মঙ্গলের সাগর নিয়ে পকপকানি

আপনি কি এখনো “মঙ্গলের মহাসাগর, মঙ্গলের পানি” এগুলো সম্পর্কে শুনতে শুনতে ক্লান্ত? না, আশা করি! কারণ, আমি আবারো এটা সম্পর্কে লিখছি। শুরুতেই বলে নিচ্ছি, আমি নিজেও অনেক তর্ক-বিতর্ক করেছি যখন একটা লেখাতে এসেছিলো, “একসময় মঙ্গলে অনেক পানি ছিলো”। ২০১৫ সালের মার্চে সায়েন্স এক্সপ্রেস ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধ  প্রকাশিত হয়েছে, যাদের সিদ্ধান্ত হলো – মঙ্গলের মহাসাগর হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও বড় ছিলো।

আসুন, একটু অতীতের দিকে চোখ ফেরাই। অনেকে অনেক ধারণা দিয়েছে, বলেছে – মঙ্গলের উৎপত্তির একদম শুরুর দিকে প্রচুর পানি ছিলো; এতো পানি যা দিয়ে নাকি মহাসাগরও ভর্তি হয়ে যেতো। এই প্রবন্ধেও তো তাই বলা হলো। তাহলে নতুন কী এলো?

11041771_840577796003266_5854139889076017893_n

এই প্রজেক্টের মূল আকর্ষণটা হচ্ছে – এটার নেতৃত্বে ছিলো নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানীরা; সাথে ছিলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার, আর এরা পৃথিবীতে অবস্থিত টেলিস্কোপ ব্যবহার করে চমৎকার কিছু কাজ করেছে।

জল – হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরমাণু দ্বারা গঠিত হয়। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন উভয়ের একাধিক আইসোটোপ বা সমাণু আছে। সমাণু বলতে সব একই, কিন্তু নিউট্রনের সংখ্যা ভিন্ন বোঝায়। পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে, Deuterium ধারণকারী পানির অণুগুলো, হাইড্রোজেন ধারণকারী পানির অণুর সঙ্গে চমত্কার ভাবে মিশে যায়। কিন্তু  পানি যখন মহাসাগর ছেড়ে চলে যায় (বাষ্পীভূত হয়), তখন আর এই ঘটনাটা ঘটে না।

Deuterium পানির তরল আর কঠিন অবস্থায় থাকতে চায়, বেচারা কোনোভাবেই বাষ্পীভূত হতে চায়না। কিন্তু পানি যখন বাষ্পীভূত হয়, Deuterium জলীয়বাষ্পের কণাতে থেকে যায়, আর বৃষ্টির সময় পানির ফোঁটারসাথে পড়ে যায়। যতদিনে পানি মেরুতে পৌঁছে জমাট বাঁধে এবং বরফে রূপ নেয়, এতে হাইড্রোজেন থাকে অনেক বেশি, Deuterium থাকে অত্যন্ত কম। ব্যাপারটা বরফের মধ্যে দেখা যায় সবসময়েই।

পৃথিবীতে, আমরা বেশ সহজেই হাইড্রোজেন ও Deuterium এর অনুপাত নির্ণয় করতে পারি, জল আর স্থল দুটো থেকেই নমুনা নিয়ে। কিন্তু মঙ্গলে তা পারি না, কারণ নমুনা নেয়ার জন্য বিশাল কোনো সমুদ্র নেই। যেখানে সঠিক যন্ত্রপাতি আছে (যেমন, কিউরিয়সিটি রোভার), সেই জায়গার অনুপাত না হয় নিতে পারলাম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই রোভার তো আছে মাত্র একটা!

গ্রহের গড় ডি/এইচ অনুপাত জিনিসটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দুই আইসোটোপ শুধুমাত্র বায়ুমণ্ডলে ভিন্নভাবে কাজ করে। যেহেতু Deuterium হাইড্রোজেন চেয়ে দ্বিগুণ ভারী, সৌর বায়ু সহজেই হাইড্রোজেনকে বায়ুমণ্ডল থেকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে পারে। ডি/এইচ অনুপাতের পরিমাপ থেকে আমরা জানতে পারি, গ্রহটি কী পরিমাণ পানি হারিয়েছে। কিন্তু যেহেতু পৃথিবীর  মত  বিশাল মহাসাগর ওখানে নেই, আর কিউরিয়সিটি দিয়ে মাত্র একটা জায়গার হিসাব নেয়া যাবে, তাই এই পরিমাণ নির্ণয় করাটা বেশ কঠিন।

এই সমস্যা থেকে সমাধান পেতে, এই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতেই বসানো চমৎকার টেলিস্কোপ ব্যবহার করলেন। ইউরোপীয় VLT এবং আমেরিকান Keck টেলিস্কোপ ব্যবহার করে (সাথে ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ সুবিধা তো ছিলোই), তারা মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে মেরু থেকে বিষুবরেখা পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে H2O এবং HDO পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। সব কিছু বাদ, শুধু এই পরিমাপের সফলতাটাই অনেক!

তারা যে পরিমাপ করেছিলো, সেখান থেকে সমগ্র গ্রহের ডিউটেরিয়ামের প্রাচুর্য অনুমান করতে সক্ষম হয়েছিলো। এটা বোঝা গেছে যে মঙ্গল ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ অনুমানের চেয়েও সমৃদ্ধশালী। ভূ-পৃষ্ঠের তুষার, বা মাটিতে লুকানো খনিজ পদার্থের মধ্যে লেগে থাকার ফলে পানিগুলো অদৃশ্য ছিলো, তাই আগের পরিমাপগুলোতে ডিউটেরিয়াম ও হাইড্রোজেনের সন্ধান মেলেনি।

চমৎকার এই পরিমাপের জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ। আমাদের কাছে এখন পুরো গ্রহের জন্য আনুমানিক একটি ডি/এইচ অনুপাত আছে। আগের গবেষকগণ মঙ্গলের meteorites এর খনিজ পদার্থের মধ্যে ডি/এইচ অনুপাত পরিমাপ করেছিলেন – আমরা মনে করি যে সেই হিসেবটা গ্রহের ভূ-পৃষ্ঠের অনেক নিচের অংশের (mantle-এ উপস্থিত) পানির ব্যাখ্যা দেয়। এই দুই পরিমাপ থেকে আমরা দ্রুত হাতে অংক কষে দেখে নিতে পারি, এই গ্রহে মূলত কতটুকু পানি ছিলো। হিসেবে দেখা যায়, প্রায় ২০ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার  পানি ছিলো। অর্থাৎ, পৃথিবীতে আর্কটিক মহাসাগরের আয়তনের কাছাকাছি।

সেখান থেকে, প্রেস রিপোর্ট অনুমান করে নেয় যে, ঐ পানির পুরোটা একসময় মঙ্গল  গ্রহের উত্তর মেরুর এক সমুদ্রে ছিলো, যেখানে নিচুভূমি আছে। তাই, তারা এরকম একটা ছবি বানিয়েছে, যে সমুদ্রের গভীরতা প্রায় ১.৬ কিলোমিটার।

আপনি যদি আমার লেখাগুলো আগে পড়ে থাকেন, তাহলে হয়তো বুঝে ফেলেছেন যে সাবধানবাণী আসছে। কারণ, প্রেস রিলিজ গবেষণার জটিল দিকগুলো এড়িয়ে যায়। এখানেও একটা বড় ব্যাপার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই পরিমাপ থেকে আমরা মঙ্গলে কতটুকু পানি ছিলো, তার পরিমাণ অনুমান করতে পারি…… কিন্তু এটা বলতে পারি না যে সবটুকু পানি ওখানে একই সময়ে ছিলো।

যদি কখনো মঙ্গলের ভূ-পৃষ্ঠে কোনো পানি থেকে থাকে, সেটা হয়তো বাষ্পীভূত হয়েছে, এবং হয়তো ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডল থেকে বেচারাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যে শিলার ওপর আমাদের কিউরিয়োসিটি রোভার বসে আছে, সেটা হয়তো মঙ্গল তৈরি হবার প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বছর পর গঠিত হয়েছিলো। ৮০০ মিলিয়ন বছর সময়টা অতিরিক্ত রকম লম্বা। আমাদের এই পৃথিবীতে, ৮০০ মিলিয়ন বছর আগে, বহুকোষী জীবের উৎপত্তি হচ্ছিলো মাত্র। যদি মঙ্গলের ভূ-পৃষ্ঠে কোনো পানির কণা চুঁইয়ে পড়েও, ছোটো হ্রদ যদি তৈরি করেও…… তারপরেও সেই পানি মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে পারে, কোনোদিন কোনো মহাসাগর তৈরি না করেই।

এই গল্পের আরেক অংশ আছে – হয়তো মঙ্গল পৃষ্ঠে কিছু পানি এসেছিলো, যেগুলো কখনোই ম্যান্টল পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এই পানি এসেছিলো ধূমকেতু এবং গ্রহাণু থেকে। হয়তো সেই পানি শুধু ভূ-পৃষ্ঠেই ছিলো, শুধু ভূ-পৃষ্ঠের ডি/এইচ অনুপাতের পরিবর্তন করেছিলো, এবং আমাদের পরিমাপের হিসাব গুলিয়ে দিয়েছিলো। মানে, ম্যান্টলই মঙ্গলের পানির মূল উৎস, এটাকে ধরে নিয়ে আমরা এগিয়েছি; ধূমকেতু আর গ্রহাণুর কথা ভাবিনি

শেষে এসে বলতে চাই, CRISM নামের একটা অসাধারণ spectrometer কিন্তু ২০০৬ সাল থেকেই মঙ্গলের চক্কর খাচ্ছে। এটা প্রমাণ পেয়েছে যে, মঙ্গলের পুরনো শিলাগুলোর অনেকগুলোই পানির প্রভাবে ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে – কাদার মত অনেক খনিজ পদার্থের বিশাল সংগ্রহশালা গঠিত হয়েছে, যেটা আসলেই পানিকে ধরে রাখতে পারে। এই খনিজ পদার্থগুলো হয়তো পানি ধারণ করতো, যখনই কোনো পানি ম্যান্টল থেকে উঠে আসতো। তাই, কোনো মহাসাগর হয়তো কখনো তৈরি হতেই পারেনি। বায়ুমণ্ডল থেকে বেরিয়ে যাওয়াই যে D/H অনুপাতে প্রভাব রাখার একমাত্র মাধ্যম, এটা সেই অনুমানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তারপরেও, এই প্রবন্ধটি একটি বড় ধরনের সফলতা। তারা একটি গ্রহে বসানো টেলিস্কোপ ব্যবহার করে, ভিন্ন এক গ্রহের পানির বিভিন্ন আইসোটোপের প্রাচুর্যের পরিমাপ করেছেন, উড়াধুরা ব্যাপার! তারা মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল এবং জলবায়ু সম্পর্কে অনেক  নতুন তথ্য জেনেছেন। আমরা যা ভেবেছিলাম, মঙ্গলের হাইড্রোজেন আর ডিউটেরিয়াম চক্র এর চেয়ে আরো জটিল দেখা গেলো। অবশেষে, অনেক অনেক জিনিসকে সত্য ধরে নিয়ে তারা মঙ্গলে কতটুকু গভীর মহাসাগর থাকা সম্ভব ছিলো,  সেই অনুমান করেছেন। মঙ্গল গ্রহের মহাসাগরের গভীরতা জিনিসটা ইন্টেরেস্টিং, এটা আমাদেরকে গ্রহের ব্যাপারে নতুন কিছু বলে। এতো এতো পত্রিকা এই ফলাফল ছাপায়, কিন্তু কেউই আসল বিজ্ঞানের ব্যাপারটা তুলে ধরে না। এতোটুকু যদি পড়ে থাকেন, তাহলে আশা করি, এতোদিন আমরা মঙ্গলের মহাসাগর বলতে যা বুঝতাম, আর এই প্রবন্ধে মহাসাগর বলতে কী বোঝানো হয়েছে, দুটোর পার্থক্য ধরতে পারবেন।

(মঙ্গল নিয়ে পকপকানি সমাপ্ত)

References:

Original article – JBB, The Earth Story

অনুবাদ – ফারহানা বৃষ্টি, ফরহাদ হোসেন মাসুম

Image credit.

Comments

বিজ্ঞানযাত্রা

বিজ্ঞানযাত্রা

বিজ্ঞানযাত্রা কর্তৃপক্ষ।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz