স্পুটনিক ১ – প্রথমবারের মত আমরা পাল তুলে দিলাম মহাশূন্যের সাগরে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে যুক্তরাষ্ট্র আর তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়াই হচ্ছে পৃথিবীর সেরা দুই সুপারপাওয়ার। গোটা দুনিয়া তখন এদের শক্তি প্রদর্শন দেখছে। এ এটা করে, তো ও ওটা করে! পৃথিবীতে তো এই প্রতিযোগিতা চলছিলোই! তারই জের ধরে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে যুক্ত হলো মহাশূন্য।

১৯৫৭ সালের অক্টোবরের ৪ তারিখে, রাত ১০ঃ২৯ মিনিটে, এই প্রতিযোগিতায় ব্যাপক একটা দান খেললো। ইতিহাসে প্রথমবারের মত কোনো মানবনির্মিত যন্ত্রকে ওরা পাঠিয়ে দিলো মহাকাশে। মানবশূন্য এই যন্ত্রটা যখন পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘোরা আরম্ভ করলো, তখন রচিত হলো ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। তাত্ত্বিকভাবে আমরা অনেকদিন ধরেই জানতাম যে, পৃথিবীর অভিকর্ষ ছিন্ন করে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সেটা সত্যি সত্যি করে দেখানো সম্ভব হয়েছিলো ইতিহাসের এই দিনটিতে। যন্ত্রটার নাম স্পুটনিক-১। “স্পুটনিক” শব্দটা রাশিয়ান, যার অর্থই হচ্ছে উপগ্রহ।

স্পুটনিকের আকার ছিলো অনেকটা ভলিবলের মত। কিছু টেকনিক্যাল ডিটেইলস দেয়া যাক –

ব্যাস ৫৮ সেন্টিমিটার
ওজন – ৮৩.৬ কেজি
গতি- ঘণ্টায় প্রায় ২৯০০০ কিলোমিটার
আবর্তনের সময় – পৃথিবীকে একবার আবর্তন করতে ওর লাগতো মাত্র ৯৮ মিনিট
দূরত্ব – সর্বোচ্চ ৯৩৯ কিলোমিটার, সর্বনিম্ন ২১৫ কিলোমিটার
স্থায়িত্ব – ৩ মাস

এটার গায়ে যে ৪টা বড় রেডিও এন্টেনা লাগানো ছিলো, সেখান থেকে সিগন্যাল এসেছিলো ২১ দিন পর্যন্ত, এরপর ট্রান্সমিটারের ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। পৃথিবীর ওপরের দিকের বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গিয়েছিলো স্পুটনিক-১ এর গতিপথ আর চলাফেরা দেখে। আয়নোস্ফিয়ার সম্পর্কেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গিয়েছিলো সেই সময়। পৃথিবীর চারপাশে নিচু কক্ষপথে স্পুটনিক-১ ঘুরেছিলো জানুয়ারির ৪ তারিখ পর্যন্ত। অর্থাৎ, তিন মাস কক্ষপথে থাকার পর, প্রায় ৭০ মিলিয়ন কিলোমিটার আবর্তনের পর সে ছিটকে পড়ে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে জ্বলে যায়।

এই কাহিনীর শুরু আমাদের ভাষা আন্দোলনের সালে, ১৯৫২ তে। International Council of Scientific Unions জানতো যে জুলাই ১, ১৯৫৭ থেকে ডিসেম্বর ৩১, ১৯৫৮ পর্যন্ত সৌর চঞ্চলতা (solar activity) তুঙ্গে থাকবে। তাই, ওরা এই সময়টাকে International Geophysical Year (IGY) হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিলো। দু বছর পর, কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিলো যে ঐ IGY এর সময়টাতে একটা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো দরকার। ১৯৫৫ সালে আমেরিকা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনাও করলো। কিন্তু সোভিয়েতদের স্পুটনিক-১ সব হিসেবনিকেশ পাল্টে দিলো। শুরু হয়ে গেলো, আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতা। নিচের ভিডিওটা কী যে শিহরণ জাগায়!

এই ঘটনাটা আমেরিকানদের মনে ভয়ংকর মাতমের সঞ্চার করেছিলো। তারা মানবজাতির সামগ্রিক এই উত্থানে খুশি হতে পারেনি। বরং কেউ হিংসায় জ্বলেছে, কারণ ওরা নিজেদেরকে প্রযুক্তির শীর্ষে মনে করতো। আবার কেউ কেউ ভয় পেয়েছিলো এই ভেবে যে এবার সোভিয়েতের কাছে এমন একটা প্রযুক্তি চলে গেলো যা দিয়ে হয়তো ওরা আমেরিকানদের ওপর স্থায়ী জয় হাসিল করে নিলো। এই পরিস্থিতিকে ওরা ডেকেছিলো “স্পুটনিক ক্রাইসিস” নামে। আর এই ভয়ের কারণও ছিলো। সোভিয়েত আর আমেরিকা দুই দলই মহাকাশে যাওয়ার প্রযুক্তিতে উন্নতি অর্জন করতে চাইছিলো, কারণে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন মানে মিসাইল প্রযুক্তির উন্নয়ন। একে অপরের ওপর খবরদারি করার জন্য দূরপাল্লার মিসাইল নির্মাণের প্রযুক্তি আর মহাকাশযানের প্রযুক্তি একই। তাই, আমেরিকানরা খুশি হতে না পারলেও পৃথিবীর আপামর বিজ্ঞানীরা মন থেকে খুশি হয়েছিলেন হয়তো।

যাই হোক, পরের মাসেই (১৯৫৭ সালের নভেম্বরের ২ তারিখ) সোভিয়েতরা স্পুটনিক-২ পাঠালো মহাকাশে, এবার একটা প্রাণী সহ। সেই কুকুরটার নাম (লাইকা) হয়তো আমরা সবাই স্কুলে পড়েছি।

laika

স্পুটনিক ছাড়ার পরপরই আমেরিকা তাদের মহাকাশ গবেষণার বরাদ্দ বাড়িয়ে দিলো। এবং পরের বছরের জানুয়ারিতেই ওরা পাঠালো এক্সপ্লোরার-১। চার বছর পর, ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল – সোভিয়েতরা আরেক হাত দেখে নিলো। এবার মানুষ গেলো মহাকাশে! তবে এবারের মহাকাশযানের নাম অবশ্য ভস্টক। আর মহাকাশে যাওয়া প্রথম ব্যক্তিটির নাম – ইউরি গ্যাগারিন।

CC_Russian-Cosmonaut-Yuri-Gagarin-the-first-man-in-space-B

যাত্রার সবে শুরু। এই যাত্রা চলেছে, চলবে……

সূত্রঃ

1) Nasa History.
2) Wikipedia.
3) History.com.

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz