তবুও পৃথিবী ঘুরবেঃ স্রোতের বিপরীতের গ্যালিলিও

আমার যতদূর মনে পড়ে, সময়টা ২০০২ সালের দিকে। তখন আমার বয়স বোধহয় আট বছর। আমাদের পরিবারে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়াকে উৎসাহ দেওয়া হতো, আর সেই উৎসাহ থেকেই আমার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। বন্ধু আর কাজিনদের মধ্যে তখন একধরনের প্রতিযোগিতা চলতো —কে কতগুলো বই পড়েছে। আমার এক আত্মীয়ের বাসায় প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি বই ছিল।

মূলত গল্পের বই বা কমিকসই বেশি পড়া হতো। তবে সেই সময়েই আমি একটি বই কিনেছিলাম—নাম ছিল বিজ্ঞানীদের গল্প’। ওই বই থেকেই প্রথম জানতে পারি মেরি কুরি, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, চার্লস ডারউইন, আলফ্রেড নোবেলদের কথা। আমার মনে হয়, প্রায় সব মানুষই ছেলেবেলায় আকাশের চাঁদ-তারা দেখতে ভালোবাসে—আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। তাই হয়তো সেই বইয়ের পাতায় গ্যালিলিও গ্যালিলেই আমার কাছে একটু আলাদা হয়ে উঠেছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যার সম্পর্কে আমি পড়েছি।

সত্যি বলতে, এখনও আমি তাঁর প্রতি সমানভাবে মুগ্ধ। একসময় হয়তো তাঁর আবিষ্কার, তত্ত্ব বা সমীকরণগুলো আমাকে বেশি আকৃষ্ট করত; এখন এই ৩২ বছর বয়সে এসে তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হই তাঁর আগ্রহ, পরিশ্রম, একাগ্রতা এবং বিশেষ করে তাঁর সাহসে। কারণ, আমি জানি—আমি গ্যালিলিওর মতো সাহসী নই।

সঙ্গীতজ্ঞ পিতার ঘরে জন্ম নেওয়া গ্যালিলিও পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিলেন। পরে গণিতবিদ অস্তিলিও রিচ্চির উৎসাহে গণিতে মনোনিবেশ করেন, যদিও তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেননি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি পিসার হেলানো টাওয়ার থেকে বস্তু ফেলে বিখ্যাত পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন বলে প্রচলিত আছে।

গণিত অধ্যয়নের সময়ই তিনি প্রায় আঠারোশ বছর আগের আর্কিমিডিসের কাজ নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা শুরু করেন। ‘হিরোর মুকুট’ সমস্যাটি ছিল সেই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য আলোচনা, যা পরবর্তীতে তাঁকে হাইড্রোস্ট্যাটিক ব্যালান্স তৈরি করতে সহায়তা করে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিন বছর পর পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের সুযোগ পান। সেখানে প্রায় ১৮ বছর কাটান—যে সময়টিকে তিনি তাঁর জীবনের “সেরা সময়” বলে উল্লেখ করেছিলেন।

এই সময়েই তিনি তখনকার সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ ( ১৮–২০ গুণ বর্ধিত ক্ষমতাসম্পন্ন) নির্মাণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা অসংখ্য নক্ষত্রের সমষ্টি; তিনি চাঁদের পৃষ্ঠের অসমতা, শনি গ্রহের বলয়, সূর্যকলঙ্ক, এবং বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণরত উপগ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। বৃহস্পতির উপগ্রহগুলো দেখেই তিনি বলেন যে সবকিছু তো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে না। তাহলে পৃথিবী যে সবকিছুর কেন্দ্র, এমনটা নাই হতে পারে।

গ্যালিলিওর নির্মিত কম্পাস, দূরবীন এবং তার নিজ হাতে অঙ্কিত চাঁদের বিভিন্ন দশার চিত্র

ধারণা করা হয়, এই সময় থেকেই গ্যালিলিও কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের মতবাদ সমর্থন করতেন। কেপলারের কাছে লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে তার আভাস পাওয়া যায়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে কোপার্নিকাসের অনুকল্প নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করছেন এবং এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন—যেমন অপমান ও বঞ্চনার শিকার কোপার্নিকাস হয়েছিলেন, তাকেও হয়তো তেমন পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

এই কারণেই তিনি দীর্ঘদিন তাঁর ক্লাসে সরাসরি কোপার্নিকাসের মতবাদ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকেন। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর আলোচনা চলত। তাঁর মতে, কোপার্নিকাসের গণিত ও ধারণা টলেমি বা অ্যারিস্টটলের পৃথিবীকেন্দ্রিক তত্ত্বের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগত ও যৌক্তিক ছিল। তবুও তিনি প্রকাশ্যে এই মতবাদ সমর্থনে এগিয়ে আসেননি, কারণ তাঁর কাছে তখনও পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না এবং তিনি চার্চের বিরাগভাজন হতে চাননি। তবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন মানুষের সাথে এই বিষয়টি নিয়ে বিষদ তর্ক করার কথা শোনা যায়, যেখানে উনি কোপার্নিকাসের ধারণার সরাসরি সমর্থনের কথা না বললেও এটার সপক্ষে যে শক্ত যুক্তি রয়েছে সেগুলো নিয়ে কথা বলতেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি রেহাই পাননি। ডমিনিকান ফ্রায়ার (ভগবানের বিশ্বস্ত) নামের এক কট্টরপন্থী গোষ্ঠী তাঁকে মৌখিকভাবে আক্রমণ শুরু করে এবং ধর্মবিরোধী বলে অভিযুক্ত করে। তাঁর বিরুদ্ধে চার্চে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। এর ফলস্বরূপ ১৬১৬ সালে কোপার্নিকাসের বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ প্রত্যাখ্যান করা হয়, কারণ তা তৎকালীন ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

সাত বছর পরে গ্যালিলিওর ঘনিষ্ঠ পরিচিত কার্ডিনাল মাফেও বার্বেরিনি পোপ নির্বাচিত হন (পোপ আরবান অষ্টম)। গ্যালিলিও মনে করলেন, এবার হয়তো তাঁর মতামত প্রকাশের উপযুক্ত সময় এসেছে। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ডায়লগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস’ রচনা করেন, যেখানে সূর্যকেন্দ্রিক ও পৃথিবীকেন্দ্রিক—দুই মতবাদকে সংলাপের আকারে উপস্থাপন করা হয়। চার্চের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনেই বইটি ইতালীয় ভাষায় প্রকাশিত হয়, যাতে সাধারণ মানুষও তা পড়তে পারে।

গ্যালিলিওর লেখা বইটি, যেটি পরে নিষিদ্ধ করা হয়

কিন্তু বই প্রকাশের পরেই তাঁর আশঙ্কা সত্যি হয়। তাঁকে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে তাঁর মতবাদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয় এবং সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ সমর্থন না করার অঙ্গীকার করাতে বাধ্য করা হয়। তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থায় জীবন কাটানোর আদেশ দেওয়া হয়।

প্রচলিত আছে, রায় ঘোষণার পর তিনি নাকি ফিসফিস করে বলেছিলেন—
“E pur si muove” — অর্থাৎ, “তবুও সে (পৃথিবী) ঘুরবে।”
যদিও ঐতিহাসিকভাবে এই উক্তিটি তিনি সত্যিই বলেছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পরে আঁকা একটি প্রতিকৃতিতে প্রথম এই বাক্যাংশটি দেখা যায়।

জীবনের শেষভাগ ছিল কষ্টকর। তিনি অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তবুও গৃহবন্দি অবস্থায় তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন—ডিসকোর্সেস অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্যাল ডেমনস্ট্রেশনস রিলেটিং টু টু নিউ সায়েন্সেস’—যেখানে তিনি বলবিদ্যা ও গতিবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো সুসংহতভাবে উপস্থাপন করেন।

১৬৪২ সালে গ্যালিলিও মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তাঁকে ধর্মবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাই যথাযথ রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় মর্যাদা ছাড়াই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

পরবর্তীকালে, ১৯৯২ সালে, প্রায় ৩৫০ বছর পরে ভ্যাটিকান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে গ্যালিলিওর প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল।

টাইকো ব্রাহে তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, কোপার্নিকাস সৌরজগত সম্পর্কে তাঁর নতুন ধারণার মাধ্যমে এবং কেপলার তাঁর বিখ্যাত সূত্রসমূহের মাধ্যমে জ্যোতির্বিদ্যাকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক চর্চা থেকে একটি সুসংগঠিত বিজ্ঞানে উন্নীত করেছিলেন। আর গ্যালিলিও—একজন প্রকৃত দার্শনিকের মতো—প্রকৃতির সমস্যাগুলি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন এবং সেগুলোর পরীক্ষামূলক সমাধান করার সাহসী প্রয়াস নিয়েছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিলেন। হয়তো তিনি নিজে কষ্ট সহ্য করেছেন, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থাপন করে গেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

গ্যালিলিওর জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্রঃ

Galilei, G., & Seeger, R. J. (1966). Galileo Galilei, his life and his works. Oxford.

McMullin, E. (1978). The conception of science in Galileo’s work. New perspectives on Galileo, 209-257

Zanatta, A., Zampieri, F., Basso, C., & Thiene, G. (2017). Galileo Galilei: science vs. faith. Global cardiology science & practice, 2017(2), 10.

Abetti, G. (1931). Galileo Galilei as a Pioneer in the Physical Sciences. Publications of the Astronomical Society of the Pacific, 43(252), 130-144.

Comments

Avatar

Md Abdullah Al Zaman (Proyash)

লিখতে ভালোই লাগে। আর বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির জন্য বিজ্ঞানযাত্রা একটা চমৎকার জায়গা। তবে নিয়মিত লেখালেখি করা হয়ে ওঠেনা। চেষ্টা করি তবুও।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x