চাপের সাথে গলনাঙ্ক, স্ফুটনাঙ্ক ও ঊর্দ্ধপাতন তাপমাত্রা পাল্টে যায় যেভাবেঃ তাপগতিবিদ্যার ১ম ও ২য় সূত্র যাচাই

(এই লেখাটার মূল উদ্দেশ্য হল চাপের সাথে যেকোনো পদার্থের গলনাঙ্ক, স্ফুটনাঙ্ক ও ঊর্দ্ধপাতন তাপমাত্রা কীভাবে করে পরিবর্তিত হয় সেটা গাণিতিকভাবে সহজে বোঝানো। সাথে সাথে তাপগতিবিদ্যার প্রথম মৌলিক স্বীকার্য যা কিনা ‘অবস্থার স্বীকার্য’ বা State Postulate হিসেবে পরিচিত তা নিয়ে আলোচনা করা এবং হেল্মহল্টজ-মুক্ত-শক্তির (Helmholtz Free Energy) ব্যাপারে ধারণা দেয়া। অবশেষে ক্ল্যাপেরন সমীকরণ প্রমাণ করা। সেখান থেকে দেখানো যে কীভাবে তাপগতিবিদ্যার ১ম ও ২য় সূত্র যাচাই করা যায়।)

যারা একটু-আধটু বিজ্ঞান নিয়ে নাড়াচাড়া করেছে তারা মোটামুটি সবাই জানে যে সাধারণ অবস্থায় পানি একশ’ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটে আর বরফ শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলতে শুরু করে। যারা আরেকটু আগ্রহী তারা সাথে সাথে এটাও জানে যে পাহাড়-পর্বতের উপর পানি একশ’ ডিগ্রীর চেয়ে কম তাপমাত্রাতেই ফুটতে শুরু করে দেয় (হিমালয়ের উপরে প্রায় ৭১ ডিগ্রীতে পানি ফুটে)। আবার রান্নার জন্য যে প্রেসার-কুকার আমরা ব্যবহার করি সেখানে প্রায় ১২০ ডিগ্রীতে পানি ফুটানো যায়- অর্থাৎ ১২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত পানি পানিই থাকে , মানে তরল অবস্থায় থাকে- তারপরে গিয়ে বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করে। আবার স্কুলে পড়া ‘বটমলির পরীক্ষা’ যারা পড়েছে তারা এটাও জানে যে ধাতব তার দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে অনায়াসে বরফের ভেতর দিয়ে সেই তারকেনিয়ে যাওয়া যায় বরফের টুকরোকে অক্ষত রেখেই। তখন তারের ঠিক নিচের বরফের গলার জন্য যে তাপমাত্রা দরকার সেটা শূন্যের চেয়ে কমে যায়- ফলে ঐসব জায়গার বরফ গলে গিয়ে ধাতব তারকে সামনে যাবার পথ করে দেয়। এসব উদাহরণ থেকে যে কেউ বলতে পারে যে চাপের তারতম্যের জন্য পানির গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক একেক সময় একেক রকম হয়।

কিন্তু কেউ যদি হঠাৎ করে প্রশ্ন করে বসে যে অমুক চাপে পানি কত তাপমাত্রায় ফুটবে সেটা বলতে কিংবা বরফের উপর এত চাপ দিলে সেটা ঠিক কত তাপমাত্রায় গলা শুরু করবেতা বলতে- তখন ব্যাপারটা কেমন হবে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটি দিতেই এই লেখাটা শুরু হল।

কিছু ছোট ছোট সহজ বিষয় নিয়ে একটু কথা বলে রাখি। চাপের সাথে সাথে যে কেবল পানিরই গলনাঙ্ক স্ফুটনাঙ্ক বাড়ে-কমে তা কিন্তু নয়। প্রতিটা বস্তুর ক্ষেত্রেই এটা হয়। আবার শুধু যে কঠিন থেকে তরল কিংবা তরল থেকে বাষ্প হবার সময় চাপের এমন কারসাজি থাকে তাও কিন্তু নয়। কঠিন থেকে সরাসরি বাষ্পে যদি কোনো বস্তু পরিণত হয় সেক্ষেত্রেও চাপের প্রভাব কাজ করে। মোট কথায় বস্তু যখনই তার অবস্থা পরিবর্তনের শিকার হয় ঠিক তখনই চাপের পরিবর্তনের সাথে সাথে যে তাপমাত্রায় সেটা ঘটছে তাও পরিবর্তিত হয়। অবস্থা পরিবর্তনের সময় বস্তুটি একই সাথে দু’টি অবস্থায় থাকে- কঠিন ও তরল অথবা তরল ও বাষ্প অথবা কঠিন ও বাষ্প। (কেউ যেন আবার এই মুহূর্তে ত্রৈধ বিন্দুর কথা আগেভাগে ধরে না বসে, কারণ ত্রৈধবিন্দুতে যদিও বস্তু তিনটি অবস্থাতেই অর্থাৎ কঠিন, তরল, বায়বীয় অবস্থায় একসাথে থাকে কিন্তু এই অবস্হা একটা নির্দিষ্ট চাপ ও তাপমাত্রাতে ঘটে- অর্থাৎ চাপ পাল্টে অন্য কোন তাপমাত্রায় আমরা ত্রৈধবিন্দু পাই না। কেন পাই না তার গাণিতিক ব্যাখ্যা পরে আলোচনা করা হবে। আমাদের মূল আলোচনাতে চাপ পাল্টানোর সুযোগ থাকতে হবে যার জন্য যে তাপমাত্রায় অবস্থার পরিবর্তন হবে সেটা পাল্টে যাবে।) অবস্থা পরিবর্তনের পুরো ব্যাপারটা ঘটার সময় তাপমাত্রার কোনো পরিবর্তন হয় নাবলে পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমরা সমোষ্ণ প্রক্রিয়া বলে চিন্তা করি। অবস্থার পরিবর্তন শুরু হলে বস্তুর একক ভরের আয়তনের(যেটা কিনা আপেক্ষিক আয়তন হিসেবে পরিচিত) পরিবর্তন ঘটে। একক ভরের আয়তন নেয়ার মূল কারণটা হল বস্তুটির পরিমাণের সাথে সাথে তার মোট আয়তনের পরিবর্তন হলেও একটা নির্দিষ্ট অবস্থায় বস্তুর একক ভরের আয়তন নির্দিষ্ট থাকে। বস্তুতে তাপ দিলেও তার তাপমাত্রা বাড়ে না বলে সে সময় যে তাপ দেয়া হয় তাকে সুপ্ততাপ বলে। বস্তুর একক ভরের অবস্থা পাল্টানোর জন্য মোট যে পরিমাণ তাপ দরকার হয় তাকে আপেক্ষিক সুপ্ততাপ বলে।

এখন আমরা মূল আলোচনার গভীরে যেতে পারি।

বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখাই গড়ে উঠেছে কিছু মৌলিক স্বীকার্য বা স্বতসিদ্ধ বা Postulate এর উপর ভিত্তি করে। মৌলিক স্বীকার্য বা স্বতসিদ্ধ হল এমন কিছু ধারণা বা সিদ্ধান্ত যা মানুষ অন্য কোনো আরো সহজ ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারে না। যেমনঃ আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার এমনই একটা স্বীকার্য হল আলোর বেগের মান নির্দিষ্ট- যে কেউ যেভাবেই সেটা মাপুক না কেন সবাই একই মান পাবে। এই ব্যাপারটা কেন হয় তার উত্তর এখনো নেই- অর্থাৎ অন্যকোনো সহজ কথা দিয়ে একে ব্যাখ্যা করা যায় না, তাই এটা একটা স্বীকার্য।তেমনি বাস্তব সংখ্যার ব্যাপারে একটা স্বীকার্য হল দুটি বাস্তব সংখ্যার যোগফল একটি বাস্তব সংখ্যাই হবে। এটা কি কেউ প্রমাণ করতে পারবে? অর্থাৎ স্বীকার্য হল এমন কিছু সিদ্ধান্ত যেটা আমরা আমাদের মানবিক ধারণা থেকে ধরে নিতে বাধ্য হই। মানবিক বলার কারণ হল স্বীকার্যকে স্বীকার করে নেয়ার সময় আমরা আর যুক্তি খুঁজে পাই না- বরং আমাদের অনুভব বা অনুধাবনের উপর পুরোপুরি নির্ভর করি।সেজন্য কিছু দিন পর পর দেখা যায় যে বিজ্ঞানের কোনো নতুন শাখা পুরানো কোনো শাখাকে ভুল প্রমাণিত করে দেখিয়ে দেয়। কোনো শাখাকে ভুল প্রমাণের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে সেই শাখার স্বীকার্যগুলোর অন্তত একটিকে ভুল হিসেবে দেখানো। যেমনঃ নিউটনের দেয়া গতিসূত্রগুলোর মূলে ছিল গ্যালিলিও-রূপান্তরের মত জিনিস (Galilean Transformation), যেটা আইনস্টাইন লরেঞ্জ-রূপান্তর (Lorentz Transformation) ব্যবহার করে দেখালেন যে সেটা ভুল। আমাদের আলোচনার মূল বিষয় যেহেতু বস্তুর অবস্থা বা তার পরিবর্তন এসব নিয়ে তাই বোঝাই যা্চ্ছে যে এসবের সাথেও কোনো না কোনো স্বীকার্য বা মৌলিক ধারণা জড়িয়ে আছে। তাপগতিবিদ্যার তেমনই একটা স্বীকার্য হল ‘অবস্থার স্বীকার্য’ বা ‘State Postulate’।  কোনো বস্তু ঠিক কেমন অবস্থায় আছে সেটা বোঝার জন্য তার সাথে জড়িত কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশকারী রাশিকে আমরা ব্যবহার করি।
এরকম মৌলিক তিনটি রাশি হল চাপ, তাপমাত্রা এবং আপেক্ষিক আয়তন। (উল্লেখ্য যে মোট আয়তনের জায়গায় আপেক্ষিক আয়তন বলা হয়েছে। এর কারণ আমরা একটু পরেই খুলে বলছি।) এই তিনটি রাশি ঠিকঠাক জানলে আমরা কোনো বস্তু বর্তমানে কেমন অবস্থায় আছে সেটার ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে যাই। এছাড়াও অন্যান্য রাশি থাকতে পারে যেগুলো না জানলে আমরা বস্তুটির অবস্থার ব্যাপারে ঠিকঠাক সিদ্ধান্তে আসতে পারবো না। এখন মূল প্রশ্নটি হচ্ছে কোনো বস্তুর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পেতে এরকম সর্বনিম্ন কতটি রাশি জানলেই হয়ে যাবে? এই প্রশ্নটির উত্তর আসে ‘অবস্থার স্বীকার্য’ বা ‘State Postulate’ থেকে। যেহেতু এটা একটা স্বীকার্য তাই বোঝাই যাচ্ছে এটার সাথে সম্পূর্ণভাবে পরিচিত হতে গেলে একটা পর্যায়ে আমাদেরকে নিজস্ব অনুভূতির আশ্রয় নিতেই হবে ! ব্যাপারটাকে বলার আগে তাই কিছু ধারণাকে যতটা পারা যায় সহজে যাচাই করে নিই। আদর্শ গ্যাস দিয়ে আগে ব্যাপারটা বুঝি। কোনো M আণবিক ভরের গ্যাসের চাপ P, তাপমাত্রা T,মোট আয়তন V  এবং তাতে n মোল গ্যাস থাকলে আদর্শ গ্যাসের সমীকরণ থেকে আমরা জানি- PV=nRT যেখানে R হল আদর্শ গ্যাস ধ্রুবক। এই সমীকরণ থেকে কাউকে যদি বলতে বলা হয় ঐ নির্দিষ্ট গ্যাসটির অবস্থা জানতে হলে কয়টি রাশি জানলেই হবে (যারা একে অন্যের উপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে মান ধারণ করতে পারে) তাহলে তার উত্তরটি কেমন হবে?এখানে একটি সমীকরণ দিয়ে P,V,T এবং n এই চারটি রাশি যুক্ত। তাই কেউ যদি বলে যেকোনো তিনটি জানলে বাকিটা সমীকরণ থেকে বলে দেয়া যাবে তাহলে মোটেই ভুল হবে না। অর্থাৎ একটা সমীকরণ একটা রাশি জানার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। যারা একটু বুদ্ধি খাটাবে তারা সমীকরণটিকে একটু সাজিয়ে লিখতে পারে-

ঠিক এখন যদি কাউকে বলতে বলা হয় ঐ নির্দিষ্ট গ্যাসটির (M নির্দিষ্ট অর্থাৎ আমরা আগেই জানি) অবস্থা জানতে হলে কয়টি রাশি জানলেই হবে তাহলে উত্তরটি কেমন হবে? উত্তরটি হয়ে দাঁড়াবে ২ টি রাশি। P, v, T এই তিনটি রাশির মাঝে যেকোনো ২ টি জানলেই আমরা বাকি রাশিটা পেয়ে যাই, সাথে সাথে গ্যাসের ঐ মুহূর্তের সব অবস্থাও বুঝতে পারি। দেখা যাচ্ছে আমরা যদি আমাদের আলোচনায় মোট আয়তনের বদলে আপেক্ষিক আয়তন ব্যবহার করি তবে অনায়াসে একটা রাশি জানার ঝক্কি কমিয়ে ফেলতে পারি। তাই আমরা তাপগতিবিদ্যায় সবখানে আপেক্ষিক আয়তনকে মৌলিক রাশি ধরে কাজ করি।
এতটুকু আসার পর আমরা এবার একটা ভিন্ন রকম প্রশ্ন করব নিজেদেরকে নিজেই। বিভিন্ন রাশির মানের পরিবর্তন করে গ্যাসটির ভেতরের মোট গতিশক্তি কতভাবে পরিবর্তন করতে পারি?

সহজে বলার জন্য একটু গণিতের আশ্রয় নিতে হবে। গ্যাসের গতিতত্ত্ব থেকে আমরা এক মোল গ্যাসের মোট গতিশক্তির (Kinetic Energy বা K.E) মান পাই

তাই সরাসরি তাপমাত্রা T পরিবর্তন করে যেমন আমরা তার মোট গতিশক্তি পাল্টাতে পারি, ঠিক তেমনি দুটি রাশির গুণফল Pv এর মান পাল্টে আমরা একই পরিমাণ গতিশক্তির পরিবর্তন আনতে পারি। তাপমাত্রা T যেহেতু তাপের সাথে জড়িত একটা রাশি তাই বাইরে থেকে তাপ সরবরাহ করে একে বাড়ানো যায়। কিন্তু Pv রাশিটি সরাসরি তাপের উপরে নির্ভর না করেও পাল্টানো যায়- যেমন বাইরে থেকে গ্যাসের উপর চাপ বাড়িয়ে দিয়ে অর্থাৎ গ্যাসের উপর আমরা নিজেরা কাজ করে তার ভেতরের গতিশক্তি বাড়াতে পারি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে গ্যাসটির ভেতরের মোট গতিশক্তিআমরা ২ ভাবে পরিবর্তন করতে পারি। আরো সহজে বলতে বললে বলতে হবে তাপ সরবরাহ করে এবং গ্যাসের উপর নিজেরাই বাইরে থেকে কাজ করে আমরা এর ভেতরের মোট গতিশক্তির পরিবর্তন আনতে পারি।

এবার আসি সবচেয়ে মজার একটা পর্যবেক্ষণে- আদর্শ গ্যাসের অবস্থা জানার জন্য  যতটি রাশি জানা দরকার (যারা একে অন্যের উপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে মান ধারণ করতে পারে) ঠিক তত ভাবেই তার গতিশক্তির পরিবর্তন আনা যায়- অর্থাৎ সংখ্যাটি হলো ২!

মানুষ অনেকভাবে বিভিন্ন বস্তুর বিভিন্ন অবস্থার উপর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে যে বস্তুর ভেতর যতভাবে শক্তির পরিবর্তন আনা যায় ঠিক ততটি রাশিই দরকার হয় তার পুরো অবস্থাকে বোঝার জন্য- এর কোনো ব্যতিক্রম নেই।

ব্যাপারটার তাৎপর্য বোঝার জন্য এবার আমরা আমাদের আলোচনায় গতিশক্তির সাথে সাথে স্থিতিশক্তির ব্যাপারটাকে নিয়ে আসি (Potential Energyবা P.E)। (অনেক রকম স্থিতিশক্তি হতে পারে- তার মাঝে অভিকর্ষ জনিত স্থিতিশক্তির কথা কেবল বলা হল) যদি আমরা বিভিন্ন উচ্চতায় গিয়ে গিয়ে এক মোল গ্যাসের মোট শক্তি (গতি+স্থিতি) হিসাব করতাম তাহলে দেখতাম উচ্চতা দিয়েও তার মোট শক্তির মাঝে আমরা পরিবর্তন আনতে পারছি- কারণ উচ্চতা (h) বাড়লে স্থিতিশক্তি বাড়ে।

P.E= Mgh

তাহলে নতুন আরেকটি রাশি অর্থাৎ উচ্চতা না জানলে আমরা গ্যাসের পুরো অবস্থা জানতে পারছি না। সুতরাং ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ালো-
গতিশক্তি পরিবর্তন করা যাচ্ছে ২ উপায়ে
স্থিতিশক্তি পরিবর্তন করা যাচ্ছে ১ উপায়ে
মোট শক্তি পরিবর্তন করা যাচ্ছে (২+১)=৩ উপায়ে।
আবার গ্যাসের অবস্থা জানার জন্য তিনটি রাশি দরকার হচ্ছে- হয় P,v,h অথবা P,T,h অথবা v,T,h।
ঠিক এই পর্যবেক্ষণটিই হল তাপগতিবিদ্যার একেবারে প্রাণ!

আমরা আরো একটু পর্যবেক্ষণ করলে এটাও পাবো যে মোট শক্তি বাড়ানোর যতরকম উপায় আছে তার মাঝে একটা উপায় অবশ্যই সরাসরি তাপ ও তাপমাত্রার সাথে জড়িত। এই উপায়ে শক্তি বাড়ালে সেখান থেকে উল্টাভাবে সরবরাহকৃত সব শক্তিকেকাজ আকারে ফিরে পাওয়া যাবে না (যেটা পরবর্তিতে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র থেকে বোঝা যায়- তাপকে পুরোপুরি কাজে পরিণত করা যায় না)। বাকী উপায়গুলো কিন্তু এমন নয়- অর্থাৎ এসব উপায়ে সরবরাহকৃত সব শক্তিকে উল্টাভাবে কাজ আকারে ফিরে পাওয়া যাবে। উদাহরণ দিলে আরো সহজে বোঝা যাবে। যেমনঃ বাইরে থেকে চাপ দিয়ে গ্যাসকে আয়তনে সংকুচিত করে তার ভেতর শক্তি বাড়ানো যায়। এরপর যদি গ্যাসকে উল্টা পথে প্রসারিত হতে দেয়া হয় তাহলে সেটি সমান পরিমাণ আয়তন বৃদ্ধিজনিত কাজ করতে পারে। আবার অভিকর্ষজ স্থিতিশক্তির ব্যাপারে লক্ষ্য করলে দেখা যায় গ্যাসের উচ্চতা বাড়ালে তার মাঝে যে পরিমাণ শক্তি জমা হয় গ্যাসটিকে যদি পৃথিবীর টানে নিচে নেমে আসতে দেয়া হয়তাহলে ঠিক সেইএকই পরিমাণ কাজ সেটা করতে পারত।

এবার আমরা সরাসরি অবস্থার স্বীকার্যকে বর্ণনা করব এভাবে –
‘বস্তুতে যত উপায়ে শক্তি বৃদ্ধি করা যায় ঠিক তত সংখ্যক তাপগতীয় রাশি বা বৈশিষ্ট্য
প্রকাশকারী ধর্ম জানলে বস্তুটির সম্পূর্ণ অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।’

এখন, তাপের সাথে বস্তুর আয়তনের পরিবর্তন ঘটে এমন বস্তু নিয়েই আমাদের আলোচনা। সাথে সাথে যদি ধরে নিই যে বস্তুর উপর বাইরের কোনো কিছুর খুব একটা প্রভাব নেই (যেমন অভিকর্ষ বল, তড়িৎ ক্ষেত্র, চৌম্বক ক্ষেত্র ইত্যাদি যেগুলো বস্তুর মাঝে মোট স্থিতিশক্তিকে কমিয়ে বাড়িয়ে দেয়)- তাহলে সেক্ষেত্রে অবস্থার স্বীকার্যটি হয়ে দাঁড়াবে –
‘বাইরের কোনো কিছুর প্রভাব না থাকলে আয়তন পরিবর্তিত হতে পারে
এমন ধরণের বস্তুর সম্পূর্ণ অবস্থা বোঝার জন্য ২ টি তাপগতীয় রাশি
বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশকারী ধর্ম জানতে হবে’

খুব সহজেই উপরের কথাটা আমরা আমাদের আগের আলোচনার সাথে মিলিয়ে বুঝে ফেলতে পারি। এখানে আমরা বস্তুর মোট শক্তি ২ ভাবে পরিবর্তন করতে পারি।  ১) তাপ দিয়ে ও ২) চাপ দিয়ে আয়তন পরিবর্তন করে। আর আমরা আগেই দেখেছি তখন বস্তুর অবস্থাকে পুরোপুরি বর্ণনা করতেও ঠিক ২ টি রাশিই লাগে।
আমরা যেহেতু বস্তুর অবস্থার পরিবর্তনের ব্যাপারে কথা বলছি (গলন, স্ফুটন, ঊর্ধ্বপাতন) তাই সেই অবস্থায় সর্বনিম্ন কয়টি রাশি আমাদের জানতে হবে তা বোঝার জন্যেই ‘অবস্থার স্বীকার্য’-কে সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অবস্থার স্বীকার্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে অবস্থার পরিবর্তনের সময় আমাদেরকে বস্তুর ২ টি রাশি বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশকারী ধর্মের ব্যাপারে জানতে হবে যারা একে অন্যের উপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে মান ধারণ করতে পারবে। আমাদের হাতে তিনটি রাশি আছে। ১) চাপ ২) তাপমাত্রা ৩) আপেক্ষিক আয়তন। এখন পরীক্ষা থেকে দেখা যায় যে গলন বা স্ফুটন বা ঊর্ধ্বপাতন প্রক্রিয়াসমূহ ভিন্ন ভিন্ন  চাপের জন্য ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় সংঘটিত হয়। অর্থাৎ চাপ ও তাপমাত্রা একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। তাই অবস্থার পরিবর্তনের বেলায় চাপ ও তাপমাত্রা স্বাধীনভাবে তাদের মান ধারণ করতে পারে না। এদের যে কোনো একটি নির্দিষ্ট হয়ে গেলে বাকিটাও নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তাই ‘অবস্থার স্বীকার্য’ অনুযায়ী আমাদের হয় চাপ ও আপেক্ষিক আয়তন অথবা তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আয়তন – এই ২ টি রাশি জানতে হবে (শুধুমাত্র চাপ ও আয়তন জানলে হবে না)।

ধরা যাক তাপমাত্রা (T) এবং আপেক্ষিক আয়তন (v) সম্পর্কে আমরা জানি। তাহলে অন্যান্য সকল রাশিকে তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আয়তনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে। যদি এক মোল পদার্থের মধ্যকার এন্ট্রপির পরিমাণ s হয় (একে আপেক্ষিক এন্ট্রপি বলে) তাহলে s কে অবশ্যই T এবং v এর ফাংশন হিসেবে দেখানো যাবে (অবস্থার স্বীকার্য থেকে পাই)। আপেক্ষিক এন্ট্রপি s কে যদি তাপমাত্রা (T) এবং আপেক্ষিক আয়তন (v) এর কোন ফাংশন f দিয়ে প্রকাশ করা হয় তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায়-
s = f(T,v)


এখন আমাদের মূল কাজ হবে এই সমীকরণে কোনোভাবে চাপ ও তাপমাত্রাযুক্ত কোনো রাশি আনা যায় কিনা সেটা দেখা- কারণ আমাদেরকে বস্তুর অবস্থা পরিবর্তনের সময় চাপের সাথে তাপমাত্রার সম্পর্ক খুঁজে বের করতে হবে।

এই জায়গায় এসে আমরা তাপগতিবিদ্যার কয়েকটি জিনিস একটু জেনে নিব।

অবস্থার পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটি যেহেতু স্থির তাপমাত্রায় ঘটে তাই একে বিশেষভাবে বোঝার জন্য হেল্মহল্টজ-মুক্ত-শক্তি (Helmholtz Free Energy) নামক একটি রাশি ব্যবহার করা হয়। (নাম শুনে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই!) এই রাশির প্রয়োজনীয়তা কেন হয় সেটা সমোষ্ণ প্রক্রিয়ার উপর তাপগতিবিদ্যার প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্র ব্যবহার করলেই খুব সহজে বোঝা যায়।

অবস্থা পরিবর্তনের সময় dQ পরিমাণ তাপ বস্তুকে দেয়া হলে যদি তার অভ্যন্তরীণ শক্তির dU পরিমাণ পরিবর্তন হয় এবং সেটি dW পরিমাণ কাজ করে তাহলে তাপতিবিদ্যার প্রথম সূত্র থেকে পাই
dQ = dU + dW
পুরো প্রক্রিয়ায় চাপের মান স্থির থাকে এবং সাথে সাথে বস্তুর আয়তন বাড়ে (একমাত্র ব্যতিক্রম হল বরফ- বরফ গললে আয়তন কমে)- তাই আয়তন বৃদ্ধিজনিত কাজের পরিমাণ
dW= PdV
সুতরাং dQ = dU + PdV

আবার বস্তুর ভেতর dS পরিমাণ এন্ট্রপি বাড়লে এবং তাপমাত্রা T হলে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র থেকে –
dS = dQ/T  বা, dQ = TdS

সুতরাং, একসাথে লিখলে dQ =TdS =dU+dW=dU+PdV
তাই,   TdS = dU+dW
তাপমাত্রা T স্থির বলে TdS = d(TS) লেখা যায়।
সুতরাং,  d(TS) = dU + dW
বা, -dW = dU- d(TS)
বা, -dW = d(U-TS)  [যোগের উপর অন্তরীকরণ বণ্টিত হয়ে যায়]
বা, dW = -d(U-TS)

দেখা যাচ্ছে সমোষ্ণ প্রক্রিয়ায় বস্তু যে পরিমাণ কাজ করে সেটা আসে (U-TS) রাশিটির ঋণাত্মক পরিবর্তনের মাধ্যমে। তাই(U-TS) রাশিটিকে একটা আলাদা রাশি ধরা হয়। এটাই হচ্ছে হেল্মহল্টজ-মুক্ত-শক্তি (Helmholtz Free Energy)। একে F দিয়ে প্রকাশকরলে
F = U-TS  ————–(3)

সুতরাং, সমোষ্ণ প্রক্রিয়ায়, dW = -dF

সহজভাবে বললে বলা যায় সমোষ্ণ প্রক্রিয়ায় বস্তুর ভেতর থেকে যতটুকু হেল্মহল্টজ-মুক্ত-শক্তি কমে যায় বস্তুটি ঠিক ততটুকুই কাজ করতে পারে। অর্থাৎ হেল্মহল্টজ-মুক্ত-শক্তি ব্যবহার করে বস্তুটি কাজ করছে বলে চিন্তা করা যায়।

এখন (3)থেকে       F = U-TS
যেকোনো প্রক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে উভয়পক্ষে অন্তরীকরণ করলে
dF = dU-(TdS+SdT)
বা, dF = dU-TdS-SdT  ———-(4)

এখন,(4) নং এ    TdS=dU+PdV বসালে পাই
dF = dU-(dU+PdV)-SdT = -PdV-SdT
সুতরাং, যেকোনো প্রক্রিয়ার বেলায় লেখা যায়
dF = -PdV-SdT  —————–(5)
দেখা যাচ্ছে F রাশিটির পরিবর্তন V ও T এর পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। F কে V ও T এর ফাংশন ধরলে এবং তার উপর অন্তরীকরণ প্রয়োগ করলে দাঁড়াবে


বামপক্ষের বন্ধনীর নিচে একটা V দেয়া হয়েছে কারণ তখন V কে স্থির ধরে T এর সাপেক্ষে দ্বিতীয় অন্তরক নেয়া হয়েছে, এবং ডানপক্ষের বন্ধনীর নিচে একটা T দেয়া হয়েছে কারণ তখন T কে স্থির ধরে V এর সাপেক্ষে দ্বিতীয় অন্তরক নেয়া হয়েছে.
(7)নং সম্পর্কটিকে বলা হয় একটি ম্যাক্সওয়েল-সম্পর্ক (Maxwell Relation)। তাপগতিবিদ্যায় এরকম আরো কিছু ম্যাক্সওয়েল-সম্পর্ক আছে। আমাদের আলোচনায় যেহেতু স্থির তাপমাত্রার কথা বলা হয়েছে তাই আমরা শেষ পর্যন্ত এই ম্যাক্সওয়েল-সম্পর্কটি পেয়েছি। এখন যদি (7)নং সমীকরণটি এক মোল পরিমাণ বস্তুর জন্য ব্যবহার করি তাহলে এন্ট্রপি S এর জায়গায় আপেক্ষিক এন্ট্রপি s এবং আয়তন V এর জায়গায় আপেক্ষিক আয়তন v ব্যবহার করা যাবে।
তখন,

(9) নং কে লক্ষ্য করলেই আমরা দেখবো যে আমরা আমাদের মূল লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি !

উপরের সমীকরণটি ক্ল্যাপেরন সমীকরণ নামে পরিচিত। এটি বস্তুর যেকোনো রকম অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।

এখন আমরা অনায়াসে বস্তুর অবস্থা পরিবর্তনের বেলায় প্রয়োগকৃতচাপের সাথে গলন বা স্ফুটন বা উর্ধ্বপাতন তাপমাত্রা কীভাবে পাল্টায় সেটা বের করে ফেলতে পারব। তার আগে ক্ল্যাপেরন সমীকরণ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
চিত্রে α ও β দিয়ে কোনো বস্তুর দুই রকম অবস্থা বুঝিয়েছে (কঠিন-তরল বা, তরল-বাষ্প বা, কঠিন-বাষ্প)। রেখাটি অবস্থা পরিবর্তনের রেখা হিসেবে পরিচিত যেটা চাপের (P) সাথে অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা (T) কীভাবে পরিবর্তিত হয় সেটা বোঝায়। রেখার উপর যেকোনো বিন্দুতে বস্তুটি একই সাথে দুটি অবস্থায় থাকে।


ক্ল্যাপেরন সমীকরণ থেকে আমরা আসলে উপরের চিত্রের অবস্থা পরিবর্তনের রেখার  যেকোনো বিন্দুতে তাপমাত্রার সাথে চাপের পরিবর্তনের হার কেমন হবে সেটা জানতে পারি। কারণ dP/dT তাপমাত্রার সাথে চাপের পরিবর্তনের হার নির্দেশ করে। এটা থেকে সরাসরি চাপ ও তাপমাত্রার সম্পর্ক পাওয়া যায় না। এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে আমরা চলকগুলো আলাদা করে উভয়পাশে যোগজীকরণ করি।

তবে যোগজীকরণ প্রয়োগ করার আগে কিছু বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তা না হলে ভুল হবার সম্ভাবনা থাকবে।

১)  রাশিটিকে যেহেতু তাপমাত্রা T এর সাপেক্ষে যোগজীকরণ করতে হবে তাই বোঝাই যাচ্ছে এই রাশিটি তাপমাত্রা T এর একটি ফাংশন। এখন এই পুরো রাশির মাঝে তিনটি পদ আছে- L, Δv এবং T । এখন আপেক্ষিক সুপ্ততাপ L যদি বস্তুর অবস্থা পরিবর্তনের তাপমাত্রার সাথে সাথে পাল্টে যায় তখন একে ধ্রুবক ধরা যাবে না। আপেক্ষিক আয়তনের পরিবর্তন Δv এর বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। সোজা কথায় L ও Δv এই রাশি দুটি নিজেরাই তাপমাত্রা T এর ফাংশন কিনা সেটা মাথায় রাখতে হবে। তাপমাত্রার সাথে আপেক্ষিক সুপ্ততাপ পরিবর্তনের বিষয়টি রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ( এবং সমস্যা!)। আলোচনার সুবিধার জন্য আমরা L কে স্থির ধরে কাজ করব।

২) কোনো বস্তু যদি তরল থেকে গ্যাসীয় কিংবা কঠিন থেকে গ্যাসীয় হয় তাহলে আপেক্ষিক আয়তনের পরিবর্তন Δv এর মান বেশ বড় হয়- কেননা কঠিন বা তরল অবস্থার চেয়ে গ্যাসীয় অবস্থায় বস্তুর আপেক্ষিক আয়তন অনেক বেশি হয়। যদি গ্যাসীয় অবস্থায় বস্তুর আপেক্ষিক আয়তন vg হয় এবং কঠিন বা তরল অবস্থায় আপেক্ষিক আয়তনকে vSL ধরা হয় তাহলে অবস্থা পরিবর্তনের সময়

৩) বস্তুটির পরিবর্তন যদি কঠিন থেকে তরল অথবা কঠিন থেকে কঠিন হয় (চোখ কুঁচকানোর কিছু নেই- গ্রাফাইট থেকে হীরার কথাটা মাথায় আনলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। আরো উদাহরণ দেয়া যায়।) তাহলে আপেক্ষিক আয়তনের পরিবর্তন খুব অল্প হয়। তখন Δv এর মানকে তাপমাত্রার সাপেক্ষে স্থির ধরে নেয়া যায়।

উপরের তিনটি বিষয় মাথায় রেখে আমরা ক্ল্যাপেরন সমীকরণকে দুইভাবে ব্যবহার করতে পারি।

i) তরল থেকে গ্যাসীয়  এবং কঠিনথেকে গ্যাসীয়- অর্থাৎ অবস্থার পরিবর্তনের সাথে গ্যাসীয় অবস্থা যুক্ত থাকলে।
ii) কঠিন থেকে তরল এবং কঠিন থেকে কঠিন- অর্থাৎ অবস্থার পরিবর্তনের সাথে গ্যাসীয় অবস্থা যুক্ত না থাকলে।


উপরের সমীকরণটি থেকে আমরা সরাসরি চাপের সাথে তাপমাত্রার একটি সম্পর্ক পাই। এই সমীকরণটিকে ক্লসিয়াস-ক্ল্যাপেরন সমীকরণ নামে পরিচিত। এটি গ্যাসীয় অবস্থার পরিবর্তনের সময় ব্যবহার করা যায়।

P1 চাপে T1 তাপমাত্রায় আমরা আপেক্ষিক সুপ্ততাপের মান (L) জানলে নতুন চাপ P2 তে নতুন অবস্থা পরিবর্তনের তাপমাত্রা T2 এর মান অনায়াসে বের করে ফেলতে পারি। এই সমীকরণে যেহেতু আদর্শ গ্যাস ধ্রুবক R আছে তাই এটা যে কেবল গ্যাসীয় অবস্থার সাথে যুক্ত সেটা মনে রাখা সহজ (তরল থেকে গ্যাসীয়  এবং  কঠিন থেকে গ্যাসীয়)।

কঠিন থেকে তরল  এবং  কঠিন থেকে কঠিন অবস্থার পরিবর্তনের বেলায় যখন Δv মোটামুটি স্থির – তখন (12) নং সমীকরণের উভয়পাশে যোগজীকরণ করলে

উপরের সমীকরণটি থেকে আমরা সরাসরি চাপের সাথে তাপমাত্রার একটি সম্পর্ক পাই। এটি কঠিন থেকেতরল এবং কঠিন থেকে কঠিন অবস্থার পরিবর্তনের সময় ব্যবহার করা যায়।

(13) ও (15) নং সমীকরণ ও তাদের থেকে যথাক্রমে আসা (14) ও (16) নং সমীকরণ দুটির তাৎপর্য অনেক। তাই এদের তাৎপর্য নিয়ে একটু আলোচনা করি। এই সমীকরণগুলো গঠিত হয়েছে তাপগতিবিদ্যার কয়েকটি মূল বিষয়কে মেনে নিয়ে- যেমনঃ অবস্থার স্বীকার্য, তাপগতিবিদ্যার ১ম সূত্র এবং তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্রে ব্যবহৃত এন্ট্রপির ধারণা ও সংজ্ঞা থেকে। তাই সমীকরণগুলো বস্তুর অবস্থার পরিবর্তনের বেলায় বাস্তবিকভাবে সঠিক ফলাফল দিলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে তাপগতিবিদ্যার অবস্থার স্বীকার্য, ১ম ও ২য় সূত্র সঠিক। অর্থাৎ এই সমীকরণগুলো ব্যবহার করে আমরা তাপগতিবিদ্যার কিছু একেবারে গোড়ার দিকের মৌলিক ধারণা যাচাই করতে পারি।
(13) নং সমীকরণ লক্ষ্য করি।

এখানে আমরা একটু স্থানাঙ্ক জ্যামিতির আশ্রয় নিব। যদি ধরি  (1/T)=x,  lnP=y, (-L/R)=m তাহলে উপরের সমীকরণটি হয়ে দাঁড়ায় y=mx+C যা একটি সরলরেখার সমীকরণ যার ঢালের মান (Slope) হল m এবং যেটি y অক্ষকে মূলবিন্দু থেকে C দূরত্বে ছেদ করে। তাই lnP vs. (1/T) গ্রাফ আঁকলে গ্যাসীয় অবস্থার পরিবর্তনের বেলায় সেটা একটি সরলরেখা হবে যদি আপেক্ষিক সুপ্ততাপের মান (L) তাপমাত্রার সাথে সাথে স্থির থাকে। আর যদি সেটা সরলরেখা হয় তবে উল্টাভাবে যাচাই হয়ে যায় যে তাপগতিবিদ্যার অবস্থার স্বীকার্য, ১ম ও ২য় সূত্র সঠিক।

কয়েকটি পদার্থের গ্যাসীয় অবস্থার পরিবর্তনের জন্য এ ধরনের গ্রাফ দেখানো হল।

পদার্থের নামঃ এসিটোন

পদার্থের নামঃ আইসোপ্রোপাইল এলকোহল

পদার্থের নামঃ পানি, CO2, আর্গন, নাইট্রোজেন (সেমি. লগগ্রাফ)

পদার্থের নামঃ CCl4, C2H5OH, H2O, C2H5Br, CH2(OH)CH2(OH)

তাই, P vs. lnT গ্রাফ আঁকলে সেটা একটা সরল রেখা হবে যদি আপেক্ষিক সুপ্ততাপ (L) তাপমাত্রার সাথে স্থির থাকে। এভাবে কঠিন থেকে তরল বা কঠিন থেকে কঠিন পদার্থের পরিবর্তনের জন্য আমরা তাপগতিবিদ্যার অবস্থার স্বীকার্য, ১ম ও ২য় সূত্র যাচাই করতে পারি।

——————————————————————————————
লেখকঃ দীপায়ন তূর্য

(আরো সহজে বর্ণনা করার কোন উপায় জানা থাকলে নিঃসঙ্কোচে জানানোর অনুরোধ রইল।)

পরিশিষ্টঃ
আরো কিছু জানতে চাইলে –

১) web.mit.edu/16.unified/www/FALL/thermodynamics/notes/node64.html
২) http://www.sjsu.edu/faculty/watkins/clausius.htm
৩) Difference between Clausius-Clapeyron equation and Antoine equation
৪) Four Postulates of Thermodynamics-PDF-MIT
৫) The Fundamental Postulates-PDF-Princeton University
৬) Posulates of Thermodynamics- Illionise.Edu
৭) State posulate- wiki
৮)State posulate – lecture PDF
৯) Maxwell Relation-wikipedia
১০) https://en.wikipedia.org/wiki/Clausius–Clapeyron_relation
১১) What is the significance of Clausius-Clapeyron equation?

Comments

Deepayan Turja

Studied Mechanical Engineering from BUET

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz