কেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ একজন বন্ড ভিলেন হবার জন্যে উপযুক্ত – শেষ পর্ব

আগের দুই পর্বে (পর্ব ১, পর্ব ২) আমরা জেনেছিলাম, রেনেসাঁ যুগের মাস্টার মাইন্ড লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কিছু প্রযুক্তিগত চিন্তা-ভাবনার কথা, যেগুলো দেখলে ‘এম আই সিক্স’ এর মত বাঘা কোনো ইন্টেলিজেন্স সংস্থারও প্যান্ট নষ্ট হয়ে যেতো। যদি ভিঞ্চির আমলে তাদের অস্তিত্ব থাকতো, তবে তারা চাইতো ভিঞ্চিকে তাদের দলে ভেড়াতে। কিন্তু যেহেতু ভিঞ্চি বাস্তবে তার এইসব ভয়াবহ আবিষ্কার পুরোপুরি গোপন রেখে গিয়েছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, তাই ধারণা করা যায়- তিনি এম আই সিক্সের সেই অফারও ফিরিয়ে দিতেন। তখন বাধ্য হয়ে এম আই সিক্স তাদের ‘টপ টেরর’ তালিকার এক নাম্বারে নাম ঘোষণা করতো ভিঞ্চির। ভিঞ্চির লাইফ তামা তামা করতে তারা সবার সামনে তাকে উপস্থাপন করতো “মানবতার জন্যে হুমকি” হিসেবে। আর এদিকে এজেন্ট ‘জিরো জিরো সেভেন’ কে গোপনে লেলিয়ে দিতো ভিঞ্চির এসব আবিষ্কারের ব্লু-প্রিন্ট চুরি করার জন্যে। (হলিউডের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের থেকে বন্ড মুভির এই আইডিয়াটা ধার নিতে পারেন। না, কোনো টাকাপয়সা লাগবে না। এজেন্ট জিরো জিরো সেভেনের বিপরীতে ভিঞ্চির মত একজন মাস্টার মাইন্ডকে ভিলেন হিসেবে পেয়েই আমরা খুশি!)

কথা হচ্ছে- ভিঞ্চিকে সবার সামনে স্কারম্যাঙ্গা, গোল্ডফিঙ্গার, কিংবা ব্লোফেল্ড এর মত কিংবদন্তীতুল্য বন্ড ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করতে এম আই সিক্সের বেশী বেগ পেতে হতো না। এর কারণ আমাদের এই মাস্টার মাইন্ডের রেখে যাওয়া কিছু আবিষ্কারের নকশা; যেগুলো ভিঞ্চির শান্তিকামী, সৌন্দর্যপিপাসু শিল্পী-সত্তার আড়ালে এক ভয়াবহ সাইকোপ্যাথের উপস্থিতিকেই নির্দেশ করে। যেমন-

৭। ঘোড়ায় টানা রথ (ম্যাড ম্যাক্স স্টাইল)

১৯৭০ এর দশকে যখন কল্প-বিজ্ঞানভিত্তিক মুভি সিরিজ ‘ম্যাড ম্যাক্স’ এর প্রথম কিস্তি মুক্তি পায়, তখন সেটা ‘ইনস্ট্যান্ট ক্লাসিক’ মুভির তালিকায় চলে যায়। এর প্রধান কারণ ছিলো- গতানুগতিক কল্পবিজ্ঞান গল্পের সাথে উদ্ভট সব অ্যাকশন সিকোয়েন্সের সমাহার। পারমাণবিক যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিরান পৃথিবীতে কীভাবে মানব সভ্যতা একটু খাদ্য এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে উঠতে পারে- সেটাই ছিলো এই মুভি সিরিজের মূল আলোচ্য বিষয়। এই ‘ম্যাড ম্যাক্স’ হতে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে ‘ফলআউট’ ভিডিও গেইম সিরিজ তৈরি করা হয়েছিলো- যেটা তিন প্রজন্ম পরে এখনো এত জনপ্রিয় যে, খুব শীঘ্রই এই একই নামে একটা টিভি সিরিজ তৈরি করার চিন্তা-ভাবনাও চলছে

ব্যাপার হলো- ম্যাড ম্যাক্সের রক্ত টগবগ করা উন্মাদ সব অ্যাকশন সিকোয়েন্সকে আরো ব্যাপকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সহায়তা করেছিলো এর বিশেষভাবে ডিজাইন করা সব যানবাহন। ম্যাড ম্যাক্স সিরিজের প্রতিটা মুভিতেই এসব ভয়াবহ আকৃতির যানবাহনের ছিলো সরব উপস্থিতি। এদের একটা হতে আগুনের হলকা বেরুচ্ছে তো আরেকটা হতে মেশিনগানের মত গুলি ছুটছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো- পারমাণবিক যুদ্ধ পরবর্তী বিরান প্রান্তরে, সীমিত কিছু সম্পদ নিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে নামা উন্মাদ মানবগোষ্ঠীর সদস্যরাই এইসব যানবাহন প্রথম তৈরি করেনি। এসব ভয়াবহ যানের আবির্ভাব ফিকশনের জগতেই প্রথম নয়। বরং বাস্তবে আরো পাঁচশ’ বছর আগেই ভিঞ্চির কল্পনায় এদের আবির্ভাব। ভিঞ্চির কল্পনাদ্ভূত এসব ডিজাইন দেখলে বিরান প্রান্তরের একচ্ছত্র অধিপতি ‘লর্ড হিউমোঙ্গাস’ এরও মাথা খারাপ হয়ে যেতো!

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন

এই লেখার দ্বিতীয় পর্বে ভিঞ্চির ‘ক্লাস্টার বোমা’ তৈরির ডিজাইন নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেছিলাম- কীভাবে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের মধ্যেকার শত-বর্ষব্যাপী যুদ্ধে ঘোড়া-নির্ভর বাহিনীরা ‘অজেয়’ হতে পুরো ‘অসহায়’ হয়ে পড়েছিলো নিত্য-নতুন সব প্রযুক্তি এবং যুদ্ধ-কৌশলের সামনে। সেই যুদ্ধে ঘোড়সওয়ারী নাইটদের হটিয়ে পাইক-ম্যান এবং ম্যান-অ্যাট-আর্মসদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা পদাতিক বাহিনীরা হয়ে উঠেছিলো যুদ্ধ ময়দানের মূল নিয়ন্ত্রণ শক্তি।

হাজারে হাজারে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে লাখে লাখে পদাতিক বাহিনীর এইভাবে যুদ্ধের ময়দানে আবির্ভাবের পর বাঘা বাঘা যুদ্ধকৌশল বিদেরা চিন্তা করতে লাগলেন কীভাবে ঘোড়া-নির্ভর বাহিনীকে ঢেলে সাজানো যায়। যুদ্ধের ময়দানে পাইক-ম্যানদের অতি পছন্দের টার্গেট ছিলো ঘোড়ারা। ধরুন, তীব্র বেগে নাইট ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসছে। সেটার ভয়ানক গতির সামনে পড়ে বিপক্ষ শিবিরের সৈনিকদের দফারফা অবস্থা। যারা কোনোক্রমে পাশ কাটিয়ে সরে যাচ্ছে তাদেরও নিস্তার নেই। নাইটের খোলা তলোয়ারে পরের মুহূর্তেই তাদের মুণ্ডু ধড় হতে আলাদা। ঠিক এই সময় শত্রুপক্ষের এক ফাজিল পাইক-ম্যান ঘোড়ার ছুটে চলা চার পায়ের মাঝে বাঁধিয়ে দিলো বিশাল লম্বা বর্শা। ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়লো মাটিতে। নাইট ছিটকে পড়লো আরো এক মাইল দূরে। কীভাবে এমন লেজে-গোবরে পরিস্থিতি হতে ঘোড়ার মত একটা দুর্ধর্ষ যুদ্ধের বাহনের উত্তরণ সম্ভব?

উত্তর হচ্ছে- সেই দুর্ধর্ষতার সাথে এক চিমটি উন্মত্ততা যোগ করে দেয়া। ভিঞ্চিও আগালেন সেই পথে। তিনি ডিজাইন করলেন এমন এক ঘোড়ার রথের, যেটার ভয়াবহতা দেখে মানবতাবাদী ‘জেনেভা যুদ্ধ আইন’ প্রণেতারা সবাই হার্ট-অ্যাটাক করে মারা যাবে।

Scythed_chariot_by_da_Vinci
উপরের ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন ভিঞ্চির ডিজাইন করা ‘ঘূর্ণনক্ষম’ ধারালো ব্লেডযুক্ত ঘোড়ার রথ। ‘ডাবল হর্স-পাওয়ার’ বিশিষ্ট (দুই ঘোড়ায় টানা) এই রথকে দুটি আলাদা মডেলে ভিঞ্চি বাজারে নামাতে চেয়েছিলেন। একটায় ঘুরন্ত ব্লেড থাকবে রথে ঘোড়ার অবস্থানের ঠিক সামনে, আরেকটায় থাকবে পেছনে (উপরের ছবি দ্রষ্টব্য)। ঘোড়ারা যখন রথটাকে টেনে নিয়ে যাবে, তখন সেটার চাকার ঘূর্ণনগতি (যেটা ভূমির সাথে লম্ব) রড এবং গিয়ার মেকানিজমের মাধ্যমে সঞ্চারিত হবে ভূমির সমান্তরালে থাকা ধারালো ব্লেডে। সেই ব্লেডটাও তখন বৈদ্যুতিক পাখার মত সাঁই সাঁই করে ঘুরতে থাকবে, আর আশেপাশে থাকা সব বস্তুকে (এক্ষেত্রে ময়দানের সৈন্যদের) মসৃণভাবে কেটে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এক ঘাস কাটার যন্ত্রকে চালু করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে মাঠে, আর সেটা বিশাল বড় বড় সব দূর্বাঘাস কাটতে কাটতে সুন্দর একটা পথ তৈরি করে সামনে আগাচ্ছে!

ঠিক এমন, তবে কল্পনা করুন- চুলের বদলে পুরো মাথাটাই নেই!

ঠিক এমন, তবে কল্পনা করুন- চুলের বদলে পুরো মাথাটাই নেই!

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
একটু বেশিই! যারা যুদ্ধ যানটার কার্যপদ্ধতি বুঝেছেন, তারা ইতোমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন যে এই যন্ত্রের শত্রু-মিত্র বাছ-বিচারের কোনো বালাই নেই। যুদ্ধের ময়দানের একধার হতে সে স্রেফ ঘাস কাটার মত করে সবকিছুকে কাটতে কাটতে আগাবে। ভিঞ্চি নিজেও জানতেন তার ডিজাইনের এই ত্রুটির কথা। কিন্তু তাতে খুব একটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হয়নি। এর কারণ সম্ভবত ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অভাব। মিলান দু চক্ষে দেখতে পারতো না ভেনিসকে, ভেনিস সহ্য করতে পারতো না জেনোয়াকে, আর জেনোয়া তো পারলে লাঠি নিয়ে তাড়া করে ফ্লোরেন্সকে! এদিকে আগেই বলেছিলাম, ইতালির সৈন্যরা প্রায় সবাই ছিলো বাইরের দেশ হতে ভাড়া করা। মিত্র সংখ্যা কম হবার ফলে যুদ্ধের ময়দানে কে এই যন্ত্রের তলে কাটা পড়লো- সেটা নিয়ে তাই বেশি ভাবতে হয়নি ভিঞ্চিকে। ফলে যেটুকু সময় বেঁচে গিয়েছিলো, সেটুকু সময় তিনি ব্যয় করেছিলেন রথের ডিজাইনের আশপাশে মনের মাধুরী মিশিয়ে সব ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মানুষের শরীর এঁকে তার এই ভয়াবহ আবিষ্কারের কার্যকারিতা প্রমাণে (ছবিতে লক্ষ্য করুন ভালোমতো)। পরে সেটা উপস্থাপন করেছিলেন মিলানের ডিউক ‘লুদভিকো ইল মোরো’ এর নিকট। যদিও পরবর্তীতে মিলানের ডিউক আর এই ভয়াবহ বস্তুটা বানানোর মত পর্যাপ্ত সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি।

৮। মেশিন গান

আহ, মেশিন গান! অটোমেটিক বন্দুকদের রাজা। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিরোধকারী পক্ষের পরম বন্ধু। বদমাশ ভিলেনের দফা-রফা করতে শোওয়ার্জেনেগার এবং স্ট্যালোনের মত হিরোদের প্রথম পছন্দ! যদিও বন্দুক এবং গান পাউডার ভিত্তিক অন্যান্য অস্ত্রসমূহের আবির্ভাব আরো আগেই ঘটেছিলো, কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত মেশিন গানের বাস্তব ব্যবহারের দেখা মেলেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকান নেভী সর্বপ্রথম যুদ্ধের ময়দানে ‘গ্যাটলিং গান’ নামক এক বস্তুর আমদানি করে। সেটা দিয়েই আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে মেশিন গানের পদচারণা শুরু। কিন্তু মেশিন গান নিয়ে আমাদের সবার কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন মেশিন গানের কথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এই ধরনের ছবি।

sylvester-stallone-rambo-ii
অথচ বাস্তবতা হলো- শোওয়ার্জেনেগার কিংবা স্ট্যালোনদের মত হেভি ওয়েট অ্যাকশন হিরোরা যেসব দানবাকৃতির বন্দুক দিয়ে নিয়মিতভাবে ভিলেনদের পশ্চাতদেশের ছাল ছাড়ান, সেগুলোই একমাত্র মেশিন গান নয়। সেগুলো মেশিনগানের এক বিশেষ শ্রেণীতে পড়ে মাত্র, যেটা হচ্ছে ‘হেভি মেশিনগান’। বাস্তবে মেশিনগান পিস্তলের মত অতি হালকা এবং এক হাতে বহনযোগ্যও হতে পারে, যেমন- উজি গান, ম্যাক-১০ ইত্যাদি। টেকনিক্যালি, যে বন্দুকে ট্রিগার শুধু একবার টেনে ধরে রাখলেই সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটানা ফায়ার করে পুরো ম্যাগাজিন খালি করে দিতে পারে- সেটাই মেশিনগান।

আর আরেকটা ভুল তথ্য হলো, মেশিন গান পুরোপুরি আধুনিক মানুষদের আবিষ্কার নয়। এর গোড়াপত্তন মূলত ৫০০ বছর আগে ভিঞ্চির হাতে, সেই সময়ে যখন ঢাল-তলোয়ার আর বল্লম-সড়কির মতো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে একে অন্যের ঘাড়ের উপরে লাফিয়ে পড়ার রীতি প্রচলিত ছিলো!

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমার নীতি খুবই কঠোর : যদি আমার আশেপাশে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, তবে সেটার নিয়ন্ত্রণ আমি আমার হাতেই চাই!  ক্লিন্ট ইস্টউড (আমেরিকায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে এক প্রশ্নের উত্তরে)

কথা হচ্ছে, ‘ক্লিন্ট ইস্টউড’ এই ব্যাপারে পুরোপুরি একা নন। তার বক্তব্যকে “ভালো, মন্দ, কুৎসিত”- যাই মনে হোক না কেন, কথা সত্য! ইতিহাস কলম দিয়ে লেখা হয় না, লেখা হয় বন্দুক দিয়ে। বন্দুকের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, ইতিহাসও তার পক্ষেই সবসময় “হুজুর! হুজুর!” করতে থাকে। যাই হোক, বন্দুকের উদ্ভব ‘গান পাউডার’ নামক যে উপাদান হতে, সেই গান পাউডারের আবির্ভাব ঘটে সর্বপ্রথম চীনে নবম শতকের দিকে। কিন্তু সেই গান পাউডার হতে আধুনিক বন্দুকের মত কাছাকাছি যন্ত্রের আবির্ভাব ঘটতে সময় লাগে আরো প্রায় তিনশত বছর। চাইনিজ সেনাবাহিনীতে দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে যোগ করা হয় ‘হ্যান্ড ক্যানন’ বিশিষ্ট সৈনিকদের। তবে সেই হাত কামানগুলোকে পরবর্তীতে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করে তুর্কীরা তাদের দুর্ধর্ষ ‘জেনিসারী’ বাহিনীর মাধ্যমে।

হাত কামান প্রযুক্তি দিয়ে চাইনিজ এবং টার্কিশরা মধ্যযুগের ইতিহাসে নিজেদের সুপার-পাওয়ার হিসেবে অধিষ্ঠিত করলেও যুদ্ধের ময়দানে এসব হ্যান্ড ক্যানন ব্যবহার করা ছিলো বেশ ঝামেলাপূর্ণ। প্রথমত, প্রতিবার গুলি ছোঁড়ার পর ধৈর্য ধরে বসে বসে রিলোডিং করা ছিলো অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। দ্বিতীয়ত, কিছুক্ষণ পরপরই যাচাই করে দেখে নিতে হতো ব্যারেলগুলো বেশী উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কিনা। বেশী উত্তপ্ত হলে হাত কামান গুলি ছোঁড়ার বদলে নিজের মুখের উপরেই ফেটে যাবে। আর সেই সাথে বোনাস উত্তেজনা হিসেবে ছিলো- নিখুঁত নিশানা-ভেদে এসব হাত কামানদের ব্যর্থতা। যথারীতি, ভিঞ্চি ভাবতে বসলেন হাত কামানের এসব সংকট দূর করার ব্যাপারে। কিন্তু তাঁর জিনিয়াস মাইন্ড আমাদের সাধারণ আই-কিউ বিশিষ্ট মানুষদের ব্রেইনের মতো ‘হ্যান্ড ক্যানন’ হতে ‘হ্যান্ড গান’ এ যায়নি। সেটা সরাসরি চলে গেলো ‘মেশিন গান’ এ!

gun_l
উপরে দেখতে পাচ্ছেন ভিঞ্চির ডিজাইন করা আগ্নেয়াস্ত্র, যেটাকে নির্দ্বিধায় প্রথম প্রজন্মের মেশিন গান বলা যায়। যেহেতু, তার সব আবিষ্কারকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিবিশিষ্ট না করা পর্যন্ত ভিঞ্চির পেটের ভাত হজম হতো না, সেহেতু তিনি তার এই আবিষ্কারকেও স্বয়ংক্রিয় করে ফেললেন। এই মেশিন গানে গুলি ছোঁড়া বন্ধ না করেই একই সময়ে ব্যারেল ঠাণ্ডা করার এবং বুলেট লোড করতে থাকার ব্যবস্থা ছিলো। ছবিতে যেমন দেখতে পাচ্ছেন- এই মেশিন গানে একটা কাঠের তৈরি প্রিজম আকৃতির ফ্রেমে প্রতি সেটে এগারটা করে তিন সেটে মোট ব্যারেলের সংখ্যা ছিলো তেত্রিশটা। এক সেটের ফায়ারিং শেষ হবার সাথে সাথে মেশিন গানটার দায়িত্বে থাকা একজন সৈনিক সামনের প্রিজম আকৃতির কাঠের ফ্রেমটা ঘুরিয়ে দিতো। ফলে সদ্য ব্যবহৃত ব্যারেলগুলো কিছুক্ষণের জন্যে অবসরে চলে যেতো ঠাণ্ডা হবার উদ্দেশ্যে, আর নতুন এক সেট ব্যারেল সম্মুখে চলে আসতো ফায়ারিং এর লক্ষ্যে। যে দুই সেট অবসরে থাকতো, সৈনিকেরা বসে বসে সেই দুই সেটের ব্যারেলে বুলেট লোড করতো- ঠিক একই সময়ে যখন ফায়ারিং করতে থাকা হতো তৃতীয় সেটের ব্যারেলগুলো হতে। বুলেটের কথা যখন আসলোই, তখন ভিঞ্চির ডিজাইন করা এই মেশিনগানের বুলেটগুলোও দেখুন।

17795
কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
টার্কিশ জেনিসারীরা রণক্ষেত্রে যতটা ভয়াবহ ছিলো- সেটাকে গুণ দিন তিন দিয়ে (হাত কামানের রিলোডিং, ওভার হিটিং এবং নিখুঁত নিশানা-ভেদের সমস্যা দূর করতে পারার জন্যে)। তারপর প্রাপ্ত সংখ্যাটাকে আবার গুণ দিন তেত্রিশ দিয়ে (তেত্রিশটা ব্যারেলের জন্যে)। সর্বশেষ ফলাফল যেটা পেলেন, সেটাই ভিঞ্চির মেশিন গানের কার্যকারিতা মাত্রা। অর্থাৎ ভিঞ্চির সমসাময়িক সব গান পাউডার প্রযুক্তির (বড় কামান বাদে) তুলনায় নিরানব্বই গুণ শক্তিশালী ছিলো তার আবিষ্কৃত এই মেশিন গান! ভিঞ্চি আদর করে তার এই আবিষ্কারের নাম রেখেছিলেন ‘অর্গান’, যেটা আমাদের মতে- ভিঞ্চির পক্ষ হতে আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মানুষদের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া এক নির্মম রসিকতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। কপাল ভালো, ভিঞ্চি পরে আর এই ভয়াবহ জিনিসটা বানানোর জন্যে সময় বের করে উঠতে পারেননি। তাই, আমাদের আরেকটা বাস্তব এবং কার্যকর মেশিনগান পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধার আগ পর্যন্ত।

৯। মরণ-রশ্মি বা ডেথ-রে

সায়েন্স ফিকশনের এক অনবদ্য উপাদান হলো ‘ডেথ-রে’। বহুযুগ ধরে সায়েন্স ফিকশন আমাদের লেজার মারণাস্ত্রের লোভ দেখিয়ে রাতের ঘুম হারাম করিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত সেই রকম ভয়ংকর কোনো লেজার মারণাস্ত্রের দেখা আমরা পাইনি। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত ভয়ংকর ডেথ-রে বলতে আছে এই জিনিসটা,

আতশ কাঁচ- পিঁপড়েদের লাইফ সফলতার সাথে তামা তামা করে আসছে, সেই ১৯৫৩ সাল থেকে!

আতশ কাঁচ- পিঁপড়েদের লাইফ সফলতার সাথে তামা তামা করে আসছে, সেই ১৯৫৩ সাল থেকে!

কথা হচ্ছে, ডেথ-রে আধুনিককালে নিকোলা টেসলার মত দুর্ধর্ষ প্রযুক্তিবিদই প্রথম আবিষ্কার করে যাননি। এবং না, এটার সূত্রপাত তালিকার বাকি সব নামগুলোর মত ভিঞ্চির হাতেও হয়নি। এটার সূত্রপাত হয়েছিলো খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে তৃতীয় শতকে বিজ্ঞানী ‘আর্কিমিডিস’ এর হাতে। কিন্তু ভিঞ্চি আর্কিমিডিসের সেই আবিষ্কারকে আরো ভয়াবহ রূপদান করেছিলেন।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
আর্কিমিডিসের মতো ভিঞ্চিও জানতেন সৌররশ্মির ক্ষমতা সম্পর্কে। আমরা যেখানে শৈশবে আতশ-কাঁচ দিয়ে পিঁপড়েদের মতো পরিশ্রমী প্রাণীদের জীবনটা তামা তামা করতে ব্যস্ত ছিলাম, সেখানে ভিঞ্চি স্বপ্ন দেখেছিলেন আরো বড় কিছুর। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আশেপাশের এলাকা হতে অনেকগুলো আয়নার মাধ্যমে সমস্ত সৌর রশ্মি সংগ্রহ করে সেটাকে এক বিন্দুতে স্থির করলে ফলাফলটা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে। এই চিন্তা-ভাবনা হতেই তিনি কিছু আঁকিবুঁকি করেছিলেন, যেটা পরে পাওয়া গিয়েছিলো তারই রচিত ‘কোডেক্স অ্যাটলান্টিকা’ নামক গ্রন্থে।

web-fire2
ভিঞ্চির ইচ্ছা ছিলো কেন্দ্রীভূত সৌর রশ্মির এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি কিছু যন্ত্রপাতি বানাবেন। যেমন- ধাতু ঝালাই (soldering) করার যন্ত্র, পানি গরম করার যন্ত্র, ইত্যাদি। ইতালির ফ্লোরেন্টিন অঞ্চল ছিলো উলের পোশাক উৎপাদনের জন্যে বিখ্যাত। ভিঞ্চি পরিকল্পনা করেছিলেন আধা মাইল ব্যাসার্ধ ব্যাপী এমন এক আয়না বানাতে যেটা দিয়ে পুরো ফ্লোরেন্টিন অঞ্চলের উল পোষাকশিল্পের জন্যে গরম পানি সরবরাহ করা যাবে। সেই সাথে চেয়েছিলেন বাসা-বাড়ির সুইমিং পুলগুলোতেও গরম পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে। কারণ-  ‘জাকুজি’ এর হট পানিতে আরাম পেতে কে না পছন্দ করে? রোমানরা তো বটেই!

হট!!

হট!

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
ভিঞ্চির এই ডিজাইনকে সাধারণ আয়না বলে অভিহিত করা আসলে ভুল। সাধারণ আয়নারা শুধু সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু ভিঞ্চির ডিজাইনে ব্যবহৃত আয়নাগুলো সূর্যের আলোর ক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখতো। সেগুলো ‘অ্যামপ্লিফায়ার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম ছিলো। কেউ চাইলে এসব আয়না কোনো টাওয়ারের উপর স্থাপন করে সমুদ্রের উপরে ভাসমান শত্রু জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু সেটা আর পরে করা হয়ে ওঠেনি। কে জানে, হয়তো সেটাই হতো আমাদের ‘ডেথ স্টার’ তৈরি করার প্রথম পদক্ষেপ!

আমাদের এই পুরো ‘ভিঞ্চি’ ট্রিলজির সারকথা হলো- এটা মানবজাতির সৌভাগ্য যে রেনেসাঁ যুগের মাস্টার মাইন্ড ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ এসব ভয়াবহ আবিষ্কারের চেয়ে তার রং-তুলির ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে বেশী পছন্দ করতেন। যদি সত্যি সত্যি তিনি ক্যারিয়ার সুইচ করে বন্ড ভিলেন হিসেবে আবির্ভূত হতেন, তবে সেই মুভিতেই আমাদের এজেন্ট ‘জিরো জিরো সেভেন’ এর দফা-রফা হয়ে যেতো। ব্লু-প্রিন্ট চুরি করতে ভিঞ্চির দুর্ভেদ্য দুর্গে ঢুকতে গিয়েই হয়তো সোলার টাওয়ারের রশ্মিতে বেঘোরে মারা পড়তো, না হয় ক্লাস্টার বোমায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কিংবা ব্লু-প্রিন্ট চুরি করে ট্যাংকে চড়ে পালানোর সময় হয়তো রোবট আর্মির সামনে পড়ে দফা-রফা হয়ে যেতো। অথবা কে জানে, মুভির শেষ ফাইটে হয়তো স্বয়ং ভিঞ্চি তার উড়ুক্কু যানে করে জিরো জিরো সেভেনকে ধাওয়া করতেন আর মেশিন গানের গুলিতে এজেন্টের এমনভাবে দফা-রফা করে দিতেন যে ‘বন্ড’ মুভির কোনো সিকুয়েল বানানোরও আর সুযোগ থাকতো না!

"মাই নেইম ইজ ভিঞ্চি......লিওনার্দো দি স্যার পিয়েরো দ্যা ভিঞ্চি!"

“মাই নেইম ইজ ভিঞ্চি……লিওনার্দো দি স্যার পিয়েরো দ্যা ভিঞ্চি!”

(সমাপ্ত)

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

2 মন্তব্য on "কেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ একজন বন্ড ভিলেন হবার জন্যে উপযুক্ত – শেষ পর্ব"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
Moon Rehman
অতিথি

দারুন একটা লেখা পড়ে খুবই ভালো লাগলো। আশা করি এমন লেখা অব্যহত থাকবে।

Rajib
সদস্য

আমি একটা জিনিস ভেবে প্রায়ই অবাক হই যে, অতীতে যারা মনিষী ছিলেন তারা অনেকেই অনেক গুলো শাখায় পৃথক ভাবে অবদান রেখেছেন। এরিস্টটল বা ভিঞ্চি এর কথাই ধরা যাক। এক জন মানুষ কতটা প্রতিভাবান হলে সাহিত্য দর্শন, বিজ্ঞান সব গুলো নিয়ে কাজ করতে পারেন!!!

wpDiscuz