(আন) ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন

একটা সময়ে, ডারউইনের জীবনকাল থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ধর্মতাত্ত্বিক ক্রিয়েশনিস্টরা সরাসরি বিবর্তনতত্ত্বকে বাতিল করে দিতেন। তবে এখন ফসিলবিজ্ঞান (Paleontology) এবং অনুপ্রাণ বিজ্ঞানের (Molecular biology) বদৌলতে বিবর্তনতত্ত্ব এখন জীববিজ্ঞানে পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছে। সেই সত্তুরের দশকেই রাশান জীববিজ্ঞানী  Theodosius Dobzhansky  তার বিখ্যাত উক্তিতে বলছিলেন, “Nothing in Biology Makes Sense Except in the Light of Evolution”. বিবর্তনতত্ত্বের পক্ষে এখন এতো বেশি অকাট্য নিদর্শন রয়েছে যে খোদ ক্রিয়েশনালিস্ট্ররাও এখন চক্ষুলজ্জার ভয়ে জনসমক্ষে সরাসরি বিবর্তনতত্ত্বকে অস্বীকার করতে লজ্জা পান, তাই তারা বিবর্তনতত্ত্বের বিরোধিতাকে একটি নতুন মোড়কে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে চান। তারা এখন বলার চেষ্টা করেন, প্রাণের বিবর্তন হয়েছে মানলাম, কিন্তু এটা আসলে নিজে নিজে হয় নি, এতে আসলে স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ হয়েছে। ঈশ্বর বা অন্য কোন অতি বুদ্ধিমান সত্তা প্রাণের বিবর্তনকে নিজ হাতে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, নচেৎ আদি সরলতর প্রাণ থেকে এতো অসংখ্য বৈচিত্র্যময় জটিলতর প্রাণের সৃষ্টি সম্ভবপর ছিল না। এই আরোপিত এবং অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের গালভরা নাম হল, ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’।

ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের ধারণা আসলে বেশ পুরনো। খুব সহজ ভাষায় ব্যাপারটা এরকমঃ আমরা প্রযুক্তির বদৌলতে টিভি, কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ যতরকম আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের গ্যাজেট ব্যবহার করি, সেগুলোর ভেতরের কাঠামো আর কার্যপদ্ধতি বেশ জটিল। এতোটা জটিল, যে এগুলোকে ডিজাইন করার জন্য মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর প্রয়োজন হয়। তবে সবচেয়ে পাওয়ারফুল সুপারকম্পিউটারও মানুষের মস্তিষ্কের জটিলতা আর শক্তি এর ব্যবহারে কর্মদক্ষতার(efficiency) কাছে খেলনা। সেজন্য ইনটেলিজেন্ট ডিজাইনের প্রবক্তারা এখানে বলতে চান যে, যেহেতু এই অপেক্ষাকৃত কম জটিল বস্তু সৃষ্টি করতে হলেই মানুষের মতো এক বুদ্ধিমান সত্তার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়, সে তুলনায় প্রাণিজগতের জটিলতা আরও অনেকগুণ বেশি, সুতরাং এখানেও কোন স্বর্গীয় বুদ্ধিমান সত্তার হাত না থেকেই পারে না।

ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের পক্ষে সবার প্রথমে খুব শৈল্পিকভাবে এই যুক্তিটা উপস্থাপন করেছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ধর্মতাত্ত্বিক (Theologist) উইলিয়াম প্যালে। উইলিয়াম প্যালে তার ১৮০২ সালে প্রকাশিত ‘Natural Theology’ তে এই চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত রূপকের ব্যবহার করেছিলেন।

“ In crossing a heath, suppose I pitched my foot against a stone, and were asked how the stone came to be there; I might possibly answer, that, for anything I knew to the contrary, it had lain there for ever: nor would it perhaps be very easy to show the absurdity of this answer. But suppose I had found a watch upon the ground, and it should be inquired how the watch happened to be in that place; I should hardly think of the answer which I had before given, that for anything I knew, the watch might have always been there”

তখনকার হাইটেক প্রযুক্তি, ঘড়ির উদাহরণ বেছে নিয়ে  এর জটিলতা বোঝানোর জন্য প্যালে এর ভেতরের নানারকম কলকব্জার কাজ ব্যাখ্যা করেছিলেন, কিভাবে ঘড়ির ভেতরের কলকব্জাগুলো নিজেদের কর্মপদ্ধতির মাঝে নিখুঁত সমন্বয় ঘটিয়ে একটা ঘড়িকে সচল রাখে সেসব বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, যেহেতু ঘড়ির মতো একটা জটিল যন্ত্রের পক্ষে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করা অসম্ভব, তাই কোন না কোন সময়ে কেউ বা কারা নিশ্চয়ই একে সৃষ্টি করেছে।

“that the watch must have had a maker: that there must have existed, at some time, and at some place or other, an artificer or artificers, who formed it for the purpose which we find it actually to answer; who comprehended its construction, and designed its use.”

শেষমেশ উইলিয়াম প্যালে তার পাঞ্চলাইনে বললেন, জীবজগতের গাঠনিক জটিলতা যে কোন ঘড়ির চেয়ে অনেকগুণে বেশি। তাই ঘড়ির মতোই এর পেছনেও কোন না কোন ডিজাইনারের হাত থাকা আবশ্যক। প্যালে চোখের সাথে মাইক্রোস্কোপের তুলনা দিয়েও বললেন, ‘there is precisely the same proof that the eye was made for vision, as there is that the telescope was made for assisting it’.

এই গল্পকে আরেকটু আধুনিক ভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন প্রয়াত জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। প্রথম আলোকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি তার সাক্ষাতকারগ্রহীতা সাংবাদিককে বলেন, ‘ধর, তুমি মঙ্গল গ্রহে হাঁটছ। সেখানে পাহাড় পর্বত দেখে তুমি হয়তো বলবে, এগুলো এখানে আদিকাল থেকেই আছে। হঠাৎ তুমি সেখানে একটা নাইকন ক্যামেরা পড়ে থাকতে দেখলে। তখন কিন্তু তোমাকে স্বীকার করতেই হবে যে এর পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন, তুমি বলতে পারবে না যে এটা আপনা আপনি এখানে এসেছে। কারণ এটা অনেক জটিল একটা যন্ত্র। কিছুদূর দূরে গিয়ে তুমি একটা খরগোশ দেখতে পেলে। এই খরগোশের চোখ নাইকন ক্যামেরার চেয়ে হাজার গুণে বেশি জটিল….. তাই যুক্তি অনুসারে এরও একজন স্রষ্টা থাকা আবশ্যক…’

হুমায়ূন প্যালের ঘড়ির অ্যানালজি জানতেন কিনা আমার জানা নেই, তবে তিনি জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে এই অ্যানালজিকে রিফ্রেজ করেছেন মাত্র। দুক্ষেত্রেই যেটা বলা হয়েছে তা হল, মনুষ্যসৃষ্ট জটিল যন্ত্রের বেলায় যেমন একটা এক্সটারনাল এজেন্ট থাকে, জীবজগতের জটিলতার বেলাতেও সেরকম থাকা আবশ্যক, জটিলতা তো কোন এজেন্ট ছাড়া এমনি এমনি আসতে পারে না(কথাটা আসলে ভুল নয়, জীবজগতের জটিলতার জন্যও আসলে এজেন্ট বা প্রভাবকের প্রয়োজন, সে কথায় পড়ে আসছি।)

প্যালে শুরুতে এই অ্যানালজিটা দিয়েছিলেন একজন/বেশি স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ। লক্ষ্য করুন এটা একটি দার্শনিক উক্তি, কোন বৈজ্ঞানিক উক্তি নয়। এ পর্যন্ত কোন সমস্যা নেই। তবে আধুনিককালে এই মতবাদের ভোল পাল্টিয়ে একে একটি বিজ্ঞানময় রূপে দেখানোর চেষ্টা চলছে। কিরকম? বলা হচ্ছে, প্রাণীরা বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত হয়েছে ঠিকই(যেহেতু সেটা এতো এস্টাব্লিশড একটা ফ্যাক্ট যে আর অস্বীকার করার জো নেই) , কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটি Divine intervention রয়েছে, প্রাণের ডিজাইন তথা ডিএনএ এর মাঝেই নাকি রয়েছে স্রষ্টার হস্তক্ষেপের নিদর্শন তথা প্রেরিত বার্তা। নচেৎ এতো জটিল একটা প্রক্রিয়া এমনি এমনি এতো জীবনের এতো বিচিত্র বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে সক্ষম হত না।

PART 2:

একটা মোবাইল ফোন বা ক্যামেরার সাথে একটা প্রাণীর বা জীবকোষের জটিলতার তুলনা দেয়াটা আসলে কেন ভুল?

খুব ছোট একটা প্রশ্ন হলেও এর উত্তরটা বহুমাত্রিক।

প্রাণ আর নিষ্প্রাণ জগতের মাঝে সাদা চোখে শুরুতেই যে ফারাকটা চোখে পড়বে, তা হল প্রাণের নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টি করার ক্ষমতা। আপনার মোবাইল ফোনটাকে অনাদিকাল চার্জে দিয়ে রাখুন, প্রয়োজনীয় শক্তির পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং রেপ্লিকা সৃষ্টির জন্য তার সমস্ত কাঁচামাল উপস্থিত থাকার পরও একটা মোবাইল ফোন কখনও তার নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টি করে সংখ্যায় দ্বিগুণ হবেনা(অন্তত এখনকার প্রযুক্তিতে না)। অথচ একটা ব্যাকটেরিয়াকে তার উপযুক্ত পরিবেশে তার উপযুক্ত শক্তির(খাবার) সরবরাহ বজায় রাখলে সেটা প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিটে সংখ্যায় দ্বিগুণ হতে পারে।১…২…৪…৮…১৬…৩২…৬৪…১২৮…২৫৬…৫১২… ২৪ ঘন্টার মাথায় এই ব্যাকটেরিয়ারদের সংখ্যা অ্যাস্ট্রোনোমিকাল নাম্বারে পৌঁছে যাবে(অণুজীবের উদাহরণ দিলাম একটু নাটকীয়তা আনার জন্য, অণুজীবেরা অন্য ম্যাক্রো লাইফের চেয়ে কম সময়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে, তাই এদের নিয়ে স্টাডি করাটা সহজ, এদের উদাহরণ দেয়াটাও সুবিধাজনক।)

তো, কেন একটা ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরিয়া বা একটা মানুষ নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টি করতে পারছে, অথচ একটা মোবাইল ফোন সেটা পারছে না?

কিছুটা ভুলভাল এবং জেনারেলাইজড ভাষায় এই প্রশ্নের হচ্ছেঃ প্রাণের বা ব্যাকটেরিয়ার কাছে ডিএনএ আছে, মোবাইলের কাছে সেটা নেই। এই ডিএনএ আসলে কি এবং এটা কেন এতো ‘special’?

ডিএনএ একটি জৈব-রাসায়নিক যৌগ। শুরতে আসি, রাসায়নিক যৌগ আসলে কি? কিছু পরমাণু বা মৌলের সমষ্টিই আসলে রাসায়নিক যৌগ। আলাদা করে জৈব-রাসায়নিক বলার কারণ হল, এই যৌগগুলো সাধারণত লিভিং সিস্টেমের বাইরে পাওয়া যায় না।

তারপর আসি, ডিএনএ কেন জৈব-রাসায়নিক যৌগগুলোর মাঝে বিশেষ স্থান দখল করে আছে ?

কারণ, ডিএনএ পরিবেশ থেকে শক্তি আর কাঁচামাল নিয়ে নিজের হুবহু রেপ্লিকা সৃষ্টি করতে পারে। আরএনএ এবং কিছু প্রোটিনও অবশ্য রেপ্লিকা সৃষ্টি করতে পারে, তবে তারা ডিএনএ এর মতো অতোটা গুরুত্ব বহন করে না, কারণ মোটাদাগে ডিএনএ হল প্রাণের ইনফরমেশন সেন্টার, আরএনএ বা প্রোটিন নয়। একটা ব্যাকটেরিয়া যে নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টি করতে গিয়ে ভুল করে হাতি বানিয়ে ফেলবে না, সেটা নিশ্চিত করে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ তে সংরক্ষিত ইনফরমেশন। এই ডিএনএ যখন নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টি করে, সে একই তার কাছে সংরক্ষিত তথ্য দিয়ে আরেকটি নতুন আরেকটি কোষের রেপ্লিকাও সৃষ্টি করে, এভাবেই একটা কোষ থেকে দুটো কোষের সৃষ্টি হয়।

ডিএনএ শুধু একটা কোষের ইনফরমেশন সেন্টারই নয়, একই সাথে এটা কোষের হেড অফিস, এখান থেকেই কোষের যাবতীয় কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয়। ডিএনএ তাই একটা কোষের ‘আত্মা’ স্বরূপ। এককোষী জীব, যেমন ব্যাকটেরিয়ার তো একটাই কোষ, তবে মানুষের মতো বহুকোষী জীবের বেলায় তো এই সংখ্যা লক্ষ কোটি। যদি একেক কোষের ইনফরমেশন সেন্টারে একেক রকম ইনফরমেশন থাকে তবে তো ভয়াবহ প্রশাসনিক গোলযোগ দেখা দেবে। তাই একটা বহুকোষী প্রাণীর সব কোষেই তার ডিএনএ এর অভিন্ন কপি থাকে। যদিও আপনার কিডনির একটা কোষ আর চোখের একটা কোষের চেহারা মাইক্রোস্কোপে আলাদা দেখাবে, আদতে এর ভেতরের ডিএনএ কিন্তু একই, শুধু ডিএনএ এর কোন অংশটা কার্যকর রয়েছে সেটা একেক কোষে একেক রকম। উদাহরণস্বরূপ, আপনার মস্তিষ্কের একটা কোষে ডিএনএ এর যে অংশ কার্যকর রয়েছে, আপনার লিভারের একটা কোষে একই ডিএনএ এর ভিন্ন অংশ কার্যকর রয়েছে(ডিএনএ এর কিছু অংশ অবশ্য মোটামুটি সব কোষেই কার্যকর থাকে।)

অন্য রাসায়নিক যৌগ থেকে ডিএনএ এর স্বাতন্ত্র্য মোটাদাগে তিন অর্থে দেখানো যেতে পারে।(কেউ এই অংশটুকু সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেটে চাইলে Addy Pross এর ‘What is life: How Chemistry becomes Biology বইটা পড়ে দেখতে পারেন।)

১। তাপগতিবিদ্যা বা থার্মোডাইনামিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে।
২। রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে।
৩। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে।

১। থার্মোডাইনামিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকেঃ

এই অংশটুকু আসলে ডিএনএ সহ পুরো লিভিং সিস্টেমের বেলাতেই প্রযোজ্য। তবে ডিএনএ যেহেতু মোটাদাগে লিভিং সিস্টেমের ম্যানেজিং এর দায়িত্বে আছে, তাই এর সিংহভাগ দায় ডিএনএ এর উপরেই বর্তায়।

থার্মোডাইনামিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে ডিএনএ বা লিভিং সিস্টেম কিভাবে স্বতন্ত্র?

প্রথমত, মহাবিশ্বের সকল প্রক্রিয়া তাপগতিবিদ্যায় দ্বিতীয় সূত্র মেনে চলে। থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র বলছে, জগতের সকল প্রক্রিয়ায় ডিসঅর্ডার বা এনট্রপি বাড়ে। তবে লিভিং সিস্টেম কিন্তু অতি উচ্চমাত্রায় ‘অর্ডার’ বা শৃঙ্খলা বজায় রাখে। একটা কাগজ ছিঁড়ে গেলে অথবা একটা মাটির পুতুল ভেঙ্গে গেলে সেটা নিজে থেকে নিজেকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে না, অথচ আপনার শরীর ছোটখাট কাটাছেড়া বা ক্ষত দুই একদিনের মাঝেই সারিয়ে ফেলে আগের অবস্থায় নিয়ে যায়। আপনার শরীরের রক্তে শুগার লেভেল, পিএইচ, এবং আরও হাজারটা রাসায়ানিক যৌগের পরিমাণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, এদের সামান্য হেরফের আপনার মৃত্যুর কারণও হতে পারে(জীবদেহে এই কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটা সাম্যাবস্থা বজায় রাখার প্রক্রিয়াকে বলা হয় Homeostasis, একটা ব্যাকটেরিয়ার কোষেও এই প্রক্রিয়া বিদ্যমান) ।এতো নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলাবদ্ধ কোন সিস্টেম জড় জগতে দেখা যায় না। একটা এককোষী ব্যাকটেরিয়ার সিস্টেমও জড় জগতের চেয়ে অনেক বেশি অর্ডারড, এবং জীবজগতের জটিলতা বাড়ার সাথে সাথে এই অর্ডারের মাত্রা বেড়েই চলে।

জীবজগতের এই উচ্চ শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থা আপাতদৃষ্টিতে থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র মেনে চলছে না বলে মনে হলেও আসলে সেরকম কিছু নয়। লিভিং সিস্টেম তার ভেতরের এই অর্ডার বজায় রাখে পরিবেশ থেকে খাবার তথা শক্তি নিয়ে, নিজের ভেতরের অর্ডার বজায় রাখার বিনিময়ে পরিবেশে আরও বেশি ডিসঅর্ডার সৃষ্টি করে। তাই সার্বিকভাবে লিভিং সিস্টেম আসলে মহাবিশ্বের এনট্রপি বাড়াতেই সাহায্য করে।

২। রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকেঃ

ডিএনএ আসলে একটি বিশেষ শ্রেণীর রাসায়নিক যৌগের মধ্যে পড়ে, নিজের প্রতিলিপি উৎপাদনে সক্ষম ‘replicative molecule’ এর শ্রেণী. এই বিশেষ শ্রেণীর যৌগ হিসেবে ডিএনএ থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্রের বাইরেও এক বিশেষ ধরনের স্বতন্ত্র নিয়ম অনুসরণ করে। এই স্বতন্ত্র নিয়ম হল এক বিশেষ ধরনের স্থিতিশীলতা(stability)।

এই বিশেষ স্থিতিশীলতা বলতে আসলে কি বোঝায়?

আমরা রসায়নের জগতে যে স্থায়িত্ব দেখি সেটা হল মূলত স্থির স্থিতিশীলতা বা ‘Static stability’.  সকল স্বতঃস্ফূর্ত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়কের(reactant) চেয়ে উৎপাদের static stability বেশি হয়, অথবা উৎপাদের মুক্ত শক্তি(Free energy) বিক্রিয়কের মুক্ত শক্তির চেয়ে কম হয়। উৎপাদ হয় বিক্রিয়কের চেয়ে less reactive, উৎপাদের বিক্রিয়া করার প্রবণতা বিক্রিয়কের চেয়ে কম থাকে। অন্যভাবে বললে, যে যৌগের বিক্রিয়া করার প্রবণতা যত কম, সেটা তত বেশি স্থিতিশীল।

তবে প্রতিলিপি উৎপাদনে সক্ষম রেপ্লিকেটিভ মলিকুল ডিএনএ স্ট্যাটিক স্থিতিশীলতা অনুসরণ না করে গতিশীল স্থিতিশীলতা অনুসরণ করে। অধুনা রসায়নের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘Dynamic kinetic stability(DKS)’. Dynamic এবং Kinetic এই দুটো টার্ম আলাদা আলাদা ভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

Dynamic stability: Dynamic stability বা গতিশীল স্থিতিশীলতার ভালো উদাহরণ হল বহমান নদী বা পাহাড়ের গায়ে জলপ্রপাত। নদী বা জলপ্রপাতের গাঠনিক উপাদান পানির অণুগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তবে সার্বিকভাবে নদী বা জলপ্রপাত স্থিতিশীল থাকে। ডিএনএ এবং আরও সাধারণ অর্থে লিভিং সিস্টেম এই গতিশীল স্থিতিশীলতা অনুসরণ করে। মানুষ, গরু, ছাগল, ব্যাকটেরিয়া, বাঘ, সিংহ- প্রতিনিয়ত এদের জন্ম-মৃত্যু হয়, তবে সবমিলিয়ে একটা প্রজাতির পপুলেশন স্থিতিশীল থাকে। অর্থাৎ, এখানে ইন্ডিভিজুয়াল বা গাঠনিক একক এককভাবে স্থিতিশীল না হলেও তারা সার্বিকভাবে পপুলেশনকে স্থিতিশীল রাখে।

গতিশীল স্থিতিশীলতা শুধু প্রাণের উপরের স্তরে নয়, এর অনেক নিচের স্তরেও বিদ্যমান। শুধু যে মানুষ জন্মায় আর মরে এরকম নয়, জীবিত মানুষের(বা অন্য বহুকোষী জীবের)  দেহের কোষগুলো নিয়মিত পরিবর্তিত হয়, কোষের ভেতরে অঙ্গাণুগুলো, অঙ্গাণুর ভেতরে অণু-পরমাণুও নিয়মিতভাবে প্রতিস্থাপিত হয়।

Kinetic stability: নদীর স্রোত বা জলপ্রপাতের সাথে লিভিং সিস্টেমের স্বতন্ত্রতা সৃষ্টি করছে আরও বিশেষ ধোরণের কাইনেটিক স্ট্যাবিলিটি, যেটা নদীর স্রোতের মতো ফিজিক্যাল না, বরং কেমিক্যাল। লিভিং সিস্টেমে যে প্রতিনিয়ত ইন্ডিভিজুয়ালের সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে, এই পরিবর্তনের হারের মাঝে যে স্থিতিশীলতা সেটাই কাইনেটিক স্ট্যাবিলিটি। কোন পপুলেশনে ইন্ডিভিজুয়াল এর সৃষ্টির হারের চেয়ে যদি তার ধ্বংসের হার বেশি হয়, তাহলে সেই পপুলেশন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। অপরদিকে ইন্ডিভিজুয়াল সৃষ্টির হার যদি ধ্বংসের হারের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত বেশি হয় তাহলে সিস্টেমে নতুন ইন্ডিভিজুয়াল সৃষ্টির জন্য কাঁচামালের অভাব দেখা দেবে। ব্যাপারটা এরকম, প্রতি বছর যদি পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়, তাহলে আমাদের নতুন শিশু তৈরির জন্য কাঁচামাল(খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, দূষণহীন পরিবেশ) ইত্যাদির অভাব দেখা দেবে, তাই মানুষের সংখ্যা এমনিতেই কমে আসবে। তবে, সার্বিকভাবে সৃষ্টির হার একটা সীমার মধ্যে থেকে ধ্বংসের হারের চেয়ে বেশি হলে একটা সিস্টেম কাইনেটিকালি বেশি স্থিতিশীল হয়। যেমন, পান্ডা, রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির ইন্ডিভিজুয়ালের জন্মের হার মৃত্যুর হারের চেয়ে কম, তাই তাদের প্রজাতি মানুষের চেয়ে কাইনেটিকালি কম স্থিতিশীল।

লিভিং সিস্টেমের এই বিশেষ ধরনের ‘dynamic kinetic stability’ এর মূল চালিকাশক্তি হল পরিবেশের শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি সৃষ্টি করার ক্ষমতা, যেটা জড় জগতে অনুপস্থিত। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এর পেছনের নাটের গুরু আসলে একটা বায়োমলিকুল, লিভিং সিস্টেমের ইনফরমেশন সেন্টার এবং এর সার্বিক কার্যকলাপের নিয়ন্ত্রক, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড বা ডিএনএ(আপনি যদি ভেবে থাকেন যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে আপনার মস্তিষ্ক, জেনে রাখুন যে আপনার মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত হয় আপনার ডিএনএ দিয়ে।)

লক্ষ্য করুন, Static stability বজায় রাখার জন্য একটা যৌগকে less reactive হতে হবে, অপরদিকে DKS বজায় রাখতে হলে একটা যৌগকে ক্রমাগত বিক্রিয়া করে নিজের নতুন প্রতিলিপি তৈরি করে যেতে হবে। এদিক দিয়েও ডিএনএ অন্যান্য রাসায়নিক যৌগের চেয়ে স্বতন্ত্র।

৩। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেঃ

ডিএনএ একটি রাসায়নিক যৌগ, সে হিসেবে এটার স্টাডি হবার কথা রসায়নে । তবে ডিএনএ থেকেই জীবন তথা জীববিজ্ঞানের শুরু, সেদিক দিয়ে এটা রসায়ন আর জীববিজ্ঞানের যোগসূত্র, তাই রসায়নের চেয়ে জীববিজ্ঞানে এটা নিয়ে বেশি স্টাডি হয়। ডিএনএ নিজের প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারে, একারণে এটা বিবর্তিত হবার ক্ষমতা রাখে। এই ডিএনএ মলিকুলের ক্রমাগত বিবর্তনের ফলেই পৃথিবীতে জটিল প্রাণের সৃষ্টি এবং বিবর্তন হয়েছে(ধারণা করা হয় ডিএনএ নিজে বিবর্তিত হয়েছে আরএনএ থেকে, যেটা আরেকটা রেপ্লিকেটিভ বায়োমলিকুল।)

এখন পুরো পোস্টের মূল পয়েন্টে আসি। কিভাবে বা কেন ডিএনএ প্রাণের বিবর্তনকে সম্ভব করে তোলে?

খুব সহজ ভাষায় এর উত্তর হল, ডিএনএ নিজের প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারে, তাই।

এই সহজ কথাটা আরও কিছু কথা দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছি।

১। Replication: ডিএনএ এর গাঠনিক একক হল নিউক্লিওটাইড। ডিএনএ তে চার ধরনের নিউক্লিওটাইড আছে। এদের নামের আদ্যক্ষর হল A,T,G,C(আপাতত এর চেয়ে বেশি বিস্তারিত না জানলেও চলবে)।

একটা নির্দিষ্ট সিকুয়েন্সের ডিএনএ নিজের হুবহু প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে পারে। ধরা যাক, কোন ডিএনএ এর সিকুয়েন্স হল ATCGATCG. তাহলে, এর প্রতিলিপি সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন যেই ডিএনএ তৈরি হবে সেটার সিকুয়েন্সও হবে ATCGATCG

এই প্রক্রিয়াকে অনুপ্রাণ বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘replication’.

২। Mutation: ডিএনএ এর এই নিজের প্রতিলিপি সৃষ্টির কাজ সবসময় শতভাগ নিখুঁত হয় না, এতে ছোটখাট ভুলত্রুটি হয়ে যেতে পারে। যদি ভুলত্রুটি হয়, তাহলে সেই নতুন প্রতিলিপির চেহারা হুবহু তার আগের চেহারার মতো হবে না। ধরা যাক, আগের ATCGATCG সিকুয়েন্সের ডিএনএটির প্রতিলিপি সৃষ্টির কাজ ঠিকমতো হয় নি, এই ভুলের ফলস্বরূপ এর নতুন প্রতিলিপির সিকুয়েন্স হয়েছে TTCGATCG.

ডিএনএ প্রতিলিপি সৃষ্টির সময় এইরকম ভুলকে বলা হয়ে থাকে মিউটেশন। ডিএনএ প্রতিলিপি সৃষ্টির সময় যদি সিকুয়েন্সের কোন নিউক্লিওটাইড ডিলিট হয়ে যায় অথবা নতুন কোন নিউক্লিওটাইড যোগ হয়, তাহলে সেটাও মিউটেশনের পর্যায়ে পড়ে।

৩। Natural selection: এটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।

আগের উদাহরণ থেকে ধরা যাক, সিস্টেমে আগে শুধু  একটা সিকুয়েন্সের ডিএনএ ছিল(ATCGATCG), মিউটেশনের ফলে একটি নতুন ডিএনএ সিকুয়েন্সের সৃষ্টি হল(TTCGATCG)। সিস্টেমে এখন দুইটা সিকুয়েন্সের ডিএনএ আছে।( আদতে ডিএনএ এর রেপ্লিকেশন ঠিক এই প্রক্রিয়ায় ঘটে না, ডিএনএ ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হবার কারণে এর দুটো আলাদা আলাদা স্ট্রান্ডের রেপ্লিকেশন আলাদাভাবে ঘটে, সেখানে কমপ্লিমেন্টারি বেস পেয়ারিং ঘটে। আমি এখানে বোঝানোর সুবিধার্থে কিছুটা সরলীকরণের আশ্রয় নিলাম।)  

যদি এই মিউটেশনের ফলে সৃষ্ট নতুন ডিএনএ সিকুয়েন্সের dynamic kinetic stability(DKS)তার আগের সিকুয়েন্সের চেয়ে বেশি হয়, অর্থাৎ যদি নতুন ডিএনএ তার প্রতিলিপি তৈরিতে পুরনো ডিএনএ এর চেয়ে বেশি দক্ষ হয়, তাহলে নতুন ডিএনএ পুরনো ডিএনএ এর চেয়ে বেশি পরিমানে এবং দ্রুতগতিতে সংখ্যাবৃদ্ধি করবে। যেহেতু তারা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরিতে একই কাঁচামাল ব্যবহার করছে(চারটি  নিউক্লিওটাইড), তাই নতুন ডিএনএ এর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পুরনো ডিএনএ এর পক্ষে নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টির জন্য কাঁচামালের সংকট পড়বে। ফলে পুরনো ডিএনএ এর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে এবং এক পর্যায়ে তারা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

যদি মিউটেশনের ফলে উদ্ভূত নতুন ডিএনএ এর গতিশীল স্থিতিশীলতা বা DKS পুরনো ডিএনএ এর চেয়ে কম হয়, তাহলে তার ভাগ্য একই ঘটনা ঘটবে।

এই প্রক্রিয়ার নাম হল natural selection.

(লক্ষ্য করুন, এখানে দুটোর মধ্যে একটা ডিএনএ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণটা হল, তারা নিজেদের প্রতিলিপি সৃষ্টিতে একই কাঁচামাল ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, তারা কাঁচামালের জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। যদি একটি ডিএনএ তার রেপ্লিকা সৃষ্টির জন্য ভিন্ন কোন কাঁচামাল বেছে নিতে পারত, তাহলে তাদের সহাবস্থান সম্ভব ছিল।)

৪। Evolution: ধরা যাক, এই ১ থেকে ৩ নম্বর পয়েন্টের কার্যকলাপ ১0 লক্ষবার রিপিট করা হল। তাহলে শেষমেশ এর অবস্থা কি দাঁড়াবে?

অসংখ্যবার মিউটেশন হবে, এবং অনেক মিউটেশনের ফলে সৃষ্ট নতুন ডিএনএ সিকুয়েন্সের DKS(dynamic kinetic stability) তাদের আগের সিকুয়েন্সের চেয়ে বেশি হবে। মিউটেশনের ফলে ডিএনএ এর সিকুয়েন্সে নিউক্লীওটাইডের সংখ্যাও পরিবর্তিত হতে পারে, তাই এমন হতে পারে ৫০ নিউক্লিওটাইডের সিকুয়েন্সের একটা ডিএনএ   ১০০ নিউক্লিওটাইডের একটা সিকুয়েন্সে পরিণত হবে(খেয়াল করুন, একেবারে কিন্তু লাফিয়ে ৫০ থেকে  ১০০ হয়ে যাচ্ছে না, প্রত্যেক বার নিউক্লিওটাইডের সংখ্যা বেড়েছে(কিংবা মাঝেমাঝে কমেছেও) নতুন ‘সফল’ মিউটেশনের উপর ভিত্তি করে । প্রত্যেকবার ‘সফল’ মিউটেশন হবার পর কিন্তু ছাঁচ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বেশী স্থিতিশীল নতুন সিকুয়েন্স, পুরনো সিকুয়েন্স নয়)।

এতগুলো সাইকেলের পরে হয়তো পুরনো সিকুয়েন্সের কোন অংশই আর নতুন সিকুয়েন্সে থাকবে না, বা থাকলেও খুব কম অংশই নতুন সিকুয়েন্সে সংরক্ষিত থাকবে।অর্থাৎ, আগের ডিএনএ সিকুয়েন্স ‘বিবর্তিত’ হয়ে নতুন সিকুয়েন্সে পরিণত হবে। এটা হল আণবিক লেভেলে বিবর্তন। ম্যাক্রো লেভেলে বিবর্তন আসলে আণবিক বিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি মাত্র। আণবিক লেভেলে বিবর্তন হল ম্যাক্রো লেভেলে বিবর্তনের পূর্বশর্ত।

ডিএনএ তথা নিউক্লিক এসিডের এই বিবর্তন কিন্তু শুধুই গালগপ্প নয়, এটা ল্যাবের পরীক্ষায় প্রমাণিত। ১৯৬৭ সালে ইলিনয়িস বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপ্রাণ বিজ্ঞানী Sol Spiegelman টেস্টটিউবে পর্যাপ্ত কাঁচামাল, উপযুক্ত পরিবেহস এবং রেপ্লিকেশনের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমের উপস্থিতিতে সেলফ রেল্পিকেটিং আরএনএ মলিকুলের রেপ্লিকেশন এবং বিবর্তন করাতে সক্ষম হন(১)(আরএনএ আর ডিএনএ উভয়েই নিউক্লিক এসিড। আরএনএ ডিএনএ এর জাতভাই, তবে সব আরএনএ মলিকুলের রেপ্লিকেশনের dnaক্ষমতা নেই।) ১৯৮৬ সালে জার্মান কেমিস্ট Gunter von Kiedrowski এই প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেন, তিনি কোন এনজাইমের সাহায্য ছাড়াই ডিএনএ মলিকুলের রেপ্লিকেশন ঘটাতে সক্ষম হন।(২)

ডিএনএ এর বিবর্তন সাথে প্রাণের বিবর্তনের কি সম্পর্ক?

ডিএনএ সিকুয়েন্সের বিবর্তনের কারণেই প্রাণের বিবর্তন হয়। কারণ, ডিএনএ লিভিং সিস্টেমের ইনফরমেশন সেন্টার এবং সকল কার্যকলাপের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে হিসেবে কাজ করে। উপরের উদাহরণে আমি যেরকম ডিএনএ এর মিউটেশন ব্যাখ্যা করলাম, এরকম মিউটেশন আদতে প্রানিদেহে বা উদ্ভিদদেহে অহরহ ঘটে থাকে। বেশিরভাগ মিউটেশন সেই অরগানিজমের DKS কমিয়ে দেয়, তাই যেসব প্রাণীর দেহে এরকম মিউটেশন ঘটে তারা টিকে থাকতে পারে না( বলে রাখি, ক্যান্সার কিন্তু এক ধরনের মিউটেশন)। তবে কালক্রমে কিছু মিউটেশন সেই অরগানিজমের DKS বাড়িয়ে দেয়, সেই মিউটেশনওয়ালা অরগানিজমগুলো আরও বেশি দক্ষতার সাথে বংশবৃদ্ধি তথা টিকে থাকতে পারে। এভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের পরিক্রমায় সেই অরগানিজম আরও অনেক অনেক নতুন মিউটেশন তৈরি করে , জন্ম দেয় আরও অনেক নতুন নতুন ডিএনএ সিকুয়েন্সের। এভাবে একটা প্রজাতি থেকে জন্ম হয় আরও অনেক নতুন শাখা প্রজাতির।

এইসব কথার পেছনে খুব সরল অথচ শক্তিশালী প্রমাণ আছে। ব্যাকটেরিয়া আমাদের আদি পূর্বপুরুষ। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকুয়েন্স আমাদের ডিএনএ সিকুয়েন্সের আদি পূর্বপুরুষ। উদ্ভিদ, মাছ, সরীসৃপেরা আমাদের আরেকটু কাছের পূর্বপুরুষ। এ সবই বোঝা যায় আমাদের ডিএনএ সিকুয়েন্স মিলিয়ে। রক্তের দাগ যেমন চাইলেও ধোঁয়া যায় না, ডিএনএ এর দাগ আরও বেশি অলঙ্ঘনীয়। এতো বিলিয়ন বছরে বিবর্তনের পরিক্রমায় তৈরি হয়েছে আজকের আধুনিক মানুষের ডিএনএ সিকুয়েন্স। এই দীর্ঘ চলার পথের বাঁকে বাঁকে অসংখ্য মিউটেশন হয়েছে, তবে এর মাঝে এতো বছর পার হয়ে যাবার পরেও আমাদের কোষের ডিএনএ তার মাঝে ব্যাকটেরিয়া, গাছ, মাছ, সরীসৃপদের ডিএনএ এর কিছু নির্দিষ্ট সিকুয়েন্স সংরক্ষণ করে রেখেছে। কার সাথে আমাদের আত্মীয়তা কতটুক সেটা আমাদের ডিএনএ সিকুয়েন্সের তুলনা করলেই বোঝা যায়(শিম্পাঞ্জীর সাথে মানুষের ডিএনএ সিকুয়েন্সের মিল শতকরা ৯৮ ভাগেরও বেশি।)

মলিকুলার লেভেলে বিবর্তন রসায়নের ল্যাবেই চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। রসায়নের স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই সেলফ রেপ্লিকেটিং মলিকুলগুলো বিবর্তিত হয়। তাই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের প্রবক্তারা যেমনটা দাবি করে থাকেন যে জীবজগতের জটিলতার ব্যাখ্যার জন্য স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ বা বহিঃস্থ কোন এজেন্টের দরকার, সেটা আসলে অমূলক। বরং এই জটিলতার পেছনে যে এজেন্ট বা প্রভাবক কাজ করছে সেটা হল আভ্যন্তরীণ, এই এজেন্ট হল পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়নের সাধারণ নিয়মগুলো।

আর তারা যে দাবি করে থাকেন যে জীবজগতের ডিজাইন অতি নির্ভুল (মূলত মানবদেহের উদাহরণ দিয়ে), সেটাও আসলে সঠিক নয়। বিবর্তন যেহেতু পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়নের নিয়ম মেনে যাওয়া একটা অন্ধ প্রক্রিয়ামাত্র, এর কোন বিচারবোধ বা বুদ্ধিশুদ্ধি নেই। এটা বিশেষভাবে মানুষদেহের জন্য একটা পারফেক্ট ডিজাইন তৈরি করবে এমনটা হবার কথা নয়, এমনটা হয়ও নি। মানবদেহের গঠনের খুঁটিনাটিতে নানাধরনের ত্রুটি বিদ্যমান, কোন মহান বুদ্ধিমান সত্তার ডিজাইনে এতো ভুল থাকার কথা ছিল না। এগুলো নিয়ে লিখতে গেলে লেখা আরও অনেক বড় হয়ে যাবে, আজকে তাই আর বিস্তারিত লিখছি না। কেউ কষ্ট করে গুগলে ‘Imperfection in Human Body’ লিখে সার্চ দিলেই অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। উইকির ‘Argument for poor design’ পেজটাও দেখতে পারেন কেউ চাইলে।

Reference:

  1. Mills DR, Peterson RL, Spiegelman S, An extracellular Darwinian experiment with a self-duplicating nucleic acid molecule. PNAS 58:217, 1967.
  1. von Kiedrowski G, A self-replicating hexadeoxynucleotide. Angew. Chem. Int. Ed. Eng. 25: 932–4, 1986.

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

6 মন্তব্য on "(আন) ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
S. A. Khan
সদস্য

‘ব্যাড ডিজাইন’ অর্থাৎ মানবদেহের গাঠনিক ত্রুটি যেগুলো আসলে কোন ‘সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি’র মধ্যে থাকার কথা নয় এবং কোন ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইনারের ডিজাইনেএধরনের ত্রুটি থাকা উচিত নয় সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত একটি লেখা আশা করছি। সেখান থেকে আরো পরিষ্কার হওয়া সম্ভব হবে যে ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইনারের ডিজাইন ত্রুটি নয় বরঞ্চ বিবর্তনের ধারাতেই উক্ত ত্রুটিসমুহের উৎপত্তি।

Naeem
অতিথি

হা হা হা……ঘুরে ফিরে আগের তেনাই পেচাইলেন। আসমান থেকে ঠাডা পড়ে একটা স্টুপিড ব্যাকটেরিয়া তৈরি হল, তারপর সেখান থেকে একটা হাইলি কম্পলেক্স এন্ড ইন্টেলিজেন্ট মানুষ তৈরি হয়ে গেল। :v

nayeem
অতিথি

What is the origin of ocean water

Mehedi
অতিথি

যদি বিবর্তনবাদ সত্যি হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় এই প্রক্রিয়া এখনও চালু থাকার কথা।কিন্তু আমরা তো এরকম কোনো ঘটনা দেখছি না।কিছু মানুষ যদি নিজেকে বানরের বংশধর মনে করে এতে আমার কোনো আপত্তি নেই তবে আমি আদমের বংশধর।

wpDiscuz