কোয়ান্টাম কম্পিউটারের যত কাণ্ড – ১

ডি-ওয়েভের তৈরী কোয়ান্টাম চিপ

ডি-ওয়েভের তৈরী এই কোয়ান্টাম চিপটি প্রথম প্রজন্মের একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ডিভাইস। সৌজন্যে: উইকিপিডিয়া

প্রোগ্রামাররা, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা, আইটি সিকিউরিটি এক্সপার্টরা নড়েচড়ে বসুন। কয়েকটি পোস্টের একটা সিরিজ শুরু করতে যাচ্ছি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে। কথা দিচ্ছি, প্রতিটিতেই থাকবে ধামাকা, প্রতিটিতেই থাকবে চমক!

তো, প্রথম পোস্টের চমকটা কি? চমকটা আর কিছুই না, আজ আপনাদেরকে এমন এক কম্পিউটারের কথা বলব, যে কম্পিউটার চালু না করলেও সমস্যার সমাধান দিতে পারে।

অলৌকিক মনে হচ্ছে? কিংবা ধাপ্পাবাজি? আসলে কোয়ান্টাম জগতের সবকিছুই একটু ধোঁয়াটে, একটু অস্বস্তিকর, একটু অলৌকিক ঠেকে সবার কাছেই, এমনকি খোদ আলবার্ট আইনস্টাইনের কাছেও প্রথম প্রথম তাই ঠেকতো। যদি আপনার কাছেও এমন না মনে হয়, তাহলে হয়তো আপনি বিজ্ঞান বোঝেন না, কিংবা এত বেশি বোঝেন যে আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছে পৃথিবী নতুন কোনো আবিষ্কারের আশায়।

তো, ভণিতা ছেড়ে দিয়ে আসল কথা বলি। কী যেন বলছিলাম, ও হ্যাঁ, যে কম্পিউটার চালু না করলেও সমস্যার সমাধান দিতে পারে। একে আপনি কী বলবেন? ভূতপিউটার? এ তো পুরোদস্তুর রূপকথা হয়ে গেল, কেমন করে তা সম্ভব?

আসলে এটি পুরনো খবর, নতুন পাত্রে পরিবেশিত। সেই ২০০৬ সাল থেকেই মানুষ জানে, প্রথম জেনেছিলেন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। যে ঘটনাটি তারা আবিষ্কার করেন, এখনকার দিনে তাকে বলে কাউন্টারফ্যাকচুয়াল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। এটি ঘটানোর জন্যে যে তারা কোয়ান্টাম ইন্টারোগেশন বলে একটি কৌশলের সাহায্য নিন। কৌশলটি খুবই সরল, আবার বুঝতে না পারলে খুবই জটিল।

আমরা জানি কোয়ান্টাম জগতের কণারা একই সাথে অবস্থান করে, আবার করে নাওয়েভ-পার্টিকল ডুয়ালিটির এই ধর্মকেই আশ্রয় করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং কোয়ান্টাম ইন্টারোগেশন টেকনিক গড়ে উঠেছে। ক্লাসিকাল নিউটনিয়ান বিট, অর্থাৎ যে বিটে সাধারণ কম্পিউটারের মেমরি (তথ্য ধারণক্ষমতা) তৈরি হয়, সে বিট যে কোনো মূহুর্তে শুধু একটি মান ধারণ করতে পারে, হয় শুন্য, নয়তো এক। কিন্তু শ্রোডিঙ্গারের বেড়ালের মতই একটি ফোটনের একই সাথে অবস্থান থাকে এবং থাকে না, একে বলে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন (উপরিপাতন), এবং এই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মেমরি বিটকে বলে কিউবিট। একটি কিউবিটের মান একই মূহুর্তে এক এবং শুন্য উভয়েই হতে পারে।

এর ফলাফল? ধরুন, আপনি একটি কোয়ান্টাম সার্চ অ্যালগরিদম তৈরি করলেন, এবং সেই অ্যালগরিদমটি রান করা আর না করা’র সুপারপজিশনে একটি ফোটনকে রেখে দিলেন। দেবার পরে অ্যালগরিদমটি আর রান করলেন না। রান না করেই আপনি ফোটনের পরিমাপ নিলেন, এবং পরিমাপের ফলে ফোটনের একটি অবস্থান পেলেন।

যেহেতু ফোটনটি সার্চ অ্যালগরিদমটি রান করা আর না করার সুপারপজিশনে ছিল, এবং অ্যালগরিদমটি রান না করে আপনি পরিমাপ নিয়েছেন, সেহেতু ফোটনটি সব সময়, আই রিপিট সব সময় অ্যালগরিদমটি রান করলে যে অবস্থানে পৌঁছাতো, তার সম্পূর্ণ বিটপ্রতি বিপরীত (নেগেটেড) অবস্থানে থাকবে। সুতরাং ফোটনটির অবস্থানটিকে নেগেট করে নিলেই আপনি সার্চ রেজাল্টটা পেয়ে যাবেন, অ্যালগরিদমটি রান করবার দরকার পড়বে না।

প্রশ্ন করতে পারেন, ফোটন একটি কণা মাত্র। অ্যালগরিদমটি রান করার আগে সে কি করে বুঝতে পারবে যে অ্যালগরিদমটি রান করলে সে কোথায় উত্তরটা খুঁজে পেতো, অর্থাৎ সে কোন অবস্থানে থাকতো, আর সেটা না বুঝতে পারলে সেটার বিপরীত অবস্থান সে নেবেই বা কেমন করে। এটাই কোয়ান্টাম ইন্টারোগেশনের যাদু। যারা ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট সম্পর্কে পড়েছেন, তারা জানেন, কিভাবে ফোটন পর্যবেক্ষণ লক্ষ্য করলে অতীতে ফিরে গিয়ে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। তো এই সব অতীত-গমন জাতীয় ভূতুড়ে ভাবসাব কেনই বা আইনস্টাইন মহোদয়ের কাছে প্রথম প্রথম স্পুকি (অলৌকিক) মনে হবে না? ব্যাপারটা আসলে তাই, ফোটন যে পথে যাওয়া যাবে না, সে পথ দেখে এসেছে যেন আগেই, এমনভাবে সে পথে না যাওয়া হলে তার বিপরীত অবস্থানটি প্রকাশ করে। এভাবেই কোয়ান্টাম ইন্টারোগেশনের মাধ্যমে একটি পথে না গিয়েও সে পথের সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব।

এই পরীক্ষা শুধু ২০০৬ সালে করা হয়নি, বার বার পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব হয়েছে এই পরীক্ষাটির বিভিন্ন পদ্ধতিতে, এবং বর্তমান কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর অন্যতম ভিত্তি ফোটন-এর এই অদ্ভুত ক্ষমতা। সর্বশেষ এই পরীক্ষাটি করা হয় ২০১৫ সালে, হীরার মধ্যে নেগেটিভলি চার্জড নাইট্রোজেন কণার ঘূ্র্ণনের মাধ্যমে একটি কোয়ান্টাম-স্কেল ‘জিনো এফেক্ট’ তৈরী করে।

পুরো জিনিসটা বেশ জটিল লাগছে, তাই না? জ্বী, আমারও লাগছে। বুঝতে সমস্যা হচ্ছে তো? হ্যাঁ, আমারও হয়। বলেছি তো, জটিল না লাগলে হয় আপনি বিজ্ঞান বোঝেন না, অথবা আপনিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। এমন করে কেন কথা বলছি? সবাই তাই বলেছে ভাই। সেই নীলস্ বোর, পলি, হাইজেনবার্গ, আইনস্টাইন, ফাইনম্যান থেকে সবাই। কেউ সহজে বোঝেনি বা বোঝাতে পারেনি কোয়ান্টাম জগতের আশ্চর্য ছলাকলা। কী করে বুঝবেন? কোয়ান্টাম জগতের কণারা যে ছোট্ট, অতিশয় ছো্ট্ট। আর ছোটদের কথা বড়রা কী বুঝবেন তাদের মোটা মাথা দিয়ে? আমরা ক্লাসিকাল জগতের মানুষরা তাই সর্বসাকুল্যে কবিগুরুর গান শুনে মনের খায়েশ মেটাই-

‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোনো কথা না বলি
তোমার ভাষা বোঝার আশা, দিয়েছি জলাঞ্জলি’…

তবু চেষ্টা তো করেই যাবো। সবাই ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন! অনেক শুভ কামনা!

তথ্যসূত্র:

১. ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা:
https://news.illinois.edu/blog/view/6367/207042

২.নিউজ কাভারেজ:
http://www.nature.com/n…/2006/060220/full/news060220-10.html

৩. ২০১৫-তে সর্বশেষ রিপিটেড পরী্ক্ষা, কোয়ান্টাম জিনো এফেক্ট ব্যবহার করে:
https://journals.aps.org/…/a…/10.1103/PhysRevLett.115.080501

৪. ২০১৫ সালের পরীক্ষাটির নিউজ কাভারেজ:
https://www.sciencenews.org/…/physicists-get-answers-comput…

৫. কাউন্টারফ্যাকচুয়াল কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন :
https://en.wikipedia.org/…/Counterfactual_Quantum_Computati…

৬. কোয়ান্টাম ইন্টারোগেশন:
http://link.springer.com/c…/10.1007%2F978-3-540-70626-7_168…

৭. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং:
https://en.wikipedia.org/wiki/Quantum_computing

৮. কোয়ান্টাম জিনো এফেক্ট:
https://en.wikipedia.org/wiki/Quantum_Zeno_effect

৯. ডাবল-্স্লিট এক্সপেরিমেন্ট:
https://en.wikipedia.org/wiki/Double-slit_experiment

১০. আরো প্রশ্নবোধক চিহ্ণ? হাঁ মুখ? কেমন করে হয়?
https://en.wikipedia.org/wiki/Quantum_mechanics

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz