নাসা স্পেস মিশন – যে কারণে এখনো মানবজাতির উপর বিশ্বাস আছে

আমরা পুরো মানবজাতি একে অন্যের উপর হতাশ। ধর্মপ্রাণরা বিধর্মীদের উপর হতাশ, বিধর্মীরা আবার সেই ধর্মপ্রাণ কিন্তু বিধর্মীদের (!) উপর হতাশ। ধর্মী-বিধর্মীরা আবার ধর্মবিহীনদের উপর মিলিতভাবে হতাশ। এইদিকে যারা “যার যার ধর্ম তার তার” নীতিতে বিশ্বাসী, তাদের মাঝেও হতাশা। সরকারি দল হতাশ বিরোধীদলকে নিয়ে, বিরোধীদল হতাশ সরকারি দলকে নিয়ে। অফিসের বস হতাশ তার কর্মচারী নিয়ে, কর্মচারী হতাশ বসকে নিয়ে। পুরুষেরা হতাশ নারীদের নিয়ে, নারীরা হতাশ পুরুষদের নিয়ে। এত কিছু দেখে ঈশ্বর এখন নিজেই পুরো মানবজাতির উপর হতাশ। আর ঈশ্বরের হতাশা দেখে যেসব স্বর্গীয় দূতেরা তাঁকে শুরুতেই মানবজাতি সৃষ্টি না করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তারা নিজেরা এখন আড়ালে চোখ টেপাটেপিতে আর কনুই গুঁতোগুঁতিতে ব্যস্ত।

কিন্তু গুটিকয় মানুষ আছে, যারা এখনো হতাশ নয়। এত হিংসা, বিদ্বেষ, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, ইট-পাটকেল মারামারি, অন্যের পরনের কাপড় টানাটানির মাঝেও তারা কোত্থেকে কোত্থেকে যেন আশার আলো খুঁজে পান! আমি নিজে হয়তো তাদের মত হয়ে উঠতে পারিনি, কিন্তু তবুও মাঝেমাঝে নিজেকে তাদের মত ভাবতে ভালো লাগে। অন্যেরা কোত্থেকে এসব আশা-ভরসা খুঁজে পায়, জানি না। কিন্তু সুঠাম ব্যক্তিদের শরীরের শক্তির উৎস যেমন ডানো দুধ (কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো কলিকাতা হারবাল), তেমনি আমার মনের সকল আশা-ভরসার উৎস হচ্ছে বিজ্ঞানচর্চা।

আমি সবসময় আমার চারপাশের মানুষজনকে জ্ঞানচর্চা ধরে রাখার ব্যাপারে উৎসাহ দিই। কিন্তু বহুবারই হতভম্ব হয়ে গেছি যখন তাদের অনেকে বলে, “তিরিশ বছরে যেটা শিখতে পারি নাই, সেটা এখন আর কীভাবে শিখবো?” এই কথার অর্থ অনেকটা এমন দাঁড়ায় – যে শিক্ষায় পকেটে দু’পয়সা বেশি আসে না, সেই শিক্ষার কোনো মানে নেই।

শিক্ষিত মানুষের মুখে এই ধরণের কথা শুনে আমার নিজেরও হতাশ হয়ে পড়তে ইচ্ছা করে। সত্যি কথা হলো, যারা জানে যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমুদ্র কত ব্যাপক, তারাই পড়ার মত কিছু পেলে সেটা গোগ্রাসে গিলতে শুরু করে। আশেপাশের জগতে কী ঘটছে, সেটা নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর তেমন সময় নেই। ভবলীলা যেকোনো মুহূর্তে সাঙ্গ হয়ে যাবার আগেই যতটুকু সম্ভব এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে জেনে যেতে হবে। আর প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময়ও তারা কেমন যেন ইতস্তত করে। কারণ তাদের মনে সবসময়ই বাজে “আমি তো কিছুই জানি না, কিছুই শিখতে পারিনি; কী নিয়ে কথা বলবো?”

যাই হোক, কথা বলছিলাম পুরো মানবজাতির হতাশা আর গুটি কয়েকজনের মত আমার কিছু আশা-ভরসার ব্যাপার নিয়ে। আমি এখন আশা খুঁজে পাই মহাশূন্যে – ছায়াপথ, নীহারিকায়। মহাশূন্যের বিশাল শূন্যতা আমি বড়ই ভালোবাসি। সত্যি কথা হলো, শুধু আমি নই, সবাই-ই মহাশূন্যকে বড়ই ভালোবাসে। সারাদিন অনলাইনে, অফলাইনে, সাইডলাইনে একে অপরের পশ্চাতে বাঁশ ঢুকিয়ে এবং নিজের পশ্চাতে বাঁশ ঢুকানো ঠেকিয়ে, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে যখন রাতে ঘরে ফিরে অন্ধকার সেই বিশাল জগতের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় এই পৃথিবীতে আসলে চাপাচাপিটা একটু বেশি হয়ে গেছে। সেই চাপাচাপিতে সব ভাব-ভালোবাসা দশ টনি ট্রাকের নিচে চাপা পড়ার মত পিষে থেঁতলে গেছে। কিছু মানুষ ঐসব ছায়াপথের কোনো এক গ্রহে পার্সেল করে দিতে পারলে মন্দ হতো না। তাহলে হয়তো সবাই একটু দম ফেলার জায়গা পেত। বিদ্বেষ, মারামারিও একটু কমতো।

সত্যি কথা হলো – আমার চিন্তাভাবনার চেয়ে খুব একটা ব্যতিক্রম নন নাসার বিজ্ঞানীরা। তবে তারা শুধু একটু দম ফেলার ফুরসতের জন্যেই ছায়াপথ হতে ছায়াপথে পৃথিবী সদৃশ গ্রহের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন না। বরং তাদের এইসব স্পেস মিশনে আরো কিছু ব্যাপার আছে, যা আমাকে এখনও পুরো মানবজাতির উপর ভরসা হারিয়ে ফেলা থেকে বিরত রাখছে। যেমন-

বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপায় তরল পানির খোঁজ লাভ

মহাশূন্যে আমাদের পদচারণা শুরু করার পর থেকে আজ অবধি আমরা ইতিউতি তাকিয়ে একটা জিনিসই খুঁজে বেড়াচ্ছি। সেটা হচ্ছে ‘পানি’। প্রথমে চাঁদে খুঁজে দেখলাম, পেলাম না। এরপর দেখলাম মঙ্গলে, কিন্তু সেটাতেও ব্যর্থ। খুঁজতে খুঁজতে আমাদের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি এখন সৌরজগত ছাড়িয়ে অন্য গ্যালাক্সিতেও গিয়ে পড়েছে, কিন্তু পানির কোনো হদিস নেই। পানির খোঁজে আমাদের যখন ‘হায় হাসান! হায় হোসেন!!’ দশা, ঠিক তখন ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-২ বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপার একটা ছবি পাঠালো যেখানে বিশাল এক বরফে আচ্ছাদিত এলাকা দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু যেহেতু বৃহস্পতি সূর্য হতে অনেক বেশি দূরে অবস্থিত, তাই সবাই ধারণা করে নিলো, সেই পানি আর ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই, জমাট বেঁধে গেছে।

পরবর্তীতে যখন স্পাই ক্যামেরার দায়িত্ব পাওয়া হাবল টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের অলি-গলি, কানাগলি সব জায়গায় ফুচকি মেরে বেড়াচ্ছিলো, তখন ২০১৩ সালে তার ক্যামেরায় ইউরোপা উপগ্রহের একটা আজব জিনিস ধরা পড়লো। সেখানে স্পষ্ট দেখা গেলো, ইউরোপার মেরুতে বরফের মাঝ দিয়ে ঝর্ণা বয়ে চলার মত কিছু একটা দেখা যাচ্ছে! তখন বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করলেন, বরফের সেই এলাকায় শুধু উপরিতলেই বরফের আচ্ছাদন রয়েছে। কিন্তু এর নিচে আসলে রয়েছে তরল পানির এক মহাসমুদ্র! ইউরোপার কেন্দ্র আসলে যতটা শীতল মনে করা হয়েছিলো, ঠিক ততটা নয়। বরং সেই উত্তপ্ত কেন্দ্র মহাসাগরের সেই পানিকে জমে এখনো বরফ হতে দেয়নি, উপরে বরফের হালকা আচ্ছাদন পড়েছে মাত্র।

খুব শীঘ্রই ইউরোপার উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হবে। একটা মহাকাশযান সেখানে গিয়ে পানির কিছু নমুনা সংগ্রহ করবে। যদি কপাল ভালো থাকে, তবে পানির নমুনায় হয়তো নতুন জীবনের খোঁজ পাওয়া যাবে। বেশি কিছু নয় – এককোষী কিছু ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেলেই যথেষ্ট।

এমনটা ঘটবে আমাদের প্রজন্মেই। আর যদি এমনটা ঘটে তবে আমাদের এই প্রজন্ম হবে মহাজাগতিক ইতিহাসের সাক্ষী। ভবিষ্যতে যদি কখনো সম্পূর্ণ একটা এলিয়েন সভ্যতার সাথে আমাদের পরিচয় হয়, তখন এর শুরু হিসেবে বিবেচিত হবে আমাদের প্রজন্মের এই সময়টা। সুতরাং অস্থিরতা, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, অশান্তির যুগ বলে আমি এই সময়টাকে কোনভাবেই মানতে রাজি নই। যারা হিংসা-হানাহানি নিয়ে ব্যস্ত, তারা নিজেরা নিজেরা কাটাকাটি করেই মরবে। ওটা সব যুগেই ছিলো। কিন্তু মানবসভ্যতার এই সময়টুকু ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে নতুন এক প্রাণের সাথে পরিচিত হবার সময় হিসেবে, মানুষের সাথে মানুষের হানাহানির সময় হিসেবে নয়।

পৃথিবীর জমে যাওয়া বরফের নিচে বিশাল সমুদ্রে যখন আমরা এককোষী হয়ে ভাসছিলাম, তখনও নিশ্চয়ই আমাদের নিয়ে কেউ না কেউ গবেষণা করছিলো। তারাও নিশ্চয়ই এক পর্যায়ে মারামারি-কাটাকাটি করে ধ্বংস হয়ে গেছে! আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হবে। কিন্তু তাই বলে আমাদের বর্তমান সময়টাকে নিয়ে হতাশ হবার কিছু নেই। ইতিহাস অপ্রয়োজনীয় সবকিছু দুইদিন পর নিজে থেকেই ছুঁড়ে ফেলে দিবে। রেখে দিবে শুধু এক প্রাণের সাথে নতুন আর এক প্রাণের মিলনের বার্তাটুকু। বহু বছর পরে সেটা হয়ে যাবে কিংবদন্তী। মিলিয়ন বছর পর এই নতুন সভ্যতা হয়তো আমাদের সাথে তাদের এই সাক্ষাৎকে দেখবে মিথলজি হিসেবে, যেমনটা আমরা আমাদের মিথলজিতে দেখি।

মানব সভ্যতার বার্তা বুকে নিয়ে ভয়েজারের ছুটে চলা

অনেকেই আছেন ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবের, তাদের কথা বাদ। এখানে বলছি কঠিন স্বভাবের মানুষদের কথা, যাদের চোখে সহজে পানি আসে না। তারা কোনো কিছুতেই আবেগে আপ্লুত হন না। কিন্তু এই স্বভাবের মানুষদেরও তিনটা সময়ে ছাড় দেয়া যায়, যখন তারা ইচ্ছা করলে হালকা কান্নাকাটি করতে পারেন।

১। যখন তারা জন্ম নেন – এটা করতেই হবে। যতক্ষণ না কাঁদবে, ততক্ষণ ছাড়াছাড়ি নাই। না হয় উল্টো করে ধরে পশ্চাদ্দেশে শক্ত মার দেয়া হবে।
২। যখন তাদের আত্মার সম্পর্কীয় কেউ মারা যান – মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান অনেকেই এই তালিকায় যোগ হতে পারে।
৩। যখন কেউ ভয়েজার সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেন।

১৯৭০ এর দশকের শেষে ভয়েজার-১ এবং তারপরে ভয়েজার-২ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিলো মূলত বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহের ছবি তুলে পাঠানোর জন্যে। কিন্তু এর আরেকটা গৌণ উদ্দেশ্য ছিলো। সেটা হলো, মনুষ্য উৎক্ষেপিত এই বস্তু মহাকাশে কতদূর পর্‍যন্ত ছুটে যেতে পারে, তা দেখা। উৎক্ষেপণের ৩০ বছরেরও বেশি সময় পরে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট এটা আমাদের সৌরজগতের সীমানা ছেড়ে বাইরের ব্রহ্মান্ডে পা রেখে সৌরজগতের বাইরে যাওয়া প্রথম মনুষ্য নির্মিত বস্তু হিসেবে নাম কুড়িয়েছে।

এই ভয়েজারের মূল চমকপ্রদ ব্যাপারটা কিন্তু এই নয় যে – এটা এখন এমন দূরত্বে অবস্থিত, যেখানে সূর্‍যের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিরও এটাকে টেনে ভেতরে নিয়ে আসার ক্ষমতা নেই। মূল ব্যাপারটা এটাও নয় যে – বস্তুটা পুরোপুরি মনুষ্যনির্মিত। এটার চমক জাগানিয়া ব্যাপারটা হলো, এর ভেতরে ভরে দেয়া তথ্যাবলী। এটা আসলে বিশাল মহাসমুদ্রে মানবজাতির পক্ষ হতে একটা কাঁচের বোতলে ভরে দেয়া বার্তা। এর ভেতরের বার্তার জন্যে ভয়েজার আমাদের মানব সভ্যতার নিকট অনন্য।

বিশ্বখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী এবং সায়েন্স ফিকশান লেখক ‘কার্ল সেগান’ এই ভয়েজার প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিভিন্ন দায়িত্বের মাঝে একটা ছিলো – ভয়েজারে এমনভাবে কিছু বার্তা ভরে দেওয়া, যাতে তা সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে বাইরের গ্যালাক্সির কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর হাতে পড়লে, তারা যেন তা সহজেই পাঠোদ্ধার করতে পারে এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক কোণায় পড়ে থাকা মানবজাতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পায়। লিখিত কিছু বার্তার সাথে সাথে কার্ল সেগান এবং তার কর্মীরা একটা স্বর্ণালী রেকর্ড ডিস্ক ভরে দিলেন। এই ডিস্কের মেমরির চেয়ে বর্তমানে আপনার হাতের চায়না মোবাইলের মেমরি অনেকগুণ বেশি। কিন্তু তবুও তারা মোটামুটি পৃথিবীর কিছু ডিজিটাল ছবি, শব্দ, গান এবং ৫৫ টি ভাষায় অভিবাদন জুড়ে দিলেন। এর মধ্যে বাংলায় “নমস্কার, বিশ্বে শান্তি হোক”-ও আছে। শব্দের মধ্যে আছে – একজন মানুষ আরেকজনকে চুমু খাবার শব্দ, নবজাত বাচ্চার কান্নার শব্দ, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ, সদ্য কথা বলতে শেখা বাচ্চার আবোল তাবোল কথামালা, পাখির শব্দ ইত্যাদি। যে করেই হোক, হয়তো তাদের ধারণা হয়ে গিয়েছিলো যে, এই রেকর্ডটা এমন কোনো এলিয়েনদের হাতে গিয়ে পড়বে, যারা সারাদিন হো হো করে হাসে, আর কান্না পেলে শুঁড়ের মত বস্তু দিয়ে চোখ মোছে। হয়তো তারা ভেবেছিলো, এই রেকর্ডটা শুনে এলিয়েনরা পৃথিবী দখলের চিন্তা বাদ দিয়ে অন্য কোনো গ্রহ আক্রমণের চেষ্টা করবে। ডিস্কে হাবিজাবি অনেক কিছু জুড়ে দেয়ার পরেও তাতে কয়েক মিনিটের মত স্পেস খালি রয়ে গেলো। কার্ল সেগান এবং তার টিম চিন্তা করতে লাগলেন, এতে আর কী ভরে দেওয়া যায়। তারা চাইছিলেন এই জায়গাটুকুতে এমন একটা কিছু দিতে, যেটা দিয়ে পুরো মানব সভ্যতাকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা যাবে। কিন্তু তারা কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না। শেষে ভেবে ঠিক করলেন – জীবনদর্শন ছাড়া মানুষ বাঁচে কীভাবে? তাই টিমের একজন ভলান্টিয়ার মানব জীবন, তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করবেন, আর একই সময়ে তার ইইজি রেকর্ড করা হবে। পরে সেটা ডিস্কে ভরে দেয়া হবে।

এই সেই গোল্ডেন ডিস্ক!

এই সেই গোল্ডেন ডিস্ক!

এইদিকে ঘটছিলো আরেক মজার ঘটনা! সেটা হলো – কার্ল সেগানের টিমে একজন বিজ্ঞানী ছিলেন যার নাম ‘অ্যান ড্র্যুইয়্যান (Ann Druyan)’। তিনি কীভাবে কীভাবে যেন সেগানের প্রেমে পড়ে গেলেন। প্রেম মানে পুরো হাবুডুবু খাওয়ার অবস্থা! কিন্তু সেগান তাকে ‘সহকর্মী’ হিসেবেই দেখেন। আর দিনরাত ভয়েজার প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আমাদের অ্যানিও তাই মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। একদিন আর না পেরে “কপালে যা আছে লেখা/মনে যদি পাইও ব্যথা/ দেখে নেবো আমি এর শেষ” নীতি নিয়ে মাঠে নামলেন। সেগানকে বলে ফেললেন তার মনের কথা।  সেগান এক ঘন্টা ধরে পুরো বক্তব্য চুপচাপ মন দিয়ে শুনলেন। তারপর গম্ভীর গলায় জানালেন, তিনি অ্যানিকে বিয়ে করতে চান। এই কথা বলেই সেগান বাইরে গিয়ে যথারীতি আবার প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। এরপরে কী ঘটেছিলো, তা অ্যানির বিশেষ মনে নেই। এর কারণ সম্ভবত তিনি পরের ঘণ্টাখানেক নাসা অফিসে তার চেম্বারে একলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন। তাই সেই সময়কার কোনো স্মৃতি তার মনে নেই।

যাই হোক, এর কিছু পরে আমাদের অ্যানিই প্রস্তাব করলেন তার মস্তিষ্কের ইইজি রেকর্ড করা হোক। কারণ মানুষ সংজ্ঞায়িত হয় ভালোবাসায়। শুধুমাত্র একটা শব্দে যদি মানুষকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয় – তাহলে সে শব্দটা হতে পারে শুধু ‘ভালোবাসা’। একজন মানুষ কতটা তীব্র ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে পারে, সেটার প্রমাণ হিসেবে তাই সংগ্রহ করা হলো অ্যান ড্র্যুইয়্যানের মস্তিষ্কের ইইজি।

image_full (1)

অ্যান ড্রুইয়ানের মস্তিষ্কের তরঙ্গের কিছু নমুনা, রেকর্ড করা হয়েছিলো ১৯৭৭ সালের ৩ জুন

পুরো ইইজি রেকর্ড করার সময় সেগান অ্যানির পাশে ছিলেন। সেই অনুভূতির কথা সরাসরি অ্যানির মুখ থেকেই শুনুন, “It was a Eureka! moment for both of us—the idea that we could find the perfect match. It was a discovery that has been reaffirmed in countless ways since…………………………….For me Voyager is a kind of joy so powerful, it robs you of your fear of death.”

পরে সেই ইইজিকে ভয়েজার নামক একটা রকেটে ভরে অসীম অন্ধকার এক সাগরে অজানার উদ্দেশ্যে ভাসিয়ে দেয়া হলো মানব সভ্যতার এক প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯৮২ সালে সেগান এবং অ্যানের বিয়ে হয়। ১৯৯৬ সালে সেগান মৃত্যুর আগ পর্‍যন্ত অ্যান ড্র্যুইয়্যানের সাথে সংসার করে যান।

Carl-and-Ann-by-Luxemburg_lg

অ্যান ড্রুইয়ান এবং কার্ল সেগান

বর্তমানে পৃথিবী হতে ১১.৭ বিলিয়ন মাইল দূরত্বে অবস্থিত ভয়েজার এই বার্তা নিয়ে প্রতি ঘন্টায় ৩৮,০০০ মাইল বেগে ছুটে চলছে মহাশূন্যের অন্ধকার বুক চিরে। এই ডিস্ক আদৌ কারো হাতে পড়বে কিনা জানা নেই। কিংবা ভয়েজারই বা আর কতদূর যাবে, তাও কেউ জানে না। কিন্তু আমরা এটা জানি যে, আমরা অন্তত চেষ্টা করেছিলাম আমাদের সেরাটুকু দিতে।

ভয়েজার হচ্ছে আমাদের মানব সভ্যতার একটা হৈ-হুল্লোড় মাখা দিনের ‘ফ্যামিলি ফটো’। এখানে আমরা সবাই হাসি হাসি মুখে ক্যামেরাম্যানের দিকে তাকিয়ে আছি, আর পেছনের ২-৪টা বাঁদর ভেংচি কেটে পুরো ছবির মুডটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যখন বাকিরা তাদের দেখছে, তারাও পেটফাটা হাসি সামলাতে পারছে না। একদিন আমরা সবাই ধূলোয় মিশে যাবো। কিন্তু যাবার আগে সবাই একসাথে কিছুটা ভালোলাগার যে মুহূর্ত কাটালাম, সেই স্মৃতি নিঃসীম অন্তরীক্ষের এক কোণা হতে আরেক কোণায় ভেসে বেড়াবে আজীবনের জন্যে। সেখানে কোথাও আমাদের এসব ঠুনকো ব্যক্তিস্বার্থ, দ্বেষ, হিংসার স্থান নেই।

তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো – আমরা যেসব গুণের কারণে মানুষ, ভয়েজার সেসব গুণের প্রতিনিধিত্ব করে। সেটা কেমন? ভয়েজার চলে কঠিন যান্ত্রিকতার যুক্তিতে, কিন্তু একই সাথে সেটা ধারণ করে অসম্ভব ভালোবাসাকে পাবার অদম্য যে আকাঙ্ক্ষা – সেই বার্তাটিকে। মানুষ হিসেবে আমাদের মূল সার্থকতা হচ্ছে কঠিন সব যুক্তিতে চলার পরেও তার সেই ভালোবাসাকে চারপাশে ছড়িয়ে দেয়া। এই নশ্বর জীবনে আরাধ্য বস্তুকে স্পর্শ করা গেলো কি গেলো না, তাতে কী আসে যায়? সেই আরাধ্য বস্তুর প্রতি আবেগ বুকে নিয়ে এই বিশ্বজগতের এক কোণা হতে আরেক কোণায় ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেয়াতেই তো আমাদের মূল উদ্দেশ্য নিহিত!

…………হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝতে পারছি, আপনার পাশে বসে কেউ সমানে পেঁয়াজ কাটছে। তাই আপনার জন্যে নীচের ফটোটা দেয়া হলো।

funny_smile_by_eyeofboa-d3avqeo

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

1 মন্তব্য on "নাসা স্পেস মিশন – যে কারণে এখনো মানবজাতির উপর বিশ্বাস আছে"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
সৌরদীপ্ত
অতিথি
অসাধারন লিখেছেন। [quote] মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-কালো-শ্যামলা-ফর্সা সবাই একসাথে চেষ্টা করে দেখবে নতুন করে আরেকটা সমাজ গড়ে তোলা যায় কিনা। এখন তো আমাদের মাঝে বিতর্ক যে, আমাদের আদি মাতা-পিতারা ফর্সা ছিলেন, তাই ফরসাতেই ভরসা। কিংবা তারা কালো ছিলেন, তাই কালোরাই জগতের আলো। তারা আল্লাহর উপাসনা করতেন, ভগবানের নাম জপতেন, নাকি সূর্‍যের পূজা দিতেন এটা নিয়ে আমাদের মাঝে মাথা ফাটাফাটি। কিন্তু সেখানে আর এটা সম্ভব নয়। যদি সত্যি সত্যি আরেকটা সভ্যতা সেখানে গড়ে উঠে, তবে তাদের আদি পিতা-মাতারা হবে কালো-ফর্সা-হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান সব। অর্থাৎ নাসার বিজ্ঞানীরা চাইছেন এমনভাবে খিচুড়ি পাকাতে, যেটা থেকে চাল-ডাল আর কোনোভাবেই আলাদা না করা যায়। খিচুড়ির আসল স্বাদ শুধু চালে কিংবা ডালে… আরো পড়ুন
wpDiscuz