আমাদের মঙ্গলযাত্রা

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে আমরা খাদ্য আর বাসস্থানের খোঁজে একস্থান থেকে আরেক স্থানে গিয়েছি, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছি। উন্মত্ত সাগরে পাল তোলা জাহাজ ভাসিয়েছি, অজানার দিকে যাত্রা করেছি নতুন কোনো দ্বীপের সন্ধানে। অনেক সময় স্রেফ কৌতুহলবশত, বা অভিযানের নেশায় আমরা পৃথিবীর আনাচে কানাচে গিয়ে পৌঁছেছি। অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে আমরা মহাশূন্যের দিকে যাত্রার শুভ সূচনা করেছি চাঁদে পা রেখে। আমরা স্বপ্ন দেখছি কোনো এক সময়ে আমরা হয়তো আন্তঃনক্ষত্রিক ভ্রমণে বের হবো। এরকম ভবিষ্যতের আভাস এখনই পাওয়া যাচ্ছে। Mars One  ২০২৬ সালে মঙ্গল গ্রহে আমাদেরই চারজনকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ওদিকে রাশিয়া থেকে ঘোষণা এসেছে নিকটবর্তী নক্ষত্র আলফা সেন্টোরিতে  মহাকাশযান পাঠানোর কথা, যা কিনা আমাদের সৌরজগত থেকে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ দুরে! তবে আমাদের মহাকাশ যাত্রার পরবর্তী বড় পদক্ষেপটি হল মঙ্গল গ্রহে পা রাখা।

মঙ্গল গ্রহে পা রাখার জন্য বিজ্ঞানীরা দিন-রাত এক করে কাজ করছেন। বিজ্ঞানের কল্যাণে যে আমরা একদিন এই গ্রহে পা রাখবো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা যে খুব সহজ নয় তাও মাথায় রাখতে হবে।

তো মানবজাতির এই মঙ্গলযাত্রায় অমঙ্গলজনক কারণগুলো কী?

মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো উপযুক্ত মহাকাশযান বানানো। এ পর্যন্ত আমরা মঙ্গলে অনেক রোবট পাঠিয়েছি, মঙ্গলের কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি। কিন্তু মানুষ পাঠাইনি। আর রোবোটিক মিশনের ক্ষেত্রে মহাকাশযানগুলো যথেষ্টই হালকা থাকে। কিন্তু মনুষ্য মিশনের ক্ষেত্রে মহাকাশযানটিকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন তাতে পাঁচজন মহাকাশচারী (ভবিষ্যৎ মঙ্গলবাসী), প্রয়োজনীয় রসদ এবং জ্বালানি বহন করা যায়। সেই সাথে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। এতো কিছুর পর মহাকাশযানটি কয়েকগুণ বেশি ভারী হবে ওইসব রোবোটিক মিশনের যানগুলো থেকে। এরকম একটি জটিল মহাকাশযান তৈরি করার পর বহুদিন মহাশূন্যে ভ্রমণের পর কিছু মানুষকে পৌঁছে দেওয়া হবে মঙ্গলগ্রহে।

কল্পনার চোখে মঙ্গলে উপনিবেশ গড়ার শুরুর দিক। এভাবেই হয়তো একদিন লাল গ্রহটি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠবে

কল্পনার চোখে মঙ্গলে উপনিবেশ গড়ার শুরুর দিক। এভাবেই হয়তো একদিন লাল গ্রহটি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠবে। ছবিঃ Mars-One

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং এর মাটিতে নিখুঁতভাবে ল্যান্ডিং করা হচ্ছে প্রাথমিক সফলতা। এরপর আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। তা হল মঙ্গলের প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়া। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর থেকে অনেক পাতলা। তারপর আবার প্রয়োজনীয় উপাদানের অনুপাতও মানুষের অনুকূলে না! পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ২০.৯৫% এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড ০.০৩৯%। অন্যদিকে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল কার্বন ডাইঅক্সাইডে ঠাসা। এর পরিমণ ৯৫.৯৭% আর অক্সিজেন অতি সামান্য, মাত্র ০.১৪৬%। বুঝতেই পারছেন, পৃথিবীর মত সেখানে যেয়ে আপনি বুক ভরে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে পারবেন না।

এরপর আছে বিকিরণ (Radiation)। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের জন্য সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে আমরা অনেকাংশেই রক্ষা পাই। কিন্তু মঙ্গলে সেই সুবিধা নাই।

মঙ্গলের অভিকর্ষও আমাদের অনুকূলে না। পৃথিবীতে অভিকর্ষজ ত্বরণ 9.8 m/s² , কিন্তু মঙ্গলে মাত্র 3.8 m/s²। এতো কম অভিকর্ষের জন্য সেখানে দীর্ঘদিন থাকলে শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস পাওয়া, পেশী আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। যদিও এই সমস্যা ব্যায়াম এবং ওষুধ দ্বারা এড়ানো সম্ভব।

মঙ্গলে পৌঁছানোর পরে মানব ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ হবে। সৌরজগতের সবচেয়ে বড় পর্বতশৃঙ্গ অলিম্পাস মনস্, যা কিনা মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও তিন গুণ বেশি উঁচু! কে হবে সেই প্রথম মানব যে এর চূড়ায় আহরণ করবে?

উন্মুক্ত আকাশে ওড়ার ক্ষমতা সেই ডাইনোসরের সময়েই প্রাণীরা আয়ত্ত করে। কিন্তু মানুষ বিবর্তনের ধারায় সেই ক্ষমতা পায়নি। কিন্তু তাতে কি! আমরা বহু বছর ধরে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছি। কল্পনার ডানা মেলে আকাশে উড়েছি। বহু রূপকথায় তার প্রমাণ মেলে। এরপর আমরা আমাদের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে কল্পনাকে বাস্তবে রূপদিয়েছি, বানিয়েছি প্লেন, ছুয়েছি আকাশ। কিন্তু এখানেই কৌতুহলী মানুষ থেমে থাকেনি। ১৯৬১ সালে প্রথম আমরা আকাশের সীমানা পেরিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি জমিয়েছি। ১৯৬৯ সালে আমরা প্রথমবারের মত পৃথিবীর বাইরে চাঁদে পা রেখেছি। এখন আমরা স্বপ্ন দেখছি মঙ্গল গ্রহে পা রাখার। আমাদের এই মঙ্গল যাত্রা শুধু মঙ্গল গ্রহে যাওয়াই নয়, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছড়িয়ে পড়ার শুভ সূচনা। আর সেটা যে আমরা করবোই, তা মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা যায়; যদি না আমরা আমাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজেদের ধংস করে ফেলি।

লেখাটা এখানেই শেষ করতে পারতাম। কিন্তু একটা বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত না করে পারছি না। মাঝে মাঝে প্রশ্ন ওঠে,  কেন আমরা মঙ্গলে যাবো? এটা কি খুব দরকার? এটা ঠিক এতো অর্থ আর শ্রম ব্যয় করে এতো দূরে মঙ্গলের নির্মম আবহাওয়া, মারাত্মক বিকিরণ, আর অনুর্বর লাল মাটিতে পা রাখার ইচ্ছা খ্যাপামি মনে হতেই পারে। কিন্তু একবার ভাবুন তো, কেন কলম্বাস পশ্চিমের দিকে যাত্রা করেছিলেন? কেন মার্কো পোলো পুর্ব দিকে অভিযান চালিয়েছিলো? কেনই বা নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের যেতে চেয়েছিলেন? এটা হলো মানুষের কৌতুহল, অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছা আর অভিযানের নেশা। প্রথমে এটা ভেবে দেখুন এটা কত দারুণ অভিযান হবে, পৃথিবী থেকে কোটি মাইল দূরের একটি গ্রহে বাস করা যার দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় পৃথিবীর দিনের সমান। তাছাড়া, সেখানে কত কিছুই না জানার আছে। হয়তো মঙ্গল গ্রহ আমাদেরকে সৃষ্টির আদি সম্পর্কে অনেক তথ্য দিতে পারে। আর এটা জীবের অস্তিত্ব বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ। সব থেকে বড় কথা মঙ্গলে যাওয়া হবে মানব জাতির এ যাবত কালের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ!

The Martian সিনেমায় মার্ক ওয়েটনি মঙ্গলের মাটিতে আলু চাষ করছে। একদিন হয়তো বাস্তবেই মঙ্গলের মাটিতে আলু, পটল, বেগুন ইত্যাদির চাষ হবে।

The Martian সিনেমায় মার্ক ওয়েটনি মঙ্গলের মাটিতে আলু চাষ করছে। একদিন হয়তো বাস্তবেই মঙ্গলের মাটিতে আলু, পটল, বেগুন ইত্যাদির চাষ হবে।

__________________________________________________________________________
তথ্যসূত্র –
১)http://www.mars-one.com/
২)https://en.wikipedia.org/wiki/Mars
৩)https://bigganjatra.org/bigbang_to_us_part_two/

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

1 মন্তব্য on "আমাদের মঙ্গলযাত্রা"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
wizard.showrav
সদস্য

“বিজ্ঞানের কল্যাণে যে আমরা একদিন এই গ্রহে পা রাখবো তাতে সন্দেহ নেই।”
আমার ধারণা মঙ্গলে মানুষ পা রাখার আগেই দ্রুতগতি সম্পন্ন মহাকাশযান তৈরি হয়ে যাবে। আর প্রাণ বা বসবাসের যোগ্য কোনো গ্রহও পেয়ে যাবো! “বিজ্ঞান চলবে অবিরাম!”

wpDiscuz