কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির আদ্যোপান্ত – দ্বিতীয় পর্ব

প্রথম পর্বের পর

কোয়ান্টাম তত্ত্বে মহাকর্ষের প্রভাব

পদার্থবিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন এতো কিছুর পরও কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি একরকম অধরাই থেকে যাচ্ছে তখন তাঁরা কোয়ান্টাম তত্ত্বে মহাকর্ষের প্রভাব কী হয় সেটা দেখার চেষ্টা করলেন। এজন্য যেটা করতে হয় সেটা হচ্ছে স্থান-কালে বিশেষ করে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র যেখানে শক্তিশালী সেখানে কোয়ান্টাম কণাগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের স্থান হতে পারে কৃষ্ণ গহ্বর বা প্রসারমান মহাবিশ্ব। ষাটের দশকে এ বিষয়ে বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর প্রথম সফলতা ছিলো একটি ভবিষ্যদ্বাণী যেখানে বলা হয়েছে, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র যদি অতি দ্রুত পরিবর্তিত হয় (কালে) তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পারমাণবিক কণার সৃষ্টি হতে পারে। মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা জানতে এই ধারণাটি কাজে লাগতে পারে।

প্রথমবারের মতো কৃষ্ণ গহ্বরের অভ্যন্তরে পদার্থবিদ্যার একটি তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটান জ্যাকব বেকেনস্টেইন, ১৯৭৩ সালে। তাঁর ধারণামতে কৃষ্ণ গহ্বরের এনট্রপি থাকা সম্ভব। এনট্রপি হচ্ছে বিশৃঙ্খলতার পরিমাপ। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রমতে, একটি বদ্ধ সিস্টেমের এনট্রপি কখনও কমে না। বাক্সভর্তি গ্যাস নিয়ে যদি কৃষ্ণ গহ্বরে ফেলা হয় তবে মহাবিশ্বের মোট এনট্রপি কমছে বলে মনে হবে কেননা এই গ্যাসকে আর কখনই উদ্ধার করা সম্ভব নয় (কারণ কৃষ্ণ গহ্বর থেকে কোন কিছুই বের হতে পারে না)। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বেকেনস্টেইন বললেন, কৃষ্ণ গহ্বরের নিজস্ব এনট্রপি থাকতে হবে যা গ্যাসসহ বাক্সটি ফেলার দরুন আরও বাড়বে। এতে মহাবিশ্বের মোট এনট্রপির পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকবে। তিনি হিসাব কষে দেখালেন, কৃষ্ণ গহ্বরের এই এনট্রপির পরিমাণ গহ্বরটির ঘটনা দিগন্তের ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক।

যেহেতু এনট্রপি হচ্ছে বিশৃঙ্খলতার পরিমাপ (অথবা বিক্ষিপ্ততা) এবং বিক্ষিপ্ত গতি তাপ উৎপন্ন করে সেহেতু কৃষ্ণ গহ্বরেরও তাপমান থাকা উচিত। ১৯৭৪ সালে স্টিফেন হকিং দেখালেন, কৃষ্ণ গহ্বরের তাপমাত্রা আছে যেটা এর ভরের ব্যাস্তানুপাতিক। অর্থাৎ কৃষ্ণ গহ্বরের ভর বাড়লে এটি ক্রমেই শীতল হতে থাকবে। হকিং আরো বললেন, কৃষ্ণ গহ্বরের তাপমাত্রা থাকায় এটি কৃষ্ণ বস্তুর ন্যায় শক্তির বিকিরণ করবে। এভাবে কৃষ্ণ গহ্বর শক্তিরূপী ভর হারাতে থাকবে। ফলে কৃষ্ণ গহ্বর আরও বেশি পরিমাণে উত্তপ্ত হবে এবং অধিক শক্তি বিকিরণ করতে থাকবে। এভাবে এক সময় এটি প্ল্যাঙ্ক ভরে পৌঁছবে এবং এমতাবস্থায় শেষ পরিণতি জানার জন্য মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রয়োজন হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কৃষ্ণ গহ্বরে পতনের পর আপতিত সকল কিছুর সকল তথ্য কি সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাবে নাকি উদ্ধার করা সম্ভব হবে। কেননা কৃষ্ণ গহ্বরে চেয়ার, টেবিল, বাতি অথবা একটি ঘড়ি ইত্যাদি ফেললে পরবর্তীতে এর ফলস্বরূপ আমরা পাবো শুধু বিকিরণ; চেয়ার, টেবিল, বাতি অথবা ঘড়ি বলতে যা বুঝি তার কিছুই পাবো না। এটা আমাদের আলোচিত কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির জন্য এক বড় ধাঁধাঁ। এই ধাঁধাঁটিকেই হকিং “Black Hole Information Paradox” নামে অভিহিত করেছেন। এই ভ্রম থেকে উদ্ধার পাবার জন্যও মহাকর্ষের কোয়ান্টাম সংযুক্তির প্রয়োজন।

অতি প্রতিসাম্যতা (Super Symmetry)

কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির পরবর্তী প্রচেষ্টা ছিলো অতি প্রতিসাম্যতার ভিত্তিতে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা। ফলাফলস্বরূপ পাওয়া যায় অতি মহাকর্ষ (super gravity)। অতি প্রতিসাম্যতা ধারণাটির জন্ম হয় কণিকা ও বলের একত্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা থেকে। অতি প্রতিসাম্যতার ভিত্তিতে ফার্মিওন এবং বোসনকে মিলিতরূপে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ফার্মিওন হচ্ছে পদার্থ সৃষ্টিকারী কণা (যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন) এবং বোসন হচ্ছে বলবাহী কণা (যেমন ফোটন, গ্লুওন)। কিন্তু অতি মহাকর্ষের গবেষণাও খুব বেশি দিন টিকতে পারেনি। এতে কেবল গাণিতিক জটিলতাই বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

তন্তু তত্ত্ব (String Theory)

ষাটের দশকের শেষের দিকে কণা পদার্থবিদ্যার একটি সমস্যার দিকে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি চলে যায়। সবলভাবে ক্রিয়াশীল কণাগুলো (যেমন প্রোটন ও নিউট্রন, যেগুলো কোয়ার্ক দ্বারা সৃষ্ট) যখন একে অপরের দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয় তখন কী ঘটে? এখানে জেনে রাখা ভালো যে, প্রোটন ও নিউট্রন ছাড়াও আরও বহু কণিকা আছে যেগুলো কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। তবে এরা খুবই অস্থায়ী প্রকৃতির হয় এবং কেবলমাত্র ত্বরক যন্ত্রে (Particle Accelerator) প্রোটনের সাথে প্রোটনের সংঘর্ষ ঘটিয়ে এদের পাওয়া সম্ভব। ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে এইসকল কণার সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও এই শ্রেণীর কণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটলে কী হয় তাও বের করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৬৮ সালে ইটালির গ্যাব্রিয়েল ভেনিজিয়ানো নামক এক তরুণ পদার্থবিদ এই তথ্য-উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করার সময় উপাত্তগুলোর মধ্যে একটি বিস্ময়কর মিল খুঁজে পান। এর উপর ভিত্তি করে তিনি একটি ফর্মুলা লিখলেন যার মাধ্যমে বিভিন্ন কোণে বিক্ষিপ্ত কণার সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়। ১৯৭০ সালের দিকে কিছু পদার্থবিদ ভেনিজিয়ানোর সম্পূর্ণ কাজকে বাহ্যিক কিছু নকশার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পান। এদের মধ্যে শিকাগো ইউনিভার্সিটির নাম্বু, নীলস বোর ইনস্টিটিউট এর নিলসেন এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির লিওনার্ড সাসকিন্ড এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই নকশা অনুসারে কণিকাগুলোকে বিন্দুবৎ কণা আকারে না দেখে তন্তু আকারে দেখতে হবে এবং এই তন্তু হবে একমাত্রিক। এছাড়াও তন্তুগুলো রবার ব্যান্ডের ন্যায় সংকোচিত-প্রসারিত হতে পারে। তন্তুগুলো শক্তি গ্রহণ করে প্রসারিত এবং শক্তি মুক্ত করে সংকোচিত হয়। এমনকি রবার ব্যান্ডের ন্যায় এরা কম্পিতও হতে পারে। প্রোটন বিচূর্ণকরণ পরীক্ষায় যে অসংখ্য সবল ক্রিয়াশীল কণার সন্ধান পাওয়া যায় এদের প্রতিটিকে তন্তুর বিভিন্ন প্রকার কম্পনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। মোটামুটি এই ছিলো তন্তু তত্ত্বের শুরুর কথা।

যে সমস্যার সমাধানকল্পে তন্তু তত্ত্বের জন্ম হয়েছিল পরবর্তীতে সেই সমস্যাটির সমাধান হয়েছিল কণা পদার্থবিদ্যার আদর্শ প্রতিরূপের মাধ্যমে। এই প্রতিরূপ অনুসারে সবল ক্রিয়াশীল কণাগুলো একটি বোসন (গ্লুওন) কণার বিনিময়ের মাধ্যমে স্থিতিশীল হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তন্তু তত্ত্বের প্রবক্তরা ভুল ছিলেন। বরং আদর্শ প্রতিরূপের মাধ্যমে মূল সমস্যার সমাধান হলেও তন্তু তত্ত্বের গবেষণা কিন্তু থেমে থাকেনি। অচিরেই বিজ্ঞানীরা (যারা তন্তু তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন) বুঝতে পারলেন যে, তন্তু তত্ত্বকে সঠিক হবার জন্য একে অবশ্যই বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আর সেটা তখনই হবে যখন তত্ত্বটি কিছু শর্ত পূরণ করবে। শর্তগুলো হচ্ছে- মহাবিশ্বকে পঁচিশ মাত্রার হতে হবে, ট্যাকিওনের অস্তিত্ব থাকতে হবে এবং এমন কণা থাকতে হবে যাকে কখনও স্থির অবস্থায় আনা যাবে না। তাছাড়া প্রকৃতিতে প্রাপ্ত অথবা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত অনেক কণিকা এই তত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। উদাহরণস্বরূপ এই তত্ত্বে ফার্মিওন শ্রেণীর কোন কণাই ছিল না। এই সমস্যার সমাধানকল্পে এগিয়ে এলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ পিয়েরে রেমন্ড, অ্যান্ড্রি নেভিউ এবং জন শোয়ার্জ। তাঁদের সংস্কারকৃত তত্ত্বে ট্যাকিওনের কোন অস্তিত্ব নেই এবং স্থানিক মাত্রা পঁচিশ থেকে কমে নয় মাত্রার (সময়ের মাত্রাসহ দশ মাত্রা) হয়েছে। এছাড়াও তাঁরা কিছু সমীকরণ বের করেছিলেন যার মাধ্যমে তন্তু তত্ত্বটি বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কিন্তু তখনও ভরহীন কণার শর্তটিকে কিছুতেই মেলানো যাচ্ছিল না। অবশেষে শার্ক, শোয়ার্জ এবং ইয়োনেয়ার গবেষণাকর্মের মাধ্যমে জানা গেলো, ভরহীন কণাটি হচ্ছে গ্র্যাভিটন। এই সেই গ্র্যাভিটন যেটাকে অন্য তিনটি বলবাহী কণার সাথে একত্রীকরণের চেষ্টায় বছরের পর বছর বিজ্ঞানীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তন্তু তত্ত্ব মতে, তন্তুর প্রান্তদ্বয় খোলা ও বদ্ধ- উভয় প্রকার হতে পারে। তন্তুর প্রান্তদ্বয় জোড়া লেগে ফাঁস গঠন করে। এই ফাঁসটির কম্পন গ্র্যাভিটনের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। আবার ফোটনের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে খোলা অথবা আবদ্ধ তন্তুর কম্পন। তন্তুর খোলা প্রান্তদ্বয় আবার বিপরীতধর্মী আধান বহন করে। যেমন তন্তুর এক প্রান্ত যদি ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণিকা ইলেকট্রনকে নির্দেশ করে তবে অপর প্রান্ত অবশ্যই এর বিপরীত কণা পজিট্রনকে নির্দেশ করবে। দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী তন্তুর ভরবিহীন কম্পন ফোটন কণার প্রতিনিধিত্ব করে যেটা কণা এবং প্রতিকণার মধ্যেকার সৃষ্ট তড়িৎচৌম্বক বল বহন করে। ফলে দুই প্রান্ত খোলা তন্তু থেকে একইসাথে কণা ও বল পাওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন, এভাবে তন্তু তত্ত্বকে যদি আরও সংস্কার সাধন করা যায় তবে প্রমিত মডেলে বর্ণিত সকল প্রকার বল ও কণার অন্তর্ভুক্তি সম্ভব। আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত তন্তু তত্ত্বে আরও দুটো বিপ্লব সাধিত হয়েছে (যার একটি ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এবং অপরটি ১৯৯৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত) যে বিপ্লবের সাথে জড়িত ছিলেন পৃথিবীর খ্যাতনামা সব পদার্থবিদ। তন্তু তত্ত্বেরও পাঁচটি প্রকার আছে যেগুলোর মধ্যে পরবর্তীতে গাণিতিক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিটি ভাগের একটি সাধারণ প্রকাশ থাকা অসম্ভব কিছু নয়। গভীর তাৎপর্যময় এই কাঠামোটিকে বলা হয় এম (M) তত্ত্ব।  এই কাঠামোটিকে ঠিক মতো বুঝতে পারাটাই এখন তন্তু তত্ত্ববিদদের অন্যতম প্রধান একটি লক্ষ্য। তন্তু তত্ত্বটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল এবং এখনও আছে। তত্ত্বটির সবচেয়ে বড় সমস্যাটা বোধ হয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণের মাধ্যমে এর সত্যতা যাচাইয়ে অসুবিধা। তত্ত্বটি এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে যেগুলো যাচাই করে দেখা আমাদের সাধ্যের অতীত। তবে বর্তমান তন্তু তত্ত্ববিদরা এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তন্তু তত্ত্বে বর্ণিত এতগুলো মাত্রা স্থানে কীভাবে জমাটবদ্ধ হয়ে থাকে সেটাও এক বিরাট ধাঁধাঁ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তত্ত্বটি এখনও পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ না। এর একটি সমস্যার সমাধান অপর একটি সমস্যার উদ্ভব ঘটায়। ফলে তাত্ত্বিক বিবেচনায় তত্ত্বটি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। অনেক তরুণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানী যেমন তন্তু তত্ত্বের গবেষণায় প্রবেশ করছেন তেমনি বহু প্রতিভাবান বিজ্ঞানী নিরাশ হয়ে গবেষণার পথ থেকে সরে এসেছেন। তারপরও বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বটিকেই কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির জন্য গ্রহণযোগ্য একমাত্র তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক কেননা তত্ত্বটি কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাতে সক্ষম হয়েছে। তবে এটা ভাবা ঠিক হবে না যে, পৃথিবীর সকল পদার্থবিজ্ঞানী তন্তু তত্ত্বের পক্ষে। তন্তু তত্ত্ববিরোধী বিজ্ঞানীদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এদের মতে, কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির জন্য তন্তু তত্ত্বের ন্যায় মরীচিকার পেছনে না ঘুরে বরং অন্য পন্থায় চেষ্টা করা উচিত। এইসকল বিজ্ঞানীদের মতে, কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির তত্ত্ব অবশ্যই পশ্চাদ্ভূমি অনির্ভর হতে হবে এবং তন্তু তত্ত্ব এই প্রাথমিক শর্তটি পূরণেই ব্যর্থ। এইসকল বিজ্ঞানীর মতে, তন্তু তত্ত্বের সফলতার চেয়ে ব্যর্থতা বেশি। অপরদিকে তন্তু তত্ত্ববাদীদের আশা এই ব্যর্থতার কবল থেকে অচিরেই মুক্ত হওয়া যাবে। শুধু একটু সময় দরকার। অনেকে আবার তন্তু তত্ত্বকে বিজ্ঞান মানতে নারাজ, কারণ তন্তু তত্ত্ব নাকি গ্যালিলিও প্রদত্ত আধুনিক বিজ্ঞানের নীতি মানে না।

মহাকর্ষের আণুবীক্ষণিক অবস্থা- কোয়ান্টাম জ্যামিতি

কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির জন্য প্রস্তাবিত আরও একটি উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব হচ্ছে “Loop Quantum Gravity” বা সংক্ষেপে LQG. এই তত্ত্ব মহাকর্ষের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করে। এই তত্ত্বানুসারে, ক্ষেত্রতত্ত্বসমূহকে (যেমন তড়িৎচৌম্বক তত্ত্ব) সরাসরি এদের ক্ষেত্ররেখারূপে বর্ণনা করা হয়। LQG এর মূল ধারণাগুলো এসেছে আলেকজান্ডার পলিয়াকভ, কেনেথ উইলসন এবং হলগার নিলসেন এর মাথা থেকে। পদার্থের অনুপস্থিতিতে ক্ষেত্ররেখাসমূহ নিজেরা নিজেদের উপর জড়িয়ে ফাঁস (loop) তৈরি করে। এ কারণে তত্ত্বটির নামকরণ করা হয়েছে Loop Quantum Gravity. ১৯৮৬ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অভয় অ্যাশটেকার একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেখানে দেখানো হয়েছে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে গেজ ক্ষেত্রের আদলে প্রকাশ করা যায়। ফলে স্থান-কাল মেট্রিক তড়িৎক্ষেত্রের ন্যায় কিছু একটাতে রূপান্তরিত হয়। আমরা যখন একইরূপ ক্ষেত্ররেখাগুলোকে কোয়ান্টাম তত্ত্বে ব্যবহার করতে যাই তখন কোন পশ্চাদ্ভূমি থাকে না কেননা ক্ষেত্ররেখাগুলোই তখন স্থানিক জ্যামিতি গ্রহণ করে। ফলে কোনরূপ চিরায়ত জ্যামিতি আর অবশিষ্ট থাকে না। চিরায়ত জ্যামিতি বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে আমাদের স্বাভাবিক ধ্যানধারণায় সৃষ্ট স্থানিক জ্যামিতি। এই তত্ত্বানুসারে, ফাঁসগুলো একত্রে জালের ন্যায় গঠন তৈরি করে যাকে বলা হয় স্পিন নেটওয়ার্ক। এই স্পিন নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে স্পিন ফোম (Spin Foam) এ পরিণত হয়। আর এর দৈর্ঘ্য কখনই প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যকে অতিক্রম করে না। অর্থাৎ স্থান নিজেই পারমাণবিক গঠনরূপে আবির্ভূত হয়। তবে তন্তু তত্ত্ব বা LQG সঠিক হোক বা না হোক, মানবজাতি এখনও পর্যন্ত যে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করতে পারেনি এ কথা সত্য। কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি এখন পদার্থবিদদের কাছে পরশ পাথরের ন্যায় আরাধ্য একটি বিষয় যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের পরিপূর্ণ একটি মডেল প্রস্তুত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz