যৌনতা ও জীবন, পর্ব ১ – প্যারাফিলিয়া

‘পাঠক কে অবশ্যই ১৬+ এবং প্রাপ্ত মনস্ক হতে হবে’

লেখার উদ্দেশ্যঃ মানুষকে তাদের যৌন জীবন ও স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন করে তোলা এবং সঠিক যৌন শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে সহযোগিতা করা।

যৌনতা হচ্ছে জীবের আদিম প্রবৃত্তি যা টিকে থাকা এবং বংশ বৃদ্ধির জন্যই প্রকৃতির গড়া নকশা। তাই যৌন-জীবন কে জীবন চক্রের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়াই বলা যায়, সন্তান উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট এই প্রক্রিয়া জলবায়ু ভেদে ১২–১৬ বছর বয়স থেকে শুরু করে মেয়েদের জন্য গড়ে ৩৭-৪২ এবং ছেলে দের জন্য গড়ে ৪৫-৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে থাকে।

এই সিরিজে সাধারণ সুস্থ যৌন জীবন, যৌন অস্বাভাবিকতা, বাংলাদেশে যৌন জীবন, যৌন জীবনে বিভিন্ন প্রভাবকের প্রভাব, প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে যৌন জীবনে মাসিক সঙ্গমের সংখ্যা (সেক্স-ফ্রিকোয়েন্সি), সফল ভাবে নিষেক সম্পন্ন হবার জন্য শুক্রাণুর গুণগত মান উন্নয়ন, শুক্রাণু কিভাবে গণনা করা হয় তার প্রাথমিক ধারণা (স্পারম-কাউন্ট), শুক্রাণুর পরিমাণের এবং শুক্রাণুর সংখ্যার সাথে মাসিক যৌন সঙ্গমের পরিমাণের সম্পর্ক (মান্থলি-সেক্স ফ্রিকোয়েন্সি)। শরীর ও মনের উপরে দীর্ঘ সময় ধরে খুব বেশি বেশি যৌন আচরণের প্রভাব, এগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এবং একটা লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিটা মানুষের মানসিকতা কিছুটা হলেও ভিন্ন। আর এই ভিন্নতর মানসিকতার কারণে তার যৌন জীবনেও বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়। কেউ প্রেম, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গীর সাথে বিয়ে করে, কেউ নিজের লিঙ্গের অন্য কাউকে বেছে নেয়, আবার অনেকে আছেন এগুলোর কোনো দিকে না গিয়ে কিছুটা ভিন্ন উপায়ে যৌন জীবন পার করে থাকেন। এর উপরে ভিত্তি করে যৌন বিন্যাস (সেক্সুয়াল-অরিয়েন্টেশন) কে এই প্রবন্ধের মূল বিষয়ের সুবিধার জন্য প্রধান ৩ ভাগে ভাগ করেছি।

১। সাধারণ যৌন জীবন ২। অনিয়ন্ত্রিত যৌন জীবন ৩। বিকৃত রুচির যৌন জীবন

লেখার সুবিধায় প্রথমে শেষের টা নিয়েই কথা বলব।

বিকৃত যৌন জীবন (Paraphilia)

জীবন, যৌনতা, সমাজে মানুষের আচার-আচরণ, এগুলো যেহেতু পুরোপুরি শুধুমাত্র বায়োলজিক্যাল বিষয় না, এগুলোর সাথে সামাজিক এবং মানসিক ব্যাপারও যুক্ত থাকে, তাই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সাইকোলজির উপর ভিত্তি করেই বিকৃত যৌনাচার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এমেরিকান মনোবিজ্ঞান সংস্থার (সাইকিয়াট্রিক সোসাইটির) মতানুসারে, বিকৃত যৌনাচার বা প্যারাফিলিয়া হল সমাজের প্রচলিত সংস্কৃতি বা নিয়মের সাথে মেলে না এমন যৌন আচরণ। যেমন- শিশু, বৃদ্ধ, পশু/প্রাণী, মৃত মানুষ, বস্তু, গাছ ইত্যাদির প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করা।
অনেক ধরনের প্যারাফেলিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –

পেডোফেলিয়া (Pedophilia): এই অসম্ভব বিকৃত রুচিতে যারা আক্রান্ত তারা তাদের যৌন আকাঙ্খা পূরণের জন্য বাচ্চাদেরকে পছন্দ করে।

ফেটিশিজম (Fetishism): এই ধরনের রুচিতে যারা অভ্যস্ত তারা সাধারণত জড় বস্তুর প্রতি যৌন আকৃষ্ট হয়। যেমন- আন্ডারওয়ার, মেয়েদের পোশাক নিয়ে খেলা(!) করা ইত্যাদি। এটা বিকৃত আচরণ হলেও সমাজের জন্য তেমন ক্ষতিকর না।

ফ্রটারিজম (Frotteurism): এটা লোকজন পূর্ণ এলাকায় বেশি হয়। এই ঘৃণ্য রুচিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত অপরিচিত মানুষের প্রতি যৌন আকৃষ্ট হয়ে মানুষের শরীরে অনুমতি ছাড়াই অশ্লীল ও ইচ্ছেকৃত ভাবে হাত দিয়ে থাকা, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়ানো, প্রভৃতি ঘটনার সাথে জড়িত থাকে। পুরুষদের ক্ষেত্রেই এটা বেশি দেখা যায়।

এছাড়াও অন্যন্য ধরনের প্যারাফিলিয়ার মধ্যে রয়েছে সেক্সুয়াল স্যাডিজম (অন্যকে শারীরিক কষ্ট দিয়ে আনন্দ লাভ), ভয়েরিজম (পিপিং টম-লুকিয়ে অন্যের যৌন সঙ্গম দেখা), নেক্রফিলিয়া (মৃত দেহের বা কঙ্কালের প্রতি যৌন আকর্ষণ),এলগোলাগনিয়া (নিজের শারীরিক কষ্টে মস্তিষ্কে যৌন সুখ পাওয়া, কিছু মানুষ আছে যারা নিজের কোন ব্যাথা পাওয়া অঙ্গে চাপ দিয়ে আরও বেশি ব্যাথা পেয়ে আনন্দ পেয়ে থাকে), সেলিব্রিফিলিয়া (সেলিব্রেটি নায়ক নায়িকার প্রতি যৌন কল্পনা) সহ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্যারাফিলিয়া

কেস স্টাডি -১ : পত্রিকার পাতা থেকে- “জুলাইয়ের ২০ তারিখে রাত ৮:৩০ এর দিকে, ঢাকা-মিরপুর এলাকায় গার্মেন্টস কর্মী মা এবং রিকশা চালক বাবার ১২ বছর বয়সের এক মাত্র মেয়ে টিভি দেখছিল তাদের টিনের চালের ঘরের ভিতরে। মেয়েটির বাবা মা দুজনই কাজের জন্য বাইরে ছিল। এসময় বাড়িওয়ালার ছেলে পলাশ দরজায় নক করে। কী ঘটতে যাচ্ছে মেয়েটি সে ব্যাপারে কোনো কিছু সন্দেহ বা ধারণা না করেই দরজা খুলে দেয়। ৩৫ বছর বয়সী পলাশ এই সাহায্যহীন বাচ্চা মেয়েটিকে ধর্ষণ করে যে এখনো কিশোরী হয়ে উঠেনি। যখন তার মা ফিরে আসে তখন সে মাকে সব বলে দেয়। এবং তার পরিবার মিরপুর মডেল থানায় একটা কেস করে। পুলিশ পলাশকে সেদিনই ধরতে বাধ্য হয়, কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহ পরই পলাশ জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়”।

কেস স্টাডি -২: পত্রিকার পাতা থেকে – “আগস্টের ২ তারিখ রবিবারে ঢাকাতে আরও ২ জন মেয়ে ধর্ষিত হয়। যার মধ্যে একজনের বাড়ি হাজারীবাগ, বয়স ৭। এবং আরেক জনের বাড়ি মিরপুর, বয়স ৯। পুলিশ হাজারিবাগের ধর্ষককে ধরতে সক্ষম হয় কিন্তু মিরপুরের শয়তান এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে”

৬ আগস্ট, ২০১৫ এর ‘ঢাকা ট্রিবিউনের একটা রিপোর্টে ২০১৫ সালের প্রথম ৬ মাসেই ২৮০ জন শিশু ধর্ষণের কথা বলা হয়’। নিচের ছবিতে একটা পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে। সেখানে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত শিশু ধর্ষণ কী পরিমাণে বেড়েছে; ৮৬-২৮০ জন। ধর্ষিতদের মধ্যে ৭-১২ বছর বয়সের আছে ৭৯ জন। এবং সব থেকে ভয়ঙ্কর খবর – মাত্র ৬ বছরের নিচেই আছে ৩০ জন। ২০ জনকে ধর্ষণ করার পর মেরে ফেলা হয়েছে। ৬১ জনকে দলবল সহ ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ৪ জন আক্রান্ত হওয়ার পর আত্যহত্যা করেছে। এবং আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য করার মতন বিষয় হল এটা ঘটেছে মাত্র ৬ মাস সময় সীমার মধ্যে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান যেটা বলছে না তা হল আন-রিপোর্টেড ভিক্টিমের সংখ্যা কত? রেপ হওয়ার পরও সামাজিক মান-সম্মান, লজ্জা এবং পুনরায় নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে প্রকৃত ভিক্টিম দের বেশ বড় অংশই এই পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

sex n life-1 image

এছাড়া জুলাই ২০০৭ – জুন ২০১০ পর্যন্ত, “নিরাপদ স্থান নেইঃ বাংলাদেশের গ্রামে শিশু যৌন হয়রানি” শিরোনামে “ব্র্যাকের” করা এক রিপোর্টে বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে ৭১৩টি শিশু ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে এমন বলা হয়েছে। আরও উল্লেখ করা হয় যে এই ঘটনার বেশিরভাগই (৮৩%) পরিবারের সদস্য নয় এমন মানুষের দ্বারা ঘটেছে। তাহলে বাকি ১৭% কিন্তু পরিবারের সদস্য দের দিকেই ইঙ্গিত করে।

কেস স্টাডি -৩: পরিবারের সদস্য বা নিকট প্রতিবেশীদের দ্বারা শিশুদের কে যৌন হয়রানির ঘটনা ব্যাতিক্রম তো নয়ই বরং বেশ সাধারণ। বাচ্চাদের চকলেট বা আইসক্রিমের লোভ দেখিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে ভুলিয়ে বিভিন্ন ভাবে যৌন হয়রানি করা হয়ে থাকে। ব্র্যাকের উপরের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ১৭% শিশু যৌন হয়রানির ঘটনা পরিবারের সদস্য দ্বারাই হয়ে থাকে। এবং এসকল নিদর্শন স্পষ্টই নির্দেশ করে যে আক্রমণকারী বা ধর্ষক পেডোফেলিয়া (Pedophilia) আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে এবং এদের সংখ্যা বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে।

কেস স্টাডি -৪: বাংলাদেশে প্রায়ই শোনা যায় বাসে বা ট্রেনের ভিড়ে মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার ঘটনা বা তাদের সাথে ভিক্টিমের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইচ্ছে করে শারিরিক সংস্পর্শে আসার মত ঘটনা। এটা পেডফেলিয়ার মতন অতটা মারাত্মক না হলেও, যে ভিক্টিম তার কাছে এটা অত্যন্ত অপমানজনক এবং লজ্জার এবং এটা আইনগতভাবে শাস্তি যোগ্য অপরাধ। এই ধরনের ঘটনা প্রতিদিন অহরহ অসংখ্য বার রাস্তা ঘাটে ঘটছে। এবং এটা বিকৃত যৌনাচার ফ্রটারিজম (Frotteurism) কে তীব্রভাবে ইঙ্গিত করে এবং দেশের বেশ বড়সড় একটা জনগোষ্ঠী যে এই বিকৃত আচরণে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে তারই ইঙ্গিত দেয়।

কেস স্টাডি -৫: নর্দার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির স্যাডিস্ট কেস স্ট্যাডি এর একটি রিপোর্ট থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ তুলে ধরছি, তা হলো – “স্যাডিস্ট কেস স্ট্যাডির জন্য পরিমাপক হিসাবে আক্রমণকারীর ব্যক্তিগত জীবন এবং চরিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে যেখানে মোট ১৬ টা নিয়ামকের সাপেক্ষে আক্রমণকারীর চরিত্র বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি এরকম – শিশু বয়সে শারীরিক হয়রানির স্বীকার, শিশু বয়সে যৌন হয়রানির স্বীকার, আত্ম্যহত্যা প্রবণতা, ড্রাগ ব্যবহার ইত্যাদি। স্যাডিস্টিক কর্মকাণ্ড ঘটানোর সময় ধর্ষিতদের সাথে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে তার জন্যও প্রায় ২২ টি নিয়ামকের সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করা হয়েছে; কয়েকটি এরকম – ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করা, ভিকটিমকে পূর্বে ঠিক করে রাখা যায়গায় নিয়ে যাওয়া, ভিক্টিমকে শারীরিকভাবে আঘাত করা, মারার সময় ভিক্টিম কে কী বলতে হবে তা বলে দেওয়া (“বল, তুই এটা করছিলি, বল” এরকম কিছু), নির্যাতনের দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করা, ভিক্টিমের দেহে বিভিন্ন বস্তু প্রবেশ করিয়ে দেওয়া” ইত্যাদি।

এই কথাগুলো বলা হলো, কারণ বাংলাদেশে খবরের কাগজ খুললেই গৃহবধূ নির্যাতন এবং হত্যা, কাজের ছেলে/মেয়ে কে শারীরিক নির্যাতনের মতন ঘটনার খবর খুব বেশি বেশি চোখে পড়ে। সেই সাথে এই ধরনের সব থেকে ভয়াবহ ঘটনা দুটি ঘটে গত বছরেই, সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন (১৩) হত্যা, এবং খুলনায় কমপ্রেসর মেশিনের হাওয়া পায়ু পথ দিয়ে প্রবেশ করিয়ে শিশু রাকিবকে হত্যা। হত্যা মামলার রায়ও হয়ে গেছে। এর পরে আসি আরেকটি মামলায় – ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ‘ভোরের কাগজে প্রকাশিত’, টাঙ্গাইলের কালোহাতীতে ছেলেকে দিয়ে মাকে ধর্ষণ করানোর চেষ্টা এবং পরে মাকে ধর্ষণ। কিন্তু আমার আলোচ্য বিষয় হলো – এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার সংখ্যা কিন্তু বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে সেক্সুয়াল স্যাডিজমের উপরে তেমন কোনো কাজ হয়েছে কিনা আমি জানি না। উপরের ঘটনাগুলোও ‘সেক্সুয়াল স্যাডিজমের’ বা ‘স্যাডিজমের’ আওতাভুক্ত কিনা আমি নিশ্চিত না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা যখন বার বার ঘটে তখন এগুলো নিয়ে শীঘ্রই বিস্তর কাজ হওয়া এখন খুবই আবশ্যক।

দুটি ব্যতিক্রমী মামলা – প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা হচ্ছে যে, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৫ এর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি সংবাদে বলা হচ্ছে “পার্থ দে নামক এক ভদ্রলোক তার বোন দেবযানীর কঙ্কাল দীর্ঘদিন যাবত নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন পরে পুলিশ তা উদ্ধার করে এবং বর্তমানে পার্থ দে পাভলভ হসপিটাল নামক একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। যার সাথে ‘নেক্রফিলিয়া’ এর সম্পর্ক খুঁজে দেখা হচ্ছে।

এছাড়াও ২০০৬ নইডা (noida) সিরিয়াল মার্ডার নামে ভারতে একটা অপরাধ সংঘটিত হয়। বলা হয় এটা নাকি ইন্ডিয়ার ইতিহাসে সব থেকে বড় বিকৃত রুচির অপরাধ। এই কেসে সুরিন্দার কলি (Surinder Koli) নামক এক ব্যক্তি ১৯টির বেশি সিরিয়াল কিলিং ঘটায় এবং এখানে একজন বাদে ভিক্টিমদের সবাই ছিল শিশু যার মধ্যে ১১ জনই মেয়ে। সুরিন্দার কলিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এবং এটা সেক্সুয়াল স্যাডিজমের সাথে সম্পর্কিত।

প্যারাফিলিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণঃ  অধিকাংশ প্যারাফিলিয়াই বেশ অপ্রতুল (পেডফেলিয়া এবং ফ্রটারিজম ব্যতিত) এবং এটা পুরুষদের ভিতরে মেয়েদের তুলনায় ২০ গুণ বেশি দেখা যায়। যাইহোক প্যারাফিলিয়ার অভ্যাস বা কল্পনা (ফ্যান্টাসি) থাকা মানেই কিন্তু মানসিক অসুস্থ থাকা না। যদিও মানসিক অসুস্থতা একটা কারণ হতে পারে। কম মাত্রায় প্যারাফিলিয়া আক্রান্তরা সাধারণত মাস্টারবেশন বা যৌন মিলনের সময় শুধু একটা বিকৃত ভাবনার (ফ্যান্টাসির) ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকে যেটা খুব একটা ক্ষতিকর না। কিন্তু একটা জনসংখ্যায় যখন ক্রমাগত অপরাধের ঘটনা ঘটতে থাকে তখন সেটা সত্যি ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যেটা এখন বর্তমান বাংলাদেশে হচ্ছে।

Abnormal Psychology: An Integrative Approach By David Barlow, V. Durand বইতে sexual dysfunction and paraphilia অধ্যায়ে বলা হয়েছে “যদিও কেস-হিস্ট্রিভিত্তিক হাইপোথিসিস বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানের বিকল্প নয়, তথাপি এই হাইপোথিসিসগুলোর সত্যতা বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়”। এবং সেখানে প্যারাফিলিক যৌন বিকৃতির কারণ নির্ধারণের জন্য কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনা-১: একটি ঘটনা এরকম, রবার্ট বহিরাগতদের সামনে ‘যৌনাঙ্গ প্রদর্শনের’ দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন, এক্সিবিশনিজম। তিনি বড় হয়েছিলেন টেক্সাসের একটি ছোট শহরে, কঠোর কর্তৃত্ববাদী পিতা ও উদাস মাতার অধীনে। তার পিতা রক্ষণশীল ধর্মে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, এবং তিনি তার পরিবারকে প্রায়ই যৌন মিলনের ব্যাপারে কড়া ধর্মীয় অনুশাসনের কথা শুনাতেন। রবার্ট তার পিতার থেকে যৌন ব্যাপারে শুধু এই শিক্ষাই পায় যে সেটা খারাপ। তাই সে নিজেকে জোর করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ এবং কোন ধরনের যৌন কল্পনা থেকে সরিয়ে রাখতো এবং সমবয়সী মেয়েদের পাশাপাশি হলে স্বস্তি বোধ করতো না। কিন্তু হঠাৎ করে সে ব্যক্তিগত যৌন আনন্দের উৎস খুঁজে পায়। সে জানলা দিয়ে সুন্দরী আত্মভোলা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকতে শুরু করে এবং জীবনের প্রথম মাস্টারবেশনের অভিজ্ঞতা এভাবেই অর্জন করে। কিন্তু রবার্ট ধরা পড়ে যায় এবং অপরিচিতদের সামনে ‘যৌন অঙ্গ প্রদর্শনের’ দায়ে আদালত তাকে অল্প সাজা দিলেও তার পিতা কে জনসম্মুখে অপমান করা হয় এবং তাদের পরিবারকে শহর থেকে বের করে দেওয়া হয়”।

ঘটনা-২: “টনি (যিনি নিজ কন্যার সাথে যৌন মিলনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলন), তার শিশু বয়সের ইতিহাস বেশ অন্যরকম, সে একটি ভালবাসা পূর্ণ সাধারণ ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠে। কিন্তু তার এক কাকা ছিলেন যিনি পরিবারের অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন। ৯-১০ বছর বয়সে টনি তার কাকার দারা উৎসাহিত হয়ে ‘কাকা এবং এক প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গম’ দেখতে আগ্রহী হয়। সে তার কাকাকে একজন রেস্টুরেন্ট কর্মীর সাথেও দেখে, এবং কাকার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের চেয়ে বয়সে ছোট, মেয়ে কাজিনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে, এবং এভাবেই একটু অল্প বয়সে সে মাস্টারবেশন এবং ছোট মেয়েদের সাথে আনন্দ উপভোগ করতে শেখে। সে যদিও কাকার দ্বারা শারীরিক সংস্পর্শের শিকার হয়নি, কিন্তু কাকার আচরণ ছিল নির্যাতনমূলক। সে ১৩ বছর বয়সে তার বোন এবং প্রেমিকার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে যা ছিল আনন্দের। পরে সে ১৮ বছর বয়সে একটি পতিতালয়ে যায় এবং যৌন মিলন করে যেটাতে সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। কারণ, সে দ্রুত বীর্যপাতের শিকার হয়। অর্থাৎ, তার স্মৃতিতে বাচ্চা মেয়েদের সাথে ব্যাপারটা সুখের ছিলো এবং বয়স্ক মেয়েদের সাথে অসন্তুষ্টির ছিলো। এরপর সে কাজে যোগ দেওয়ার পর বারবণিতাদের কে খুঁজে নিত যারা ১২ বছরের কাছাকাছি বয়স’।

এই দুটি ঘটনা আমাদেরকে এটাই বুঝতে সেখায় যে তাদের দুজনের কেউই ছোট বেলায় সুস্থ মানসিক বিকাশের সুযোগ পায়নি। এছাড়া The Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders (DSM), published by the American Psychiatric Association এর কাজের ধারা অনুযায়ী প্যারাফিলিয়ার জন্য আরও কয়েকটি কারণ দায়ী হতে পারেঃ

১। নিউরোট্রান্সমিটার নামে পরিচিত মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক উপাদান (যেমন, ডোপামিন (dopamine), সেরোটোনিন (serotonin), নরেপিনফ্রিন (norepinephrine) এর ভারসাম্যহীনতা যা বিকৃত যৌন আচরণের কারণ হয়ে থাকতে পারে। এগুলো সাধারণত শরীরের জন্য উপকারী রাসায়নিক পদার্থ এবং আমাদের মন মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করে।

২। পুরুষ এবং নারীদের দেহে থাকা এন্ড্রজেন নামের সেক্স হরমোন সেক্সুয়াল আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে, প্যারাফিলিয়ায় এর ভুমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে।

৩। দীর্ঘ দিন ধরে বার বার আনন্দদায়ক কোনো কিছু করার ফলে তা মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্রের গঠনে পরিবর্তন আনে এবং এটা এক সময় অভ্যাসে পরিণত হয় যা বার বার মানুষ কে একই কাজ করতে প্ররোচিত করে।

প্যারাফিলিয়ার চিকিৎসা

১। প্যারাফিলিয়ার চিকিৎসায় সাইকোথ্যারাপি, ওষুধ এবং কাউন্সিলিং এক সাথে ব্যবহৃত হয়। হতাশা, বিষণ্ণতা, এলকোহল, এবং ড্রাগের প্রভাবও বিবেচনায় রেখে এগুলোর চিকিৎসা করা হয়।

২। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে গ্রুপ তৈরি করে নিজেদের জীবনের গল্প বিনিময় করার মাধ্যমেও এর চিকিৎসা করা হয়।

৩। ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে হতাশা-নিরোধক ঔষধ, এন্টি-এন্ড্রজেন্স (যা অতিরিক্ত যৌন চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে)। মানসিক স্থিতিশীলতা তৈরির জন্য মুড-স্ট্যাবিলাইজার যেমন লিথিয়াম ও নাল্ট্রেক্সন (naltrexone) ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য করণীয়

১। রক্ষণশীল বাংলাদেশের অধিকাংশ কিশোরই বেড়ে ওঠার সময় সুস্থ পরিবেশ পায় না। তাই বাবা মা কে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে তার সন্তানের মানসিক বিকাশ ঠিকমতন হচ্ছে কিনা। তার সন্তান কিশোর বয়সে কী ধরনের আচরণ করছে। কার সাথে মেলামেশা করছে। এবং তার সাথে সঠিক যৌন শিক্ষার ব্যাপারে খোলাখুলি বন্ধু সুলভ কথা বলা।

১.১। একদম বাচ্চা বয়সে শিশুদের যৌন শিক্ষা দেওয়াটা উচিৎ নয়, কিন্তু কিছু ব্যাপারে তাদেরকে সচেতন করে দিতে হবে, যেমন- নিকট আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের কেউ তাদের সঙ্গে সন্দেহজনক কোনো আচরণ করছে কিনা। তাদেরকে চকলেটের লোভে ভুলিয়ে গায়ের স্পর্শকাতর যায়গায় কেউ হাত দিচ্ছে কিনা। এবং এ ধরনের কিছু হলে সে যেন সেখান থেকে দ্রুত চলে আসে এবং বাবা-মা কে জানায়। এবং আপনার সন্তান এধরনের কোনো কিছু জানালে কখনই অবহেলা করবেন না। এখানে সতর্কতার নমুনা হিসাবে একটা ভিডিও লিঙ্ক দেওয়া হলো।

২। যৌন শিক্ষা এখনো বাংলাদেশে খুবই অপ্রতুল। স্কুল কলেজ গুলোতো অনেক দূরে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত সঠিক যৌন শিক্ষার ব্যাপারে জানে না, এ ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলা অনেকটা যেন অলিখিত নিষেধ। এই বাধা কাটিয়ে উঠতে হবে, স্কুল কলেজের শিক্ষক দের কে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে। যৌন শিক্ষার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের সাথে নিওমিত সময় নিয়ে কথা বলতে হবে।

৩। কিছু এন.জি.ও এই ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করছে যেমন ‘ব্র্যাক’। তারা ক্লাস ৮ এর শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধের প্রশিক্ষণ ও ক্লাস ৯ এর শিক্ষার্থীদের যৌন শিক্ষার ব্যাপারে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু খুবই অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী (জেলায় ১০-২০ জন) এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়, এই প্রোগ্রামও সব সময় চালু থাকে না। তাই সরকারী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলোকে একসাথে হয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে সকল শিক্ষার্থী তাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

৪। সরকারী ভাবে পাঠ্য বইয়ে ক্লাস ৬-৭ থেকে যৌন শিক্ষার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে অধ্যায় যোগ করা যেতে পারে কিংবা এর জন্য আলাদা একটা পাঠ্য বইও যোগ করা যেতে পারে।

৫। সমাজে ধর্ষণ, নারীর শ্লীলতাহানি রোধ করার জন্য এবং সুস্থ সমাজ গড়ার জন্য প্যারাফিলিয়া আক্রান্তদের কে চিহ্নিত করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। শিশু ধর্ষণ, নারী ও শিশু হয়রানি সংক্রান্ত আইনের সংস্করণ করা এবং মামলা সত্য প্রমাণিত হলে দ্রুত বিচারের আওতায় জামিন অযোগ্য যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা।

বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ

প্যারাফিলিয়া এবং মানসিক অসুস্থতার উপর বানানো Rotten Tomatoes এ ৯৫% এর উপরে ফ্রেশ রেটিংপাওয়া বেশ কয়েকটি ভাল মুভি আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো – Being There (1979), Best Boy (1979), Bill (1981), Dominick and Eugene (1988), I Stand Alone (1999), Heart Is a Lonely Hunter (1968), Of Mice and Men (1992), Sling Blade (1996), To Kill a Mockingbird (1962), What’s Eating Gilbert Grape (1993.

বিশেষ ধন্যবাদঃ Abu hayat Khan ভাই কে। যিনি আর্টিকেলটা লিখতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।

চলবে…

তথ্য সূত্রঃ

1. Wiki – paraphilias.
2. MSD manual.
3. Psychologist anywhere anytime.
4. Mdhil.
5. NIU
6. 280 children raped in first six months of 2015
7. NCBI
8. Partha cremates Debjani’s remains/
9. Noida Serial Murders
10. BD News
11. সময়ের খবর
12. আমাদের সময়
13. বাংলা নিউজ
14. ভোরের কাগজ
14. channel i online
15. Movies and mental illness
16. Causes of paraphillia
17. Causes pf paraphillia 2.

Comments

Rajib

I'm still thinking!

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

1 মন্তব্য on "যৌনতা ও জীবন, পর্ব ১ – প্যারাফিলিয়া"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
trackback

[…] বজায় রেখে বোঝার সুবিধার জন্য “যৌনতা ও জীবন, পর্ব-১ প্যারাফিলিয়া” পড়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা […]

wpDiscuz