বসন্তের দূত – জিনিয়া

“ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত” – প্রবাদ হয়ে যাওয়া কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই পঙক্তি মার্কিন নভোচারী স্কট কেলি ও তার দলবল জানতেন কিনা জানা নেই, তবে ফুল ফুটিয়েই অসময়ে বসন্তের ঘোষণা করলেন তারা ওই মহাশূন্যের ওপার থেকে। পৃথিবীর প্রায় 400 km উপরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station – ISS)-এর সবজি বাগানে (ভেজি প্ল্যান্ট গ্রোথ সিস্টেম) ফুটলো আগুন-রঙা জিনিয়া ফুল (চিত্র ১)।

new-picture

চিত্র ১। ভেজি প্ল্যান্ট গ্রোথ সিস্টেম (VEGGIE prototype)

নভোচারীদের খাবার রসদ সমৃদ্ধ করে মহাকাশ স্টেশনকে স্বাবলম্বী করে তোলার (যাতে পৃথিবী থেকে পাঠানো আনাজ-ফসলের বহর কমিয়ে স্পেস শাটলের ভার লাঘব করা যায়) যে প্রচেষ্টা চলছে বহুদিন ধরে তারই ফসল হলো এই আবিষ্কার। তবে ISS-এ উদ্ভিদের প্রাণের স্পন্দন অবশ্য নতুন নয়। মানুষের বাসযোগ্য কৃত্রিম উপগ্রহটির নিরামিষ পরীক্ষাগারে আগেও লেটুস (যা সালাদের অন্যতম উপকরণ) জাতীয় সব্জি ফলানো হয়েছে। এই ফুল জিনিয়া যেমন দেখতে চমৎকার, তেমন সালাদে খেতেও বেশ (চিত্র ২)। তবে এর জন্য যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখাতে হয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের। লেটুসের সঙ্গে জিনিয়ার কোনো তুলনাই হয় না। এরকমই একটি ফুলকে চিত্র ৩-এ দেখানো হল।

new-picture-1

চিত্র ২। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের অভ্যন্তর। লেটুসের স্বাদ পরীক্ষা করে দেখছেন কিমিয়া ইউয়ি, কিয়েল লিন্ডগ্রেন এবং স্কট কেলি

new-picture-2

চিত্র ৩। মহাকাশ স্টেশনে বিকশিত জিনিয়া ফুল

যদিও জিনিয়ার মতো সেটাও রীতিমতো কসরত করে ফলাতে হয়েছে ISS-এর কৃত্রিম আবহাওয়ায়। পরিবেশ বা সূর্যালোক, জিনিয়ার জন্য দু’টোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর দু’টোর কোনোটাই ISS-এ নেই। তাছাড়া জিনিয়ার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা-এতে সময় লাগে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ দিন, অর্থাৎ লেটুসের থেকে বেশি। ফলে লড়াইটাও দীর্ঘ। এই কঠিন কাজটা করতে গিয়ে বেশ চাপের মুখেই পড়তে হয়েছিল গবেষকদের। লেটুস চাষ সফল হওয়ার পর জিনিয়া লাগান গবেষকরা। কিন্তু গবেষণার প্রথমেই ধাক্কা! জল একটু বেশি হয়ে যাওয়ায় পচন ধরতে শুরু করে গাছে। শেষে গাছগুলোকে বাঁচাতে বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হয়, যাতে গাছের পাতায় লেগে থাকা জল তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। কিন্তু তাতে উল্টো বিপত্তি! এবার জলাভাবে (ডিহাইড্রেশন) মরতে থাকে একের পর এক গাছ। বেঁচে যায় হাতে গোণা কয়েকটি। তারই মধ্যে একটিতে ফোটে ফুল। কিন্তু বেশ দুর্বল। পাঁপড়িগুলো দু’দিক থেকে মুড়ে যায় (চিত্র ৪)। কারণটা অবশ্যই মাধ্যাকর্ষণের অনুপস্থিতি; ISS-এ মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব নেই বললেই চলে। আলো, তাপমাত্রা, এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ করে কোনো রকম মাটি ছাড়া গবেষণাগারের পুষ্টিকর তরলে এই কৃত্রিম চাষকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘হাইড্রোপোনিক্স’। মহাশূন্যের নিঃসীম অন্ধকারের বুকে সালোকসংশ্লেষণের জন্য আলোর উৎসও কৃত্রিম-তিন-রঙা এলইডি বাতি। সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ, মাধ্যাকর্ষণের অভাব – জিরো গ্র্যাভিটি।

new-picture-3

চিত্র ৪। দু’দিক থেকে মুড়ে যাওয়া পাঁপড়ি

ছাত্রাবস্থায় জীববিজ্ঞান বই থেকে জেনেছি, কীভাবে বিভিন্ন উদ্দীপনায় সাড়া দেয় উদ্ভিদ। কেন উদ্ভিদের কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা এবং পাতা সর্বদাই লকলকিয়ে ওঠে সূর্যের পানে, কেনইবা সদাই নিম্নমুখী হয় তার শিকড় আর কিভাবেই বা উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গ বহিঃস্থ উদ্দীপনায় সাড়া দেয় – তা ট্রপিক, ন্যাস্টিক, ও ট্যাক্টিক চলন পঠন পাঠনের মাধ্যমে শিখেছি আমরা। কিন্ত্ত সে ধারণাতেও বুঝি ভুল হতে চলেছে। এবিষয়ে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু-র প্রবন্ধ ‘স্নায়ুসূত্রে উত্তেজনা-প্রবাহ’ প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু এবারে বোধহয় গাছের আচার-আচরণ নিয়ে আমাদের মৌলিক ধারণাগুলোই ধাক্কা খেতে বসেছে – কারণ ধ্রুব সত্য হয়ে যাওয়া ধারণা হলো গাছের শিকড় সর্বদাই ছুটে যাবে মাটির দিকে, জল আর অভিকর্ষের টানে। কিন্তু ISS-এ মাধ্যাকর্ষণের বালাই প্রায় নেই বললেই চলে; সেখানেও তো দেখা যাচ্ছে শিকড়ের অভিমুখ নীচের দিকেই। ‘মাইক্রোগ্র্যাভিটি’ যেটুকু আছে তা শিকড়কে নিম্নাভিমুখী করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। তাহলে মাধ্যাকর্ষণের অনুপস্থিতিতে বা ‘মাইক্রোগ্র্যাভিটি’-র উপস্থিতিতে মূলের নিম্নাভিমুখী হওয়ার পেছনে প্রভাবক কোনটি – আলো? জল? নাকি কৃত্রিম কালচারের পুষ্টিকর তরল?

চমকে দেওয়া উত্তরটি হল আলো। অর্থাৎ আলো শুধু শাখা-প্রশাখা কিম্বা পাতার চালিকা শক্তি নয়, শিকড়েরও চলন-গমন নিয়ন্ত্রক। আর এখান থেকেই উন্মোচিত হচ্ছে গবেষণার নতুন দিগন্ত। শেকড়ের ওপর আলোর নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কাজ করে, তার নাগাল পেতে বিজ্ঞানীরা নজর দিয়েছেন বেশ কিছু প্রজাতির গাছের জিন-বিন্যাসে। একটি জিনকে মূলত চেনা যায় তার কোড থেকে সংশ্লেষিত প্রোটিনের কার্যপদ্ধতির মাধ্যমে, যাকে বলে ‘প্রোটিন এক্সপ্রেশন’। প্রতিপ্রভ প্রোটিন মার্কার ব্যবহার করে এবং বিশেষ ধরনের ক্যামেরা ও অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ISS-এর অচেনা, প্রতিকূল পরিবেশে পড়ে পুরোপুরি বদলে গেছে বেশ কিছু জিনের আচরণ। যে জিনের কার্যকারিতা পৃথিবীর বুকে ছিল এক রকম, মহাকাশে এসে তারই কার্যকারিতা যথেষ্ট বদলে গেছে। পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণের উপস্থিতিতে যে জিন মূলকে নিম্নাভিমুখী হতে নির্দেশ দিত, সেই জিন মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের প্রায় অনুপস্থিতিতে কার্যকারিতা হারায়। পক্ষান্তরে, যে জিন পৃথিবীতে শুধু শাখা-প্রশাখার নির্দেশক ছিল, মহাকাশে সেই জিন নিয়ন্ত্রণ করছে শিকড়কেও, নির্দেশ পাঠাচ্ছে আলোর বিপরীত দিকে যেতে। এহেন আবিষ্কারের হাত ধরে ফুটে উঠেছে আগুন-রঙা জিনিয়া।

এ কথা ভুললে চলবে না যে, জিনিয়া ফুটেছে পুরোপুরি কৃত্রিম পরিবেশে, একেবারে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, কৃত্রিম উপগ্রহের নিরামিষ গবেষণাগারের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আবহাওয়ায়। এই প্রতিকূলতার সঙ্গে পৃথিবীর বর্তমান আবহাওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন মিল আমরা দেখতে পাচ্ছি। কারণ, নির্বিচার বৃক্ষনিধন, অবৈধভাবে জলাশয় ভরাট করা,পরিবেশ দূষণ, এবং সর্বোপরি বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে আমাদের আবহাওয়া-জলবায়ু। এরকম একটি সন্ধিক্ষণে, এই বসন্তের দূত আমাদের হাতে প্রতিকূল পরিবেশে ফসল ফলানোর চাবিকাঠি তুলে দিচ্ছে। কী বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠছে মহাজাগতিক গাছে, তা পৃথিবীর বুকে বসে বোঝার জন্য ইতিমধ্যেই স্পেস শাটল ‘ডিসকভারি’ তে চড়িয়ে পাঠানো হয়েছে ‘মিজুনা’ নামে এক ধরনের জাপানি লেটুসের চারা (চিত্র ৫)।

mizuna

চিত্র ৫। মিজুনা – এক ধরনের জাপানি লেটুস

মহাকাশ স্টেশনে চাষ-আবাদ করা নানা চারাগাছের নমুনা সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা এখন ব্যস্ত আছেন সেই শক্তিধর সুইচ সন্ধানে। কী সেই সুইচ? প্রতিকূলতার মুখে আলাদা আলাদা পারিপার্শ্বিকে বা পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা আলাদা জিনের কার্যকারিতার সুইচ। মহাকাশে উদ্ভিদের কোনো জিন যদি অবস্থা বুঝে নিজে ব্যবস্থা নেয়, তা হলে এখানেও সেটা সম্ভব কিনা সেটাই হলো মূল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরের উপর সামগ্রিকভাবে পৃথিবীতে ফসল চাষ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে। পৃথিবীতে ফসলের শত্রু সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রতিকূল পরিবেশ, আবহাওয়ার ব্যাপক রদবদল, জলাভাব, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, ও ভাইরাস-ব্যাকটিরিয়া ইত্যাদি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির হাত ধরে বিপুল জনবিস্ফোরণে পৃথিবী যদি এতটাই বসবাস অযোগ্য হয়ে ওঠে যে, মানুষকে মঙ্গলে বা অন্য কোনো গ্রহে বা উপগ্রহে বিকল্প ঘাঁটির কথা ভাবতে হয়, তাহলে প্রথমেই তো দরকার হবে চাষবাস, খেত খামারের। ফসল ফলবে কেমন করে সেখানকার মাটিতে? সেই পথ দেখাক লাল জিনিয়া।

Comments

সুমন পাল

লেখক হরেন্দ্র কুশারী বিদ্যাপীঠে সহকারী শিক্ষক এবং ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র সান্ধ্য মহাবিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে অতিথি অধ্যাপক রূপে কর্মরত। লেখাপড়া কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (University College of Science) থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে B.Ed. এবং Ph.D.। গবেষণার ক্ষেত্র – আয়নমণ্ডলের প্লাজমা ও তাপীয় ঘটনাবলী, আবহবিদ্যুৎ ও চুম্যান অনুনাদ, রেডিও তরঙ্গ, ভূকম্পন। বর্তমানে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre of Advanced Study in Radio Physics and Electronics-এ আংশিক সময়ের গবেষক।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz