সায়েন্টিফিক পোস্টার নিয়ে কিছু কথা এবং পাওয়ারপয়েন্ট দিয়ে পোস্টার বানানোর উপায়

প্রবন্ধটি ফরহাদ হোসেন মাসুমের সাথে যৌথ উদ্যোগে লিখিত

সায়েন্টিফিক পোস্টার কী?

বিভিন্ন কনফারেন্সে অনেক উপায়ে আপনি নিজের বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার ফলাফলগুলো তুলে ধরতে পারেন, যেমন – বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা (দশ থেকে বিশ মিনিট গবেষণার বৃত্তান্ত বলে যাওয়া), ফ্ল্যাশ প্রেজেন্টেশন (৫ মিনিটে তড়িৎ গতিতে সারাংশ উপস্থাপনা), হাতে কলমে প্রজেক্ট দেখানো। সায়েন্টিফিক পোস্টারও তেমনই একটা সৃজনশীল উপায়। প্রায় সব বড় কনফারেন্সগুলোতেই একটা পোস্টার সেশন থাকে, যেখানে গবেষকগণ (ছাত্র-শিক্ষক) তাদের পোস্টার নিয়ে হাজির হতে পারেন। পোস্টার সেশনে প্রত্যেক পোস্টারের সামনে সেই পোস্টারের নির্মাতা উপস্থিত থাকেন এবং উপস্থিত অন্যান্য দর্শক এবং বেস্ট পোস্টার প্রতিযোগিতার বিচারকদেরকে নিজের পোস্টারের ব্যাপারে বর্ণনা দিয়ে থাকেন। পোস্টার প্রতিযোগিতায় বেশ ভালো মানের পুরষ্কার পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বে প্রথম পুরষ্কারের মূল্য ৩০০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

1st Prize Winning Poster, 12th Annual Southern Bioproduct Conference, বানিয়েছেন ফরহাদ হোসেন মাসুম

সায়েন্টিফিক পোস্টারের সাইজ এবং উপাদানসমূহ

সায়েন্টিফিক পোস্টার পোট্রেট বা ল্যান্ডস্কেপ এই দুই সেট-আপেই করা যায়। এটা নির্ভর করে কনফারেন্স বা যেখানে আপনার কাজ প্রদর্শিত হবে সেই ক্ষেত্রের সামর্থ্য-সুযোগের উপর। সায়েন্টিফিক পোস্টারের সাইজও নির্ধারণ করেন যারা কনফারেন্স আয়োজন করেন তাদের উপর। তবে প্রচলিত সাইজ হলো ৪৮ ইঞ্চি বাই ৩৬ ইঞ্চি (প্রস্থে ৪ ফুট, লম্বায় ৩ ফুট ) বা ৩৬ ইঞ্চি বাই ৪৮ ইঞ্চি। তবে আরো বড় কিংবা ছোট পোস্টারও করা যেতে পারে।

পোস্টারে কী কী থাকবে, তা নির্ভর করে প্রেজেন্টারের উপর, কে কিভাবে ডিজাইন করবেন তার উপর। আজকাল অনেকেই অনেক ইন্টারেকটিভ উপায়ে নিজের কাজকে উপস্থাপন করেন। একটা সায়েন্টিফিক পোস্টারে যে অংশগুলো থাকে তার একটা জেনারালাইজড ফরম্যাট উপস্থাপন করলাম নিচের চিত্রে (চিত্র ১)। জেনারালাইজড মানে এখানে পোস্টারভেদে সামান্য পরিবর্তন লক্ষণীয়। আর কনটেন্টের মধ্যে ছবি, গ্রাফ, টেবিল, লেখা ইত্যাদি অর্ন্তভুক্ত।

Title – পোস্টারের জন্য লাগবে একটা নজরকাড়া টাইটেল। Font size – 48 to 54.

Authors and institution – কারা কারা এই পোস্টারের জন্য কাজ করেছেন, তাদের নাম এবং তারা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, সেগুলো লিখতে হবে। সাথে অন্তত একজনের (সাধারণত প্রথম যার নাম থাকে, তার) ইমেইল এড্রেস দিতে হবে। Font size – 36 to 40.

Abstract – গবেষণার সারাংশ, কী করলাম, কিভাবে করলাম, কী পেলাম, ইত্যাদি লিখে ফেলতে হবে ২০০ শব্দের মধ্যে। ABSTRACT শব্দটার ফন্ট সাইজ হতে পারে 32. আর সারাংশের মূল টেক্সটের ফন্ট সাইজ 24. তাহলে সামান্য দূরত্ব থেকে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে পড়া যাবে।

Introduction – কেন করলাম এই গবেষণা, কেন এটা জরুরি, গবেষণার ফলাফল কী কাজে লাগতে পারে, ইত্যাদি লিখতে হবে। বেশি না লেখাই শ্রেয়। কারণ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তেমন কেউই লেখাগুলো পড়বে না। দর্শকরা সামনে এলে মুখেই বলতে হবে। ফন্ট সাইজ abstract সেকশনের মত।

Content 1,2,3 – এগুলোতে কীভাবে কাজটা করলেন, সেটার বিস্তারিত লিখতে পারেন, কিন্তু কম কথায়; এই সেকশনের নাম মেথডলজি। আর কী পেলেন, সেই ফলাফলটাকে টেবিল বা গ্রাফ বা ফ্লো-চার্ট বা অন্য কোনো সৃজনশীল উপায়ে তুলে ধরতে পারেন। ফন্ট সাইজ abstract সেকশনের মত।

Acknowledgement – এই সেকশন দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। গবেষণার ফান্ডিং কোথা থেকে আসছে, অনেক সময় তাদেরকে ধন্যবাদ জানানো হয় এই সেকশনে। অথবা, যাদের নাম পোস্টারের লেখক তালিকায় নেই, অথচ গবেষণার টুকিটাকিতে তাদের সাহায্য/অবদান আছে, তাদের নাম দেয়া হয় এখানে।

Reference – পোস্টারে যদি কোথাও অন্য কোনো গবেষণা প্রবন্ধের উল্লেখ করে থাকেন, তাহলে এখানে সেই রেফারেন্স উল্লেখ করতে হয়। রেফারেন্স লেখার উপযুক্ত বা সঠিক উপায় নিয়ে আরেকটা বিশাল লেখা লিখে ফেলা যাবে। আজ আর সেদিকে যাচ্ছি না।

কীভাবে বানাবেন?

সায়েন্টিফিক পোস্টার তৈরির জন্য অনেককেই বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেসে বা ব্যানার তৈরি করে এমন দোকানে ছুটতে হয়। তাও যে ব্যাক্তি ডিজাইন করেন তাকে তোয়াজ করে চলতে হয়, মন-মর্জি বুঝে বলতে হয়, ব্যস্ততা থাকে, এটা ওটা চেঞ্জ করতে গেলে প্রায়ই বিরক্তিবোধ দেখা যায় তাদের মধ্যে। ইলাস্ট্রেটরের কাজটা (প্রধানত পেন টুল) শেখা খুব কঠিন নয়, তবে বেশ সময় লাগে শিখতে। কিন্তু আপনি সামান্য চেষ্টা করলেই মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজের পাওয়ারপয়েন্ট দিয়েই সায়েন্টিফিক পোস্টার ডিজাইন করে সেটা প্রেসে দিয়ে কোন ঝামেলা/কথাবার্তা ছাড়াই প্রিন্ট করতে পারবেন। এই ট্রিকটা হয়তো অনেকেই জানেন আবার অনেকেই হয়তো জানেন না। এটা যারা জানেন না তাদের জন্যই। আর এই ট্রিক দিয়ে শুধু সায়েন্টিফিক পোস্টারই নয়, যেকোন আকারের ব্যানার বা ম্যাগাজিনও ডিজাইন করা সম্ভব যদি আপনার আগ্রহ থাকে।এবং এটা বেশ সোজা।

প্রথমে মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্টের একটা নতুন ফাইল ওপেন করুন।

এরপর ডিজাইন এ ক্লিক করুন, (লাল মার্ক)

এরপর পেইজ সেট-আপ এ ক্লিক করুন।

পেজ সেট-আপে ক্লিক করলে এরকম একটা পপ-আপ স্ক্রিন আসবে, সেখানে আপনার পছন্দমত সাইজ দিন।

এরপর আপনি চাইলে ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা রেখে কাজ শুরু করতে পারেন বা ভিন্ন কালার সেট করে নিতে পারেন ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাইলে গিয়ে। (লাল বৃত্ত দ্বারা দেখানো হয়েছে) । ব্যাকগ্রাউন্ড ফর্ম্যাটে ক্লিক করলেই আপনার ইচ্ছামত কালার দিতে পারবেন।

এরপর আপনি ইনসার্টে গিয়ে শুধুমাত্রা বিভিন্ন কালারের স্কোয়ার বা রেকট্যাঙ্গল শেপ ব্যবহার করেই আপনার পোস্টারটা সাজিয়ে তুলতে পারেন। (লাল বৃত্ত দিয়ে দেখানো)। কিভাবে ডিজাইন করলে আপনার পোস্টার মনোমুগ্ধকর দেখাবে, সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকুন। বানিয়ে ফেলুন চোখ ধাঁধানো পোস্টার। চাইলে একেক বক্সের একেক রঙ দিতে পারেন – বক্সে ক্লিক করে FORMAT মেনুতে যান, সেখানে SHAPE FILL থেকে রঙ নির্বাচন করুন।

ডিজাইন শেষ হলে File অপশনে গিয়ে Save as এ ক্লিক করলে এরকম একটা ফিল্ড আসবে। সেখানে লাল বৃত্ত দিয়ে চিহ্নিত অংশতে ক্লিক করুন।
ক্লিক করলে যে অপশনগুলো আসবে সেখান থেকে PNG অথবা PDF ফরম্যাটে ক্লিক করে সেইভ করুন। আমি পিএনজি ফরম্যাটকেই বেশি সমর্থন করি এর ফ্লেক্সিবিলিটির জন্য। পিডিএফ মাঝে মাঝে সমস্যা করে।
এবার ওই পিএনজি ফাইলটা নিয়ে গিয়ে প্রেসে দিন। এবং পিএনজি ফাইলটাই ইলাস্ট্রেটর বা ফটোশপে বসাতে বলেন। দেখবেন বিন্দুমাত্র পিক্সেল এবনরমালিটি বা ইনএডিকোয়েট রেজ্যুলেশনের (ফাটা ফাটা ছবি) সমস্যা হবে না।
এছাড়াও আরো সহজ হলো পোস্টার টেমপ্লেট নামিয়ে নেওয়া। তাহলে আপনার আর কষ্ট করে ডিজাইনও করা লাগবে না। তবে আপনার কনটেন্ট অনুযায়ী সবসময় ভালো ডিজাইনের পোস্টার টেমপ্লেট পাবেন না। এজন্য নিজে ডিজাইন করলেই ভাল।
দুটি লিংক দিলাম, যেখান থেকে টেমপ্লেট পাবেন, এমনকি প্রচলিত সাইজের চেয়ে বড় সাইজের পোস্টারের টেমপ্লেটও পাবেন এখানে।
আগেই বললাম, এই প্রক্রিয়ায় আপনি ম্যাগাজিন বা ব্যানারও তৈরি করতে পারবেন।
এ পর্যন্তই থাক। কারো উপকারে এলে ভালোই লাগবে। কোন মতামত থাকলে সানন্দে জানান।

Comments

Md. Abdullah Al Zaman (Proyash)

লিখতে ভালোই লাগে। আর বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির জন্য বিজ্ঞানযাত্রা একটা চমৎকার জায়গা। তবে নিয়মিত লেখালেখি করা হয়ে ওঠেনা। চেষ্টা করি তবুও।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz