্রামের ১২/১৩ বছরের ছেলেমেয়ে হয়, দেখবো তাদের অলরেডি যৌন অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে।” কথাটার সত্যতা কতটুকু!

আহমেদ রিফাত
অতিথি

মাঝেমধ্য অনলাইন সংবাদগুলোতে এমন কিছু লেখা পাই যা পড়লে মনে হয় মাষ্টারবেট করা পৃথিবীর জঘন্য অপরাধগুলির একটি! যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীদের মাষ্টারবেট বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয় | সেক্স এডুকেশান বিষয়ে এদেশে অবশ্যই সচেতনতা বাড়ানো উচিত, কিন্তু বাঙলাদেশে এটা এখনো ট্যাবুই রয়ে গেছে..

Rajib
সদস্য

অবিবাহিত বা কিশোর যুবক দের জন্য সপ্তাহে ৩/৪ বার মাস্টারবেশন কোন সমস্যা না। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই বা দিনে একাধিক বার মাস্টারবেশন ক্ষতিকারক হতে পারে।

Rajib
সদস্য
রবিউল ভাই, কারো সমস্যা না থাকলে সেখানে তো কোন কথাই নেই। কিন্তু উনি শুধুমাত্র এটাই বলেছেন। এটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কিন্তু এটা কিন্তু শুধু একটা “উদাহরণ” ছিল মাত্র। বাস্তবে (ফ্যাক্ট) হাইফ্রিকোয়েন্সি স্যাম্পেল এর উপরে কোন গবেষণা রিপোর্ট না। বাস্তবে এই নিয়ে কাজ হয়েছে এমন একাধিক গবেষণার জার্নাল রিপোর্ট সহ আমি এই বিষয়ে একটা লেখা জমা দিয়েছি। পাবলিশ হলে পড়ার অনুরোধ করব।আবারো বলছি কেউ দিনে ৫ বার করেও সমস্যা ফিল না করলে সেটা অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা হিউম্যান সেক্সুয়াল ক্যাপাবিলিটি এক্সিড করার সম্ভাবনা আছে খুব বেশি দীর্ঘ সময় যেমন ৬+ মাস এরকম একটানা করলে, তাই এভারেজ রেট হল ৩/৪ বার দীর্ঘ… আরো পড়ুন
rayhan
অতিথি

দাদা, আপনার ফেসবুক আইডির নামটা বলবেন দয়া করে? একটু যোগাযোগ করতে চাই….

যাযাবর
অতিথি

মাস্টারবেশন চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটে,
আবার মাস্টারবেশনই পরবর্তী চাহিদার জন্ম দেয়,
সহনশীল বা স্বাভাবিক মাএা নিরুপন করাটাই মুশকিল।

wpDiscuz