ওয়াইনের কান্না (Tears of Wine!)

অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের কথা তো আমরা সবাই জানি। আমার এক বন্ধু একবার মদ্যপান করে হঠাৎ করে হু হু কান্না শুরু করে দিল, পুরোনো প্রেমের ব্যথার চরম বিস্ফোরণ! তো, কথা হচ্ছে, মদ খেয়ে মানুষ না হয় কান্নাকাটি করতে পারে, কিন্তু মদেরও যে কান্না আছে সেটা কি আমরা জানি? মজার বিষয় হচ্ছে, এলকোহল মিশ্রিত পানীয়র গ্লাসে এক ধরনের অদ্ভুত ঘটনা দেখা যায়, যাকে প্রচলিত ভাষায় বলা হয় ‘Tears of Wine’, আর এই ঘটনাকে পদার্থিবিদ্যার ভাষায় বলা হয় ‘মারাংগনি ইফেক্ট’ (Marangoni effect) বামারাংগনি কনভেকশন’ (Marangoni Convection)। আর এই মারাংগনি ইফেক্টের প্রয়োগ আছে সিলিকন ওয়েফারের ড্রাইং প্রসেসে। তাই সেমিকন্ডাক্টর ম্যাটেরিয়াল নির্ভর যন্ত্র/যন্ত্রাংশ উৎপাদনে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

800px-Wine_legs_shadow

ওয়াইন গ্লাসে দেখা যায় যে সবসময়ই ওয়াইনের উপরিতলের বেশ উপর থেকে ওয়াইনের ফোঁটা গ্লাস বেয়ে বেয়ে নিচে পড়ছে। অথচ ফিজিকালি উপরে তো ওয়াইন থাকারই কথা না! তাহলে এই ওয়াইন আসছে কোথা থেকে? বিষয়টা আরও ভাল করে প্রত্যক্ষ করার জন্য এই ভিডিও দেখে নেয়া যেতে পারে…

মূল কথা শুরু করার আগে একবার দুইটা ভাষাতেই জরুরি শব্দগুলো জেনে নিই। যে যেটা ভালো পারেন, সেটা দিয়ে বুঝতে পারবেন। তবে নিচের বক্তব্যে বাংলাগুলোই ব্যবহার করবো।

পৃষ্ঠটান = Surface tension, কৈশিক প্রভাব = Capillary effect, ভর পরিবহন = Mass Transfer, ব্যাপন = Diffusion, বেগ = Velocity/ Bulk Velocity, পরিচলন = Convection, সমসত্ত্ব = homogeneous, অসমসত্ত্ব = heterogeneous/in-homogeneous, বাষ্পীবভন = Evaporation, স্থানান্তর প্রক্রিয়া = Transfer Phenomena,

এবার এটার ব্যখ্যা করার চেষ্টা করি সহজ ভাষায়। আমরা জানি যে পৃষ্ঠটানের কারণে গ্লাসে রাখা কোনো তরল গ্লাসের গায়ের সাথে লেগে সামান্য উপরে উঠে থাকে, যাকে আমরা বলি কৈশিক প্রভাব। আর ভর পরিবহনের স্বাভাবিক সূত্র অনুযায়ী আমরা জানি অধিকতর ঘনত্বের অঞ্চল হতে নিম্ন ঘনত্বের অঞ্চলে বস্তু বা বস্তুকণা প্রবাহিত হয়। ভর পরিবহনের এই পদ্ধতিটিকে আমরা বলি ব্যাপন। ভর পরিবহন শুধুমাত্র যে ঘনত্বের ভিন্নতার কারণেই হতে পারে এমন নয়, এটি পরিচলনের মাধ্যমেও হতে পারে। ব্যাপন হচ্ছে একটি কণা ঘনত্বের ভিন্নতার জন্য এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে প্রবাহিত হয়, এখন আপনি যদি ঐ কণাটাকে এমন একটা প্রবাহের মধ্যে রাখেন যে প্রবাহের নিজেরও একটা বেগ আছে তাহলে ঘনত্বের ভিন্নতার পাশাপাশি সে প্রবাহ দ্বারাও কণাটি আরও দ্রুত প্রবাহিত হবে। অর্থাৎ, সে নিজে যাবে ঘনত্বের ভিন্নতার কারণে, পাশাপাশি মূল প্রবাহের কারণে তার যাওয়াটা আরও তরান্বিত হবে। এটাকেই পরিচলন বলে। একই ভাবে, কোনো মিশ্রণ যদি অসমসত্ত্ব হয়, তাহলে দেখা যাবে মিশ্রণের একে অঞ্চলের ধর্ম একেক রকম হয়ে গেছে। এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হচ্ছে ‘পৃষ্ঠটান’। সাধারণত দেখা যায়, একটি অসমসত্ত্ব মিশ্রণে তরল পদার্থ নিম্ন পৃষ্ঠটানের অঞ্চল হতে অধিক পৃষ্ঠটানের দিকে প্রবাহিত হয়।

ওয়াইনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলকোহল থাকে এবং এই মিশ্রণটি সমসত্ত্ব। এখন গ্লাসে ঢালার পর পৃষ্ঠটানের কারণে ওয়াইন উপরিতলের পরিধি বরাবর গ্লাসের গা বরাবর একটু লেগে উঠে থাকবে (কৈশিক প্রভাব)। এই উপরে উঠে থাকা অংশ থেকে এলকোহল এবং পানির স্বতঃবাষ্পীভবন হতে থাকে, কিন্তু এলকোহলের বাষ্পচাপ বেশি হওয়ার কারণে এটি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। ফলে মুহূর্তের মধ্যে সেখানে স্থানীয়ভাবে একটি অসমসত্ত্ব মিশ্রণের সৃষ্টি হয় যাতে পানির অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি। এলকোহলের পৃষ্ঠটান পানির চেয়ে কম, বা অন্যভাবে বলা যায়, সৃষ্ট অসমসত্ব মিশ্রণে এলকোহলের অনুপাত কম হওয়ার কারণে স্থানীয়ভাবে বেশি পৃষ্ঠটানের একটা অঞ্চল তৈরি হয়।

এর ফলাফল দুটি।

১) অতিরিক্ত পৃষ্ঠটানের কারণে তরল গ্লাসের গা বেয়ে আরও অনেক বেশি উপরে উঠে যায়।

২)স্থানীয়ভাবে এলকোহলের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কারণে আশে পাশের অধিক ঘনত্বের এলাকা থেকে এলকোহল এই স্থানে আসা শুরু করে। অথবা বলা যায় – নিম্ন পৃষ্ঠটানের এলাকা হতে অধিক পৃষ্ঠটানের অঞ্চলে তরল প্রবাহিত হয়।

ফলে একটা চক্র তৈরি হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে অধিক পৃষ্ঠটানের কারণে তরল গ্লাসের গা বেয়ে অনেক উপরে উঠে যায় এবং একসময় নিজের ওজনের ভারে গড়িয়ে পড়ে। আর এটাকেই কাছ থেকে দেখলে অশ্রুজলের মত মনে হয় বলে এর নাম দেয়া হয়েছে Tears of Wine!

marangoni_wine_sigma

এখানে সিগমা হচ্ছে পৃষ্ঠটান

এলকোহল যেহেতু ঘনত্বের ভিন্নতার কারণে ঐ অঞ্চলে আসতেই থাকে, ফলে এটা চক্রাকারে চলতে থাকে। এক কথায়, এলকোহল আসবে, এলকোহল বাষ্পীভুত হবে, পৃষ্ঠটান বাড়বে,তরল গ্লাসের গা বেয়ে অনেক উপরে উঠে যাবে, এরপর নিজের ভারে আবার গড়িয়ে পড়ে যাবে। এই মারাংগনি ইফেক্টের সবচেয়ে অধিক প্রচলিত ব্যবহার হয় সেমিকন্ডাক্টর ম্যাটেরিয়াল তৈরির সময় শুষ্ককরণের কাজে। যেহেতু এটি মূলত একটি পদার্থের স্থানান্তর প্রক্রিয়া, এর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে মাইক্রো লেভেলে কোনো সিস্টেমকে পানিশূন্য করা সম্ভব। তাপীয়-বৈদ্যুতিক শীতলীকরণের মধ্যেও এর প্রয়োগ আছে।

এখন একটি মজার প্রশ্ন করা যেতে পারে। যদি মাধ্যাকর্ষণ বল না থাকে তাহলে তরল কি আর মিশ্রণে ফেরত আসবে? অবশ্যই না, কারণ তখন তার কোনো ওজন থাকবে না, কাজেই পৃষ্ঠটানকে ব্যালান্স করার জন্য অন্য কোন বলই তো সিস্টেমে থাকবে না। তাহলে কি গ্লাসের দেয়াল বরাবর ওয়াইন উপরে উঠতেই থাকবে? তাত্ত্বিকভাবে উত্তর হচ্ছে ‘হ্যাঁ’, তবে এখানে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক আছে (যেমন, মারাংগনি নাম্বার) যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে এটা কিন্তু বিজ্ঞানীদের খুবই কৌতুহলের বিষয় যে মাধ্যাকর্ষণবিহীন জায়গায় এই মারাংগনি প্রভাবের আচরণ কেমন হবে। নাসার একদল বিজ্ঞানী No gravity  বা micro gravity পরিবেশে মারাংগনি ইফেক্ট কেমন আচরণ করে তা নিয়ে গবেষণাও করছেন। এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে নাসার ওয়েবসাইটে

মারাংগনি ইফেক্ট/ টিয়ারস অব ওয়াইন সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ করেন পদার্থবিদ জেমস থমসন। মারাংগনি ইফেক্টের নামকরণ করা হয়েছে ইতালিয় বিজ্ঞানী কার্লো মারাংগনির নাম থেকে, তার পিএইচডি গবেষণায় এর বিস্তারিত তুলে ধরেন ১৮৬৫ সালে। আর এটার পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায় বিজ্ঞানী গিবসের গবেষণায়। এজন্য এটাকে Marangoni-Gibbs effectও বলা হয়ে থাকে।

পাদটীকাঃ ছোটবেলায় আমরা জাফর ইকবাল স্যারের ‘বিজ্ঞানের ১০০ মজার খেলা’ বইতে পড়েছিলা্ম যে, কাগজের পেছনে অল্প একটু সাবান লাগিয়ে দিয়ে পানিতে ছেড়ে দিলে সেটা ধাই করে চলা শুরু করে। এটা কিন্তু মারাংগনি ইফেক্ট এর কারণেই হয়। ছোটবেলার স্মৃতিটা ঝালিয়ে নিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চাইলে এই ভিডিওটা দেখে নিতে পারেন।

তথ্যসূত্র

১) https://www.comsol.com/multiphysics/marangoni-effect

২) https://en.wikipedia.org/wiki/Tears_of_wine

৩) http://www.nasa.gov/mission_pages/station/research/news/marangoni.html

Comments

সুদীপ্ত সাহা

মাঝরাতে মাঝে মাঝে মরিবার হয় বড় সাধ...।।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz