সাজিদ আলী হাওলাদারঃ সরীসৃপ প্রাণির শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী

মো. সাজিদ আলী হাওলাদার বিশ্বের সরীসৃপ প্রাণির শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী বলে স্বীকৃত। আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির কিউরেটর ড. ড্যারেল ফ্রস্ট তাকে এই স্বীকৃতি দিয়েছেন।

১৯৮৫ সালে জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশি এই বিজ্ঞানী ২০১১ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সেই তার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন প্রাণির শ্রেণিবিন্যাসের আন্তর্জাতিক জার্নাল জুট্যাক্সা-য়। সেসময় তিনি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির একটি ব্যাঙ আবিষ্কার করেছিলেন। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডঃ গাজী সৈয়দ আজমতের নামে প্রথম আবিষ্কৃত ব্যাঙটির নামকরণ করেছেন Zakerana asmati (জাকেরানা আসমতি)। 

4

প্রথম ব্যাঙ আবিষ্কারের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সাজিদ বলেন,

২০০৮ সালে একটা অন্যরকম ব্যাঙ পেয়ে সেটি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া শুরু করি। কিন্তু সারা বিশ্বে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ও তালিকাভুক্ত প্রায় ৭০০০ প্রজাতির ব্যাঙের মধ্যে এই ব্যাঙ খুঁজে পেলাম না। এরপর আরও নিশ্চিত হতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, পর্তুগাল, ইতালি, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। তারপর এই ব্যাঙটি সম্পর্কে গবেষণা প্রবন্ধ লিখে প্রাণির শ্রেণিবিন্যাসের কাজে নিয়োজিত জার্নাল জুট্যাক্সায় পাঠাই। অবশেষে ২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জুট্যাক্সা জার্নালের ২৭৬১ ভলিউমে আমার গবেষণা প্রকাশিত হয়।

৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে ‘পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্স’-এর জার্নালে সাজিদের দ্বিতীয় আবিষ্কার উন্মোচিত হয়। এটি ছিল Euphlyctis kalasgramensis নামের ব্যাঙ। খেয়াল করুন নামের “kalasgramensis” অংশটি। “কলস গ্রাম” হলো বরিশাল জেলার একটি গ্রাম। সাজিদ এই গ্রামের নামেই ব্যাঙের এই প্রজাতির নামকরণ করেছেন। কারণটাও বেশ মজার। কলস গ্রাম ঘুরতে গিয়ে তার দেখা হয়েছিলো গ্রামের একজন চা দোকানদারের সাথে। তিনি তাকে আপ্যায়ন করেন এবং নতুন ব্যাঙ আবিষ্কার করতে পারলে তাদের গ্রামের নামে নাম দিতে অনুরোধ করেন। তার কথার ওপর শ্রদ্ধা রেখেই সাজিদ এই নামকরণ করেছেন। তবে Euphlyctis kalasgramensis নামের ব্যাঙটি এর আগে পরিচিত ছিলো Euphlyctis cyanophlycti নামে। কারণ ১৭৯৯ সালে জার্মান গবেষক Schneider ভারতে এক নতুন প্রজাতির ব্যাঙ আবিষ্কার করেন, এবং নাম দেনEuphlyctis cyanophlycti । বাংলাদেশেও ব্যাঙের একটা প্রজাতি এই নামে পরিচিত ছিলো। কিন্তু সাজিদ তার গবেষণায় বাংলাদেশের ঐ নির্দিষ্ট প্রজাতির ব্যাঙটিকে নতুন প্রজাতি হিসেবে প্রমাণ করতে সমর্থ হন। ফলে এটির নাম এখন হয়েছে Euphlyctis kalasgramensis

বাঙালির গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে সাজিদই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রাণির কোনো নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করলেন। এমনকি Zakerana (জাকেরানা) নামে প্রাণির নতুন একটি গণেরও (genus) নামকরণ করেছেন তিনি! আগে এটি পরিচিত ছিলো Fejervarya নামে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিতর্ক দিয়ে সাজিদ নতুন ‘গণ’ (genus) Zakerana প্রতিষ্ঠা করেছেন।  প্রজাতির তুলনায় ‘গণ’ পর্যায়ে সংস্কার করাটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আরও বেশি কঠিন এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আর শ্রেণিকরণবিদ্যার ভাষায় এখন এই গণের নাম দাঁড়িয়েছে zakerana howlader 2011 । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইমেরিটাস প্রফেসর ডঃ কাজী জাকের হোসেনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই গণের নামকরণ করেছেন সাজিদ। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ২০ প্রজাতির ব্যাঙের গণ এখন ‘জাকেরানা’ নামে পরিচিত হলো। তার এ কাজ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম এবং IUCN লাল তালিকাসহ সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে।

সাজিদের এই কৃতিত্বে আকৃষ্ট হয়ে ২০১১ সালে বেলজিয়ামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলস তাকে এমএস করার আমন্ত্রণ করে। তবে সেখানে সাজিদের যাওয়া হয়নি। একই বছর ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ বিবেচনায় সাজিদকে সরাসরি পিএইচডি প্রোগ্রামে নিয়ে নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নের নিয়ম অনুযায়ী, ঐদেশের স্থানীয় সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করতে হয়। কিন্তু সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে সাজিদ বাংলাদেশের ব্যাঙের উপর কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ লক্ষ্যে তিনি দেশ থেকে ১০০টি ব্যাঙ সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা মেনে নেয়। বাংলাদেশি ব্যাঙের ওপর ডিএনএ সিকুয়েন্সিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে সাজিদ এ পর্যন্ত আরও ছয়টি নতুন প্রজাতির ব্যাঙের সন্ধান পেয়েছেন। নতুন এই ছয় প্রজাতির ব্যাঙ শনাক্তকরণের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি চটগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট পুরষ্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন ‘হেলসিংকি কালচারাল ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৩’। অ্যাওয়ার্ডটি জৈব প্রযুক্তি গবেষণায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য বছরে একবার এবং একজনকেই দেয়া হয়।

তবে অতি সম্প্রতি সাজিদ আবিষ্কার করেছেন ব্যাঙের আরেকটি নতুন প্রজাতি। এর নাম দিয়েছেন Zakerana dhaka । ২০১৬ সালের ২ মার্চ বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী প্লস ওয়ান-এ তার গবেষণা প্রকাশিত হয়।

3

চলুন দেখি এই আবিষ্কার সম্পর্কে সাজিদ কী বললেন

“ব্রিটিশ ভারতের আমলে ঢাকাতে অনেক গাছপালা, জলাধার, এবং নাম না জানা অনেক বন্যপ্রাণীর বসবাস ছিলো। আমার জানামতে, ব্রিটিশ শাসন আমলে তাই ঢাকায় পাওয়া গিয়েছিলো সর্বশেষ আবিষ্কৃত বন্যপ্রাণীটি, যা British Naturalist W. Theobold দেড়শো বছর আগে আবিষ্কার করেছিলেন।

আজ ঢাকায় অনেক মানুষের বসবাস। ঢাকা এখন পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মেগা সিটি। জলাধার, গাছপালা দিন দিন কমে যাচ্ছে, সাথে অনেক বন্যপ্রাণী হয়ত আমাদের জানার আগেই চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বুক থেকে। নাম না জানা সেই সব প্রজাতির বাসস্থানের উপর গড়ে উঠছে বিভিন্ন নামের ভবন আর মার্কেট। তাই ঢাকার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণী এবং অজানা সেইসব প্রজাতির খোঁজে আবার অভিযান শুরু হয়েছিলো ২০১২-এর শুরু থেকে।

সব চিন্তাগুলোকে আরেকবার ভুল প্রমাণ করে দিলো এই প্রাথমিক ফলাফল। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরই পাওয়া গেলো একটা নতুন প্রজাতির ব্যাঙ, যার পরিচয় ছিলো পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছেই অজানা! ঢাকার চিপা/সরু রাস্তার পাশের এই ব্যাঙগুলোআজ পৃথিবীর মানুষের কাছে পরিচিত হলো নিজ পরিচয়ে। সবচেয়ে মজার বাপার হলো, ব্যাঙটি আবিষ্কৃত হলো গণভবন এবং সংসদ ভবন এলাকা থেকেই। এই প্রজাতির ব্যাঙ শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও বর্ষাকালে দেখা যায়। ঢাকা শহরের নামেই দেয়া হলো ব্যাঙ্টির নাম “Zakerana dhaka”। বাংলাতে বলা যেতে পারে “ঢাকাইয়া ব্যাঙ” (আমার প্রস্তাব)!

পৃথিবীর তালিকাতে এ প্রজাতিটি যুক্ত করতে বৃষ্টি কাদা মেখে আমার পাশে ছিলো আমার দুই দোস্ত Tapu Rayhan এবং Nasimul Ahsan।”

নিচের ভিডিও থেকে নতুন ব্যাঙটিকে দেখতে পারবেন।

এই তরুণ বিজ্ঞানীর ইচ্ছে দেশের জন্য কাজ করার। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন – “কাউকে ধরে নয়, বরং আমার যোগ্যতার বিচারে যদি আমাকে সুযোগ দেয়া হয় তবে অবশ্যই দেশে যেতে চাই। আমি আমার দেশের জন্য সব মেধা নিংড়ে দিতে প্রস্তুত— যদি আমাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়া হয়। আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য গোটা ইউরোপের প্রায় ৫ গুণ বেশি। একবার ভাবুন, আমাদের সম্ভাবনা কত!”

সূত্রঃ

১) বাংলা ট্রিবিউন

২) প্লস ওয়ান

৩) উইকিপিডিয়া

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz