ব্রাত্য বিজ্ঞানী স্যার টম কিবল

স্যার টম কিবল, যিনি বিশ্বের সেরা তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম, সম্প্রতি ৮৩ বছর বয়সে মারা গেলেন; রেখে গেলেন স্ত্রী অ্যানকে, তাদের পুত্র রবার্ট এবং দুই কন্যা হেলেন এবং অ্যালিসনকে। পুরো নাম টমাস ওয়াল্টার ব্যানারম্যান কিবল। এই কিংবদন্তী পদার্থবিদের জন্ম ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯৩২ সালে, মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই), ভারতে। তার বাবা ওয়াল্টার ছিলেন মিশনারি এবং মায়ের নাম জ্যানেট ব্যানারম্যান। ১৯৪৪ সালে কিবল এডিনবরার মেলভিল কলেজে পড়ার জন্য সেখানে হোস্টেলে চলে যান। 1951 সালে তিনি স্নাতক ছাত্র হিসেবে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন, তার পড়াশোনার বিষয় ছিল গণিত ও পদার্থবিদ্যা। সেখান থেকেই কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের কিছু দিক নিয়ে কাজ করে ১৯৫৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এর মধ্যে তিনি ১৯৫৭ সালে বিয়ে করেন অ্যানকে। এরপর কমনওয়েলথ ফেলো হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক)-তে এক বছর কাজ করেন। ১৯৫৯ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন পোস্ট ডক্টোরাল ফেলো হিসেবে যা সদ্য সদ্য আব্দুস সালাম-এর অধীনে গঠিত হয়েছিল। ১৯৬১ সালে তিনি একজন প্রভাষক হিসেবে ওই বিভাগেই যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন ১৯৮৩ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত। তিনি অবসর গ্রহণ করেন ১৯৯৮ সালে এবং আমৃত্যু এমেরিটাস অধ্যাপক ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ছিলেন। অনেক সম্মানের মধ্যে, তিনি ১৯৮০ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন এবং তাদের হিউজেস পদকজয়ী ছিলেন। তিনি ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্স থেকে রাদারফোর্ড এবং গাথারি পদক, এবং বার্নে আইনস্টাইন সোসাইটি থেকে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন পদক পান। তিনি ১৯৯৮ সালে সিবিই হিসেবে নিযুক্ত হন এবং তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয় ২০১৪ সালে।

টম কিবলের প্রধান গবেষণার বিষয় ছিল কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, প্রাথমিক কণা এবং তাদের পারস্পরিক ক্রিয়ার তত্ত্ব, বিশেষ করে, কসমোলজি ও কন্ডেন্সড ম্যাটার পদার্থবিজ্ঞানে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গ এবং তার প্রভাব নিয়ে। ১৯৬৪ সালের গ্রীষ্মে, দুই আমেরিকান সহকর্মী জেরাল্ড গুরালিংক এবং রিচার্ড হ্যাগেন-এর সঙ্গে, কিবল যে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলোঃ কিভাবে কণা – যেগুলি প্রকৃতির মৌলিক বল বহন করে – সাধারণ তাত্ত্বিক নীতি অনুযায়ী ভরহীন হওয়া উচিত, তবু ভর লাভ করতে পারে? প্রকৃতি প্রতিসাম্য স্থিতিশীলতা পছন্দ করে। কিবলের ভর প্রক্রিয়া নীতিটি এই মৌলিক নীতির ওপর নির্ধারিত। গাণিতিক সমীকরণের যে সমদৈশিকতা বা ধরন যদিও ভর বিহীন কণার জন্য, কিন্তু এটি দাবি করে প্রকৃতি আরো স্থিতিশীল হয় যখন কণার ভর থাকে। Physical Review Letters-এ তাদের প্রকাশিত সেই কাজ ২০০৮ সালে গত ৫০ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবে ঘোষিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত, তাদের ধারণা আমজনতার সামনে আসার আগেই একবার না, দু-দু’বার প্রকাশিত হয়। প্রথমবার রবার্ট ব্রাউট ও ফ্রাসোয়া এংলারট দ্বারা এবং দ্বিতীয়বার হিগস দ্বারা। হিগস একাই সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করে নেন একটি নোবেল কণার অস্তিত্ব কল্পনা করে, পরে যাকে “হিগস বোসন” নামে অভিহিত করা হয় যা কিনা এখন “ঈশ্বর কণা” নামে বহুল পরিচিত। আর তাই নোবেল ফাউন্ডেশনের কাছে ৪৮ বছর পরে বোসন এর পরীক্ষামূলক আবিষ্কার স্বীকৃতি পায়।

সেই সময়ে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, ভর প্রক্রিয়া তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের কাছে মণিমানিক্য-সম ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো স্পষ্ট প্রয়োগ। শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট কণা, ফোটন, যা কিনা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বল সঞ্চালন করে, তার সম্পর্কে ধারণা খানিকটা পরিষ্কার হয়েছে; আর সেখানেও ধরে নেওয়া হয়েছে তা ভরহীন। ওই একই সালে, সালাম দুর্বল বলের ধারণা দেন, যা তেজস্ক্রিয়তার একটি ধরনের জন্য দায়ী এবং যে হারে সূর্য তার মৌলিক জ্বালানি ব্যবহার করে তার নিয়ন্ত্রক। সালাম এর মতে, ফোটন যেমন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বল সঞ্চালন করে তেমনই দুর্বল বল সঞ্চালনের জন্যও কোনো কণা চাই; যার নাম তিনি দেন “W-বোসন” এবং যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বতঃসিদ্ধ হলো এটি হতে হবে ভরযুক্ত। এমন ভাবা যেতেই পারে যে, সালাম ও কিবল যদি তাদের ধারণার মিলন ঘটাতে পারতেন, তাহলে তারা দুর্বল বল তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ করতে পারতেন এবং তাহলে হয়তো একটি নোবেল পুরস্কার ভাগ হয়ে যেতে পারতো তাদের মধ্যে। যাই হোক, তা তো ঘটেইনি, বরং তাদের নিজ নিজ ধারণা উপেক্ষিত হয়েছে পরবর্তী কয়েক বছর।

কণা এবং বলের প্রতিষ্ঠিত বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বীজ কিন্তু সেই ১৯৬৭ সালেই বপন করেছেন কিবল যখন তার অনন্য পর্যবেক্ষণ দেখিয়েছে কিভাবে এই গাণিতিক ধারণার বাস্তব জগতে প্রয়োগ করা যায়। কিবল দেখিয়েছেন কিভাবে তার তত্ত্ব ভরযুক্ত কণার অস্তিত্বকেই প্রতিষ্ঠা করে কিন্তু ফোটন-এর ভরহীন অঙ্গীকারকে অক্ষুণ্ণ রেখে। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার সালাম এবং অপর এক আমেরিকান তাত্ত্বিক স্টিভেন ওয়াইনবার্গকে পথ দেখায়।

সালাম চিরকাল তার ব্যবহারিক প্রয়োগের স্বীকৃতিস্বরূপ “হিগস-কিবল প্রক্রিয়া”-র উল্লেখ করেন; আর অন্যদিকে দুর্বল বলের আধুনিক তত্ত্ব গড়ে তুলতে ওয়াইনবার্গ কিবল এর যুগান্তকারী আবিষ্কারকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ফল হলো কী? “ওয়াইনবার্গ-সালাম মডেল” ১৯৭৯ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার জিতে নিল শেলডন গ্ল্যাশোর সঙ্গে যুগ্মভাবে; ব্রাত্য রয়ে গেলেন পথিকৃৎ কিবল। শেষ এখানেই নয়। কিব্বলের কাজের উপর ভিত্তি করেই 1999-এর নোবেল পুরস্কার, যা জিতে নিলেন জেরার্ড হুফ ও মার্টিনাস ভেল্টম্যান। তাদের কাজও ছিল দুর্বল এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বলের একটি সমন্বয় তত্ত্ব।

নাটকের শেষ এখানেই নয়। CERN এর বড় Hadron Collider-এ, এটলাস এবং সিএমএস পরীক্ষায় আবিষ্কৃত হলো বহু প্রতীক্ষিত মৌলিক কণা হিগস বোসন। সাল ২০১৩। ধরেই নেওয়া হল পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন হিগস এবং এই পুরস্কার ওই বছর আর যাদের সঙ্গে ভাগ হবে তারা হলেন ফ্রাসোয়া এংলারট এবং তৃতীয় বিজ্ঞানী হিসেবে কিবল স্বয়ং। কারণ রবার্ট ব্রাউট ২০১১ সালে মারা গিয়েছেন। দুই জীবন্ত যোগ্য তাত্ত্বিকদের মধ্যে কিবল ছিলেন অন্যতম। যেহেতু একটি নোবেল পুরস্কার সর্বোচ্চ তিনটি ভাগে বিভক্ত হতে পারে তাই সকলেই সঙ্গত কারণেই ভেবেছিলেন হিগস, এংলারট ও কিবলের নাম। কিন্তু নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত উস্কে দিলো বিতর্ক। ঘোষণা হল হিগস ও এংলারট-এর নাম। তৃতীয় বিকল্প খালিই রয়ে গেল। বঞ্চিত হলেন একজন  অসাধারণ বিনয়ী ও নম্র বিজ্ঞানী। কিন্তু কী যে ছিল তার পিছনের কারণ, তা আমাদের কাছে অজ্ঞাত এবং অবশ্যই দুর্বোধ্য রয়ে গেল।

তার কর্মজীবন ব্যাপী, কিবল বিশেষ প্রতিসাম্য প্রকৃতি নিয়েই কাজ করে গেছেন; এবং বিশেষ করে, যখন একটি প্রাকৃতিক সিস্টেম দশা পরিবর্তন (যেমন বাষ্প থেকে তরল হিসেবে, অথবা তরল থেকে কঠিন হিসেবে) করে তখন প্রতিসাম্যের পরিবর্তন নিয়ে। তাঁর আর একটি অবদান হল “কিবল-জুরিক প্রক্রিয়া”; এই তত্ত্ব বিগ ব্যাং মধ্যস্থিত গরম উপাদানের ঘনত্বের অস্থিরতা থেকে ছায়াপথ স্তবকের গঠনকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। এখানে কিবল “মহাজাগতিক স্ট্রিং”-এর কল্পনা করেন। অর্থাৎ, স্থান ও কালের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, যা একটি বৈশিষ্ট্যমূলক প্রতিসরণ দ্বারা সনাক্ত করা যেতে পারে। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী পরীক্ষালব্ধ ভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কাজটিও নোবেল মানের। কিন্তু তার আর এই পুরষ্কার পাওয়া হল না। তিনি চলে গেলেন সকল কিছুর উপরে।

গত শতকের ৫০ ও ৬০-এর দশকে, অন্যান্য অনেক পদার্থবিজ্ঞানীর মত, টম কিবলও বিজ্ঞানের সামরিক প্রয়োগ এবং বিজ্ঞান সামরিকীকরণের সম্পর্কে বিশদ মনোযোগ দেন। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিপদ সম্পর্কে ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। সেই সময়ের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের বায়ুমণ্ডলীয় পরীক্ষা এবং তার থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া। এই বিপর্যয়ের প্রভাব ছিল দীর্ঘ এবং তিনি লড়াই-এ নেতৃত্ব দিয়ে সমস্ত রকম পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করতে সক্ষম হন।

সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটিকেও তিনি কোনদিন উপেক্ষা করেননি। British Society for Social Responsibility in Science (BSSRS) গঠিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই তিনি যোগ দেন এবং এর জাতীয় কমিটির সদস্য ছিলেন ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত। Scientists Against Nuclear Arms (SANA)-এর প্রাথমিক সদস্য ছিলেন এবং এর জাতীয় সমন্বয় কমিটিতে ছিলেন ১৯৮১ থেকে ১৯১ সাল পর্যন্ত যার মধ্যে শেষ সাত বছর সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও ১৯৮৮ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান কংগ্রেস “Ways out of the Arms Race”-এর সাংগঠনিক কমিটিতেও তিনি প্রধান ছিলেন।

অসাধারণ এই বিজ্ঞানসাধক সকলকে ছেড়ে মহাজাগতিক কোন ছায়াপথের দিকে রওনা দিলেন ২ জুন, ২০১৬-তে?

তথ্যসূত্র

https://www.theguardian.com/science/2016/jun/08/sir-tom-kibble-obituary

http://www.sgr.org.uk/pages/sgr-sponsors#TKibble

http://www.nobelprize.org

Comments

সুমন পাল

লেখক হরেন্দ্র কুশারী বিদ্যাপীঠে সহকারী শিক্ষক এবং ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র সান্ধ্য মহাবিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে অতিথি অধ্যাপক রূপে কর্মরত। লেখাপড়া কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (University College of Science) থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে B.Ed. এবং Ph.D.। গবেষণার ক্ষেত্র – আয়নমণ্ডলের প্লাজমা ও তাপীয় ঘটনাবলী, আবহবিদ্যুৎ ও চুম্যান অনুনাদ, রেডিও তরঙ্গ, ভূকম্পন। বর্তমানে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre of Advanced Study in Radio Physics and Electronics-এ আংশিক সময়ের গবেষক।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz