মেক্সিকো উপসাগরে বিপি (ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম) এর দুর্ঘটনা – কী ঘটেছিলো আসলে?

২০১০ সালের ২০শে এপ্রিল, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ তেল বিপর্যয় ঘটে গিয়েছিলো। প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দূষিত করে ফেলেছিলো মেক্সিকো উপসাগর। ১২৭ কর্মীর মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু ঘটেছিলো, ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে দেখা দিয়েছিলো মারাত্মক সব ত্রুটি। কিন্তু কেন ঘটেছিলো এমন? আবারো কি ঘটতে পারে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক ঘটনা?

image

ডীপওয়াটার হরাইজন – বিপি এর মালিকানাধীন এবং ট্রান্সওশান দ্বারা পরিচালিত ড্রিলিং কোম্পানি – ড্রিলিং করছিলো মেক্সিকো উপসাগরের Macondo Prospect-এ, ৫০০০ ফুট গভীরে। তখনই পানি, কাদা, তেল, আর গ্যাসের একটা উত্তাল তরঙ্গ প্রবেশ করলো কূপের মধ্যে। সাথে সাথে সেটা উঠে এলো পানির উপরিভাগে, জ্বলে উঠলো, দুটো বিস্ফোরণ ঘটালো, আর ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ডুবিয়ে দিলো পুরো কাঠামোটাকে।

মার্চের ৮ তারিখের “কিক”টাকেই প্রথম সাবধানবাণী হিসেবে ধরা উচিৎ ছিলো। “কিক” জিনিসটা হচ্ছে কূপের মধ্যে হঠাৎ করে অতিরিক্ত পরিমাণ হাইড্রোকার্বন ঢুকে পড়া, যেটাকে তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দিতে হয়। শক্তিশালী কিক পড়লে, তেল আর গ্যাস সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে এসে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, মুহূর্তের মধ্যে ড্রিলিং জাহাজ আর প্রাণ, সব ধ্বংস করে দিতে পারে। যাই হোক, কেন জাহাজের ক্রু-রা এটাকে সামাল দিতে এতো দেরি করলো, সেটা নিয়ে বিপি কখনোই তদন্ত করেনি; আর ব্যাপারটা কখনোই পাবলিকের সামনে আনা হয়নি।

২০শে এপ্রিলে পৌঁছানোর আগে, বিপি নিজেদের প্ল্যান চেঞ্জ করে কূপের ওপর সিমেন্ট দিয়ে একটা ঢাকনা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। এতে করে প্রসেসটা আরো জটিল তো হলোই, পাশাপাশি ঝুঁকিও আরো বেড়ে গেলো। মনে করা হচ্ছে, মূলত এই কারণেই নেমে এসেছিলো সেই ভয়াবহ দুর্যোগ।

দুর্যোগের দিনে, অয়েল সার্ভিস কোম্পানী Halliburton, বিপির নতুন নির্দেশ মোতাবেক সেই সিমেন্টের কাজটা করছিলো। সিমেন্টের বাঁধাই কতটা শক্তিশালী হলো, সেটা যাচাই করার জন্য যে টেস্ট করা হয়, সেটাকে বলা হয় নেগেটিভ টেস্ট। ভুলভাল রেজাল্ট আসার পরেও কর্মীরা সেটা ধরতে পারেনি। একসাথে বেশ কিছু ড্রিলিং অপারেশন চলছিলো বলে এমনটা ঘটে থাকতে পারে। তাহলে এটারও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে কেন হাইড্রোকার্বনের অতিরিক্ত প্রবাহ সনাক্ত করার পরেও কর্মীরা আরেকটা জরুরি পরীক্ষা (Critical Flow Meter Test) বাদ দিয়ে গেলো। যেটা কারোই চোখে পড়লো না, সেটা হচ্ছে – সিমেন্টের বাঁধাই কূপটাকে ঢেকে দেয়ার জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট ছিলো না। সেই সন্ধ্যাতেই আবরণটা ধসে পড়লো।

যখন অতিরিক্ত পরিমাণ হাইড্রোকার্বন কূপ বেয়ে উঠে এলো, তখন কর্মীরা সেটা থামানোর জন্য Blow Out Preventer (BOP) চালালো। যদিও আইন মোতাবেক প্রয়োজনীয় সার্ভিসিং করানো হয়নি, তারপরেও BOP চালু হয়েছিলো। যদি এটা ঠিকমতো কাজ করতো, তাহলে এটা পাইপটাকে কেটে দিয়ে কূপটা বন্ধ করে দিতো। যাই হোক, বিপি বা গ্যাস ইন্ডাস্ট্রির কেউই ঐ সময়ে জানতো না যে, এ ধরনের ব্যাপক চাপে ড্রিল পাইপ বেঁকে যেতে পারে। তাই হলো শেষ পর্যন্ত, কূপের মুখ বন্ধ করতে পারলো না BOP. হাইড্রোকার্বন প্রবাহিত হতেই থাকলো, পৌঁছে গেলো সমুদ্রপৃষ্ঠে, এবং বিস্ফোরিত হলো।

হ্যালিবার্টন, ট্রান্সওশান, এবং বিপি – সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, Bureau of Ocean Energy Management, Regulation and Enforcement এর প্রণীত আইন ভঙ্গের কারণে। যদি ঠিকঠাকমত সবগুলো নিয়ম মেনে চলা হতো, তাহলে এই বিপর্যয় এড়ানো যেতো বলে বলা হয়েছে। বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে বলা হলো, কূপের ঢাকনা ধসে পড়া; অবশ্য বিপি’র বাজে ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি যাচাই, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবকে সেই ধসে পড়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এরপর থেকে, নিরাপত্তা আইন আরো জোরদার করা হয়েছে, নতুন প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে যাতে এই মাত্রার বিপর্যয় ঠেকানো যায়। সমস্যা হচ্ছে, যখন সব জায়গাতেই খরচ কমাতে চাইবেন, ঝুঁকি নেয়াটাকে সাধারণ ব্যাপার মনে করবেন, তখন এ ধরনের সম্ভাবনার পুনরাবৃত্তি ঘটা অসম্ভব কিছু নয়।

References:
http://1.usa.gov/1lbAqU4http://bit.ly/1Gf3d2t,http://bit.ly/1fnOq9S

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz