মেরুর বরফের ভাঙন – আমরা নূহের নৌকা মিস করে ফেলেছি

“দীর্ঘসূত্রিতা, আধ-খ্যাঁচড়া প্রচেষ্টা, সুবিধাজনক ও আরামদায়ক অবস্থান, এবং বিলম্বের দিন শেষ। বরং আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি পরিণামের জগতে।” – উইন্সটন চার্চিল

পটভূমি

২০১০ সালের আগস্টে ম্যানহাটন শহরের চেয়ে ক্ষেত্রফলে চার গুণ বড় (৯৭ বর্গমাইল) এবং Empire State Building এর অর্ধেক উচ্চতার একটি বরফখণ্ড ভেঙ্গে গিয়েছিলো গ্রীনল্যাণ্ডে। এই বরফদ্বীপের মধ্যে এতো পানি ছিলো যে, এটা দিয়ে গোটা আমেরিকার ট্যাপের মধ্যে ৪ মাস ধরে পানি সরবরাহ করা সম্ভব। দুই বছরের মাথায়, ২০১২ সালে এটার অর্ধেক সাইজের (৪৬ বর্গমাইলের) একটা বরফদ্বীপ ভেঙ্গে গিয়েছিলো। আরো দু বছর পর, ২০১৪ সালের মে মাসে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, পশ্চিম এন্টার্কটিকার একটি বিশাল অংশ আগামী শতাব্দীতে গলে যাওয়ার এক ভয়ংকর চেইন রিয়েকশন শুরু হয়েছে, অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে ভয়াবহ ধস।

Point of no return

আশ্চর্যের কিছু নেই, আমাদেরকে তো আগেই সতর্ক করা হয়েছিলো। কয়েক দশক ধরেই, বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলে আসছেন যে, আমাদের পৃথিবী এক আশংকাজনক হারে উত্তপ্ত হচ্ছে এবং আমরা যদি উদ্যোগ না নেই, তাহলে পরিণাম ভয়াবহ হবে। এন্টার্কটিক পেনিনসুলা অন্তত অর্ধেক শতক ধরে উত্তপ্ত হচ্ছে, এবং মহাদেশের পশ্চিম অংশ গত ৩০ বছর ধরে ক্রমবর্ধমান হারে উত্তপ্ত হয়েই চলেছে। এবং এখন আমরা পরিণাম দেখতে পাচ্ছি। আসলে, দেখছি বেশ কিছু সময় ধরেই…

পশ্চিম এন্টার্কটিকার বড় বড় গ্লেসিয়ারগুলো থেকে যে বরফ কমে যাচ্ছে, এবং এই লোকসান ঠেকানোর যে কোনো উপায় নেই – এটা দুটো গবেষণা থেকে স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা বলেছেন যে, এই গ্লেসিয়ারগুলো ছোটো হতে থাকবে আগামী দশকগুলোতে বা এই শতাব্দীতে, এবং আমরা এটা থামাতে পারবো না। একইভাবে, অন্য গবেষক দল, নাসা’র জেট প্রোপালসন ল্যাবরেটরী বলেছে যে, “পশ্চিম এন্টার্কটিক বরফের চাদরের বড় একটা অংশ “point-of-no-return” পার করে ফেলেছে।

ক্রাইওস্যাট ২ থেকে পাওয়া তথ্য

তিন বছর আগে, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সী লঞ্চ করেছিলো ক্রাইওস্যাট ২, সাদা মহাদেশ এন্টার্কটিকার বরফের স্তর পাতলা হওয়ার ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করার জন্য। তিন বছর ধরে ডেটা সংগ্রহ করার পর, একটা আর্টিকেল ছাপা হলো কয়েকদিন আগেই। বরফের শীট নিয়ে স্যাটেলাইটের রাডার ডেটা বিশ্লেষণ করে যে রেজাল্ট দেখা গেলো, সেটা খুব একটা স্বস্তিজনক নয়। তার ওপর কয়েকদিন আগেই আবার দেখা গেলো যে পশ্চিম এন্টার্কটিকের আইস-শীট ধীরগতিতে হলেও অপ্রতিরোধ্য ভাবে ধসের মুখোমুখি এগোচ্ছে।

ক্রাইওস্যাট, ঐ মহাদেশের ৯৬% অংশকে প্রত্যেক মুহুর্তে কভার করছে, পূরণ করে দিচ্ছে তথ্যের ফাঁকগুলো, প্রথমবারের মত তুলে ধরছে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের আইস-শীটের প্রকৃত চিত্র। এই Cryosphere (বরফের দুনিয়া, বরফমণ্ডলের) এতো ভালো চিত্র আর কখনোই আমরা পাইনি। এর মাধ্যমে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো, যেটা থেকে আমরা ভবিষ্যতের পরিবর্তন অনুমান করতে পারবো। তথ্যের ফাঁকগুলো প্রধানত ছিলো উপকূলীয় অঞ্চলে যেখানে বরফ ভাঙ্গে সবচেয়ে বেশি। যদিও একেক এলাকা একেকভাবে আচরণ করে, কিন্তু বার্তাটা একদম পরিষ্কার – বরফের স্তর খুব দ্রুত পাতলা হচ্ছে, বিশেষ করে মহাদেশের পশ্চিম দিকে।

ক্ষয়ের হার ও গতিপ্রকৃতি

২০১৪ সালের প্রজেক্টটিতে ৪০ বছরের ডেটা গবেষণা করে ওরা দেখেছেন যে, এখন যে হারে ওখানে বরফ গলছে, তা ৪০ বছর আগের চেয়ে ৭৭% বেশি। ২০০৫ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ক্ষয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৩%; আর গত দুই দশকে ক্ষয় বেড়েছে দ্বিগুণ। যদিও এই পরিবর্তনের কিছুটা অবশ্য আগে উল্লেখ করা তথ্যগত ফাঁকের জন্যে দায়ী।

পশ্চিম এন্টার্কটিক এর বরফের স্তর গলা শুরু করেছে নিচে থেকে, ওপর থেকে নয়। বাতাসের চলাচলের ধরন পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ পানি উঠে আসছে গ্লেসিয়ারের নিচের দিকে। বেশির ভাগ ক্ষয়ই হচ্ছে পশ্চিম দিকে (৮৭%) যেখানে গ্লেসিয়ারগুলোর শেকড় আবদ্ধ ছিলো সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের উচ্চতায়; কিন্তু এখন সেগুলো চলা শুরু করে দিয়েছে, ছুটে যাচ্ছে মহাসাগরের দিকে। মূল গ্লেসিয়ারগুলো, যেমন – Thwaites বা Pine Island, প্রত্যেক বছর ৪ থেকে ৮ মিটার পুরুত্ব হারাচ্ছে; যেটা প্রমাণ করে যে ভয়াবহ এবং দ্রুত পরিবর্তন কিন্তু ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

যে জায়গাটার কথা বলা হচ্ছে, ওখানে কোনো পাহাড় থাকলে হয়তো গলে যাওয়াটা ধীর হতে পারতো। কিন্তু ঐ জায়গাটা বলতে গেলে পুরোটাই ঢালু। তাই, একটু গললে পরেরটার গলে যাওয়া সুনিশ্চিত হয়। এজন্য এটাকে থামানো অসম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকরা।

অনুমিত ফলাফল

নিঃসন্দেহে এটার প্রথম ও প্রধান ফলাফল দাঁড়াবে, আগের চেয়েও বেশি হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া। আমরা এমন একটা দুনিয়ায় বাস করি, যেখানে বেশির ভাগ মেগা-সিটিগুলোই সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি উচ্চতায় আছে। আর এই আর্টিকেলে দেখানো হয়েছে যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এন্টার্কটিকার অবদান গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। জাতিসংঘের ২০১৪ সালের জলবায়ু পরিবর্তন রিপোর্টে বলা হয়েছিলো, ২১০০ সাল নাগাদ ১ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যেতে পারে। তার মানে হচ্ছে, কোটি কোটি মানুষ ঘরছাড়া হয়ে পড়বে সারা বিশ্বে। আর এই রিপোর্টে এন্টার্কটিকার কথা মাথায় রাখা হয়নি, কারণ ঐ এলাকার কোনো গবেষণা শেষ হয়নি তখনো। এই রিপোর্ট যুক্ত করলে জাতিসংঘের রিপোর্ট ৩ ফিটের দিকেই ঝুঁকবে বেশি বলে মনে করছে আরেক গবেষক আনন্দকৃষ্ণান।

অনেকদিন ধরে ভবিষ্যদ্বাণী করে আসা এবং খুবই ভয়ংকর এক উত্তপ্ত জলবায়ুর দিকে ইশারা করছে পুরো ব্যাপারটা। আমরা হয়ত একটা Domino Effect দেখতে যাচ্ছি, যেখানে একটা ডমিনো চিপসে টোকা দেয়ার পর পুরো গঠনের সবগুলো চিপস পড়ে যাবেই। আর সেই টোকাটা দেয়া হয়ে গেছে। পুরো আইসশীট-ই গলে যেতে পারে এবার, গ্রীনহাউজ গ্যাস কমুক আর নাই কমুক।

গত ৪০ বছরের বরফের হ্রাস নির্দেশ করছে যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে IPPC-র আগের (২১০০ সাল নাগাদ, ৯০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধির) যে অনুমান ছিলো, সেটা ভুল। এই পুরো এলাকাটা গত ৫ থেকে ৬ লক্ষ বছরে গলেনি। নাসার মতে, যদি পুরো আইস শীট গলে যায় (আন্দাজ করা হচ্ছে, ২০০ বছরের মধ্যে সেটা ঘটবে), তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে ৩.৩ থেকে ৪ মিটার বা ১২ ফুট পর্যন্ত। পাল্টে যাবে প্রত্যেক মহাদেশের উপকূলের মানচিত্র।

এটার সবচেয়ে সহজ অর্থ হচ্ছে, আমরা নূহের নৌকা মিস করে ফেলেছি।

References:

1) Guardian News.

2) Cryosat.

3) নাসার প্রেস রিলিজ.

 

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz