অজানার পথে (বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী)

রাত ২ টা বাজে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। গত দুইদিন যাবৎ ঘুমাতে পারিনি। কাজের প্রচণ্ড চাপ। মেজাজটা বিগড়ে যায় অফিসের বসের এমন উদ্ভট আচরণে। তাঁর কাছে দিন মনে হয় ৪০ ঘণ্টা। মাঝে মাঝে কাজের চাপে মনে হয় সত্যিই এমন কোথাও চলে যাই, যেখানে দিন ৫০ ঘণ্টা হবে। কাজ সব শেষ করে বসের হাতে কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে শান্তি পাবো। কিন্তু, এটা ভেবে মন খারাপও থাকে বসবাসযোগ্য তেমন কোন গ্রহ আমরা আজও পাইনি। ইস! কবে যে টেলিভিশন অন করে দেখবো, “নতুন বসবাসযোগ্য গ্রহ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা!”

মাঝে মাঝে মনে হয় আসলেই আর কেউ নেই এই সুবিশাল মহাবিশ্বে। বসবাসের আর কোন জায়গা নেই। আশায় আশায় দিন কাটানো ছাড়া কিছু না। যাই হোক, দু’দিনের ক্লান্তি ততটা মনে হচ্ছে না, কাজটা সম্পন্ন করেছি তাই। মনে হচ্ছে আর্কিমিডিস সাহেবের মত আনন্দের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি! আপাতত ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে তপুর “এভাবে না” গানটা অল্প শব্দে দিয়ে গোসল করতে বাথটাবে নামলাম। এতরাতে গোসল আমি প্রায়ই করে থাকি। ভৌতিক পরিবেশ! নিঃশব্দ চারিদিক। তার মাঝে পানির শব্দ ও তপুর শান্ত গান একটা কেমন জানি উদ্ভট অনুভূতি দিচ্ছে। গোসল শেষ করে যথারীতি অগোছালো চুল পরিপাটি করার বাড়তি চেষ্টা না করে বিছানাতে বসলাম। জানালার দিকে দৃষ্টি গেলো।  সুন্দর চাঁদ! অনুভব করলাম, ওটা চাঁদ না হয়ে রুটি হওয়া ভালো এখন। কারণ, আমি এখন ক্ষুধার্ত। ঝটপট একটা ডিম সিদ্ধ করে খেলাম। সাথে এক লিটার পানি। আর লোড না দিলেও চলবে! তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যখন বিছানার দিকে ঘুরলাম, তখন জানালার দিকে চোখ গেলো। কিছু একটা যেন আমাকে দেখছে! হয়তো মস্তিষ্কের এলোমেলো চিন্তা হবে এটা। ক্লান্তিটা বুঝতে পারছি।  আর কোন কাজ না করে একলাফে বিছানায় আরামে শরীরটাকে ছড়িয়ে দিলাম। চোখ নিমিষেই বুজে এলো। বুঝতে পারলাম, আমি ঘুমাচ্ছি।

কিছুক্ষণ পর একটা উৎকট গন্ধ নাকে এলো। বিছানা ছেড়ে উঠে গন্ধের উৎস খুঁজতে লাগলাম। নিতান্তই বিশ্রী গন্ধ। অচেনাও বটে। ইঁদুর, বিড়াল, সাপ এখানে কেন আসবে? আসলেও পঁচবে কেন? পঁচলেও ওদের গন্ধ আমি চিনি। এটা একটু অন্যধরনের। বিছানায় বসে ভাবছি, বিবর্তনের ধারায় কত কোটি আজব আজব প্রাণী এই পৃথিবী দেখছে! অন্য কোনো গ্রহে কি এমনটা হচ্ছে?

“ঠক..ঠক…ঠক….” দরজায় কেউ মৃদু আঘাত করছে। “এত রাতে?!” ভাবলাম আমি! এতরাতে কে দরজায় আঘাত করছে!? একটানা শব্দ করেই যাচ্ছে। অবশেষে যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে দরজাটা খুলে দিলাম। হাত বাড়িয়ে দিলো একটা শরীর। ধাতব শরীর। ভিতরে মাংসের অস্তিত্ব আছে কিনা বোঝা দায়। অঙ্গভঙ্গি করে ভিতরে আসবে কিনা জানতে চাইলো। মনে হলো আমি কিছুক্ষণের জন্য রোবট হয়ে গেছি। অনুমতি দিলাম! অথচ কোনো ইচ্ছা ছিলো না এই অসহ্য ধাতবে আবৃত দেহকে ভিতরে আসতে অনুমতি দেওয়ার। অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলো দেহটি!

“আমাকে মাফ করবেন, এতরাতে আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি। কিন্তু আমি অপারগ ছিলাম।” এটাই হয়তো বললো সেই অদ্ভুত দেহটি! আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। বোঝানোর চেষ্টা করলাম,  “তুমি কি এই বিশ্রী পোষাকটি খুলতে পারবে?”।  আমাকে সামান্য অবাক করে সে “না” বললো! “কারণটা কী?” জানতে চাইলে সে আমাকে কাছে টেনে নিলো। মাথাটা শক্ত করে ধরলো। মনে হলো কোনো যন্ত্র আমার মাথায় ধরলো। অতঃপর, খাঁটি বাংলাতে বললো,”জানি অবাক হয়েছেন। আমি আমার ভাষায় কথা বলছি। কিন্তু সেটা কনভার্ট হয়ে আপনার ভাষায় আপনি শুনছেন। আমি পোষাকটি খুলতে পারবো না। আমি যদি ভুল না হই, পৃথিবী নামক এই গ্রহটিতে লিথিয়াম খুব কম। আমরা লিথিয়াম ছাড়া শ্বাসকার্য চালাতে পারিনা! এই পোষাকটা আমার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র।”

“মা..মা..মানে?!” আমি অবাক হয়ে বললাম,”আপনি অন্য গ্রহের?”

“হ্যাঁ। রেক্টার্ন নামক গ্রহের বাসিন্দা আমি। পৃথিবী আমরা আবিষ্কার করেছি কিছুদিন হলো। নবম গ্রহ এটা, যেটাতে আমরা প্রাণ পেলাম।” সে বললো।

“অর্থাৎ, আরো সাতটা প্রাণসমৃদ্ধ গ্রহ আপনারা আবিষ্কার করেছেন?” আমি বললাম।

“হ্যাঁ, আপনি বেশ ভালো গণিত পারেন। আমরা এতটাও আশা করিনি! কিন্তু, দুঃখিত মিস্টার রবার্টসন। আপনাকে আমরা আমাদের গ্রহে কিছুদিনের জন্য নিতে চাই, যদি অনুমতি দেন।”, ধাতব শরীরটা গম্ভীরভাবে বললো।

“কিন্তু মিস্টার….. ” আমি তার নাম জানিনা। মিস্টার বলেই ভাবতে লাগলাম স্মার্ট সাজতে এলোমেলো হয়ে গেছে!

“জেমসন রেবক”, নিজের নামটি বললেন তিনি!

“হ্যা, মিস্টার রেবক। আমার কাল অফিস আছে!”, বসের ভয়ে এমন উত্তেজনাও ভয় ধরায়!

“আপনি ওটা নিয়ে ভাববেন না। আমাদের এক রোবট আপনার অনুকরণে আপনার দায়িত্ব পালন করে দিবে এ কয়েকদিন। ততদিনে আপনাকে নিয়ে গবেষণা করবো আমরা। জানি, মানতে কষ্ট হচ্ছে আপনার। কিন্তু আমরা সোজাসাপ্টা কথায় বিশ্বাসী।”

“অবশেষে আমি গবেষণার জিনিস! আপনারা কি ঠিক করেছেন আমাকেই নিবেন?”, ভীত আমি বললাম।

“মোটামুটি সেটাই। কারণ, আমরা দু’দিন ধরে আপনাকে দেখছি। আর মানবজাতির প্রতি কৌতুহলী। আপনি কি প্রস্তুত?”, মনে হচ্ছে নিশ্চিত হয়েই কথাগুলো বলছেন তিনি।

“হ্যাঁ। যদি এদিকে সব ঠিক থাকে, আমি প্রস্তুত।”, আগ্রহ নিয়ে বললাম। “আমার সাথে বাইরে আসুন”, তিনি বললেন।

বাইরে যেতেই আমি অবাক! ইজিবাইকের মত একটা গাড়ি। তাতে আমাকে নেওয়া হলো। বিশেষ পোষাক পড়ানো হলো। মুহূর্তের মধ্যে উড়াল দিলো! কিছু সেকেন্ড পর আমি পৃথিবীটাকে আর দেখতে পেলাম না। ওটা আমার দৃষ্টির বাইরে। একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে উঠলো, “আমরা আলোর বেগে যাচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” আমি বাইরে তাকালাম।  অন্ধকার, অন্ধকার ও অন্ধকার। তার মাঝে মিটিমিটি আলো। উড়ে চলছি কোনো অজানার পথে!


কী হতে কী হলো, তাই ভাবছিলাম! তখন, অসহ্য এলার্মে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। নিজেকে পৃথিবীতে দেখে আমি যারপরনাই অবাক ও হতাশ! তবে, ঘটনাটা কি সত্য নাকি মিথ্যা ছিলো? এতক্ষণ যা হলো! সেটা ভাবতে ভাবতে বিছানা ছাড়লাম।

Comments

MHLikhon

বর্তমানে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও ভ্রমণ নিয়েই চলে যায় দিন! লেখালেখিও এগুলো নিয়েই।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

3 মন্তব্য on "অজানার পথে (বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী)"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
Imtiaz Siddique
সদস্য

ভাল লিখেছেন, চালিয়ে যান।

মেহেদী হাসান লিখন
অতিথি

ধন্যবাদ।

এটা আমার দ্বিতীয় চেষ্টা ছিলো সাই-ফাইতে। আশা করি পরে আরো ভালো কিছু দিতে পারবো। ?

Azad007
সদস্য

eto baje likha age kokhono pori nai….

wpDiscuz