কেন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা জরুরি?

প্রাণীজগতের কোনো প্রাণীই চিরকালের জন্য পৃথিবীতে বিরাজ করতে আসেনি। প্রাকৃতিক ভাবেই বিবর্তনের একটি অন্যতম ধাপ হল প্রজাতির বিলুপ্তি। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়া যদি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিবর্তনীয় ঘটনা হয়, তাহলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে এতো আলোচনা কেন? সুন্দরবনের বাঘ সব মরে ভূত হয়ে গেলে অন্য কোনো প্রাণীই না হয় আমাদের গৌরবের প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে! আজকের এই পোস্টে আলোচনা করবো কেন সম্প্রতি কেনিয়াতে সাদা গণ্ডার প্রজাতির শেষ কর্ণধারের মৃত্যুতে আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিৎ।

উত্তুরে সাদা গণ্ডার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এই প্রজাতির শেষ পুরুষ প্রাণীটির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ছবিটি inhabitat.com থেকে সংগ্রহকৃত

পৃথিবীর আদি থেকেই অসংখ্য প্রজাতি আলোর মুখ দেখেছে একই সাথে হারিয়েও গিয়েছে কালের গহবরে। আমাদের দেশের মা-বাবারা একটা উপদেশমূলক কথা ব্যবহার করেন, “সবকিছুরই সঠিক সময় আছে”। একই ভাবে, একটি প্রজাতির সামগ্রিকভাবে বিলুপ্ত হতে একটি নির্দিষ্ট সময় যাপন প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, একেকটি প্রজাতি পৃথিবীতে অন্তত ৫ থেকে ১০ লক্ষ বছর টিকে। এই সময়েই এরা বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতির উন্মেষ ঘটায়। এভাবেই সুদূর অতীত থেকে জীববৈচিত্র্য টিকে থাকছে। কোনো কারণে হুট করে কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেলে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানে একটি বিশাল ফাঁকা স্থানের সৃষ্টি হয়। আর এই শূন্যস্থান পূরণ হতে লেগে যায় আরো কয়েক লক্ষ বছর। আমাদের এই নীল গ্রহ ইতিমধ্যে পাঁচ বার বড় ধরনের জীবচিত্র্যের বিলুপ্তির মুখোমুখি হয়েছে। সেই যে, সেবার ডাইনোসরেরা সব উধাও হল? সেরকমই! কিন্তু এর আগের সব বারের চেয়ে বর্তমানের জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তির হারের প্রকৃতি অনেকাংশেই ভিন্ন। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানবসৃষ্ট কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আরে এই ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার হার এতটাই বেশি যে, নতুন প্রজাতির উন্মেষে যে সময়টুকু প্রয়োজন, সেটা তারা পাচ্ছেই না। ফলে, প্রকৃতিতে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে কিন্তু তা পূরণ করা হয়ে উঠছে না।

আমি বিশ্বাস করি, আপনি যদি এই অনুচ্ছেদ পর্যন্ত পড়ে থাকেন, জীববৈচিত্র্যের টিকে থাকা না থাকা আপনাকে কিছুটা হলেও বিচলিত করেছে। তাও ধরে নিলাম একজন ঘাড়ত্যাড়া মানুষ মাথা ঝাঁকিয়ে বলছে, “এত ধরনের পশু-পাখি/ পোকা-মাকড়/গাছপালার কী দরকার? গাছে গাছে ঝুলে বেড়ানো সব দুষ্টু বানর দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে না, তাই তাদের উচ্ছেদ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনই যৌক্তিক”। এই প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে রাখি, প্রাণীবৈচিত্র্যের সাথে জীবসম্পদ ও বাস্তুসংস্থানীয় সেবার নিবিড় সংযোগ রয়েছে। জীবসম্পদ শব্দটিই মূল কথা বলে দেয়। জীবজগতের বিভিন্ন প্রজাতি বিভিন্ন ভাবে আমাদের, অর্থাৎ মানবপ্রজাতির, সম্পদ হয়ে উঠছে। খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ কী না পাচ্ছি আমরা জীবজগৎ থেকে! সেই তুলনায় বাস্তুসংস্থানীয় সেবা কথাটি একটু অপরিচিত লাগতে পারে। প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের বিভিন্ন প্রজাতি নিজেদের টিকে থাকার জন্য যেসব জৈবিক কর্ম সম্পাদন করে, আর আমরা নিজেদের স্বার্থে মুফতে সেগুলোর ফায়দা লুটি, সেগুলোই হচ্ছে বাস্তুসংস্থানীয় সেবা। এই যে গাছ অক্সিজেন প্রস্তুত করে, সেটা তো তারা নিজেদের স্বার্থেই করে। মাঝে দিয়ে আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করছি। পতঙ্গ যে পরাগায়ন ঘটাচ্ছে, তা পতঙ্গ ও শস্যের নিজেদের টিকে থাকতেই জরুরি। মাঝে দিয়ে আমরা হচ্ছি সুবিধাভোগী। তো, এইভাবে জীব জগতের অন্যান্য প্রজাতি আমাদেরকে যে সেবা দিচ্ছে সেটার আর্থিক হিসেব করলে দেখা যায়, অংকটা নিতান্ত কম না। অস্ট্রেলিয়াতে শুধুমাত্র একটি প্রাণী প্রজাতি, কোয়ালার কারণে ১৯৯৭ সালে দেশটির পর্যটন বিভাগ প্রায় ৭৫০ লক্ষ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছে। তাহলে, আমাদের দেশের পর্যটনে বাংলা লজ্জাবতী বানরের অবদানের অংকটা কত হতে পারে?

কিউটনেসের দাম লক্ষ ডলার!

কোটি টাকার কিউটনেস!

মানবিকতার খাতিরেই একটি মৃত্যু মন খারাপ করে দিতে সক্ষম। সেটা সুদূর আফ্রিকার গণ্ডার কিংবা বাসার সামনের রাস্তার কুকুর- যাই হোক না কেন। দিন শেষে একটা প্রাণ তো! না, আমি নৈতিক শিক্ষা ক্লাস কিংবা জীবে দয়া করে ঈশ্বর সেবার মত বাণী প্রচারে আসিনি। প্রসঙ্গতই, নৈতিকতার বিচারে মানুষ, জীবজগতের অন্যতম এক প্রাণী হয়ে নিজেদের স্বার্থে অন্যান্য প্রাণীদের এই বিপুলা ধরণী থেকে চিরকালের জন্য সরিয়ে ফেলার কোনো অধিকার রাখে না। অবশ্য আপনি যদি, জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে বিশ্বাসী হন তাহলে ভিন্ন কথা। আর সেই নীতি অনুসারে, পরের বার সগোত্রীয় কারো উপর আক্রমণ হলে হ্যাশট্যাগ দেয়ার আগে না হয় নিজের নীতি আরেকবার আউড়ে নিতে পারেন।

তাহলে আমাদের কেন বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন? সহজ ভাষায়, যেন নতুন প্রজাতি উন্মেষের যথেষ্ট সময় পায় এবং বিবর্তন প্রক্রিয়া চলমান থাকে- সেই জন্য। পরিবেশবিজ্ঞানের অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জীববৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানবসমাজের উপকারে আসে। একটি স্থিতিশীল পরিবেশের সাথে মানবপ্রজাতির তথা মানুষের ভালো থাকার সম্পর্ক রয়েছে। আর এসমস্ত লাভ ক্ষতির উর্ধ্বে উঠে নীতিগত ভাবেই, জীবজগতের অন্য প্রাণীদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া বুদ্ধিমান প্রাণি হিসেবেই আমাদের জন্য মোটেই মানানসই নয়।

তথ্যসূত্রঃ

১. Northern white rhino: Last male Sudan dies in Kenya

২. A Primar of Conservation Biology by Richard B. Primack

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz