অমরত্বের গবেষণায় বিজ্ঞান : প্রথম পর্ব – জীবন ও মৃত্যু

‘অমরত্ব’ চার অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ; কিন্তু এখনো পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের মনে শব্দটি তার আকারের চেয়ে হাজার গুণ বড় একটি ধাক্কা দিয়ে বসার মত ক্ষমতা রাখে। অতীতের নানান মিথলজিতে আমরা দেখি নানা রকম ‘শর্ত প্রযোজ্য’ ও ‘নিঃশর্ত’ অমরত্বের কথা। রয়েছে অমরত্বের সাথে তথাকথিত শয়তানের যোগসাজশের কথা, আরো কত কী!

এখানে সেসব মিথলজি নয়, বরং অদূর অতীতে দুরারোগ্য ব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণে এনে এককালের ‘অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু’কে বধ করার ইতিহাস এবং বর্তমান বিজ্ঞান, বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক ন্যানো-টেকনোলজির মিশ্রণে বিজ্ঞান গবেষণা বর্তমান মরণশীল মানুষকে কিভাবে সুদূর ভবিষ্যতে অমরত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণার নানা তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে।

প্রথমেই কয়েকটি ডিসক্লেইমার দেয়া জরুরি বোধ করছি।

ডিসক্লেইমার ১ ‘অমরত্বের গবেষণায় বিজ্ঞান’ বলতে এখানে অমরত্বকে কেন্দ্র করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার কথা বলা হচ্ছে না। বরং, সেসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সেসকল গবেষণা যেগুলোর ফলাফল হয়ত সুদূর ভবিষ্যতে মানুষকে অমরত্বের দিকে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখতে পারে সেগুলো নিয়েই কিছু তথ্য দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

ডিসক্লেইমার ২ এখানে কোনোভাবেই বর্তমানে মানুষকে অমর বলা হচ্ছে না, বা অদূর ভবিষ্যতে মানুষ অমরত্বের স্বাদ পাবে তেমন কোন দাবিও করা হচ্ছে না। এখানে অমরত্ব নিয়ে কোনো বিশেষ ‘দৈব ব্যবস্থা’র কথাও বলা হচ্ছে না। বরং এখানে অত্যাধুনিক কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও গবেষণা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হচ্ছে যেগুলো এককালের ‘অবধারিত মৃত্যু’ অবস্থা থেকে বর্তমানে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

ডিসক্লেইমার ৩ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল এখানে মানুষের ‘অবিনশ্বরতা’র কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে অমরত্বের কথা। অর্থাৎ হয়ত কখনো মানুষ অনন্ত যৌবন ও জৈবিক অমরত্ব কিংবা অন্তত স্মৃতিগত বা মনস্তাত্ত্বিক অমরত্ব হলেও (Eternal youth & Biological Immortality or Mental Immortality) লাভ করলেও করতে পারে। তার মানে আবার এই নয় যে মানুষ টিভি শো’তে দেখানো তথাকথিত সুপারন্যারাচাল পাওয়ার অর্জন করবে, মানুষের মাথার উপর থার্মোনিউক্লিয়ার ওয়ারহেড ফেললেও সে ‘দৈব শক্তি’র বলে বেঁচে থাকবে।


অমরত্বের কথায় যাবার আগে জরুরি হচ্ছে মৃত্যু সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত ধারণা থাকা। আর তার জন্য দরকার জীবন বা প্রাণের সঠিক ধারণা। এজন্য প্রথম পর্বে থাকছে জীবন ও মৃত্যুর বিজ্ঞানভিত্তিক ধারনার সংক্ষিপ্তসার।

জীবন ও মৃত্যু

একেবারে সুস্পষ্ট ও সুসংগঠিতভাবে প্রাণের সংজ্ঞা দেয়া না গেলেও জীববিজ্ঞানীগণ জীবের কিছু আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছেন। বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে – জীব বাহ্যিক পরিবেশ থেকে শক্তি সংগ্রহ করবে, সেগুলো দেহাভ্যন্তরে প্রক্রিয়াজাত করে দেহের বৃদ্ধি ঘটাবে, এবং নিজের অনুরূপ প্রতিলিপি তৈরি করে বংশবৃদ্ধি করবে।

এসব বৈশিষ্ট্য থেকে জীবের সংজ্ঞা এমনভাবে দেয়া যায় –
“জীব হচ্ছে জৈব-রাসায়নিক পদার্থের সুবিন্যস্ত এমন একটি কাঠামো যা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক পরিবেশের অন্য জীব বা জড় পদার্থ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে, দৈহিক বৃদ্ধি ঘটায় এবং যৌন/অযৌন প্রক্রিয়ায় বংশ বৃদ্ধি করে সমগুণ সম্পন্ন অনুরূপ নতুন জীবের উৎপত্তি ঘটায়।”

প্রতিটি জীব, সে প্রাণী হোক আর উদ্ভিদ হোক, একাধিক সরল থেকে জটিল বহুরকম জৈব-রাসায়নিক পদার্থের একটি সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন কাঠামো যাতে প্রতিনিয়ত নানা রকম রাসায়নিক বিক্রিয়া ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটে চলছে। জীবদেহের হাজারো রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে ক্রমাগত ঘটতে থাকা বিক্রিয়া ও ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়ই হচ্ছে প্রাণ। দেহের নানারকম রাসায়নিক ব্যবস্থা আবার একটি অপরটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। এদের একটি প্রক্রিয়ার ভারসাম্যহীনতা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবস্থার স্থিতাবস্থার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

যতক্ষণ জীবদেহের সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে চলতে থাকে, ততক্ষণ আমরা প্রচলিত ভাষায় বলি ‘দেহে প্রাণ আছে’। আর যখন রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতায় জীবের জৈব-রাসায়নিক ক্রিয়াকলাপ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তখন আমরা বলি ‘মৃত্যু ঘটেছে’। তখন মৃত জীব বা প্রচলিত ভাষায় লাশের সাথে জড়বস্তুর গুণগত আর কোনো পার্থক্য থাকে না। জীবের এসব বৈশিষ্ট্য থেকে দেখা যায় জীবন বা প্রাণ আলাদা কোন বস্তু বা সত্ত্বা নয়। কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তিও নয়। প্রাণ হচ্ছে একটি চলমান রাসায়নিক ব্যবস্থা মাত্র যেখানে পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত হাজারো রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া চলছে প্রতিনিয়ত।

এক কথায় নির্দিষ্ট জীবে নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমাহার সঠিকভাবে চলতে থাকাই প্রাণের অস্তিত্বের ঘোষণা আর অসামঞ্জস্যতার কারণে স্থায়ীভাবে বিক্রিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়াই মৃত্যু। জীবন ও মৃত্যুর মাঝে অতিপ্রাকৃত শক্তির কোনো দেয়াল নেই। এটি শুধুই কিছু রাসায়নিক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়ার অবিরাম চলতে থাকা ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া মাত্র।

১৯৩৩ সালে ইলেক্ট্রনের তরঙ্গ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন কণা পদার্থবিজ্ঞানী Erwin Schrödinger. কণা পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও প্রাণের বিশেষত্ব নিয়ে তাঁর আগ্রহের কারণে ১৯৪৪ সালে তিনি তাঁর What is Life? বইটি প্রকাশ করেন। অদূর ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানকে পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে এমন অসাধারণ চমকপ্রদ ধারণা উঠে এসেছিল তাঁর এ বইতে। পরবর্তীতে বহু জীববিজ্ঞানীর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল এই বইটি।

এ বইয়ের সকল ধারণাই সঠিক ছিল তেমন নয়। পরবর্তীকালে এ বইয়ের কিছু কিছু ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে সেই সময়ের জন্য প্রাণকে ভৌত পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করার ভাবনা ছিল অতুলনীয়।

প্রাণ সম্পর্কে আরো বৃহৎ পরিসরে জানতে চাইলে সচলায়তন ব্লগে সজীব ওসমান এর ‘প্রাণ কী’ সিরিজে প্রাণ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। [১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব, ৬ষ্ঠ পর্ব]

জীবনের ব্যাখ্যায় আত্মার ধারণা : একটি ভুল হাইপোথিসিস

আমরা যেটাকে জীবন বা প্রাণ বলছি সেটা কোন ব্যক্তি, বস্তু, শক্তি বা এমন কিছুই নয়। প্রাণ একটি অবিরাম চলমান রাসায়নিক ও জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া মাত্র। সুনির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থ যখন নির্দিষ্ট গঠনে নির্দিষ্ট পরিবেশে থাকে তখন সেখানে প্রাকৃতিক উপায়ে স্বভাবতই উৎপত্তি ঘটা সম্ভব ‘প্রাণের’।

ইতোপূর্বে ধারণা করা হতো – জৈব ও অজৈব পদার্থ দুটোর ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। অজৈব ও জৈব পদার্থের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। কোনো ‘বিশেষ কারণে’ বা ‘বিশেষ শক্তিবলে’ জৈব পদার্থ তৈরি হয়। কিন্তু ১৮২৮ সালে রসায়নবিদ Friedrich Wohler এ্যামোনিয়া যৌগ থেকে ইউরিয়া তৈরি করে প্রমাণ করেন জৈব পদার্থ তৈরিতে কোনো বিশেষ ‘জৈব শক্তি’র প্রয়োজন নেই। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই অজৈব থেকে জৈব পদার্থ উৎপন্ন করা যায় এবং জৈব ও অজৈব পদার্থের গঠনগত পার্থক্যের কারণে তাদের বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা দেখা যায়। তখন থেকেই মূলত আধুনিক জৈব রসায়নের যাত্রা শুরু।

জীবনের ব্যাখ্যায় আত্মার ধারণার কফিনে এখন পর্যন্ত সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছেন Dr. Craig Venter. ২০১০ সালে ল্যাবরেটরিতে মৃত ব্যাকটেরিয়ার দেহে রাসায়নিকভাবে সংশ্লেষিত জিনোম প্রবেশ করিয়ে নতুন জীবন দিতে সক্ষম হয়েছেন। আর ল্যাবরেটরিতে এই মৃত ব্যাকটেরিয়াকে জীবিত করা হয়েছে কোনো প্রকার তথাকথিত অতিপ্রাকৃতিক ‘জীবনী শক্তি’ বা আত্মার প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার ছাড়াই। কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত জিনোম নিয়ে সেই ব্যাকটেরিয়া স্বাভাবিক জীবিত ব্যাকটেরিয়ার মতই আচরণ করতে সক্ষম হয়েছে।

এ বিষয়ে আর কথা বাড়াবো না। প্রাণের ব্যাখ্যায় আত্মার ধারণার অসাড়তা আর জীবনের জন্য আত্মার অপ্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত ও প্রামাণ্য বিবরণ রয়েছে অভিজিৎ রায়ের পাঁচ পর্বের ‘আত্মা নিয়ে ইতং বিতং’ সিরিজে। [১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব] পরবর্তীতে এই সিরিজটি তাঁর অবিশ্বাসের দর্শন বইতে সংযুক্ত হয়েছে। প্রাণের জন্য আত্মার ধারণা যে শুধুই প্রাচীন মানুষের উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত এবং বাস্তবে যে আত্মার অস্তিত্ব নেই ও সত্যিকার অর্থে সেটার প্রয়োজনও নেই তা নানারকম যৌক্তিক ও প্রামাণ্য বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা নিরীক্ষার উদাহরণ ও তথ্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে সেখানে।

জীবের মধ্যে প্রাণী ও উদ্ভিদ রয়েছে আবার প্রাণীর মধ্যেও রয়েছে লাখো প্রজাতি। আলোচনার সুবিধার্থে এবং নানাদিকে ডালপালা না মেলে দিয়ে আপাতত শুধুমাত্র মানুষের মৃত্যু ও অমরত্ব নিয়েই লিখছি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের মৃত্যু

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের মৃত্যু প্রধানত দুই ধরনের। কার্ডিয়াক ডেথ এবং ব্রেইন ডেথ।

কার্ডিয়াক ডেথ : একে প্রচলিত ভাষায় কার্ডিয়াক এরেস্ট বা হার্ট এ্যাটাক বলা হয়। কার্ডিয়াক এরেস্টে যদি কোন মানুষের হৃদপিণ্ডের (Heart) সঞ্চালন ক্ষমতা বা হৃৎস্পন্দন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় তখন রোগীর মৃত্যু ঘটে। এভাবে ঘটা মৃত্যুকে কার্ডিয়াক ডেথ বলা হয়। কার্ডিয়াক এরেস্ট হচ্ছে সাময়িক সময়ের জন্য হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়া অথবা বাধাগ্রস্ত হওয়া, আর যখন হৃদপিণ্ডের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় তখন তাকে বলা হয় কার্ডিয়াক ডেথ।

মানব দেহের শ্বসনের জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। প্রতিটি কোষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন অত্যন্ত জরুরি। রক্ত ফুসফুসে এসে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এই অক্সিজেন সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্ত হৃদপিণ্ড হয়ে ধমনীর মধ্য দিয়ে সারা দেহের কৈশিক জালিকায় পৌঁছে যায়। দেহকোষ কৈশিক জালিকার অক্সিজেন সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ রক্ত থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিয়ে কোষীয় কার্যক্রম চালায় এবং কোষাভ্যন্তরে উৎপন্ন কার্বন-ডাই-অক্সাইড কৈশিক জালিকার রক্তে ফেরত পাঠায়। সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত দূষিত রক্ত কৈশিক জালিকা থেকে শিরার মধ্য দিয়ে পুনরায় ফুসফুসে পৌছায় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে অক্সিজেন নিয়ে বিশুদ্ধ রক্ত হিসেবে হৃদপিণ্ডের মধ্য দিয়ে সারা দেহে ছড়িয়ে পরে। এভাবে প্রতিনিয়ত রক্ত সারা দেহে আবর্তন করে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড বহন করছে। এখানে দেহে রক্ত সঞ্চালনের জন্য পাম্পের কাজটি করছে হৃদপিণ্ড। হৃৎস্পন্দনের মাধ্যমে রক্ত চক্রাকারে সারাদেহে আবর্তিত হচ্ছে।

হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির কারণে যদি কখনো হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় বা অল্প সময়ের জন্য হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায় তখন এ ঘটনাকেই হার্ট এ্যাটাক বা কার্ডিয়াক এরেস্ট বলা হয়। এ অবস্থায় বুকের বাঁ দিকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। ছোটখাটো কার্ডিয়াক এরেস্ট এর ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই হৃদপিণ্ড পুনরায় তাঁর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে সক্ষম হয় এবং হৃৎস্পন্দন ফিরে আসে।

কিন্তু বড় ধরনের কার্ডিয়াক এরেস্ট এর ক্ষেত্রে যেমন অতি উচ্চ রক্তচাপে হৃদপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ রক্তনালী ছিঁড়ে/ফেটে যাওয়া, কপাটিকা (Valve) সম্পূর্ণরূপে অকেজো হয়ে যাওয়া ইত্যাদির কারণে কার্ডিয়াক এরেস্ট ঘটলে সেক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন হৃদযন্ত্র স্থায়ীভাবে তাঁর স্পন্দন ক্ষমতা হারায়। ফলে হৃদযন্ত্র হৃৎস্পন্দনের মাধ্যমে সারা দেহে রক্ত সঞ্চালনের যে কাজটি করছিল সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেহকোষে অক্সিজেন সরবরাহ ঘটে না এবং অক্সিজেনের অভাবে পর্যায়ক্রমে দেহের প্রতিটি অংশের কোষ ও টিস্যুর কার্যকারিতা নষ্ট হতে থাকে। মস্তিষ্কের কোষে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে মস্তিষ্কের কোষের কার্যকারিতাও নষ্ট হয়ে যায়। সহজভাবে বললে বলা যায় অক্সিজেনের অভাবে দেহের অন্যান্য অংশও পর্যায়ক্রমে মারা যায়।

এভাবে হৃদযন্ত্রের স্পন্দন কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে একে একে মানুষের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মৃত্যু হওয়াকেই কার্ডিয়াক ডেথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ব্রেইন ডেথ : একজন মানুষের অস্তিত্ব, স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব সবই আসলে থাকে তাঁর মস্তিষ্কে। তাই মস্তিষ্কের মৃত্যু মানে মানুষটির মৃত্যু। মস্তিষ্ক মানুষের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ। নানারকম রাসায়নিক তরল, সবচেয়ে লম্বা বিশেষ আকৃতির কোষ, কোষীয় সংযোগে ইলেকট্রিক পালস, সারা দেহের সকল স্নায়ুর সংযোগ সব মিলিয়ে অত্যন্ত জটিল এই অঙ্গের স্বাভাবিকত্ব তথা চৈতন্য খুব সূক্ষ্মভাবে বজায় থাকা জরুরী।

সাধারণত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (Brain Stroke), মস্তিষ্কের রাসায়নিক তরলের অত্যধিক অসামঞ্জস্যতা, মাথায় প্রচণ্ড আঘাত, ব্রেইন টিউমার, ব্রেইন ক্যান্সার ইত্যাদির কারণে ব্রেইন ডেথ ঘটে থাকে। ব্রেইন ডেথ হচ্ছে একজন মানুষের মস্তিষ্কের সেই অবস্থা যখন তাঁর মস্তিষ্কের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় কিংবা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা শরীরের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কর্তৃক অথবা চিকিৎসা পদ্ধতিতে পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। যখন কারো মস্তিষ্কের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং তা আর ফিরে আসার বা আনার উপায় থাকে না তখন মানুষটিকে ‘ব্রেইন ডেড’ ঘোষণা করা হয়। ব্রেইন ডেড অবস্থায় রোগীর কোনো রকম চৈতন্য বিরাজমান থাকে না। যদি এমন অবস্থায় অতিরিক্ত অক্সিজেন সরবরাহ, লাইফ সাপোর্ট ইত্যাদি বজায় রাখা হয় তাহলে ব্রেইনডেড হবার পরেও দেহের ‘অটোমনিক অর্গান’ যেমন হৃদপিণ্ড, ফুসফুস এগুলো কাজ করতে থাকে। তবে ব্রেইন সিগন্যালের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সিগন্যাল না পেয়ে অকেজো হতে শুরু করে ও অল্প সময়ের ভেতরে মারা যায়। এভাবে দেহের বিভিন্ন অংশের কার্যক্রম বন্ধ হবার প্রতিক্রিয়ায় এসব অটোমনিক অর্গান গুলোর কার্যক্রমও ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে ও লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং রোগী দৈহিক ও চৈতন্যগত দিক থেকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।

মানুষের মৃত্যুর কারণ ও প্রাণ সংশয়কারী অবস্থা

একজন মানুষ বিভিন্ন কারণে, ঘটনা-দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বা বিশেষ পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে মারা যেতে পারে। আশেপাশে দেখা মৃত্যুর কারণ গুলোকে পর্যালোচনা করলে মানুষের জীবনসংশয়কারী অবস্থা ও মৃত্যুর জন্য দায়ী ঘটনাগুলোকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়।

বার্ধক্য বা জরা – বিরল ও ব্যতিক্রমী কিছু জীব ছাড়া প্রায় সকল বহুকোষী জীবেরই বার্ধক্যে উপনীত হবার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেসকল জীবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনেক প্রতিকূল অবস্থাতেও বেঁচে থাকতে সহায়তা করে তারাও দেখা যায় বার্ধক্যে উপনীত হয়ে মারা যায়।

মানুষ ও অন্যান্য বহুকোষী জীব জন্মের পর দৈহিক ভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। দেহের প্রতিটি কোষ বহুবার বিভাজিত হয়ে দেহের বৃদ্ধি ঘটায়। শিশুকালে কোষ বিভাজনের হার হয় সবচেয়ে দ্রুত। যত দিন যায় তত বিভাজনের হার কমতে থাকে। একটা বয়সে এসে দেহের ক্ষত পূরণ ব্যতীত দৈহিক বৃদ্ধির জন্য কোষ বিভাজিত হয় না। দেহের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জীবনের একটা পর্যায়ে যে সময়টাকে আমরা বলি বার্ধক্যে উপনীত হওয়া, তখন দেহের কোষগুলোর কার্যকারিতার মাত্রা কমতে থাকে, দেহের রোগ প্রতিরোধ ও ক্ষয়পূরণ ক্ষমতা হ্রাস পায়, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের নিজেদের কাজ আগের মত ভালভাবে করতে পারে না, দেহের অভ্যন্তরীণ প্রত্যঙ্গের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।

সময়ের সাথে দেহকোষ তথা সামগ্রিকভাবে দেহাংশগুলোর কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়া ও দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়ার এই চলমান অবস্থাকেই বলা হয়ে থাকে বার্ধক্য। বার্ধক্যে উপনীত একজন মানুষের দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কখনো কখনো এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সামান্য অসুস্থতাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাহ্যিক চিকিৎসা প্রয়োগ করেও অনেকসময় তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। মানুষের ক্ষেত্রে সচরাচর আমরা এধরনের মৃত্যুকে বার্ধক্যজনিত মৃত্যু বা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে থাকি।

বার্ধক্যের জৈব-বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান নিয়ে কাজ করা জীববিজ্ঞানীদের জন্য একপ্রকার চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এ বিষয়ের গবেষণা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে বলে অবলীলায় বার্ধক্যকে ‘অবধারিত নিয়তি’ বলে চালিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু আসলেই কি বার্ধক্য অবধারিত নিয়তি? জাপান সমুদ্রে বসবাসরত বিশেষ এক প্রজাতির জেলিফিশ Turritopsis nutricula. এই ‘অবধারিত নিয়তি’ কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তার বয়স কমিয়ে আবার শিশু বয়সে চলে আসতে সক্ষম। এই বিশেষ জেলিফিশ এবং বার্ধক্য ‘অবধারিত নিয়তি’ কিনা তা নিয়ে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী বিষয়ভিত্তিক পর্বে।

রোগশোক ও অসুস্থতা – প্রাণ হচ্ছে একটি সুবিন্যস্ত জৈব রাসায়নিক চলমান প্রক্রিয়া বিশেষ। যখন এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, অসামঞ্জস্য ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় তখনই জীবদেহে দেখা দেয় অসুস্থতা। জৈবনিক প্রক্রিয়ায় অসামঞ্জস্যতার কারণে বহুকোষী জীবের কোন কোন দেহাংশ সাময়িকভাবে যথাযথভাবে কাজ করতে না পারলে তখন ঐ দেহাংশে রোগ হয়েছে বলা হয়ে থাকে। এই রাসায়নিক অসামঞ্জস্য বা ভারসাম্যহীনতা অভ্যন্তরীণ জৈব রাসায়নিক কারণে কিংবা বাহ্যিক ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া-পরজীবীর আক্রমণে হতে পারে।

রোগ অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতাই হোক আর বাহ্যিক পরজীবীর আক্রমণেই হোক; যখন দেহের Immune system এবং বাহ্যিক চিকিৎসা পদ্ধতি অসুস্থতা নিরাময় করতে ব্যর্থ হয় তখন রোগটি দেহের সাময়িক রাসায়নিক অসামঞ্জস্যতাকে স্থায়িত্বের দিকে নিয়ে যায় যার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও অসামঞ্জস্যতা বা অসুস্থতা ছড়িয়ে পরে ও রোগীকে প্রলম্বিত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।

বর্তমান অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, ন্যানো টেকনোলজি ও জেনেটিক্স অনেক দুরারোগ্য ব্যাধিকেও নিরাময় যোগ্য ব্যাধিতে পরিণত করেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী সংশ্লিষ্ট পর্বে।

ট্রমা (trauma) বা আঘাত – ছোটখাট দুর্ঘটনা ও আঘাতে দেহাংশ ক্ষতিগ্রস্থ হলে তা দেহের Immune system নিরাময় করে থাকে। যেমন কোথাও কেটে গেলে বা পুড়ে গেলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেক বড়সর দুর্ঘটনার ক্ষতিও যথাযথ চিকিৎসায় নিরাময় হয়। কিন্তু আঘাত মারাত্মক হলে ও সংবেদনশীল দেহাংশে গুরুতর আঘাত মানুষের মৃত্যু এমনকি তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। যেমন মাথায় প্রচণ্ড আঘাত, সড়ক দুর্ঘটনায় মাথা বা বুকে প্রচণ্ড আঘাত ইত্যাদি।

মাথায় আঘাতের কারণে তাৎক্ষণিক ব্রেইন ডেথ ঘটার সম্ভবনা রয়েছে। অন্যদিকে বুকে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে। হৃৎপিণ্ডে আঘাত সরাসরি কার্ডিয়াক ডেথ এর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অপরদিকে ফুসফুস রক্ত সংবহন তন্ত্রের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অংশ যার অকার্যকারিতার ফলে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহের অভাবে কার্ডিয়াক ও ব্রেইন ডেথ উভয়ই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটা সম্ভব।

দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা নির্ভর করছে মানুষের উপরেই। সচেতনতা, যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন ও নিরাপত্তা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিস্ময়কর পরিমাণে দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব। বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে ঝুকিপুর্ন ক্ষেত্রের নিরাপত্তায় এত ধরণের নিরাপত্তামূলক ডিভাইস রয়েছে যার যথাযথ ও সচেতন ব্যবহার দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানি যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে সক্ষম। এমনকি মাত্রাতিরিক্ত ঝুকিপূর্ন ও প্রাণ সংশয়কারী কাজে এখন উন্নত যন্ত্রমানব (Robot) ব্যবহৃত হচ্ছে বহুল পরিমাণে। দুর্ঘটনার পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব না হলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা অসম্ভব কিছু নয়।

পরিবেশগত বিপর্যয় – মানুষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসেছে, বর্তমান পৃথিবীর পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এই অবস্থার হঠাৎ অত্যাধিক পরিবর্তন, আবহাওয়া ও জলবায়ুর হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন কিংবা মানুষের মানিয়ে নেয়ার গতির চেয়ে দ্রুত গতিতে পরিবর্তন মানুষের জন্য বিপদজনক। মানুষের জীবন ধারণের অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামক যেমন বিশুদ্ধ খাবার পানি, অক্সিজেন ইত্যাদি যথাযথ পরিমাণে পরিবেশে বিদ্যমান থাকা জরুরি। অন্যদিকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড, এ্যামোনিয়া ইত্যাদি ক্ষতিকর মাত্রার নিচে থাকতে হবে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস ইত্যাদি বিস্তৃত আকারে হলে তা সংশ্লিষ্ট এলাকার জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রাকৃতিক পরিবেশের দ্রুত অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে এসকল জীবনের ধারণের সাথে সম্পর্কিত উপাদানগুলোর পরিবর্তনের প্রভাব স্বল্প সংখ্যক মানুষের জন্য নয় বরং পুরো মানব জাতির জন্য হুমকি হতে পারে। এমনকি শুধু মানুষ নয় সমগ্র প্রাণিজগতের জন্য হুমকি হতে পারে মাত্রাতিরিক্ত জলবায়ু পরিবর্তনের ফল।

পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের পর থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট বড় গণ বিলুপ্তির (Mass Extinction) ঘটনা। এর মধ্যে পাঁচটি গণবিলুপ্তিকে সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে গণ্য করা হয়। মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের ব্যবধানে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির (Spices) প্রাণী ও উদ্ভিদ। প্রাণের আবির্ভাবের পর বিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে কোটি কোটি প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ। প্রাণের আবির্ভাবের পর থেকে গণনা করলে, আজ পর্যন্ত আবির্ভূত জীব প্রজাতির ৯৯.৯ শতাংশই এখন বিলুপ্ত। ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে পারমিয়ান গণবিলুপ্তিতেই হারিয়ে গেছে তৎকালীন পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়ানো প্রজাতির প্রায় ৯৫ শতাংশ। গণবিলুপ্তির ইতিহাসে এই বিলুপ্তিই সর্ববৃহৎ জীববিলুপ্তি, এমনকি ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরের বিলুপ্তির সময়কার গণবিলুপ্তি থেকেও ভয়াবহ ছিল পারমিয়ান গণবিলুপ্তি। এজন্য পারমিয়ান যুগের গণবিলুপ্তি “The Great Dying” নামেও পরিচিত।

মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই হোক আর প্রাকৃতিক কারণেই হোক মানব জাতি কী অকস্মাৎ এমন কোনো গণবিলুপ্তি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে? সূর্যের জ্বালানি যখন শেষ পর্যায়ে এসে যাবে সূর্য যখন পৌঁছে যাবে বার্ধক্যে, ক্রমান্বয়ে লোহিত দানব ও সাদা বামনে পরিণত হয়ে এই পুরো সৌরজগতের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ যখন হয়ে যাবে তখন কী হবে মানুষের গন্তব্য? এমন সব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর নিয়েই সাজানো থাকবে আসন্ন একটি পর্ব।


এই ছিল প্রথম পর্বে প্রাণ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা যেটি অমরত্বের বিষয়ে যাবার আগে প্রথমেই জরুরি ভিত্তিতে জানা প্রয়োজন ছিলো। পরবর্তী পর্বে থাকছে প্রকৃতিতে পাওয়া অমরত্ব বা অমরত্বের কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু প্রাণীর খোঁজ। এমন কিছু প্রাণীর বর্ণনা নিয়েই থাকবে দ্বিতীয় পর্ব “প্রকৃতিতে অমরত্বের হাতছানি”।


তথ্যসূত্র : –

১. Erwin Schrödinger – Facts : nobelprize.org

২. Book : What is Life? – Erwin Schrödinger

৩. প্রাণ কী? – সজীব ওসমান : সচলায়তন ব্লগ [১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব, ৬ষ্ঠ পর্ব]

৪. Primordial soup was edible: abiotically produced Miller-Urey mixture supports bacterial growth – The Nature Journal

৫. অবশেষে মানুষের ঈশ্বর হয়ে ওঠা : তৈরি হল প্রথম কৃত্রিম প্রাণ – অভিজিৎ রায় : মুক্তমনা ব্লগ

৬. Creation of a Bacterial Cell Controlled by a Chemically Synthesized Genome – Science Magazine

৭. Synthetic Genome Brings New Life to Bacterium – Science Magazine

৮. আত্মা নিয়ে ইতং বিতং – অভিজিৎ রায় : সচলায়তন ব্লগ [১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব]

৯. বই : অবিশ্বাসের দর্শন – অভিজিৎ রায়

১০. International Guidelines for the Determination of Death – World Health Organization (WHO)

১১. Causes of death – World Health Organization (WHO)

১২. Mass Extinction – American Museum of Natural History

১৩. The Great Dying – National Aeronautics and Space Administration (NASA)

Comments

S. A. Khan

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাছে পরাজিত সকল বাঁধা।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz