স্টারলিং ইঞ্জিনঃ অতীতের আবিষ্কারে ভবিষ্যতের সমাধান

মে ২, ২০১৮, নাসা মহাকাশে ব্যবহার উপযোগী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সফল পরীক্ষার ঘোষণা করে। এই পারমাণবিক চুল্লী ভবিষ্যত মহাকাশ যাত্রায় শক্তির যোগান দেবে। এই ব্যবস্থাটির একটি বিশেষত্ব রয়েছে। প্রচলিত বয়লার-টার্বাইন পদ্ধতি ব্যবহার না করে এখানে স্টারলিং ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০ বছর আগে আবিষ্কৃত এই প্রযুক্তি ভবিষ্যত মহাকাশযাত্রায় ভূমিকা রাখবে।

    কম তাপমাত্রায় চালিত স্টারলিং ইঞ্জিন

একটুখানি ইতিহাস

স্কটিশ প্রকৌশলী রবার্ট স্টারলিং স্টারলিং ইঞ্জিনের আবিষ্কারক। ইঞ্জিনের নামটাও তার নাম থেকেই এসেছে। শিল্প বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন। আর বাষ্পীয় ইঞ্জিনের চালিকাশক্তি ছিল বয়লার। আমাদের দেশে মাঝে মাঝে বিভিন্ন কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ হয়, সেসময় ইংল্যান্ডেও বয়লার বিস্ফোরণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। স্টারলিং তাই এমন ইঞ্জিনের কথা ভাবলেন যেটাতে বয়লারের প্রয়োজন হবে না। ১৮১৬ সালে স্টারলিং তার ইঞ্জিন পেটেন্ট করেন। কিন্তু সে সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার জন্য এটি তেমন সফলতা পায়নি। এছাড়া বয়লারের উন্নতি, পেট্রল ইঞ্জিন, ডিজেল ইঞ্জিন এবং ইলেকট্রিক মোটরের আবিষ্কার এর অগ্রযাত্রা একেরকম থামিয়ে দেয়। তাহলে এই ইঞ্জিন ২১ শতকে আবার কিভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে? এটা জানতে আমাদের স্টারলিং ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালী জানতে হবে।

কার্যপ্রণালী

ইঞ্জিন সাধারণত দুধরনের হয়ে থাকে- অন্তর্দহ ইঞ্জিন এবং বহির্দহ ইঞ্জিন। অন্তর্দহ ইঞ্জিনে ইঞ্জিনের ভিতরে জ্বালানি পুড়ে তাপ উৎপন্ন হয়। পেট্রল ইঞ্জিন, ডিজেল ইঞ্জিন, জেট ইঞ্জিন এ ধরনের ইঞ্জিন। বহির্দহ ইঞ্জিনে জ্বালানী ইঞ্জিনের বাইরে পুড়ে। স্টারলিং ইঞ্জিন এক ধরনের বহির্দহ ইঞ্জিন।

প্রথমে দেখে নেই স্টারলিং ইঞ্জিনে কী কী থাকে। স্টারলিং ইঞ্জিনে সাধারণত দুটি চেম্বার বা সিলিন্ডার থাকে। দুটি  স্টারলিং ইঞ্জিনের সিলিন্ডারের ভিতরে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রবাহী পদার্থ(সাধারণত গ্যাস) থাকে। একটি সিলিন্ডার জ্বালানি থেকে উৎপন্ন তাপ গ্রহণ (চিত্রের বড় সিলিন্ডার) করে। অন্যটির (চিত্রের ছোট সিলিন্ডার) সাথে কুলিং সিস্টেম যুক্ত থাকে, যা গরম গ্যাসকে ঠাণ্ডা করে। দুটি সিলিন্ডারের মধ্যে গ্যাস প্রবাহের সংযোগ থাকে।

একটি ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল পিস্টন। স্টারলিং ইঞ্জিনে দুটি পিস্টন থাকে। দুটি পিস্টন একটি ক্রাংক মেকানিজমের  মাধ্যমে যুক্ত থাকে।

এবার আসি মূল কার্যপ্রণালীতে। গরম সিলিন্ডারের (চিত্রের বড় সিলিন্ডার) তাপ গ্রহণের ফলে ভিতরের গ্যাসের চাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে সিলিন্ডারের ভিতরের পিস্টন প্রসারিত হয়। একই সময়ে ঠাণ্ডা সিলিন্ডারের (চিত্রের ছোট সিলিন্ডার) পিস্টন সংকুচিত অবস্থায় থাকে, ফলে গ্যাস তাপ গ্রহণের সুযোগ পায়। এরপর ঠান্ডা সিলিন্ডারের পিস্টন প্রসারিত হয়ে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌছে , অন্যদিকে গরম সিলিন্ডারের পিস্টন সংকুচিত হয়। গরম সিলিন্ডারের পিস্টন যখন সর্বোচ্চ সংকুচিত অবস্থায় থাকে তখন ঠাণ্ডা সিলিন্ডারের পিস্টন সংকুচিত হতে শুরু করে। এর ফলে প্রায় সম্পূর্ণ গ্যাসই তাপ বর্জন করে । এর পরের ধাপে ঠাণ্ডা সিলিন্ডারের পিস্টন সংকুচিত হয়, ফলে গ্যাস গরম সিলিন্ডারে প্রবেশ করে আবার তাপ গ্রহণ শুরু করে। এভাবে চক্রের পুনারাবৃত্তি চলতে থাকে।

ইঞ্জিনের জ্বালানি

ইঞ্জিনের কার্যপ্রণালী নিয়ে কথা বললেও আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করিনি। ইঞ্জিনটা চলছে কী দিয়ে? এটা চালাতে কী ধরনের জ্বালানি লাগে?

উত্তরটা হলো কোনো নির্দিষ্ট জ্বালানি নয়। স্টারলিং ইঞ্জিনের জন্য এর দুটো সিলিন্ডারে মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য রাখা প্রয়োজন। ফলে স্টারলিং ইঞ্জিন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি বা তাপ উৎসের তাপ দিয়ে চালানো যায়। প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি পারমাণবিক চুল্লী থেকে উৎপন্ন তাপ, ভূতাপ (geothermal), বর্জ্য এমনকি সৌরশক্তি দিয়ে এই ইঞ্জিন চালানো সম্ভব।

ব্যবহার  

পারমানবিক চুল্লী থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্টারলিং ইঞ্জিনের ব্যবহার আমরা প্রথমেই দেখেছি। প্রচলিত পদ্ধতিতে বয়লার প্রয়োজন যা বাষ্প তৈরি করে, এই বাষ্প টার্বাইনকে ঘোরায়। স্টারলিং ইঞ্জিন বয়লারে পানি বাষ্পীভূত করার ঝামেলা নেই, এটি সরাসরি তাপকে কাজে লাগাই। তাপ মহাকাশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এটি ব্যবহৃত হবে।

কিছু কিছু ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনে স্টারলিং ইঞ্জিন ব্যবহৃত হচ্ছে। ডিজেল চালিত সাবমেরিনগুলো পানির নিচে চলাচলের সময় ব্যাটারির ওপর নির্ভর করে। এই ব্যাটারিগুলো চার্জ করার জন্য সাবমেরিনকে পানির উপরে উঠে আসতে হয়। স্টারলিং ইঞ্জিন থাকার ফলে সাবমেরিন পানির নিচেই ব্যাটারি চার্জ করতে পারে। তরল অক্সিজেন এর সাহায্যে ডিজেল পুড়িয়ে পানির নিচেও স্টারলিং ইঞ্জিন চলতে পারে। স্টারলিং ইঞ্জিন সৌরশক্তির মাধ্যমে চলতে পারে, তাই স্টারলিং ইঞ্জিন ব্যবহার করে সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তবে এটি খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না।

ভবিষ্যৎ

সারা পৃথিবীতেই জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে রয়েছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। ২০০ বছর আগে স্টারলিং ইঞ্জিন ব্যবহৃত হলেও তা আজ নতুন ভাবে আমাদের ভাবাচ্ছে। ভবিষ্যতে  পারমাণবিক, সৌর এবং ভূতাপীয় শক্তি ব্যবহারে স্টারলিং ইঞ্জিন নতুন দিক উন্মোচন করবে।

তথ্যসূত্র 

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Stirling_engine

২. http://www.stirlingbuilder.com/how-stirling-engines-work

৩.  নাসার অফিসিয়াল ঘোষণা  এখানে 

আরো পড়ুন 

১. https://www.scientificamerican.com/article/are-engines-the-future-of-solar-power/

২. সাবমেরিনে ব্যাবহার নিয়ে পড়ুন এখানে

Comments

Jilan Hasan

একজন বিজ্ঞানযাত্রী। প্রকৃতির বিশাল পাঠশালার একজন ছাত্র।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x