স্টিফেন হকিং এর জীবনী

তিনি একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, মহাবিশ্ববিদ, লেখক, বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারী, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক মহাকাশবিদ্যা বিভাগের পরিচালক, এবং প্রফেসর। পড়াশোনা করেছে, কিন্তু তার নাম জানে না, এমন মানুষ মনে হয় গোটা দুনিয়াতে একজনও পাওয়া যাবে না। বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা মেধাবী এই মানুষটার নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। জীবনের বেশির ভাগ সময় মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে হুইলচেয়ারে কাটিয়েছেন, তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়েছেন। তারপরেও তার অর্জনের খাতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মহিমান্বিত। আসুন, আজ আমরা এই অসামান্য মেধাবী লোকটার জীবনের গল্প শুনি।

জন্ম ও শৈশব

তার বাবা-মা দুজনেই অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করতেন, কিন্তু তখন তাদের দেখা হয়নি। আমরা অনেক সময় যুদ্ধকালীন সময়ের রোমান্সের গল্প পড়ি। তাদের গল্পটা বুঝি অনেকটা সেরকমই। পড়াশোনা শেষ করার পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার কিছু সময় পর লন্ডনে তাদের দেখা হয়েছিলো। চারিদিকে জার্মান বোমা পড়ছে, এমন একটা সময়ে মা ইসোবেলের গর্ভে এলেন স্টিফেন হকিং। তার জন্ম হয়েছিলো অক্সফোর্ডেই, ১৯৪২ সালের ৮ই জানুয়ারি। জন্মের আগেই গর্ভবতী মা লন্ডন ছেড়ে অক্সফোর্ডে চলে এসেছিলেন, কারণ লন্ডনে তখন প্রায়ই সাইরেন বাজে; “বোমারু বিমান আসছে”- সেই সাইরেন।

মেধাবী পরিবারেই জন্ম হয়েছিলো তার, এবং মা-বাবা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার দিকে বেশ মনযোগও দিয়েছিলেন। প্রাইমারি স্কুলে অনেকদিন পার করার পরেও হকিং পড়তে পারতেন না, এজন্য তিনি স্কুলকেই দোষ দিয়েছেন। অবশ্য সেটা কেটে গিয়েছিলো কয়েক বছরের মধ্যেই, ইন্টারমিডিয়েটও পাশ করে ফেলেছিলেন অন্যদের চেয়ে এক বছর আগেই, প্রধান শিক্ষকের বিশেষ অনুমতি নিয়ে।

তার আগে অবশ্য আসে হাই স্কুল (শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে, টুয়েলভে গিয়ে শেষ হয়)। বাবা চেয়েছিলেন নামকরা ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াতে, কিন্তু বিধি বাম! স্কলারশিপের জন্য একটা পরীক্ষা দিতে হয়, আর সেই পরীক্ষার দিন হকিং অসুস্থ হয়ে পড়লেন, পরীক্ষা আর দেয়া হলো না। আর এত টাকা খরচ করে সেখানে পড়ানোর মত অবস্থাও বাসায় ছিলো না। তাই আগের স্কুল সেইন্ট আলবানস-ই সই! সেখান থেকেই ইন্টার পাশ করেছিলেন তিনি। ও হ্যাঁ, আরেকটা জিনিস, স্কুলে অনেকেই তাকে “আইনস্টাইন” বলে ডাকতো। এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে, বলুন!

অক্সফোর্ডে পড়াশোনা

১৯৫৯ সাল। হকিং এর বয়স ১৭।

আগেই বলেছি, তার বাবা-মা অক্সফোর্ডে পড়েছিলেন। ইউরোপ-আমেরিকাতে একটা জিনিস খুব বেশি চলে। বাবা-মা চায়, তাদের সন্তান তাদেরই ইউনিভার্সিটিতে পড়ুক; তারা যে হাউজে থাকতেন, সেই হাউজেরই সদস্য হোক। নিজ নিজ হাউজের জন্য অনেকে অনেক অনুদানও দেয়।

বাবা চাইলেন, “তুমি আমার ছেলে, তুমি আমার মত ডাক্তারি পড়বে”।

ছেলে বললো, “গণিত পড়বো”।

বাবা বললেন, “গণিত পড়লে খাবে কী? তাছাড়া তুমি অক্সফোর্ডে পড়বে, এটা নিয়ে কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না। অক্সফোর্ডে গণিত বলে কোনো বিষয় নাই”। হুম, ঐ আমলে অক্সফোর্ডে ম্যাথামেটিক্স ছিলো না।

ছেলে বললো, “আচ্ছা, অক্সফোর্ডে পড়বো, কিন্তু ডাক্তারি পড়বো না। ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি পড়বো। এটা নিয়ে কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না।” —- এগুলো সম্পূর্ণ আমার মস্তিষ্কপ্রসূত কাল্পনিক ডায়লগ, কিন্তু কাহিনী সত্য!

যাই হোক, তরুণ হকিং সাহেব “আইনস্টাইন” ডাকনামটার নামকরণের সার্থকতা যাচাই করে যাচ্ছিলেন অক্সফোর্ডে এসেও। পড়াশোনা নাকি পানিভাত ছিলো তার কাছে। তাকে পদার্থবিজ্ঞানে একাডেমিক কোনো সমস্যা দিলেই সমাধান হাজির- এটা তার তৎকালীন প্রফেসর রবার্ট বারম্যানের মন্তব্য। এজন্য পড়াশোনার দিকে তার ধ্যান ছিলো খুবই কম। অনার্স জীবনের তৃতীয় বছরে পড়াশোনা বলতে প্রায় বাদ দিয়ে টোঁটো করে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, বন্ধু বান্ধব বানানোর দিকে মনযোগ দিলেন। চতুর্থ বছরে, ফাইন্যাল পরীক্ষার ফলাফল এমন হলো যে ফার্স্ট ক্লাস নাকি সেকেন্ড ক্লাস- সেটা নির্ধারণের জন্য ভাইভা প্রয়োজন হলো। অমনযোগী ছাত্র হিসেবে ততদিনে তিনি বেশ সুনাম(!) কামিয়েছেন। ভাইভাতে গিয়ে তিনি সেটার সুযোগ নিলেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা বলেছিলেন, সেটা সরাসরি অনুবাদ করে তুলে দিচ্ছি, “যদি আমাকে ফার্স্ট ক্লাস দেন, তাহলে কেম্ব্রিজে চলে যাবো, ওখানে গিয়ে মহাবিশ্বতত্ত্ব পড়বো। যদি সেকেন্ড ক্লাস দেন, তাহলে অক্সফোর্ডেই থাকবো। মনে হয়, ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে বিদেয় করে দিলেই ভালো হবে”।

তিনি ভাইভা বোর্ডের শ্রদ্ধা অর্জন করলেন, ফার্স্ট ক্লাস পেলেন, ইরান থেকে ঘুরে এলেন, শুরু করলেন কেম্ব্রিজের পিএইচডি জীবন।

কেম্ব্রিজে পিএইচডির দিনগুলি

বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়েল তখন কেম্ব্রিজে পড়াচ্ছেন। হকিং চেয়েছিলেন, তার সাথে কাজ করতে। কিন্তু তাকে সুপারভাইজার হিসেবে পাওয়া গেলো না। হয়েল অনেক ব্যস্ত ছিলেন, এটা একটা কারণ হতে পারে। যারা হয়েলকে চেনেন না, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি – আমরা এখন জানি যে, আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান। আমাদের শরীরের প্রত্যেকটি অণু পরমাণু কোনো একটা নক্ষত্রের হৃদয়ে তৈরি হয়েছে। কার্ল সেগান এই ধারণাটাকে সবার মধ্যে জনপ্রিয় করে দিয়েছিলেন “we are star stuff” উক্তি দিয়ে। কিন্তু সেই একাডেমিক গবেষণা করেছিলেন ফ্রেড হয়েল এবং তার সহযোগী গবেষকরা (মার্গারেট বারবিজ, জেফ্রি বারবিজ, আর উইলিয়াম ফাওলার)। B2FH paper লিখে গুগল করলেই আর্টিকেলটা পেয়ে যাবেন। এমন একটা গবেষকের সাথে কাজ করতে না পেরে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিলো তার। তবে, তিনি যাকে পেয়েছিলেন, সেটা হকিং এর জন্য শাপে বর হবে একদিন। তার সুপারভাইজার ছিলো ডেনিস সিয়ামা, আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের জনকদের একজন। তার সাথে কাজ করতে গিয়ে, প্রথমদিকে নিজের গণিতজ্ঞান নিয়েও ঠোকর খাচ্ছিলেন হকিং। আগেই বলেছি, তিনি অক্সফোর্ডে ছিলেন, আর সেখানে গণিতের জন্য উৎসর্গীকৃত বিভাগও ছিলো না তখন। তবু সাধারণ আপেক্ষিকতা আর মহাবিশ্বতত্ত্ব নিয়ে কাজ শিখে নিতে লাগলেন তিনি। ডেনিসও খুব ধৈর্য নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতেন।

এমন সময় তার বোনের একটা বন্ধু জেইন ওয়াইল্ডের সাথে দেখা হলো তার। ফরাসি সাহিত্যে পড়ুয়া এই মেয়েটার সাথে খুব দ্রুত তার সখ্যতা গড়ে উঠলো এবং সেটা প্রেমেও গড়ালো। এই মেয়েটা না থাকলে হকিং হয়তো হকিং হয়ে উঠতেন না; কারণটা আমরা কিছুক্ষণ পরেই দেখবো।

মোটর নিউরন রোগ বা ALS

পেশী নাড়ানো যায় না, আস্তে আস্তে শরীর দুর্বল হতে থাকে, শারীরিকভাবে অথর্ব হয়ে পড়ে রোগী, কথা বলা অসম্ভব হয়ে যায়, খাবার গেলা যায় না, আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসও আটকে যেতে থাকে – কারণ এই রোগে পেশী নাড়ানোর জন্য যে নিউরনগুলো দায়ী, সেগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে আস্তে আস্তে। রোগের নাম মোটর নিউরন রোগ বা Amyotrophic lateral sclerosis (ALS). এই রোগে আক্রান্ত রোগী মারা পড়ে কয়েক বছরের মধ্যেই। আর সেই রোগে স্টিফেন হকিং আক্রান্ত হলেন মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৬৩ সালে। ডাক্তাররা বললো, হাতে আর দু বছরের মত সময় আছে। কোনো কোনো ডাক্তার বললো, ২৫ বছর পর্যন্ত বাঁচবেন না হকিং।

এটা জানার পর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়লেন তিনি, পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইলেন। ডাক্তাররা বললো, “ব্যস্ত থাকো, কিছু একটা নিয়ে লেগে থাকো। পড়াশোনাটা ছেড়ো না”। তার সুপারভাইজার ডেনিস সিয়ামাও বললেন, “এসো, আমি জানি, তুমি পারবে”। সবচেয়ে বড় খুঁটি হয়ে পাশে দাঁড়ালো সদ্য প্রেমিকা জেইন ওয়াইল্ড। বললো, “চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি”।

হকিং সেই সময়ের কথা রোমন্থন করে বলেছিলেন, “আমাদের বাগদান (এঙ্গেইজমেন্ট) আমাকে বেঁচে থাকার রসদ যুগিয়েছিলো”। ১৯৬৫ সালে দুজন বিয়েও করে ফেললেন।

 

 

মহাবিশ্বতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা

 

ঠিকমত কলমটাও ধরতে পারতেন না তিনি, যখন আবার গবেষণায় ফিরেছিলেন। তখনো তার ডক্টরাল থিসিসের বিষয় ঠিক হয়নি। তখন তিনি একটা বিষয়ে আগ্রহ খুঁজে পেলেন। রজার পেনরোজ তখন বেশ বিখ্যাত গবেষক ছিলেন। কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে তিনি চমৎকার কিছু কাজ করেছিলেন। বলেছিলেন, কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে নাকি স্থান-কালের অনন্যতা আছে। সহজ ভাষায়, এটার কেন্দ্রে গিয়ে স্থান আর কাল এমনভাবে অবস্থান করে যেন এটা অসীম, কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা জায়গায়। অর্থাৎ, সেখানে সময় যেন থেমে আছে মহাকর্ষের টানে, আর একই টানে স্থানও বেঁকে গিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে গেছে ধারণার অতীত একটা অবস্থানে। হকিং ভাবলেন, একই কাহিনী যদি গোটা মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়, তাহলে কেমন হয়?

জর্জ লেমিত্রে আর এডুইন হাবলের কল্যাণে বৃহৎ বিস্ফোরণ তত্ত্ব ততদিনে অনেক জনপ্রিয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনপ্রিয়তার কথা না হয় আর নাই বললাম। এগুলোকে ভিত্তি হিসেবে ধরে তিনি তার থিসিস লেখা শুরু করলেন ১৯৬৫ সালে, Properties of extending universe অথবা “প্রসারণশীল মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলো”। ১৯৬৬ সালে সেটাকে অনুমোদন দেয়া হলো। পেনরোজ স্বয়ং তার থিসিস কমিটিতে ছিলেন। আমার মনে হয় না, ডেনিস তার পাশে খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে না থাকলে এত কিছু সম্ভব হতো। পিএইচডি জীবনে সুপারভাইজারই সবচেয়ে বড় কথা। ঐ অবস্থায় সুপারভাইজার যদি বলতেন, “আমি কোনো সাহায্য করতে পারবো না”, তাহলে সেই থিসিস কখনো আলোর মুখ দেখতো না।

সেই সময়টাতে চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না তার। বাকি জীবনটা হুইলচেয়ারেই কাটাতে হবে তাকে।

কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণা + হকিং বিকিরণ + কৃষ্ণগহ্বর তথ্য বৈপরীত্য

পিএইচডি শেষে তিনি কেম্ব্রিজে পেনরোজের সাথেই কাজ শুরু করলেন। ১৯৭০ সালে পেনরোজ এবং তিনি মিলে প্রমাণ করে দেখালেন যে আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড কোনো এক অনন্যতা থেকেই শুরু হয়েছে। একই বছরে তিনি কৃষ্ণগহ্বর নিয়েও আরো বিস্তৃত কাজ শুরু করলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন যে, কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনাদিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন (যেখানে ঢুকে গেলে আর মুক্তি নেই, গহ্বর আপনাকে শুষে নেবেই, সেটা) সময়ের সাথে ছোটো হয় না। অন্য গবেষকদের সাথে মিলে কৃষ্ণগহ্বরের ক্রিয়াকৌশল নিয়ে চারটা নীতি উত্থাপন করলেন ১৯৭০ সালে। ঘটনা দিগন্ত ছোটো না হওয়ার বৈশিষ্ট্যটা রাখলেন দ্বিতীয়তে। ১৯৭৩ সালে জর্জ এলিসের সাথে যুগ্মলেখক হিসেবে তিনি প্রথম বই প্রকাশ করলেন। নাম – The Large Scale Structure of Space-Time.

একই বছরে তিনি মহাবিরক্ত হয়ে খেয়াল করলেন যে কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে তার দেয়া দ্বিতীয় নীতিটা ভুল। কারণ কিছু রাশিয়ান গবেষকরা দেখিয়েছিলো যে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে ঘূর্ণনরত কৃষ্ণগহ্বর থেকে কণা নির্গত হবার কথা। হকিং গবেষণা করে দেখালেন যে, কাহিনী সত্য। ১৯৭৪ সালে তিনি বললেন, “কৃষ্ণগহ্বর থেকে বিকিরণ হয়, এবং এটা ততদিন চলবে, যতদিন এটার শক্তি শেষ না হয়, যতদিন এটা বিকিরণ করতে করতে উবে না যায়।” এই বিকিরণকে এখন হকিং বিকিরণ বা Hawking Radiation বলা হয়।

১৯৮১ সালে তিনি প্রস্তাব করেন যে, বিকিরণ করতে করতে যখন কৃষ্ণগহ্বর উবে যায়, তখন এর ভেতরের তথ্যগুলোও হারিয়ে যায়। কিন্তু তথ্য তো কখনো হারিয়ে যায় না। তাই, এটা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞান জগতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া (পড়ুন, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা-সমালোচনা) শুরু হয়ে যায়। তথ্যসংক্রান্ত এই বৈপরীত্যের নাম Blackhole Information Paradox.

বাকশক্তি হারিয়ে ফেলা

১৯৮৫ সাল। হকিং তখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে, CERN এ গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। ভয়াবহ শারীরিক অবস্থা হয়েছিলো তার। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিলো। যেহেতু রোগী কোমায় এবং তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ, তাই ডাক্তাররা তার স্ত্রী জেইনকে জিজ্ঞেস করলো, লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হবে কিনা। এই নারীর প্রচণ্ড মনোবলে হকিং সেই যাত্রায় বেঁচে ফিরে এসেছিলেন। জেইন হকিংকে কেম্ব্রিজে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সংক্রমণ ঠেকানো হয়। কিন্তু তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। তাই, হকিং এর শ্বাসনালী কেটে সেখানে টিউব বসানো হয়। ALS এর জন্য আগে এমনিতেই তার কথা জড়িয়ে যেতো, এবার তিনি সম্পূর্ণরুপে বাকশক্তি হারালেন।

প্রথমে কিছুদিন তিনি বানান কার্ড ব্যবহার করে যোগাযোগ করতেন। তাকে একটা একটা অক্ষর দেখানো হতো, তিনি যেটা বলতে চাইতেন, সেটাতে এসে থামলে ভ্রু উঁচু করতেন। পরবর্তীতে হকিং এর এক সহযোগী পদার্থবিদ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা কোম্পানি Words Plus এ যোগাযোগ করলেন। এই কোম্পানি কম্পিউটার আর হাতের মধ্যে রাখা ক্লিকার ব্যবহার করে শব্দ আর বাক্য বানানোর মত সফটওয়্যার প্রযুক্তি বানিয়েছিলো। সেখানকার সিইও ওয়াল্টার ওয়োল্টজকে মার্টিন কিং বললেন, “এটা দিয়ে কি ALS এ আক্রান্ত ইংরেজ এক প্রফেসরকে সাহায্য করা যাবে?”

ওয়াল্টার সাহেব সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি স্টিফেন হকিং এর কথা বলছেন?”

কিং বললেন, “অনুমতি ছাড়া তার নামটা বলা যাবে না”।

পরের দিন অবশ্য তিনি ওয়াল্টারকে নিশ্চিত করেছিলেন যে এটা হকিং এর জন্যেই। ওয়াল্টার ALS এ আক্রান্ত শ্বাশুড়ির জন্য এটা বানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, “যা যা দরকার, সবই পাঠিয়ে দেবো।”

এই সফটওয়্যারটাকে একটা ভয়েস সিনথেসাইজারের সাথে যুক্ত করে দিয়েছিলো Speech Plus নামের একটা কোম্পানি। এরপর থেকে মিনিটে পনেরোটার মত শব্দ বলতে পারতেন তিনি।

“কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” প্রকাশ

১৯৮২ সাল, ততদিনে হকিং এর তিন সন্তান খানিকটা বড় হয়ে গেছে। টাকাপয়সার কিছুটা টানাটানি শুরু হয়েছিলো। তিনি ঠিক করলেন, সর্বসাধারণের জন্য সাধারণ ভাষায় একটা বই লিখবেন। বইটার প্রথম খসড়া প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলো ১৯৮৪ সালেই, বাকশক্তি হারানোর এক বছর আগে। কিন্তু তার প্রকাশকের কাছে বইটা কঠিন মনে হওয়ায় (মানুষ বুঝবে না মনে হওয়ায়) আরো সহজ ভাষা ব্যবহার করতে বলেছিলেন।

সিনথেসাইজার দিয়ে কথা বলতে পারার সাথে সাথেই তিনি সেই কাজটা শুরু করলেন। তিনি যতই সহজ করেন, প্রকাশক সন্তুষ্ট হন না। দিন যায়, প্রকাশক বলতে থাকে, “এই জায়গাটা আরেকটু সহজ করো”। হকিং এর জন্য একই জিনিস বারবার দেখা আর লেখাটা খুবই কষ্টের হয়ে উঠছিলো। ব্যাপারটাকে তিনি সময়ের অপচয় বলে মনে করতেন। কিন্তু প্রকাশক পেছনে পড়েছিলো। অবশেষে ১৯৮৮ সালে বইটা প্রকাশিত হলো, প্রথম সংস্করণে ভূমিকা লিখে দিলেন খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। বইটা ধুম মাচিয়ে দিলো সাথে সাথেই। এতদিনে প্রায় কোটির ওপরে কপি বিক্রি হয়ে গেছে।

ডিভোর্স, বিয়ে, এবং ডিভোর্স

বলতে গেলে ঐ সময়েই তিনি রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে যান। আর হ্যাঁ, টাকাপয়সার সমস্যা আর কোনোদিন দেখতে হয়নি তাকে বা তার পরিবারকে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। দাম্পত্য জীবনে বেশ অসুখী ছিলেন তিনি। তাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিলো ঠিকই, কিন্তু একসাথে থাকা আর সম্ভব হচ্ছিলো না।

১৯৯০ সালে, হকিং তার এক নার্সের সাথে থাকা শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে জেইনের সাথে তার ডিভোর্স হয়ে যায়। আর সেই নার্সকে বিয়ে করেন হকিং। ২০০৬ সালের দিকে সেই সম্পর্কেরও ইতি টানেন তিনি। জেইনের সাথে পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। জেইন আগে একটা বই লিখেছিলেন, Music to Move the Stars. ২০০৭ সালে সেটার একটা পরিমার্জিত রুপ বের করেন, Travelling to Infinity: My Life with Stephen.

স্বাস্থ্যের অবনতি

আস্তে আস্তে যে আঙুল দিয়ে ক্লিকার ব্যবহার করতেন, সেটাও অসাড় হয়ে যেতে লাগলো। ২০০৮ সালের দিকে, তার গ্র্যাজুয়েট এসিস্ট্যান্ট চশমায় ইনফ্রারেড লাগিয়ে গালের পেশীর নড়াচড়া দিয়ে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করলো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাও দুর্বল হয়ে যেতে লাগলো। ২০১১ এর দিকে, মিনিটে ১৫টার জায়গায় ২টা শব্দে এসে ঠেকলো তার যোগাযোগের গতি। তিনি ইন্টেলকে চিঠি লিখলেন, ওরা কোনো সাহায্য করতে পারবে কিনা জানতে চেয়ে। ইন্টেল একটা টিম পাঠালো, যাতে কম্পিউটার-হিউম্যান ইন্টারএকশন ডিজাইনার ছিলেন পিট ডেনম্যান। কাহিনীটা অদ্ভুত!

পিট ডেনম্যান নিজেও হুইলচেয়ার ব্যবহার করতেন। ঘাড় ভেঙে যাওয়ার পর যখন তাকে হুইলচেয়ারে আটকে পড়তে হয়েছিলো, তখন তার মা তাকে “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” বইটা দিয়ে বলেছিলেন, “হুইলচেয়ারে বসেও মানুষ চমৎকার সব কাজ করতে পারে”। স্টিফেন হকিং ছিলেন পিট ডেনম্যানের প্রেরণা; আর তার প্রেরণার মানুষটা তাদের সাথে ৩০টা শব্দ বলতে ২০ মিনিট নিয়েছিলেন।

অনেক সাধনার পরে তারা এমন এক ব্যবস্থা করলেন যাতে তাকে কোনো শব্দ টাইপ না করতে হয়, বরং তিনি যাতে দেখানো শব্দগুলো থেকে দ্রত বাছাই করতে পারেন, তার গালের পেশী দিয়েই। বারবার তারা সেটার ইন্টারফেস পাল্টেছেন, যাতে তিনি অপেক্ষাকৃত দ্রুত শব্দ বাছাই করতে পারেন।

নিকটতম নক্ষত্রে মহাকাশযান পাঠানোর প্রজেক্ট

বিস্তারিত – বিজ্ঞানযাত্রার এই প্রবন্ধে

রাশিয়ান পদার্থবিদ+ব্যবসায়ী ইউরি মিলনার আর জুলিয়া মিলনার মিলে মহাকাশ গবেষণা ব্রেকথ্রু ইনিশিয়েটিভ নামক একটি সংস্থা স্থাপন করেছিলেন ২০১৫ সালে। এই প্রকল্পের একটা অংশ হচ্ছে নিকটতম নক্ষত্রে মহাকাশযান পাঠানোর জন্য। নিউ ইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে জ্যোতিঃপদার্থবিদ স্টিফেন হকিং আর ইউরি মিলনার ২০১৬ সালের এপ্রিলের ১২ তারিখে ব্রেকথ্রু স্টারশটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মার্ক জুকারবার্গও তাদের এই প্রচেষ্টার, অর্থাৎ Breakthrough Starshot এর বোর্ডে যুক্ত হয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। এই প্রকল্পের অধীনে খুব কম ওজনবিশিষ্ট একটা মহাকাশযান তৈরি করা হবে। এর ওজন হতে পারে এক গ্রাম। আর এটার সাথে লাগানো থাকবে lightsail. Lightsail হচ্ছে এমন একটা পাল যেটা আলোর ধাক্কায় চলে। আলোকপাল নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলাম যখন প্ল্যানেটারি সোসাইটি মহাকাশে সফলতার সাথে (২০১৫ সালে) তাদের প্রথম লাইটসেইল পাঠিয়েছিলো।

 

স্টিফেন হকিং এর ধর্মবিশ্বাস

আইনস্টাইনের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে অনেকে টানাহ্যাঁচড়া করে। আইনস্টাইন প্রচলিত কোনো ধর্মের ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলেও বারংবার মহাবিশ্বের ঐকতানকে ঈশ্বরের নাম দিয়ে উক্তি দিয়েছেন। হকিং এর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে টানাটানি করার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য সেটা সাম্প্রতিক সময়ে। একসময় তিনিও উদাহরণ দিতে গিয়ে ঈশ্বর শব্দটা ব্যবহার করেছেন। কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে তিনি লিখেছেন, “যদি কোনোদিন আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব আবিষ্কার করতে পারি, সেটা হবে মানুষের যুক্তিক্ষমতার সর্বোচ্চ বিজয়- আর সেদিন আমরা ঈশ্বরের মন বুঝতে পারবো”। কেউ টানাটানি করতে চাইলে এই লাইনটা নিয়ে করতে পারে; যদিও একই বইতে তিনি লিখে দিয়েছিলেন, “মহাবিশ্বের উৎপত্তি বর্ণনা করার জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই”। ২০১৪ সালে এটাকে আরো খোলাসা করে বলেছেন, “ঈশ্বরের মন বুঝতে পারা বলতে আমি বুঝিয়েছি, যদি কোনো ঈশ্বর থেকে থাকে–যা আসলে নেই–তাহলে সেই ঈশ্বরের যা যা জানার কথা, আমরা তাই জানবো। আমি নাস্তিক”।

হকিং এও বলেছেন, “ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। ধর্মের ভিত্তি কর্তৃত্ব ফলানোতে, আর বিজ্ঞানের ভিত্তি পর্যবেক্ষণ আর যুক্তিতে। জয় হবে বিজ্ঞানেরই, কারণ এটা কার্যকর”। স্বর্গ বা পরকালকে তিনি রুপকথার গল্প বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের জীবন একটাই। এই এক জীবনেই ব্রহ্মাণ্ডের মহান নকশার কদর করতে হবে। আর সেই জীবন পেয়েছি বলে আমি কৃতজ্ঞ।”

তাকে নিয়ে বানানো মুভি, Theory of Everything

হকিং এর প্রথম স্ত্রীর লেখা বই Travelling to Infinity: My Life with Stephen এর কথা উল্লেখ করেছিলাম একটু আগে। সেটা দিয়ে একটা সিনেমা বানানো হয়েছিলো ২০১৪ সালে, Theory of everything. স্টিফেন সেই সিনেমাটা দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। হকিং এর ভূমিকায় এডি রেডমেইনকে দেখে তিনি মনে করেছিলেন যে তিনি যেন নিজেকেই দেখতে পাচ্ছেন।

সিনেমাটা আসলেই চমৎকার! আর এডি রেডমেইন একটা অস্কারও জিতে নিয়েছেন হকিং এর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য।

 

মৃত্যু

তিনি জন্মেছিলেন গ্যালিলিওর মৃত্যুবার্ষিকীতে। আর মৃত্যুবরণ করলেন আইনস্টাইনের জন্মবার্ষিকীতে। ২০১৮ সালের ১৪ই মার্চ, স্টিফেন হকিং ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজে মৃত্যুবরণ করেন।

তার মৃত্যুর আগে কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতো, “এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী মানুষটা কে?” – তাহলে সহজেই উত্তর দিতে পারতাম। কিন্তু এখন আর পারছি না। তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সাথে সাথে চোখ ঘোলা হয়ে গিয়েছিলো। তার স্মৃতিতে লিখেছিলাম –

প্রিয় স্টিফেন হকিং,
আমি আইনস্টাইনের সময়ে এই পৃথিবীতে ছিলাম না। যতদিন কার্ল সেগান বেঁচে ছিলেন, ততদিন ওনাকেও চিনতাম না। ফাইনম্যানের সময়েও না, নিউটনের সময়েও না। আমি এই পৃথিবীটা সজ্ঞানে ভাগাভাগি করেছি আপনার সাথে। আপনি আমাদের সময়ের সবচেয়ে মেধাবী পদার্থবিদ ছিলেন। সারাজীবন ব্যাপক পরিশ্রম করে আজ আপনি চিরবিদায় নিলেন।

আপনার এতদিন বেঁচে থাকার কথা ছিলো না। ডাক্তাররা দু বছরের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন সেই কত বছর আগে। মোটর নিউরন ডিজিজ এর শিকার হয়ে হুইলচেয়ারে আটকে পড়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেই পুরো দুনিয়াটাকে জয় করে নিয়েছিলেন আপনি। Even from a wheelchair, you achieved a lot, more than a lot of us combined.

হকিং সাহেব, আপনার জীবন এবং কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রইলো। Thank you for coming and living into this world.

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz