বিজ্ঞান-কল্পগল্প: “ওরা মাংসের তৈরি”

মূল: টেরি বিসন
অনুবাদ: সাজেদুল ওয়াহিদ নিটোল

===::===::===::===::===


“ওরা মাংসের তৈরি”।

“মাংস?”

“হ্যাঁ, মাংস। ওরা মাংসের তৈরি”।

“মাংস?”

“কোনো সন্দেহ নেই। আমরা গ্রহটির ভিন্ন ভিন্ন অংশ থেকে ওদের বেশ কয়েকজনকে আমাদের জরিপ জাহাজে তুলে এনেছি এবং সব ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেছি। ওরা পুরোটাই মাংস।”

“অসম্ভব! তাহলে রেডিও বার্তাগুলো কোত্থেকে আসলো? মহাশূন্যে যেগুলো পাঠানো হয়েছিল?”

“ওরা রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে বার্তা পাঠিয়েছিল, কিন্তু ঐ সংকেতগুলো ওদের কাছ থেকে আসছিল না। সেগুলো এসেছিল কিছু যন্ত্র থেকে।”

“তো, সেই যন্ত্রগুলো কে বানালো? তাদের সাথেই তো আমরা যোগাযোগ করতে চাই।”

“ওরাই যন্ত্রগুলো বানিয়েছে। এটাই তোমাকে বুঝানোর চেষ্টা করছি। মাংসগুলোই যন্ত্র বানিয়েছে।”

“কী হাস্যকর! মাংস কী করে যন্ত্র তৈরি করতে পারে? তুমি আমাকে বুদ্ধিমান মাংসের গপ্পো বিশ্বাস করতে বলছো?”

“আমি বিশ্বাস করতে বলছি না, আমি জানাচ্ছি। এই জীবগুলোই ঐ পুরো অঞ্চলের একমাত্র বুদ্ধিমান প্রজাতি এবং ওরা মাংসের তৈরি।”

“হয়তো ওরা ওরফোলেইদের মতো। এদেরকে তো তুমি চেনো, এরা কার্বন-নির্ভর বুদ্ধিমান জীব যারা জীবনে একটি মাংসীয় পর্যায় পার করে।”

“না। ওরা মাংস হয়েই জন্মে এবং মাংস হয়েই মরে। আমরা ওদেরকে কয়েক প্রজন্ম ধরে পরীক্ষা করেছি, খুব একটা বেশি সময় লাগেনি। মাংসের জীবনকাল কতো- এই ব্যাপারে তোমার কি কোনো ধারণা আছে?”

“জানতে চাইও না, আমায় মাফ করো। আচ্ছা, এমন তো হতে পারে যে- ওরা আংশিক মাংস। অনেকটা হয়তো ওয়েড্ডেলেইদের মতো। মাংসের মাথা কিন্তু ভেতরে একটি ইলেকট্রন প্লাজমার মস্তিষ্ক।”

“না। যেহেতু ওয়েড্ডেলেইদের মতো ওদের মাথাও মাংসের, সেহেতু আমরাও সম্ভাবনাটুকু খতিয়ে দেখেছি। কিন্তু, তোমাকে আগেই বলেছি, আমরা বেশ ভালোমতোই ওদের পরীক্ষা করেছি। মাথার ভেতরেও পুরোটাই মাংস।”

“তাহলে মস্তিষ্ক নেই?”

“আরে, মস্তিষ্ক ঠিকই আছে। শুধু ব্যাপার হলো যে, মস্তিষ্কও মাংসের তৈরি। এটাই তো তোমাকে এতক্ষণ বুঝানোর চেষ্টা করছি।”

“তো… চিন্তাভাবনা করে কী দিয়ে?”

“তুমি ইচ্ছে করে বুঝার চেষ্টা করছো না, তাই না? আমি যা বলছি তা বারবার তুমি এড়িয়ে যাচ্ছো। ঐ মস্তিষ্ক দিয়েই ওরা চিন্তাভাবনা করে। ঐ মাংস দিয়েই।”

“চিন্তাশীল মাংস! তুমি আমাকে চিন্তাশীল মাংসের কথা বিশ্বাস করতে বলছো?”

“হ্যাঁ, চিন্তাশীল মাংস! সচেতন মাংস! স্নেহশীল মাংস! স্বপ্নবান মাংস! পুরো জিনিসটাই মাংস! তুমি কি পুরো চিত্রটা ধরতে পেরেছো নাকি আমাকে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে?”

“হায় ঈশ্বর! তুমি তাহলে সত্যিই সিরিয়াস। ওরা মাংসের তৈরি।”

“যাক, অবশেষে! হ্যাঁ, ওরা আসলেই মাংসের তৈরি। এবং ওদের সময়ের প্রায় একশ’ বছর ধরে ওরা আমাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে আসছিল।”

“হায় ঈশ্বর! তো এই মাংসগুলো কী চায়?”

“প্রথমে ওরা আমাদের সাথে কথা বলতে চায়। ধারণা করি, এরপর হয়তো মহাবিশ্ব অন্বেষণে যেতে চায়, অন্যান্য বুদ্ধিমান জীবের সাথে যোগাযোগ করতে চায়, তথ্য ও তত্ত্ব আদানপ্রদান করতে চায়। এইধরনের স্বাভাবিক ব্যাপারস্যাপার।”

“আমরা মাংসের সাথে কথা বলবো?”

“সেটাই তো ওরা চায়। সেই বার্তাই ওরা রেডিওর মাধ্যমে প্রচার করছে। ‘হ্যালো। কেউ কি আছো? কেউ কি শুনছো?’- এই ধরনের ব্যাপারস্যাপার।”

“ওরা তাহলে সত্যিই কথা বলে। ওরা কি শব্দ, ধারণা ইত্যাদি ব্যবহার করে?”

“অবশ্যই। তবে সবই করে মাংস দিয়ে।”

“তুমি তো সবে বললে যে ওরা রেডিও ব্যবহার করে কথা বলে।”

“তা তো ব্যবহার করেই, কিন্তু সেই রেডিও বার্তায় কী থাকে বলে তোমার ধারণা? মাংসের ধ্বনি। মাংসে মাংসে ঝাপটা দিলে কী ধরনের ধ্বনি সৃষ্টি হয়- তা তো তুমি চেনোই, তাই না? ওরা নিজেদের মাংসে মাংসে ঝাপটা দিয়ে দিয়ে কথা বলে। ওরা এমনকি তাদের মাংসের মধ্য দিয়ে সজোরে বাতাস বের করে গাইতেও পারে।”

“হায় ঈশ্বর! গায়ক মাংস! এতো কিছু একসাথে গ্রহণ করা কঠিন। …. তো, এদের ব্যাপারে তোমার পরামর্শ কী?”

“আনুষ্ঠানিক পরামর্শ? নাকি অনানুষ্ঠানিক?”

“দু’টোই।”

“আনুষ্ঠানিকভাবে, আমাদের কাজ হলো সব ধরনের সংস্কার, ভয়ভীতি কিংবা পক্ষপাত একপাশে সরিয়ে রেখে মহাবিশ্বের এই অংশের যে কোনো বুদ্ধিমান প্রজাতি বা স্বত্বার সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং আমাদের তথ্যকেন্দ্রে ওদের ব্যাপারে তথ্য ঢুকিয়ে নেয়া। কিন্তু আমার অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ হলো: আমরা ওদের সব তথ্য মুছে দিয়ে পুরো ব্যাপারটাই ভুলে যাই।”

“আমি আশা করছিলাম, তুমি এমনটাই বলবে।”

“কথাটা রূঢ় শোনাচ্ছে, কিন্তু সবকিছুর একটা সীমা আছে। আমাদেরকে কি শেষমেশ মাংসের মাংসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে?”

“আমি শতভাগ একমত। কী বলবো আমরা ওদেরকে? ‘হ্যালো, মাংস। কেমন চলছে সবকিছু?’ কিন্তু আমাদের বুদ্ধিটা কি কাজ করবে? এখানে ক’টা গ্রহ নিয়ে যুঝতে হচ্ছে আমাদের?”

“কেবল একটাই। ওরা বিশেষ মাংসের কৌটায় করে অন্য গ্রহে যেতে পারে, কিন্তু সেখানে বাস করতে পারে না। এবং মাংস হওয়ার কারণে, ওরা শুধুমাত্র সি স্পেসের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতে পারে, যা ওদেরকে আলোর গতিসীমার মধ্যে বেঁধে রাখে। যার ফলে, অন্য বুদ্ধিমান জাতির সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনাও খুবই কম। সত্যি বলতে, একেবারেই নগণ্য।”

“তো…আমরা এমন ভাব দেখাবো যেন মহাবিশ্বে আর কেউই নেই?”

“হ্যাঁ, ঠিক তাই।”

“কী নিষ্ঠুর! কিন্তু তুমি নিজেই বলেছো, কে-ই বা মাংসের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইবে? আর যে মাংসগুলোকে জাহাজে তুলে এনে পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের কী হবে? তুমি কি নিশ্চিত যে ওরা সবকিছু ভুলে যাবে?”

“মনে পড়লেই বা কী আসে যায়? তখন পাগল বলেই গণ্য হবে। আমরা ওদের মাথায় ঢুকে ওখানকার মাংসগুলো ঠিকঠাক করে দিয়েছি। আমরা ওদের কাছে এখন কেবলই একটা স্বপ্ন।”

“মাংসের স্বপ্ন! কেমন অদ্ভুতভাবে জুতসই ব্যাপার যে আমাদেরকে শেষমেশ মাংসের স্বপ্ন হতে হলো।”

“এবং আমরা পুরো অঞ্চলটিকে অনধিকৃত হিশেবে চিহ্নিত করে দিয়েছি।”

“ঠিক আছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে মামলা খতম। আচ্ছা, আর কেউ কি আছে? ছায়াপথের এই প্রান্তে কৌতূহলোদ্দীপক কোনো জাতির খোঁজ মিলেছে?”

“হ্যাঁ, গ৪৪৫ মণ্ডলের নবম শ্রেণীর নক্ষত্রের একটি খুবই লাজুক কিন্তু মিষ্টি হাইড্রোজেন-কেন্দ্রিক গুচ্ছ-বুদ্ধিমত্তা রয়েছে। দুই ছায়াপথীয় আবর্তনকাল পূর্বে যোগাযোগ করেছিল, এরা আবার বন্ধুত্ব করতে চায়।”

“এরা সবসময়ই ফিরে আসে।”

“এবং ফিরবে না-ই বা কেন? একবার চিন্তা করে দেখো, এই মহাবিশ্বটা কেমন অকথ্য ও অসহ্য-রকমের বিষাদময় হতো যদি আমরা একদম একলা হতাম…”

===::===::===
১৪/১০/২০১৭

Comments

সাজেদুল ওয়াহিদ নিটোল

সাজেদুল ওয়াহিদ নিটোল

দুনিয়াজুরা প্রচুর গিয়াঞ্জাম! এই গিয়াঞ্জামে একটু আরাম খুঁজি...

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
2 Comments
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
Inline Feedbacks
View all comments
ফরহাদ হোসেন মাসুম
এডমিন
3 বছর পূর্বে

অসাধারণ অনুবাদ হয়েছে, নিটোল। অনেকদিন পরে তোমার লেখা পড়লাম।

2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x