প্রশিক্ষণ পদ্ধতি: সরকারি বনাম বেসরকারি

ক্যানাডা প্রবাসী আমার প্রিয় প্রাক্তন সহকর্মী জাকারিয়ার আমার একটি পোষ্টিং এর মন্তব্যে তার স্মৃতিকথা লিখেছিলেন।

জাকারিয়া আমাদের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ছিল। সে ভীষণ উদ্যোগী আর আন্তরিক ছিল কাজে। আমরা উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন ফল গাছের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছিলাম। কাজেই আমাদের রিসার্চ বিভাগের সকল কর্মকর্তা ও বিভিন্ন এনজিও এর প্রকল্প সমন্বয়কারীদের ফল গাছের রোগ-বালাই এর একটি প্রশিক্ষণ আয়োজন করছিলাম। যেহেতু আমি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে (বার্ক) কাজ করেছি, প্রশিক্ষণ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনেক, এমনই সবার ধারণা। আমি ২০০০ সালে বার্ক থেকে লিয়েন নিয়ে সুইস এজেন্সি ফর ডেভলপমেন্ট এন্ড কোঅপারেশন এর ‘গ্রাম ও খামার বনায়ন প্রকল্পে’ পরিচালক হিসেবে যোগদান করি। আমাদের মূল দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশে বিভিন্ন ফলের ওপর যে সব উন্নত জাত কৃষি গবেষণা বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত হয়েছে এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে সে সব জাতকে কৃষকের দারগোড়ায় পৌছে দেয়া। আপনারা খেয়াল করবেন, আমাদের গবেষণার অনেক ফলাফল সেলফ বন্ধি হয়ে থাকে যথাযথ সম্প্রসারণ পদ্ধতির অভাবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উন্নত চারা শুধুমাত্র কতিপয় মানুষের হাতে পৌঁছায়। আমাদের দায়িত্ব ছিল গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রজাতির ফলের চারা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সঠিক পদ্ধতি বের করা এবং বিভিন্ন জেলায় উন্নত জাতের ফলের চারার কলম প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। কাজটি করতে আমাদের সম্প্রসারণ বিষয়ে গবেষণা করতে হয়েছে এবং মূলত সরকারি নার্সারি ও বেসরকারি নার্সারি মালিকদের নিয়েই কাজ করতে হয়েছে। আমরা কৃষি গবেষণা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার কর্তৃক উদ্ভাবিত ফলের জাত মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু করেছিলাম। প্রতিটি জেলাতে একটি করে উন্নত জাতের ফলের মাতৃ গাছের বাগান তৈরির কাজ প্রথমে হাতে নিলাম। শুরুতে পাঁচ জাতের ফল নিলাম – আম, লিচু, পেয়ারা, বাতাবি লেবু, লেবু।

নার্সারিতে চারার ও ফলের বাগানে নানা ধরণের রোগ-বালাই দেখা যাচ্ছিল। আমরা রোগ-বালাই এর ওপর একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করছিলাম। আমরা যারা দীর্ঘদিন সরকারি সংস্থায় কাজ করেছি, তাদের কাছে প্রশিক্ষণ মানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রশিক্ষণার্থীদের ক্লাশের আয়োজন করা। আমার প্রায় সব সহকর্মী ও এনজিও এর প্রজোক্ট ম্যানেজাররা কৃষি ডিগ্রিধারী। আমাদের মূল প্রশিক্ষক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ডিপার্টমেন্টের ড. রহিম ভাই। সাথে দু’জন রোগ বালাই বিশেষজ্ঞ: ড. শরিফ (পোকামাকড় বিশেষজ্ঞ) ও ড. আইয়ুব (গাছের রোগ বিশেষজ্ঞ)। দু’জনেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার যোগদানের পূর্বেও অনেক প্রশিক্ষণের আয়োজন হয়েছে।

ইতোপূর্বে যে সব প্রশিক্ষণের আয়োজন হয়েছিলো তা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারেই হয়েছে; মূলত সরকারি পদ্ধতিতে। অর্থাৎ সারাদিনের ছয় ঘণ্টা ক্লাসে প্রতি ঘণ্টায় একজন রিসোর্স পার্সন এক ঘণ্টা করে তার বিষয়ের ওপর বক্তৃতা দেবেন। বক্তৃতা শেষে একটি ছোট কাগজে সই করে একটি হলুদ খাম নিবেন যেখানে কিছু সম্মানী থাকে। প্রশিক্ষণ শুরুর আগে জ্ঞান যাচাই করা হতো। প্রশিক্ষণ শেষে আবার যাচাই হতো। দেখা যেত প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর জ্ঞানের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কোন সময়েই তা শতকরা ৮০% এর নীচে থাকতো না। দাতা সংস্থারা খুবই খুশি হতেন। তাদের অনুদানে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। এ পদ্ধতি শুধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, সব সরকারি সংস্থায় প্রচলিত ছিল এবং আছে। এ শুধু গবেষণা পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা যখন পিএটিসি’তে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম, সেখানেও এরকমেরই। প্রশিক্ষণের যখন বাজেট করা হত, সেখানে প্রথমে থাকতো ষ্টেশনারিজের খাত, তারপর প্রশিক্ষকদের সম্মানী, অংশগ্রহণকারি বা প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা, কক্ষ ভাড়া, মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টর, লাউড স্পিকারের ব্যাটারি, ইত্যাদি।

আমার প্রিয় সহকর্মী জাকারিয়া দীর্ঘদিন বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেছেন। সে যখন আমার কাছে প্রশিক্ষণের কর্মসূচি আর বাজেট নিয়ে এলো আমি দেখলাম সে সেই সরকারি পদ্ধতি অবলম্বনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। আমি সব সময়ই আমার সহকর্মীদের নতুন কিছু একটা করতে উৎসাহ দিয়ে থাকি। যে প্রস্তবাই নিয়ে আসুক তার যুক্তি শুনতে চেষ্টা করি। খেয়াল রাখি আমার কোন কথাবর্তায় সে যেন অসম্মান বোধ না করে। কারণ একবার যদি সে লজ্জা পেয়ে যায় বা ভয় পেয়ে যায় তার সৃজন শক্তি হারিয়ে যাবে। সে কখনও নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে আমার কাছে আসবে না।

আমার মধ্যে সব সময়ই আরও একটি ধারণা কাজ করে। যারা আমার চাইতে তরুণ, তারা আমার চাইতে বেশি জানে। এ ধারণার পেছনে রয়েছে মরুহুম ড. কামাল উদ্দিন। আমার এক বছরের জুনিয়র ছিল। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি সে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমি এসএম হলে থাকতাম। কামাল ছাত্র হিসেবে অসাধারণ ছিলো তা বলবো না। তবে পড়াশুনার প্রতি তার ভীষণ আগ্রহ। বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি। সেও হুদা স্যারের ছাত্র ছিল। ছুটির সময়ে সে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা চলে আসতো আমার কাছে পড়ার জন্যে। আমার সাথে এক বিছানায় হলে থাকতো। ফিজিওলজি, জেনেটিক্স পড়তো। আমি এমন ডেডিকেটেড মানুষ খুব কম দেখেছি। আমার বাবার আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। আমি নিজেই টিউশনি করে ঢাকায় পড়তাম। তাছাড়া, বড় ভাইয়ের স্কলারশীপের ১৫০০ টাকা আমাকে দিয়ে গেছে আপদকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্যে। কামালকে হলে খাওয়াতাম। তা প্রতি বেলার খাওয়া হতো দু’টাকায়। সকালের নাস্তা ১ টাকা। সব মিলে দৈনিক ৫ টাকা ব্যয়। খুব বেশি মনে না হলেও তখনকার দিনের জন্য সে অনেক টাকা। মাসে ১৫০ টাকা ব্যয় হত। আমি টিউশনি করে মাত্র ১৫০ টাকাই পেতাম। কামাল দু’তিন দিন থাকতো। কামালের কথাটা বলার কারণ হচ্ছে, সে যখন এবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে ফিরলো তখন দেখলাম তার সামনে কথা বলতে আমাকে খুব হুঁশিয়ার হতে হলো। সে ফরেষ্ট্রির অনেক কিছু বলছে, যা আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। ওকে বললাম, “কামাল, আমিতো পিছিয়ে পড়ে গেলাম”। ভীষণ বিনয়ী কামাল। কৌশলে সে আমাকে জিতিয়ে দিতো। বলতো, আপনার কাছ থেকে শিখলাম। কামালের বিনয় বুঝতে পারতাম। কামাল শিক্ষক হিসেবে এবং গবেষক হিসেবে অত্যন্ত সফল ছিল। চীনে এক মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় সে মারা যায়।

কামালের বিনয় আর মেধা থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো আমার সামনে যে বসে আছে সে আমার চাইতে বেশি জানে। হুদা স্যারের সে কথা সব সময় মনে রাখি। Learn to listen, listen to learn – শুনতে শিখুন, শিখতে শুনুন। দেবতাতুল্য মানুষটি ‘বাবার মতো শাসন করতেন আর মা’য়ের মত আদর করতেন’ তাই আমি সবার কথা মনে রাখি। স্যার আমাদের সত্য কথা বলতে সাহস যোগাতেন। বলতেন, “তুমি যদি অন্যায় করো, মিথ্যে বলো, তাহলে বিবেক তোমাকে চিরদিন দংশন করবে”। স্যার বলতেন, মনে রাখবে ‘God may forgive our sin but nervous system never does’. যখন স্যারের উক্তিগুলি উপলব্ধি করলাম, তখন থেকেই আমাদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো।

এখানে একটি ঘটনা না বললেই নয়। পাকিস্তানে ফরেষ্ট্রিতে এমএসসি করার সময়ের ঘটনা। আমাদের দু’বছরে দু’বার ম্যারাথন দৌড় ছিলো। ১০ কিলোমিটার রাস্তা এক ঘণ্টায় দৌড়াতে হবে। আমাদের শারিরিক সক্ষমতা প্রমাণের জন্যই এ দৌড়। ডিসেম্বরের শুরুতেই এ ম্যারাথন হয়। গাড়িতে করে আমাদের ১০ কিমি: দূরে ছেড়ে দেয়া হল।

ভোর বেলা। প্রায় অন্ধকার। পেশোয়ার শহর তখন ঘুমে। হুইসেল বাজার সাথে সাথে দৌড় শুরু হল। আমি ভুল করে প্রথমেই বেশ জোরে দৌড় দিলাম। ভাল রেজাল্ট করতে হবে। প্রথম হতে হবে। সবার চাইতে এগিয়ে থাকলাম। কিন্তু প্রায় ৫ কি.মি. রাস্তা অতিক্রম করার পর মনে হলো – আর পারছি না। হঠাৎ এমন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম রাস্তায় বসে গেলাম। এমন সময় একটি সামরিক জীপ যাচ্ছিল। আমাকে দেখে মনে করলেন আমি বোধ হয় অসুস্থ হয়ে পড়েছি। সাদা টি শার্ট আর হাফ পেন্ট, সাদা কেডস। বুঝলেন প্রশিক্ষণার্থী। আমাকে শুধালেন “কী হয়েছে?” বললাম, “ম্যারাথন দৌড়ে আছি, কিন্তু আর পারছি না”। সেনা কর্মকর্তা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি তো খুবই কাহিল হয়ে গেছ। আমি তোমাকে কিছুটা এগিয়ে দিই”।

আমি এতই ক্লান্ত বোধ করছিলাম যে, তার প্রস্তাবটা মনে হল স্বর্গের দূত এসেছে। আমি বললাম খুব ভাল হয়। আমাকে তিন কি.মি নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। এর মধ্যে আমার কোর্সের অনেক ছাত্র আমাকে ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছে। আমাকে নামিয়ে দিলেন। আমি আবার দৌড়াতে শুরু করলাম। প্রথম হতে পারিনি কিন্তু উতরে গেলাম। কেউ টের পায়নি, আমি কেমন করে পিছিয়ে পড়লাম, আর কেমন করে পৌঁছলাম।

আমি প্রতি সপ্তাহে বাবা-মা’কে একটি করে চিঠি লিখতাম। বাবাকে সেনা কর্মকর্তার সহানুভূতির গল্পটা বললাম। আমার বাবা ভীষণ মন খারাপ করে আমাকে চিঠি লিখলেন। চিঠিতে লিখলেন, অসাধুপন্থায় জয়ের চাইতে হেরে যাওয়া আনন্দের। মিথ্যে বলে জয়ের চাইতে সত্যি বলে হেরে যাওয়া আনন্দের। বাবা লিখলেন, আমি যেন অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আমার অসাধুতার কথা জানাই। এবং এ জন্যে যদি আমাকে কোর্স থেকে বের করে দেয় তাতে বাবা কষ্ট পাবেন না। বাবা লিখলেন পরের চিঠিতে আমি যেন বাবাকে জানাই আমি কী করলাম। বাবা স্বল্পভাষী। কখনও রাগ করতেন না। আমাদের কখনও বকা দেন নি। কিন্তু বাবা যে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন, তা আমি বুঝেছি। মনে মনে ভাবলাম, যদি আশফাক স্যার জানেন যে আমি অসাধুপন্থা অবলম্বন করেছি তাহলে নিশ্চিত আমাকে বের করে দেবেন। বাবার আদেশ আর হুদা স্যারের সেই উক্তি, ‘God may forgive our sin but nervous system never does’. আমাকে মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে দিল। আমি কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে আমার পড়াশুনার এখানেই শেষ হতে যাচ্ছে।

গেলাম আশফাক স্যারের কাছে। ভীষণ রাগী মানুষ। কেউ তার সামনে পড়ে না। হাত পা কাঁপতে থাকে তার সামনে পড়লে। স্যারের রুমে গেলাম। ভয়ে ভয়ে বলে ফেললাম আমার অসাধুতার কথা। আর কেঁদে ফেললাম। স্যার জানতে চাইলেন, আমি স্যারকে এ কথা বলতে গেলাম কেন? তার শাস্তি কী হতে পারে তা আমি জানি কি না? আমি চোখের জল মুছে বললাম, হ্যাঁ জানি। আমি অনেকটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। আমাকে ফিরে যেতে হবে। আমার বাবার কথাগুলি বললাম। স্যার কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বললেন, ঠিক আছে আর কখনও এ কাজ করো না। মাফ করে দিলেন। বাবাকে লিখলাম। আমাকে মাফ করে দিলেন সে কথাও লিখলাম। বাবা খুশি হলেন।

মাঝখানে এত গল্পের কারণ হলো আমি আমার জীবন থেকে অনেক শিক্ষা নিয়েছি। আমার সাথে যারা কাজ করে তাদের ভুলের জন্যে আমি কখনও রাগ করি না কিন্তু যদি কেউ আমাকে ঠকাতে চেষ্টা করে আমি খুব কষ্ট পাই। তখন আমি ক্ষমা করতে পারিনা, যদিওবা আমি নিজে ক্ষমা পেয়েছি।

জাকারিয়াকে বললাম, প্রশিক্ষণের এ ধারা বদলাতে হবে। আমি তাকে একটি ছোট্ট গল্প বললাম। কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক প্রথাগত প্রশিক্ষণে আমি যখন মূল্যায়ন করছিলাম প্রশিক্ষণের কনটেন্টস আর প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে তখন কেয়ার বাংলাদেশের জনি মন্টু সরকার লিখেছিলেন,

তিন দিনের প্রশিক্ষণে আমাদের প্রাপ্তি হচ্ছে তিনটি দিন নষ্ট। প্রশিক্ষকরা মনে করেছেন আমরা ছাত্র। আমরও যে মাঠে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আমাদেরও যে অনেক জ্ঞান আছে তা তারা ভাববারও সময় পান নি। ওনারা এসেছেন, কম্পিউটারে প্রেজেন্টেশন লোড করেছেন। আর ভরা কলসিতে জল ঢেলে চলে গেছেন। জল উপচে পড়লো কি না, জলের কি আদৌ প্রয়োজন ছিল কিনা, তার কোনো যাচাই ছিল না। বলতে গেলে ওয়ান ওয়ে পদ্ধতি। আমরা কিছুক্ষণ মনযোগ দিয়ে শুনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শুনেনি।

এমন মন্তব্যে আমার সহকর্মীরা কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও আমি বিষয়টি অনুধাবন করতে চেষ্টা করলাম। সত্যিই তো। যারা সরকারি – বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন তারা তো কেউ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। বয়স্ক শিক্ষা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা তো এক হতে পারে না। ইন্টারনেটে গেলাম। মজার সব তথ্য পেলাম বয়স্ক শিক্ষা নিয়ে, পেডাগগি (pedagogy) বিষয়ে। চেষ্টা করলাম পদ্ধতির পরিবর্তন করতে। পারলাম না। সরকারি পদ্ধতি। পরীক্ষিত পদ্ধতি। এর সাথে বাজেট জড়িত। শুধু বার্কের নয়, সমস্ত গবেষণা পদ্ধতির। কাজেই ব্যর্থ হলাম।

যেই না সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক প্রকল্পের দায়িত্ব পেলাম আমার নিজস্ব পদ্ধতির পরীক্ষণের সাহস করলাম। জাকারিয়া বললাম, প্রশিক্ষণটা আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ও লিচু বাগানে করতে চাই। জাকারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে রইল ভাবল আমি বোধ হয় আরও কিছু বলবো। আমি বললাম, না আমি সত্যিই বলছি, আমরা প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বদলিয়ে দিতে চাই। আমাদের ৩০ জন কর্মকর্তাকে ময়মনসিংহ না পাঠিয়ে তিনজন রিসোর্স পার্সন ড. রহিম ভাই, শরিফ ভাই ও আইয়ুব ভাইকে এখানে এনে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে চাই। সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. শাহ আলম (উদ্ভিদ রোগ বিশেষজ্ঞ) স্যারকে রাখতে চাই। জাকারিয়া বলল, ভাই শাহ আলম স্যারকে কেন? আমি বললাম, আমরা যে প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করবো তা শুধু আমাদের কর্মবাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে নয়, জ্ঞান বিনিময়ের জন্যে। আমি জানি শাহ আলম স্যারের এ কোর্সে কিছু দেয়ার আছে, কিছু নেয়ারও আছে। জাকারিয়াকে বললাম তুমি চার জন রিসোর্স পার্সনের জন্য চিঠি ড্রাফট করে নিয়ে এসো।

সে যথারীতি চিঠি তৈরি করে নিয়ে এল। আমি সই করে পাঠিয়ে দিলাম। রহিম ভাই, আইয়ুব ভাই ও শরিফ ভাই ফোন করতে লাগলেন উনারা যে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করবেন চিঠিতে সে বিষয় উল্লেখ করিনি কেন? জানতে চাইলেন, কে কোন বিষয়ের ওপর বক্তৃতা তৈরি করবেন। আমি বললাম, আপনাদের কোন প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে হবে না। শুধু আপাদের অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান নিয়ে আসবেন। কিছুটা হতবাক হলেন। এ কেমন প্রশিক্ষণ কোর্স। শাহ আলম স্যারও কিছুটা অপ্রস্তুত। আমাকে খুব বেশি চিনেন না। তবে বার্কে দু’একবার দেখা হয়েছে। উনি ইতোপূর্বে কখনও এমন আমন্ত্রণ পান নি।

যথারীতি আমরা প্রশিক্ষণের দিন চলে গেলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আম বাগানে গিয়ে বসলাম। আমি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছি। কোন ক্লাশ রুম নয়। আম বাগানে। বসার কোনো আয়োজন নেই। বললাম, আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কোনো বসার ব্যবস্থা করতে পারিনি বলে। আমরা আমের পাতা সরিয়ে বসতে চেষ্টা করবো। তাই করলাম আমরা ছয় জন এক পাশে; যারা প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন তারা আমাদের সামনে। আমি দাড়ালাম। বললাম, এ আম বাগানে নানা ধরণের রোগ-বালাই আছে। আপনারা এক ঘণ্টা সময়ে রোগাক্রান্ত পাতা বা ডালপালা বা পোকা মাকড় সংগ্রহ করবেন এবং ঠিক যেখানে বসেছি সে যায়গায় ফিরে আসবেন। সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। স্যারদের বললাম আপনারা তাদের সাহায্য করতে পারেন। দেখিয়ে দিতে পারেন রোগাক্রান্ত অংশ দেখিয়ে দিতে বা পোকা মাকড় দেখিয়ে দিতে। কিন্তু দয়া করে আর কিছু বলবেন না। সবাই মিলে উৎসবের মতো ছুটতে লাগলো এদিক ওদিক। এক ঘণ্টায় শেষ করতে পারলো না। প্রায় দু’ঘন্টার বেশি সময় নিয়ে এক গাদা নমুনা সংগ্রহ করলো।

৩০ জন অংশগ্রহণকারীকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করলাম। প্রত্যেক গ্রুপে ৫ জন। সব গ্রুপে বাদামী রংয়ের বড় বড় কাগজ দেয়া হল। কলম দেয়া হল। বললাম এবার গ্রুপে একপাশে নমুনা রাখ, নমুনা দেখে তোমাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে রোগ বা বালাই এর নাম লিখ এবং এ রোগ কিভাবে তোমরা দমন কর তার বর্ণনা দাও। স্যারদের বললাম, আপনারা দেখতে থাকুন। কিছুই বলবেন না। আমরা আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে রোগ বালাই দমনের প্রথাগত দমন পদ্ধতিসমূহ আগে জেনে নিই। রহিম ভাই প্রথম দিকে খুব বিরক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে তার চেহারায় যে পরিবর্তন আসছে তা বুঝতে পারছিলাম। শরীফ ভাই শুধু মুচকি মুচকি হাসছেন। আইয়ুব ভাই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। হাসতেও কিপ্টেমি করে। স্বভাব। শাহ আলম স্যারের কাছে সব কিছুই খুব আনন্দের। দু’ঘণ্টা চললো আলাপ আলোচনা। শেষ হল আমের রোগ বালাই চিহ্নিতকরণ এবং প্রথাগত দমন পদ্ধতির তথ্য সংগ্রহ। দুপুরের খাবার শেষ। এবং উপস্থাপনের পালা। প্রতি গ্রুপ থেকে একজন উপস্থাপন করলেন। জাকারিয়াকে বললাম সব পোষ্টারের ছবি তুলে রাখার জন্য। হারুনী আর রফিকের দায়িত্ব ছিল ডকুমেন্টেশন। স্যারদের বললাম – এবার আপনাদের কাজ শুরু। প্রতিটি উপস্থাপনের পর আপনারা বলবেন প্রশিক্ষণার্থীরা যে রোগের কথা বলছে এবং তার যে দমন পদ্ধতি আছে সে বিষয়ে বাড়তি জ্ঞান বা আধুনিক জ্ঞান সর্ম্পকে আপনার কি জানা আছে? স্যাররা বললেন, সকাল থেকে প্রশিক্ষণার্থীরা যে রোগ বালাই এর নমুনা সংগ্রহ করেছে তার সব আমাদের নিজেদেরই জানা নেই। আমে এত ধরণের সমস্যা আছে তা এখানে না আসলে বুঝতাম না। শরীফ ভাই সাথে সাথে বললেন, আমি এ ধরনের পোকা নিয়ে গবেষণার জন্য একজন পিএইচডি ষ্টুডেন্ট নেব। আইয়ুব ভাইও ভাবলেন, অন্তুত: দু’একজন এমএস বা এমফিল ষ্টুডেন্ট নেয়া যেতে পারে। রহিম ভাই তার গবেষণার প্রচুর রসদ খুঁজে পেলেন। শাহ আলম স্যার বললেন, আমরা যারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, আমাদের কেউ কোনোদিন এভাবে ডাকে নি। আমার জানা ছিলো না এভাবেও একটি প্রশিক্ষণ হতে পারে। যেখানে ভেবেছিলাম কিছু জ্ঞান দান করবো, সেখানে আমি অনেক কিছু শিখে যাচ্ছি। আমার ছাত্রদের শিখাতে পারবো।

একই পদ্ধতিতে আমরা পরদিন লিচু বাগানে প্রশিক্ষণ কোর্স চালালাম। জাকারিয়ার আনন্দ আমাকে আবেগ আপ্লুত করেছিল তার সফলতার জন্যে। বাকি সময়টাতে সে শুধু এ ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজন করেছিল। তাকে অবশ্যই বেশিদিন ধরে রাখতে পারিনি। মাত্র দু’বছরের মাথায় সে ক্যানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে যায়। কিন্তু জাকারিয়া ভুলেনি তার সে কাহিনী। তাই জাকারিয়া আমার পোষ্টিং এ সে প্রশিক্ষণের বিষয়টি এনেছে।

Comments

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

আমার জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫২ ইং। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে এমএসসি, ১৯৮৩ সালে পাকিস্তানের ফরেষ্ট্রি ইন্সটিটিউট থেকে ফরেষ্ট্রিতে এমএসসি এবং ১৯৯৫ সনে যুক্তরাজ্যের ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস ডিগ্রি লাভ করি। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিটউট ও কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ২৫ বছর সরকারি চাকুরি, ৫ বছর সুইজারল্যাণ্ড ভিত্তিক আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইন্টারকোঅপারেশনে এবং বিগত ৮ বছর ধরে আরণ্যক ফাউন্ডেশনে কাজ করছি।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

1 মন্তব্য on "প্রশিক্ষণ পদ্ধতি: সরকারি বনাম বেসরকারি"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
আসরাফ
অতিথি

চমৎকার লেখা,
আমার চারকরী জীবনও অনেক প্রশিক্ষন নিতে এবং দিতে হয়। এটা আমার কাজে লাগবে। তবে সেই কথা এখনো সত্য যে নতুন কিছু চালু করা খুবই কঠিন। সবাই গতানোগতিক ভাবেই কাজ করতে চায়।

wpDiscuz