তিল রহস্য

প্রেক্ষাপট – বুধের সরণ

দিনটা ছিল ২০১৬ সালের ৯ই মে। সূর্যের বুকে ছোট্ট একটা কালো তিলের মতো গজিয়ে ওঠা বস্তু দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম ঐ দিন। আদতে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে খুদে সদস্য – বুধগ্রহ, ঐ দিন সূর্যের ওপর দিয়ে পরিক্রমণ করছিল। বুধ গ্রহ যখন ঘুরতে ঘুরতে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে আসে, তখন বুধকে সূর্যের বুক জুড়ে চলন্ত একটি ছোট কালো অন্ধকার বিন্দু হিসেবে দেখা যায়। এই ঘটনাকে সূর্যের বুক জুড়ে বুধ গ্রহের পরিক্রমণ বা বুধের সরণ বলে।

বুধের সরণ

বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য ও নেপথ্য কারণ

এখন এই জাতীয় ঘটনা শুধু যে বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, সব শ্রেণীর মানুষের কাছেই এর আকর্ষণ বাড়ছে। তা এই উৎসাহ কি শুধু একটি মহাজাগতিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার জন্য, না পৌরাণিক গল্পগাথা রাহু ও কেতুর কবল থেকে চন্দ্র ও সূর্যের মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ-এর মতো মহাজাগতিক ঘটনার কারণ বোঝার জন্য? সূর্যগ্রহণ-এর মতো ঘটনা থেকে আমরা যেমন পৃথিবীর আবহমণ্ডল, সূর্যের আলোকমণ্ডল ও নিঃসৃত বিকিরণ, আয়নমণ্ডল দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের ওপর প্রভাব প্রভৃতি নানা বিষয়ে কিছু জ্ঞান লাভ করেছি, তেমনই এই পর্যবেক্ষণ এবং তার থেকে পাওয়া ফলাফল থেকে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা যেতে পারে এবং তাই এই প্রচেষ্টা। একই ঘটনা শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে বা পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। চাঁদের ক্ষেত্রে যা ঘটে সেটাকে আমরা সকলে চিনি সূর্যগ্রহন হিসেবে। সূর্যের বুকের উপর দিয়ে বুধের এমন সরণের কারণ কী? বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যগ্রহণের বা চন্দ্রগ্রহণের নেপথ্যে যে জ্যামিতিক কারণ, সরণের ক্ষেত্রেও তা-ই। ছায়া উৎপন্ন হওয়ার জ্যামিতি।

বছরের কোন সময়ে ঘটে ও কেন?

বুধের সরণ শুক্র বা চন্দ্রের তুলনায় সংখ্যা বেশি হয়। প্রতি একশো বছরে ১৩ থেকে ১৪ বার সাধারণত মে ও নভেম্বর মাসে ঘটে থাকে। তা বছরের অন্য সময়ে নয় কেন? বুধ গ্রহের সরণ ঘটবে শুধুমাত্র যদি গ্রহটি সূর্যের নিম্নতম সংযোগে থাকে এবং পৃথিবীর গ্রহণসংক্রান্ত সমতল কক্ষপথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। এককথায়, যদি সকলে একই সঙ্গে একই সমতলে একই সরলরেখায় থাকে তবেই। পৃথিবীর ইতিহাসে বর্তমান সময়কালে বুধের কক্ষপথ প্রতি বছর মে এবং নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে পৃথিবীর সমতল কক্ষপথ অতিক্রম করে। আর সেই সময়ে বুধ যদি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে আসে তখনই একটি সরণ দেখা যায়। চাঁদের ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট কোণ থাকার জন্য যেমন আমরা প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পাই না, তেমনই বুধের ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট কোণ থাকার জন্য প্রতি মে বা নভেম্বর মাসে সরণ হয় না।

বুধের ও পৃথিবীর কক্ষতলের একটি প্রতিরূপ

মে মাসে ঘটা সরণের সংখ্যা নভেম্বরে ঘটা সরণের সংখ্যার মোটামুটি অর্ধেক। মে মাসের সরণ হয় ৮ মে এবং নভেম্বরের সরণ হয় ১০ নভেম্বর তারিখকে কেন্দ্র করে। একটি নভেম্বরের সরণ ও পরবর্তী নভেম্বরের সরণ এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান ৭, ১৩ বা ৩৩ বছর হতে পারে এবং একটি মে মাসের সরণ ও পরবর্তী মে মাসের সরণ এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান হয় ১৩ বা ৩৩ বছর। কারন, মে মাসের সরনের সময় বুধ থাকে অপসূর (গ্রহ বা ধূমকেতুর কক্ষপথের যে স্থান সূর্য থেকে দূরতম) অবস্থানে অন্যদিকে নভেম্বর মাসের সরণের সময় বুধের অবস্থান হয় অনুসূর (গ্রহের বা ধুমকেতুর কক্ষের যে বিন্দু সূর্যের নিকটতম)। অনুসূর অবস্থানে সরণ অপসূর অবস্থানে সরণের তুলনায় ঘন ঘন হয় তার কারণ মূলত দুটিঃ প্রথমত, অনুসূর অবস্থানে কক্ষপথে বুধের গতি বেশী থাকে এবং আরো দ্রুত পরিক্রমণ বিন্দু (transit node)-তে পৌঁছতে পারে, এবং দ্বিতীয়ত, অনুসূরে বুধ সূর্যের কাছাকাছি থাকায় উভয়ের মধ্যে লম্ব দূরত্ব কম হয়। মে মাসের সরণে বুধের কৌণিক ব্যাস হয় ১২” এবং এই পরিক্রমণ হয় অবরোহী বিন্দুগামী (descending node); পক্ষান্তরে, নভেম্বর মাসের সরণে বুধের  কৌণিক ব্যাস হয় ১০” এবং এই পরিক্রমণ হয় অধিরোহী বিন্দুগামী (ascending node)। মাঝে মাঝে বুধের পরিক্রমণে সূর্যের উপর শুধুমাত্র একটি আঁচড় মনে হয় কারণ সেক্ষেত্রে পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে একটি পূর্ণ সরণ হয় যখন অন্যান্য অঞ্চলে শুধুমাত্র একটি আংশিক সরণ (কোনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংযোগ থাকে না) হয়।

বুধের অবরোহী, অধিরোহী সরণ ও বুধের পরিক্রমণে সূর্যের উপর শুধু একটি আচড়

গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংযোগ

এবার একটু জেনে নেওয়া যাক, যেকোন গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সংযোগ কাকে বলে? প্রথম সংযোগ – যে মুহূর্তে একটি গ্রহণের আংশিক পর্যায় শুরু হয়; দ্বিতীয় সংযোগ – যে মুহূর্তে একটি গ্রহণের পূর্ণ বা বলয়াকার পর্যায় শুরু হয়; তৃতীয় সংযোগ – যে মুহূর্তে একটি গ্রহণের পূর্ণ বা বলয়াকার দশা শেষ হয় এবং চতুর্থ সংযোগ – যে মুহূর্তে যখন একটি গ্রহণের আংশিক পর্যায় শেষ হয়। আলোর পথের সাপেক্ষে শীর্ষছেদ লম্বভাবে দেখলে ছবিটি পাওয়া যাবে।

প্রচ্ছায়া ও উপচ্ছায়া অঞ্চল লম্ব দিক থেকে দেখলে যেমন দেখা যাবে (চন্দ্রগ্রহনের চিত্র হলেও বুধের সরণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক)

ঠিক দ্বিতীয় সংযোগের পরে ও তৃতীয় সংযোগের ঠিক আগে একটি ছোট কালো অশ্রুবিন্দুর মতো (অবশ্যই বৃহৎ সূর্যের প্রেক্ষাপটে) গঠন সংযোগস্থলে দেখা যায়। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংযোগ আলাদা করে ভালভাবে বোঝাই যায় না। আর যখন প্রান্তগামী হয় তখন তো একেবারেই নয়। এই ব্যাপারটিকে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক ড্রপ এফেক্ট বলছেন। আর এজন্যই বুধের একটি আংশিক সরণে কোনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংযোগ থাকে না। বোঝার সুবিধার জন্য শুক্রগ্রহের পরিক্রমণের ক্ষেত্রে ব্ল্যাক ড্রপ এফেক্ট-এর একটি চিত্র দেওয়া হল।

৮ জুন ২০০৪ সালে ঘটা শুক্রগ্রহের পরিক্রমণের ক্ষেত্রে ব্ল্যাক ড্রপ এফেক্ট

পরিশেষে

বুধ গ্রহের পরিক্রমণ পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছিল প্রায় ৪০০ বছর আগে। সেই থেকে চলার শুরু। আমরা ভারতে বসে বুধের সরণ দেখতে পাব আবার ২০৩২ সালের নভেম্বর মাসে। কারণ, ২০১৯-এর নভেম্বরের সরণ ভারত থেকে দেখা যাবে না। তবে পৃথিবীর যেখান থেকেই দেখা যাক, সেই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানের নবদিশা উন্মোচন করুক, এই হোক আমাদের প্রার্থনা।

তথ্যসূত্র

১) বুধের সূর্য-সরণ, বিজ্ঞান, নভেম্বর ২০১৬

২) নাসার গ্রহণ সংক্রান্ত ওয়েব পেজ

Comments

সুমন পাল

লেখক হরেন্দ্র কুশারী বিদ্যাপীঠে সহকারী শিক্ষক এবং ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র সান্ধ্য মহাবিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে অতিথি অধ্যাপক রূপে কর্মরত। লেখাপড়া কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (University College of Science) থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে B.Ed. এবং Ph.D.। গবেষণার ক্ষেত্র – আয়নমণ্ডলের প্লাজমা ও তাপীয় ঘটনাবলী, আবহবিদ্যুৎ ও চুম্যান অনুনাদ, রেডিও তরঙ্গ, ভূকম্পন। বর্তমানে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre of Advanced Study in Radio Physics and Electronics-এ আংশিক সময়ের গবেষক।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz